<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>Religion &amp; Philosophy &#8211; ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন</title>
	<atom:link href="https://mamoon.net/category/opinion/religion-philosophy/feed" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://mamoon.net</link>
	<description>mamoon.net</description>
	<lastBuildDate>Sat, 10 Oct 2026 23:50:39 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=7.1.3</generator>

<image>
	<url>https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/05/Logo-Mamoon-Vai-150x150.png</url>
	<title>Religion &amp; Philosophy &#8211; ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন</title>
	<link>https://mamoon.net</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>আমার হজযাত্রা ২০২৪</title>
		<link>https://mamoon.net/opinion/1394</link>
					<comments>https://mamoon.net/opinion/1394#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[admi@mamoo252]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 09 Oct 2026 06:02:19 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Opinion]]></category>
		<category><![CDATA[Religion & Philosophy]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://mamoon.net/?p=1394</guid>

					<description><![CDATA[১. অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশি কোটায় হজযাত্রা বাংলাদেশি হজ কোটায় হজের ভিসা নিতে হয় বাংলাদেশি পাসপোর্টে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া থেকে যাত্রার সময় অস্ট্রেলীয় নাগরিক হিসেবে অস্ট্রেলীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হয়। ফলে যাত্রাপথে...]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>অস্ট্রেলিয়া</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>বাংলাদেশি</strong> <strong>কোটায়</strong> <strong>হজযাত্রা</strong></p>
<p>বাংলাদেশি হজ কোটায় হজের ভিসা নিতে হয় বাংলাদেশি পাসপোর্টে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া থেকে যাত্রার সময় অস্ট্রেলীয় নাগরিক হিসেবে অস্ট্রেলীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হয়। ফলে যাত্রাপথে দুটি দেশের পাসপোর্ট কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা নিয়ে অনেকের মনে সংশয় ছিল। কারও কারও ধারণা ছিল, এভাবে ভ্রমণ করা সম্ভব নয়।</p>
<p>তবে এ বছর হজ পালন করতে গিয়ে দেখলাম, বিষয়টি নতুন কিছু নয়। দ্বৈত নাগরিকত্বধারী অনেকেই আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সময় দুটি দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে থাকেন। বিমানবন্দরের চেক-ইন কাউন্টারের অধিকাংশ কর্মীরই এ বিষয়ে ধারণা থাকার কথা। তবে বোর্ডিং পাস ইস্যু করার সময় কোনো কর্মকর্তা ইতস্তত করলে অন্য কাউন্টারের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা কিংবা সুপারভাইজারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।</p>
<p>হজযাত্রীদের জেদ্দা বিমানবন্দরে সৌদি আরবের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে হয়। সিডনি কিংবা অস্ট্রেলিয়ার অন্য কোনো শহর থেকে জেদ্দায় সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় যাত্রাপথে সাধারণত একটি ট্রানজিট নিতে হয়। কোন এয়ারলাইনসের টিকিট কাটছেন, তার ওপর নির্ভর করে ট্রানজিটের স্থান নির্ধারিত হয়। যেমন, ইতিহাদ এয়ারওয়েজে গেলে আবুধাবিতে এবং কাতার এয়ারওয়েজে গেলে দোহায় ট্রানজিট নিতে হয়।</p>
<p>এ ছাড়া হজযাত্রায় দুটি ভিন্ন এয়ারলাইনসের ফ্লাইটও ব্যবহার করা যায়। যেমন, আমি মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসে কুয়ালালামপুর যাই এবং সেখান থেকে সৌদিয়া এয়ারলাইনসে জেদ্দা পৌঁছাই।</p>
<p><strong>মূল </strong><strong>বিষয়টি </strong><strong>হলো, </strong><strong>প্রতিটি </strong><strong>দেশের </strong><strong>ইমিগ্রেশন </strong><strong>প্রক্রিয়ায় </strong><strong>প্রবেশ (Entry) </strong><strong>ও </strong><strong>প্রস্থান (Exit) </strong><strong>করার </strong><strong>সময় </strong><strong>সংশ্লিষ্ট </strong><strong>দেশের </strong><strong>জন্য </strong><strong>উপযুক্ত </strong><strong>একই </strong><strong>পাসপোর্ট </strong><strong>ব্যবহার </strong><strong>করতে </strong><strong>হবে</strong><strong>।</strong> কোনো দেশের ইমিগ্রেশনে প্রবেশের সময় এক পাসপোর্ট এবং প্রস্থানের সময় অন্য পাসপোর্ট ব্যবহার করলে রেকর্ডের অসংগতি তৈরি হতে পারে। তাই প্রতিটি দেশের প্রবেশ ও প্রস্থানের ক্ষেত্রে একই পাসপোর্ট ব্যবহার করাই নিয়মসম্মত পদ্ধতি।</p>
<p>অন্যদিকে, এয়ারলাইনসের চেক-ইন প্রক্রিয়া ইমিগ্রেশন থেকে আলাদা। বোর্ডিং পাস ইস্যু করার আগে এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ যাত্রীর পরিচয়পত্র, গন্তব্য দেশে প্রবেশের অনুমতি এবং প্রয়োজনীয় ভিসা যাচাই করে।</p>
<p>অস্ট্রেলিয়ার যে শহর থেকে যাত্রা শুরু করবেন, সেখানকার বিমানবন্দরের চেক-ইন কাউন্টারে টিকিটসহ অস্ট্রেলীয় ও বাংলাদেশি, দুটি পাসপোর্টই দেখাতে হবে। স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে, বাংলাদেশি পাসপোর্টে আপনার সৌদি আরবের হজ ভিসা রয়েছে। এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে ট্রানজিট গন্তব্য এবং সেখান থেকে জেদ্দা যাওয়ার জন্য বোর্ডিং পাস ইস্যু করবে। তবে সংযোগকারী ফ্লাইট, ট্রানজিটের নিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের নীতির ওপর নির্ভর করে প্রক্রিয়াটি ভিন্ন হতে পারে।</p>
<p>অস্ট্রেলিয়া ত্যাগের সময় অস্ট্রেলীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হবে। ট্রানজিট দেশের ইমিগ্রেশন থাকলে সেখানে সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম অনুযায়ী উপযুক্ত পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হবে। আর সৌদি আরবে প্রবেশের সময় জেদ্দা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ও হজ ভিসা দেখাতে হবে।</p>
<p><strong>সুতরাং, </strong><strong>দ্বৈত </strong><strong>নাগরিকত্বধারীদের </strong><strong>জন্য </strong><strong>দুটি </strong><strong>পাসপোর্ট </strong><strong>ব্যবহার </strong><strong>করে </strong><strong>হজে </strong><strong>যাওয়া </strong><strong>সম্ভব </strong><strong>হলেও </strong><strong>যাত্রার </strong><strong>আগে </strong><strong>সংশ্লিষ্ট </strong><strong>এয়ারলাইনস </strong><strong>এবং </strong><strong>অস্ট্রেলিয়া, </strong><strong>ট্রানজিট </strong><strong>ও </strong><strong>সৌদি </strong><strong>আরবের </strong><strong>কর্তৃপক্ষের </strong><strong>নিয়ম </strong><strong>যাচাই </strong><strong>করে </strong><strong>নেওয়া </strong><strong>জরুরি</strong><strong>।</strong></p>
<p>নিচের লাইন ডায়াগ্রামে পুরো প্রক্রিয়াটি তুলে ধরা হলো।</p>
<p><img fetchpriority="high" decoding="async" class=" wp-image-1446 aligncenter" src="https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/10/h1-300x211.jpg" alt="" width="378" height="266" srcset="https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/10/h1-300x211.jpg 300w, https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/10/h1-768x541.jpg 768w, https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/10/h1.jpg 904w" sizes="(max-width: 378px) 100vw, 378px" /></p>
<p><strong>২</strong><strong>. </strong><strong>দুটি</strong> <strong>পাসপোর্ট</strong> <strong>নিয়ে</strong> <strong>ভ্রমণ</strong><strong>: </strong><strong>অভিজ্ঞতা</strong> <strong>ও</strong> <strong>করণীয়</strong></p>
<p>বাংলাদেশি হজ কোটায় হজের ভিসা নিতে হয় বাংলাদেশি পাসপোর্টে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া থেকে যাত্রার সময় অস্ট্রেলীয় নাগরিক হিসেবে অস্ট্রেলীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হয়। ফলে যাত্রার সময় দুটি দেশের পাসপোর্ট কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা নিয়ে অনেকের মনে সংশয় ছিল। কারও কারও ধারণা ছিল, এভাবে ভ্রমণ করা সম্ভব নয়।</p>
<p>কিন্তু ২০২৪ সালে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের ক্ষেত্রে দুটি পাসপোর্ট ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে কোন দেশের ইমিগ্রেশনে কোন পাসপোর্ট দেখাতে হবে, তা আগে থেকে পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি।</p>
<p>সিডনি থেকে জেদ্দা পর্যন্ত সরাসরি কোনো বিরতিহীন ফ্লাইট না থাকায় সাধারণত মাঝপথে একটি ট্রানজিট নিতে হয়। যেমন, ইতিহাদ এয়ারওয়েজে গেলে আবুধাবি এবং কাতার এয়ারওয়েজে গেলে দোহায় ট্রানজিট নিতে হয়। চাইলে দুটি ভিন্ন এয়ারলাইন ব্যবহার করেও যাত্রা করা যায়। আমি মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসে কুয়ালালামপুর এবং সেখান থেকে সৌদিয়া এয়ারলাইনসে জেদ্দা গিয়েছিলাম।</p>
<p>আমার অভিজ্ঞতায়, যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রবেশ ও বহির্গমনসংক্রান্ত নিয়ম এবং এয়ারলাইনসের পাসপোর্ট যাচাইয়ের শর্ত জেনে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় সাধারণত একই পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হয়। এক পাসপোর্টে প্রবেশ করে অন্য পাসপোর্টে বের হওয়ার চেষ্টা করলে ইমিগ্রেশনে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।</p>
<p>অস্ট্রেলিয়ার বিমানবন্দরে চেক-ইন করার সময় আমি দুটি পাসপোর্টই সঙ্গে রেখেছিলাম। কর্মীদের জানিয়েছিলাম, বাংলাদেশি পাসপোর্টে আমার হজের ভিসা রয়েছে। বোর্ডিং পাস ইস্যু করার সময় কোনো কর্মী বিষয়টি নিয়ে দ্বিধায় পড়লে অভিজ্ঞ সহকর্মী বা সুপারভাইজারের পরামর্শ নেওয়া ভালো।</p>
<p>সাধারণভাবে অস্ট্রেলিয়া থেকে বহির্গমনের সময় অস্ট্রেলীয় পাসপোর্ট এবং সৌদি আরবে প্রবেশের সময় বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হয়। তবে যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও এয়ারলাইনসের কাছ থেকে নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী বিষয়টি নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত।</p>
<p><strong>৩</strong><strong>. </strong><strong>বাংলাদেশি</strong> <strong>কোটায়</strong> <strong>হজে</strong> <strong>যাওয়ার</strong> <strong>প্রস্তুতি</strong></p>
<p>বাংলাদেশি কোটায় হজে যেতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আগে থেকে সম্পন্ন করতে হয়। ২০২৪ সালের আমার অভিজ্ঞতায় প্রক্রিয়াটি ছিল নিম্নরূপ।</p>
<p><strong>১</strong><strong>. </strong><strong>বাংলাদেশি</strong> <strong>পাসপোর্ট</strong><strong>:</strong> বাংলাদেশি হজ কোটায় ভিসা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রয়োজন।</p>
<p><strong>২</strong><strong>. </strong><strong>প্রাক্‌</strong><strong>&#8211;</strong><strong>নিবন্ধন</strong><strong>:</strong> সংশ্লিষ্ট হজ এজেন্সির মাধ্যমে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রাক্‌-নিবন্ধন করতে হয়।</p>
<p><strong>৩</strong><strong>. </strong><strong>হজ</strong> <strong>প্যাকেজ</strong> <strong>নির্বাচন</strong><strong>:</strong> এজেন্সিগুলো সাধারণত ভিআইপি, এ, বি, সি ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণির প্যাকেজ দিয়ে থাকে। আর্থিক সামর্থ্য এবং প্যাকেজের সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।</p>
<p><strong>৪</strong><strong>. </strong><strong>বায়োমেট্রিক</strong> <strong>নিবন্ধন</strong><strong>:</strong> সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত অ্যাপ Saudi Visa Bio বা পদ্ধতিতে বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।</p>
<p><strong>৫</strong><strong>. </strong><strong>হজ</strong> <strong>ভিসা</strong><strong>:</strong> আমার ক্ষেত্রে এজেন্সি বাংলাদেশি পাসপোর্টের প্রথম পাতার স্ক্যান কপি নিয়ে ভিসার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল। মূল পাসপোর্ট দেশে পাঠাতে হয়নি।</p>
<p><strong>৬</strong><strong>. </strong><strong>টিকা</strong> <strong>ও</strong> <strong>মেডিকেল</strong> <strong>সার্টিফিকেট</strong><strong>:</strong> ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতায় ইনফ্লুয়েঞ্জা ও মেনিনজোকক্কাল (Meningococcal A,C,Y,W-135) টিকা নেওয়া এবং নির্ধারিত মেডিকেল সার্টিফিকেট সংগ্রহের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমাদের এজেন্সি বাংলাদেশ থেকে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা করেছিল। ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য আমরা অস্ট্রেলিয়াতেও টিকা নিয়েছিলাম। তবে টিকার ধরন, সনদ এবং গ্রহণযোগ্যতার নিয়ম প্রতিবছর পরিবর্তিত হতে পারে। তাই যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি।</p>
<p><strong>৭</strong><strong>. </strong><strong>নুসুক</strong> <strong>কার্ড</strong><strong>:</strong> সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর নিবন্ধিত হজযাত্রীদের নুসুক কার্ড দেওয়া হয়। রাস্তাঘাটে বা বিভিন্ন চেকপয়েন্টে এটি দেখাতে হতে পারে। তাই কার্ডটি সব সময় সঙ্গে রাখা উচিত। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও একটি পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছিল, যদিও আমার অভিজ্ঞতায় সেটি তেমন কাজে আসেনি।</p>
<p><strong>৪</strong><strong>. </strong><strong>জেদ্দা</strong> <strong>বিমানবন্দরে</strong> <strong>প্রথম</strong> <strong>অভিজ্ঞতা</strong></p>
<p>জেদ্দা বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। ইমিগ্রেশনের কাজ আনুমানিক পাঁচ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়েছিল। লাগেজও দ্রুত হাতে পেয়েছিলাম।</p>
<p>বাংলাদেশি যাত্রীদের সঙ্গে বিমানবন্দরে দুর্ব্যবহারের কথা আগে অনেকের মুখে শুনেছিলাম। তাই কিছুটা শঙ্কা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি। ইমিগ্রেশন থেকে বের হওয়ার সময় আমাদের দলের মাত্র একজনের মেডিকেল সার্টিফিকেট পরীক্ষা করা হয়েছিল।</p>
<p>বিমানবন্দরে নেমেই চোখে পড়ল ইংরেজিতে দক্ষ একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবক। তাঁরা হজযাত্রীদের বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন। মক্কায় আমাদের হোটেলের নাম বলতেই সৌদি মোয়াল্লেম নির্ধারিত বাসে ওঠার ব্যবস্থা করে দিলেন। বাসে উঠে দেখলাম যাত্রীদের জন্য জুস, কেক ও বিস্কুটের প্যাকেট রাখা আছে।</p>
<p>দীর্ঘ যাত্রার পর এমন সহযোগিতা ও আতিথেয়তা সত্যিই ভালো লেগেছিল।</p>
<p><strong>৫</strong><strong>. হজের ফরজ, ওয়াজিব ও প্রকারভেদ</strong></p>
<p>হজের ফরজ কাজ তিনটি:</p>
<p>১. ইহরাম বাঁধা বা হজের নিয়ত করা।<br />
২. আরাফাতের ময়দানে নির্ধারিত সময়ে অবস্থান করা।<br />
৩. তাওয়াফে জিয়ারত বা কাবা শরিফ তাওয়াফ করা।</p>
<p>হজের ওয়াজিব কাজ ছয়টি:</p>
<p>১. মুজদালিফায় নির্ধারিত সময়ে অবস্থান করা।<br />
২. নির্ধারিত দিনে জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করা।<br />
৩. হজের কুরবানি করা (যেসব হজযাত্রীর জন্য প্রযোজ্য)।<br />
৪. ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মাথার চুল মুণ্ডন বা ছোট করা।<br />
৫. তাওয়াফে বিদা বা বিদায়ী তাওয়াফ করা (যাদের জন্য প্রযোজ্য)।<br />
৬. সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাঈ করা।</p>
<p>জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত হজের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমগুলো মূলত পাঁচটি স্থানে সম্পন্ন হয়—মিনা, আরাফাত, মুজদালিফা, জামারাত ও বাইতুল্লাহ শরিফে। এসব স্থানে হজের বিভিন্ন ফরজ ও ওয়াজিব আমল আদায় করতে হয়। হজের কার্যক্রমগুলো নিচের ছবিতে তুলে ধরা হলো।</p>
<p>হজ প্রধানত তিন প্রকার: <strong>কিরান, তামাত্তু ও ইফরাদ।</strong> মক্কার বাইরে থেকে আগত হজযাত্রীরা প্রযোজ্য বিধান ও নিজেদের পরিস্থিতি অনুযায়ী এই তিন প্রকারের যেকোনো একটি পদ্ধতিতে হজ পালন করতে পারেন।</p>
<p><strong>১. কিরান হজ:</strong> মীকাত অতিক্রমের আগে উমরা ও হজ—উভয়ের নিয়তে ইহরাম বাঁধা হয়। একই ইহরাম বজায় রেখে প্রথমে উমরার আমল সম্পন্ন করা হয়। এরপর ইহরাম থেকে মুক্ত না হয়ে হজের নির্ধারিত সময়ে হজের আমলগুলো সম্পন্ন করতে হয়। কিরান হজে কুরবানি করা ওয়াজিব।</p>
<p><strong>২. তামাত্তু হজ:</strong> মীকাত থেকে শুধু উমরার নিয়তে ইহরাম বাঁধা হয়। মক্কায় পৌঁছে উমরার আমল সম্পন্ন করার পর মাথার চুল মুণ্ডন বা ছোট করে ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়া যায়। এরপর একই সফরে হজের নির্ধারিত সময়ে নতুন করে ইহরাম বেঁধে হজের আমলগুলো সম্পন্ন করতে হয়। তামাত্তু হজেও কুরবানি করা ওয়াজিব। আমরা তামাত্তু পদ্ধতিতেই হজ পালন করেছি।</p>
<p><strong>৩. ইফরাদ হজ:</strong> মীকাত থেকে শুধু হজের নিয়তে ইহরাম বাঁধা হয়। মক্কায় পৌঁছে হজের আমল সম্পন্ন করার জন্য ইহরাম অবস্থায় অপেক্ষা করতে হয়। এ পদ্ধতিতে হজের আগে উমরা করা হয় না। নির্ধারিত সময়ে হজের আমলগুলো সম্পন্ন করা হয়। ইফরাদ হজে হজের কারণে কুরবানি করা বাধ্যতামূলক নয়।</p>
<p>হজ পালনের জন্য শারীরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি বৈষয়িক ও মানসিক প্রস্তুতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকারের হজ ব্যবস্থাপনার আওতায় প্রাক্‌-নিবন্ধন সম্পন্ন করার পর এ বছরের জানুয়ারিতেই আমার হজের কোটা নিশ্চিত হয়েছিল। এই নিশ্চয়তা আমাকে মানসিক স্বস্তি দিয়েছিল। ফলে হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে হজের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পেরেছিলাম।</p>
<p><img decoding="async" class="alignnone  wp-image-1447" src="https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/10/h2-300x235.jpg" alt="" width="416" height="326" srcset="https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/10/h2-300x235.jpg 300w, https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/10/h2-90x70.jpg 90w, https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/10/h2.jpg 672w" sizes="(max-width: 416px) 100vw, 416px" /></p>
<p><strong>৬</strong><strong>. </strong><strong>হজ</strong> <strong>এজেন্সি</strong> <strong>নির্বাচন</strong><strong>: </strong><strong>সবচেয়ে</strong> <strong>গুরুত্বপূর্ণ</strong> <strong>সিদ্ধান্ত</strong></p>
<p>অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশি কোটায় হজ পালনের পরিকল্পনা করলে শুরুতেই একটি নির্ভরযোগ্য এজেন্সি নির্বাচন করা জরুরি। ভিসা, নিবন্ধন, আবাসন, পরিবহন এবং হজের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে এজেন্সির কার্যক্রম সরাসরি জড়িত।</p>
<p>হজের সফর আর সাধারণ ছুটি কাটানো এক বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন মুসলমানের গভীর আবেগ, দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এবং আধ্যাত্মিক প্রত্যাশা। বিশেষ করে যাঁরা প্রথমবার হজে যাচ্ছেন, তাঁদের মনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ থাকে। তাঁরা সঠিকভাবে হজের নিয়মকানুন পালন করতে পারবেন কি না, সুস্থ থাকতে পারবেন কি না, কিংবা প্রয়োজনের সময় সাহায্য পাবেন কি না, এসব চিন্তা স্বাভাবিক।</p>
<p>আমার নিজের অভিজ্ঞতায়, হজের সময় সর্দি-জ্বরসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আমার সঙ্গে যাঁরা গিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে একজন দায়িত্বশীল ও অভিজ্ঞ মোয়াল্লেম এবং এজেন্সির কার্যকর সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p>এজেন্সি নির্বাচনের আগে পূর্ববর্তী হজযাত্রীদের সঙ্গে কথা বলা উচিত। তাঁরা প্রতিশ্রুত সেবা পেয়েছিলেন কি না, হোটেলের মান কেমন ছিল, খাবার ও পরিবহনব্যবস্থা কতটা সন্তোষজনক ছিল, মিনার তাঁবুর ব্যবস্থা কেমন ছিল এবং কোনো সমস্যায় এজেন্সি কত দ্রুত সাড়া দিয়েছিল, এসব বিষয়ে খোঁজ নিতে হবে।</p>
<p>হজের মতো বিশাল আয়োজনের ক্ষেত্রে সব প্রতিশ্রুতি শতভাগ পূরণ করা সব সময় সহজ নাও হতে পারে। কিছু বিষয় এজেন্সির নিয়ন্ত্রণের বাইরেও থাকে। কিন্তু আবাসন, খাবার, পরিবহন এবং হজের ফরজ ও ওয়াজিব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সহায়তার মতো মৌলিক দায়িত্বে অবহেলা গ্রহণযোগ্য নয়।</p>
<p>কিছু হজযাত্রীর কাছ থেকে শুনেছি, ভিআইপি তাঁবুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে সেখানে জায়গা পাওয়া যায়নি। কোথাও প্রতিশ্রুত মানের হোটেল পাওয়া যায়নি, কোথাও খাবারের মান ছিল নিম্নমানের। আবার চারজনের থাকার কথা থাকলেও একই কক্ষে পাঁচজনকে থাকতে হয়েছে।</p>
<p>এ ধরনের অভিজ্ঞতা এড়াতে হজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই তাড়াহুড়া না করে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। প্যাকেজের বিজ্ঞাপনে কী লেখা আছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবে কী কী সেবা দেওয়া হবে, তা পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া।</p>
<p><strong>৭</strong><strong>. </strong><strong>হজের</strong> <strong>প্যাকেজ</strong> <strong>নির্বাচন</strong></p>
<p>হজের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হজের কার্যক্রম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা অর্জন করা। ইসলামী বিধান অনুযায়ী হজের ফরজ, ওয়াজিব এবং অন্যান্য আমল সম্পর্কে আগে থেকে জানা থাকলে প্যাকেজ নির্বাচন ও সফরের পরিকল্পনা সহজ হয়। ধর্মীয় বিধানের বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।</p>
<p>হজের প্যাকেজের মূল্য সাধারণত মক্কা ও মদিনার হোটেলের অবস্থান, কক্ষে কতজন থাকবেন, মিনার তাঁবুর শ্রেণি, খাবারের ব্যবস্থা এবং পরিবহনের ওপর নির্ভর করে। ভিআইপি, এ, বি, সি ইত্যাদি বিভিন্ন নামে প্যাকেজ দেওয়া হয়। তবে শুধু প্যাকেজের নাম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কোন সুবিধাটি বাস্তবে পাওয়া যাবে, তা বিস্তারিত যাচাই করা প্রয়োজন।</p>
<p>কিছু এজেন্সি প্রথমে হজযাত্রীদের মদিনায় নিয়ে যায় এবং পরে হজের আগে মক্কায় নিয়ে আসে। হজের মৌসুমে মক্কায় হোটেলভাড়া সাধারণত অনেক বেশি হওয়ায় এভাবে ভ্রমণের খরচ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।</p>
<p><strong>মিনার</strong> <strong>তাঁবুর</strong> <strong>শ্রেণি</strong> <strong>ও</strong> <strong>সুযোগ</strong><strong>&#8211;</strong><strong>সুবিধা</strong></p>
<p>হজের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে মিনায় অবস্থান করতে হয়। তাই মিনার তাঁবুর মান ও অবস্থান হজযাত্রীদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জামারাত থেকে দূরত্ব, তাঁবুতে মানুষের সংখ্যা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, বিছানা ও খাবারের ব্যবস্থা বিবেচনা করে বিভিন্ন শ্রেণির তাঁবু নির্ধারণ করা হয়।</p>
<p>২০২৪ সালের আমার অভিজ্ঞতা ও সে সময়ের প্যাকেজের বিবরণ অনুযায়ী, তাঁবুর কয়েকটি শ্রেণির বৈশিষ্ট্য ছিল নিম্নরূপ।</p>
<p><strong>আল</strong> <strong>কাবশ</strong><strong> (</strong><strong>ভিআইপি</strong><strong>):</strong> জামারাত থেকে আনুমানিক ৩০০ থেকে ৭০০ মিটার দূরে। প্রতি তাঁবুতে সাধারণত ১০ থেকে ২০ জনের থাকার ব্যবস্থা। সোফা-বেড, বালিশ, কম্বল, স্প্লিট এসি এবং বুফে খাবারের ব্যবস্থা ছিল।</p>
<p><strong>ক্যাটাগরি</strong> <strong>এ</strong><strong>:</strong> জামারাতের প্রায় ৬০০ মিটারের মধ্যে অবস্থিত। প্রতি তাঁবুতে আনুমানিক ১০ থেকে ২০ জনের থাকার ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভিআইপি ক্যাম্পের কাছাকাছি।</p>
<p><strong>আল</strong> <strong>মুইসিম</strong><strong>:</strong> অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, তুরস্ক ও ইউরোপের অনেক হজযাত্রীকে এ এলাকায় রাখা হয়। জামারাত থেকে দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। প্রতি তাঁবুতে আনুমানিক ৫০ থেকে ১০০ জন থাকতে পারেন। সুযোগ-সুবিধা সাধারণত ভিআইপি ও এ ক্যাটাগরির মাঝামাঝি।</p>
<p><strong>ক্যাটাগরি</strong> <strong>বি</strong><strong>:</strong> জামারাত থেকে আনুমানিক ৫০০ মিটার থেকে এক কিলোমিটার দূরে। প্রতি তাঁবুতে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা। বিছানা, বালিশ, কম্বল, এসি এবং বুফে খাবার থাকতে পারে।</p>
<p><strong>ক্যাটাগরি</strong> <strong>সি</strong><strong>:</strong> জামারাত থেকে প্রায় এক থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। প্রতি তাঁবুতে ১০০ জনের বেশি হজযাত্রী থাকতে পারেন। সাধারণত পাতলা ফোমের ম্যাট্রেস, ছোট বালিশ, চাদর ও এসি থাকে। খাবার সরবরাহ করা হলেও সব ক্ষেত্রে বুফে ব্যবস্থা থাকে না।</p>
<p><strong>ক্যাটাগরি</strong> <strong>ডি</strong><strong>:</strong> জামারাত থেকে তিন কিলোমিটারেরও বেশি দূরে হতে পারে। প্রতি তাঁবুতে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা থাকতে পারে। সাধারণত পাতলা ফোমের ম্যাট্রেস, ছোট বালিশ, চাদর ও এয়ার কুলার থাকে। খাবারের ব্যবস্থাও তুলনামূলক সাধারণ।</p>
<p>তবে তাঁবুর শ্রেণি, দূরত্ব ও সুযোগ-সুবিধা বছরভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বুকিংয়ের আগে সংশ্লিষ্ট বছরের নির্দিষ্ট প্যাকেজের বিবরণ যাচাই করা জরুরি।</p>
<p>কিছু এজেন্সির মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে তাঁবুর শ্রেণি উন্নীত করার সুযোগ থাকে। যেমন, ক্যাটাগরি ডি থেকে এ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করতে কোনো কোনো এজেন্সি অতিরিক্ত আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত চেয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের পরিবর্তন সব সময় সহজ নয়। এর জন্য সৌদি মোয়াল্লেমের সহযোগিতা এবং এজেন্সির প্রতিনিধির উপস্থিতি প্রয়োজন হতে পারে।</p>
<p>আমি নিজেও তাঁবুর শ্রেণি উন্নীত করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভিআইপি প্যাকেজ না নেওয়ায় এজেন্সি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে আগ্রহী হয়নি। ফলে আমার পক্ষে তাঁবু পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি।</p>
<p>এ অভিজ্ঞতা থেকে বলব, প্যাকেজ নির্বাচনের সময় মিনায় কোন শ্রেণির তাঁবুতে থাকতে হবে, তাঁবুর অবস্থান কোথায় এবং জামারাত পর্যন্ত যাতায়াত কতটা সহজ হবে, তা স্পষ্টভাবে জেনে নেওয়া উচিত।</p>
<p><strong>৮</strong><strong>. </strong><strong>আমাদের</strong> <strong>হজ</strong> <strong>প্যাকেজের</strong> <strong>অভিজ্ঞতা</strong></p>
<p><strong>প্যাকেজের</strong> <strong>মেয়াদ</strong></p>
<p>বাংলাদেশি হজ প্যাকেজের মেয়াদ সাধারণত ১৫ দিন থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত হতে পারে। অস্ট্রেলিয়া থেকে যাওয়া অনেক হজযাত্রী সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে ১৫ অথবা ২১ দিনের প্যাকেজ বেছে নেন। আমরাও স্বল্পমেয়াদি প্যাকেজের মাধ্যমে হজ সম্পন্ন করেছি।</p>
<p><strong>মক্কার</strong> <strong>হোটেল</strong></p>
<p>জেদ্দা বিমানবন্দর থেকে আমাদের সরাসরি মক্কার হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হজের পর আমরা মদিনায় যাই।</p>
<p>আমাদের হোটেলটি মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ১০ মিনিটের হাঁটার দূরত্বে, ক্লক টাওয়ারের পেছনে মিসফালা এলাকায়, বিখ্যাত কবুতর চত্বরের কাছে অবস্থিত ছিল। পুরুষ ও নারীদের আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছিল। প্রতি কক্ষে চারজনের থাকার ব্যবস্থা ছিল। চাইলে তিনজন কিংবা স্বামী-স্ত্রী দুজনের জন্যও কক্ষ নেওয়ার সুযোগ ছিল, তবে সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হতো।</p>
<p>হোটেল নির্বাচন করার সময় শুধু তারকা-মান দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে মসজিদুল হারাম থেকে দূরত্ব বিবেচনা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার মনে হয়েছে। হোটেল যত কাছে হবে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে অংশ নেওয়া এবং তাওয়াফ করার জন্য যাতায়াত তত সহজ হবে।</p>
<p>আমাদের হোটেলের রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন তিন বেলা বাংলাদেশি খাবার দেওয়া হতো। মাছ, মাংস, ডাল, শাকসবজি ও বিরিয়ানির স্বাদ এখনো মনে আছে। মিসফালা এলাকাকে এক অর্থে বাঙালি পাড়া বলা যায়। এখানকার অনেক হোটেলে বাংলাদেশি হাজিরা থাকেন। রাস্তায় বেরোলেই সারি সারি বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি রেস্তোরাঁ চোখে পড়ে।</p>
<p><strong>মদিনার</strong> <strong>হোটেল</strong></p>
<p>মদিনায় আমাদের হোটেলটিও বেশ মানসম্মত ছিল। মসজিদে নববী থেকে মাত্র তিন মিনিটের হাঁটার পথ। সেখানেও তিন বেলা বুফে খাবারের ব্যবস্থা ছিল।</p>
<p><strong>পরিবহন</strong></p>
<p>মক্কা থেকে মিনার ক্যাম্প, মিনা থেকে আরাফাত, জামারাত থেকে মক্কা, মক্কা থেকে মদিনা এবং ফেরার সময় মদিনা থেকে জেদ্দা বিমানবন্দর পর্যন্ত এজেন্সির বাস সার্ভিস ছিল।</p>
<p>মিনা থেকে জামারাত যাওয়ার জন্য ট্রেন ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া হারামাইন হাইস্পিড ট্রেনে মক্কা থেকে মদিনা কিংবা জেদ্দা বিমানবন্দরের দিকে যাওয়া যায়। অনলাইনে টিকিট কেনা সম্ভব হলেও চাহিদা বেশি থাকায় আগেভাগে বুকিং করা ভালো। ট্রেনে বড় আকারের লাগেজ রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে।</p>
<p>এজেন্সির পক্ষ থেকে মক্কা ও মদিনার দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার ব্যবস্থাও ছিল।</p>
<p><strong>মিনার</strong> <strong>তাঁবু</strong> <strong>ও</strong> <strong>মুজদালিফার</strong> <strong>অভিজ্ঞতা</strong></p>
<p>হজের সময় বাংলাদেশি হজযাত্রীদের অনেককে মিনার সাধারণ শ্রেণির তাঁবুতে রাখা হয়। হজযাত্রীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কিছু এলাকায় তাঁবুর সীমানা ও অবস্থান নিয়ে জটিলতা দেখা যায়। আমাদের তাঁবুটিও মুজদালিফা এলাকায় ছিল।</p>
<p>এর একটি সুবিধা ছিল, তাঁবুর অবস্থানের কারণে মুজদালিফায় রাত যাপনের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা তুলনামূলক সহজ হয়েছিল। তাঁবুর মাত্র ৫০ মিটার দূরেই কার্পেট বিছানো একটি জায়গা ছিল, যেখানে রাত কাটানোর ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সেখানে জায়গা না পেয়ে আমরা পাশের রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাই।</p>
<p>মুজদালিফায় জামারাতে নিক্ষেপের জন্য ছোট পাথর সংগ্রহ করতে হয়। তবে আমাদের ক্ষেত্রে মোয়াল্লেমের পক্ষ থেকেই ব্যাগে করে পাথর সরবরাহ করা হয়েছিল।</p>
<p>আমাদের মিনার তাঁবুতে প্রায় ১৫০ জন হজযাত্রী ছিলেন। ঘুমানোর জন্য ছিল প্রায় ৫৫০ মিলিমিটার চওড়া পাতলা ফোমের ম্যাট্রেস। প্রচণ্ড গরমে এমন তাঁবুতে থাকা অনেকের জন্য কষ্টকর হতে পারে। কখনো এয়ার কুলার ঠিকমতো কাজ করে না, আবার টয়লেট ব্যবহারের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। এসব পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও সহনশীলতা জরুরি।</p>
<p>তাঁবুর ভেতর প্রথমবার ঢুকে কিছুটা চমকে গিয়েছিলাম। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, পরে মানিয়ে নিতে কোনো সমস্যা হয়নি। বরং এটিকে হজেরই একটি পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম।</p>
<p>তাঁবুর চারপাশে লুঙ্গি ও গামছা পরা বাংলাদেশি হাজিদের দেখে মনে হয়েছিল, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন, এঁরাই আমার আপনজন। এখানেই আমার শিকড়।</p>
<p>তাঁবুর বাইরে বিভিন্ন স্থানে ফ্রিজে ঠান্ডা পানির বোতল রাখা ছিল। এক পাশে রান্নাঘরে বড় বড় হাঁড়িতে বাংলাদেশি হাজিদের জন্য খাবার তৈরি হতো। তিন বেলা বক্সে করে খাবার তাঁবুতে পৌঁছে দেওয়া হতো। বাইরে বড় ডিসপেনসারে গরম চায়ের ব্যবস্থাও ছিল। চা নেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইন দেখেছি। একবার খাবারের পর একজন হাজিকে পানের ডিব্বা খুলে বসতে দেখে ভালো লেগেছিল। তিনি আমাকেও পান ভাগ করে দিয়েছিলেন।</p>
<p>ক্যাম্পে স্কোয়াট ও কমোড, দুই ধরনের টয়লেটই ছিল। সেগুলো নতুন ও মোটামুটি পরিচ্ছন্ন ছিল এবং নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছিল। আগে যেমনটি আশঙ্কা করেছিলাম, বাস্তব পরিস্থিতি ততটা খারাপ ছিল না।</p>
<p>আরাফাতের ক্যাম্প তুলনামূলক উন্নত মনে হয়েছিল। সেখানে স্প্লিট এসি ছিল এবং বাংলাদেশি খাবারের ব্যবস্থাও ছিল।</p>
<p><strong>কুরবানি</strong> <strong>ও</strong> <strong>রিয়াদুল</strong> <strong>জান্নাহ</strong></p>
<p>হজের পর কুরবানির ব্যবস্থাও এজেন্সির পক্ষ থেকে করা হয়েছিল। আমরা জনপ্রতি ৭০০ সৌদি রিয়াল দিয়েছিলাম। সে সময় সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রতি ভাগ ৭২০ রিয়াল বলে জানতে পেরেছিলাম। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী নিজেও অনুমোদিত মাধ্যমে কুরবানির অর্থ জমা দেওয়া যায়। কুরবানি সম্পন্ন হলে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বার্তা পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।</p>
<p>মদিনায় রিয়াদুল জান্নাহ জিয়ারতের জন্য এজেন্সি গ্রুপ বুকিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল। তবে শুধু গ্রুপ বুকিংয়ের অপেক্ষায় না থেকে নুসুক অ্যাপের মাধ্যমে নিজেও বুকিংয়ের চেষ্টা করা যায়। এ ক্ষেত্রে আগে থেকে ব্যবস্থা নেওয়া ভালো, কারণ পছন্দের সময়ের স্লট দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে।</p>
<p><img decoding="async" class="alignnone size-medium wp-image-1448" src="https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/10/h3-300x96.jpg" alt="" width="300" height="96" srcset="https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/10/h3-300x96.jpg 300w, https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/10/h3-1024x328.jpg 1024w, https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/10/h3-768x246.jpg 768w, https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/10/h3.jpg 1077w" sizes="(max-width: 300px) 100vw, 300px" /></p>
<p><strong>৯</strong><strong>. </strong><strong>হজের</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>কী</strong> <strong>কী</strong> <strong>প্রস্তুতি</strong> <strong>নেওয়া</strong> <strong>প্রয়োজন</strong></p>
<p>হজে যাওয়ার আগে কী কী জিনিস সঙ্গে নিতে হবে, তা নিয়ে অনলাইনে ও ইউটিউবে প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়। তবে অপ্রয়োজনীয় জিনিস বহন না করে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো বেছে নেওয়াই ভালো। আমি অনেক কিছু নিয়ে গিয়েও দেখেছি, তার কিছুই ব্যবহার করা হয়নি।</p>
<p><strong>ধর্মীয়</strong> <strong>বই</strong> <strong>ও</strong> <strong>ইহরামের</strong> <strong>কাপড়</strong></p>
<p>কুরআন, তাফসির এবং প্রয়োজনীয় ধর্মীয় বই সঙ্গে রাখা যেতে পারে। ইহরামের কাপড় ও বেল্টও আগে থেকে কিনে নেওয়া উচিত।</p>
<p>জেদ্দায় পৌঁছানোর আগেই মিকাত অতিক্রম করতে হয় বলে বিমানে বা ট্রানজিট বিমানবন্দরে ইহরাম পরার প্রয়োজন হতে পারে। তাই অস্ট্রেলিয়া ছাড়ার সময় হাতব্যাগে অন্তত এক সেট ইহরামের কাপড় রাখা ভালো।</p>
<p>আমি সিডনির অবার্ন এলাকা থেকে ইহরামের কাপড় ও বেল্ট কিনেছিলাম। কাপড় খুব মোটা হলে গরমে অস্বস্তি হতে পারে। দুটি সেট থাকলে সুবিধা হয়, কারণ একটি ময়লা হয়ে গেলে অন্যটি ব্যবহার করা যায়। দ্বিতীয় সেটটি মক্কা থেকেও কেনা সম্ভব। হোটেলের আশপাশের দোকানে ৩০ রিয়ালের মধ্যে ইহরামের কাপড় পাওয়া যেত।</p>
<p>তাওয়াফের সময় ইহরাম বেল্টে মোবাইল ফোন, টাকা ও ব্যাংক কার্ড রাখার সুবিধা পেয়েছি।</p>
<p><strong>ব্যক্তিগত</strong> <strong>পরিচ্ছন্নতা</strong> <strong>ও</strong> <strong>গরম</strong> <strong>থেকে</strong> <strong>সুরক্ষা</strong></p>
<p>আমি প্রচুর জিনিসপত্র নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত compressed tissue, দরজায় ঝোলানোর হুক, wet wipes এবং ইহরাম অবস্থায় ব্যবহারের উপযোগী সুগন্ধিবিহীন সাবান বেশি কাজে লেগেছে।</p>
<p>প্রচণ্ড গরম থেকে সুরক্ষার জন্য ছাতা, সানগ্লাস এবং পর্যাপ্ত পানি পান করার ব্যবস্থা জরুরি। চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশনও সঙ্গে রাখা যেতে পারে। সম্ভব হলে portable misting fan উপকারী হতে পারে।</p>
<p>হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় আমরা নিয়মিত পানির সঙ্গে হাইড্রালাইট মিশিয়ে পান করতাম। দীর্ঘক্ষণ হাঁটার সময় ঠান্ডা পানিতে ভেজানো ছোট তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছলে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেত। মিনা ক্যাম্পেও portable misting fan কাজে লেগেছিল।</p>
<p>মক্কার হোটেলে পৌঁছে মোয়াল্লেম একটি করে সাদা ছাতা দিয়েছিলেন। কিন্তু আমারটি খোলার আগেই ভেঙে যায়। মক্কার দোকান থেকে প্রায় ১০ রিয়ালে ছাতা কেনা যেত। ছাতা হারিয়ে যেতে পারে বা ভেঙে যেতে পারে, তাই প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ছাতা রাখার কথা ভাবা যেতে পারে।</p>
<p><strong>ওষুধ</strong> <strong>ও</strong> <strong>চিকিৎসাসামগ্রী</strong></p>
<p>নিয়মিত ব্যবহৃত ওষুধের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী সঙ্গে রাখা ভালো। যেমন, ব্যান্ডএইড, অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম এবং ত্বকের র&#x200d;্যাশের উপযোগী ক্রিম।</p>
<p>জ্বর, ব্যথা, সর্দি বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যার জন্য কী ওষুধ নেওয়া উচিত, তা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শে ঠিক করা ভালো। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়। অন্যের ওষুধ ধার করে খাওয়াও নিরাপদ নয়।</p>
<p>হজের সময় মসজিদুল হারামে যাওয়া, তাওয়াফ করা এবং বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের জন্য প্রচুর হাঁটতে হয়। পায়ের ব্যথার কারণে আমি নিয়মিত প্যারাসিটামল খেয়েছিলাম। মক্কায় ঠান্ডা পানীয় না খেলেও মিনায় যাওয়ার পর আমার জ্বর, গলাব্যথা ও কাশি শুরু হয়। অসুস্থতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় পরে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিল।</p>
<p>মক্কার মিসফালা এলাকায় বাংলাদেশ হজ মন্ত্রণালয়ের একটি মেডিকেল ক্লিনিক ছিল। সেখানে কয়েকজন চিকিৎসক ও একটি ফার্মেসি ছিল। হাজীদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হতো। ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনা আমার কাছে প্রশংসনীয় মনে হয়েছে।</p>
<p>মক্কায় পৌঁছানোর দুদিন পর অসুস্থ বোধ করলে আমি সেখানে যাই। রিসেপশনে বাংলাদেশি পরিচয়পত্র দেখিয়ে টিকিট নিয়ে অপেক্ষা করি। রোগীর সংখ্যা বেশি হলেও সবাইকে সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়াতে দেখেছি। অল্প সময়ের মধ্যেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ফার্মেসি থেকে ওষুধ পাই। এ উদ্যোগের জন্য বাংলাদেশ হজ মন্ত্রণালয় প্রশংসার দাবিদার।</p>
<p><strong>হজের</strong> <strong>দিনগুলোর</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>ব্যাগ</strong></p>
<p>মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় যাতায়াতের জন্য মাঝারি আকারের একটি ব্যাকপ্যাক যথেষ্ট। বড় ট্রলি ব্যাগ নেওয়া এড়িয়ে চলাই ভালো। ব্যাকপ্যাক পিঠে নিয়ে জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করতে যাওয়া সহজ, কিন্তু বড় ট্রলি ব্যাগ নিয়ে চলাফেরা করা বেশ অসুবিধাজনক।</p>
<p>মসজিদুল হারামে নামাজ পড়তে যাওয়া ও তাওয়াফের সময় জায়নামাজ, পানির বোতল, ছাতা ও স্যান্ডেল বহনের জন্য ছোট স্ট্রিং ব্যাগও কাজে আসে।</p>
<p>জেদ্দায় পৌঁছানোর পর মোয়াল্লেম আমাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট জমা নিয়ে নিয়েছিলেন। অস্ট্রেলীয় পাসপোর্ট আমি হোটেলের সুটকেসে তালাবদ্ধ করে রেখেছিলাম। হোটেলের কক্ষ নিরাপদ মনে হয়েছিল এবং সেখানে মূল্যবান জিনিস রাখার জন্য সেফও ছিল। তবে পাসপোর্ট সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নিজের নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কপি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।</p>
<p><strong>দীর্ঘ</strong> <strong>সময়</strong> <strong>বসার</strong> <strong>জন্য</strong> <strong>ফোল্ডেবল</strong> <strong>ম্যাট</strong></p>
<p>মসজিদুল হারামে পছন্দমতো জায়গায় নামাজ পড়তে হলে কখনো কখনো এক-দুই ঘণ্টা আগেই যেতে হয়। ফলে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয়। আমার কোমরব্যথা থাকায় দীর্ঘক্ষণ মেঝেতে বসে থাকা বেশ কষ্টকর ছিল।</p>
<p>এ কারণে পিঠে ঠেস দেওয়ার সুবিধাসহ একটি ফোল্ডেবল প্রেয়ার ম্যাট আমার খুব কাজে লেগেছিল। মক্কার বিভিন্ন দোকানে ২০ থেকে ২৫ রিয়ালের মধ্যে এ ধরনের ম্যাট পাওয়া যায়। কেউ কেউ ছোট ফোল্ডিং চেয়ারও ব্যবহার করেন। কোমর বা পিঠের সমস্যায় যাঁরা ভোগেন, তাঁদের জন্য এমন ব্যবস্থা উপকারী হতে পারে। মদিনার মসজিদে নববীতেও বসার জন্য বিভিন্ন স্থানে ফোল্ডিং চেয়ার রাখা ছিল।</p>
<p><strong>অর্থ</strong> <strong>ও</strong> <strong>ব্যাংক</strong> <strong>কার্ড</strong></p>
<p>অস্ট্রেলিয়া থেকে যাওয়ার সময় আমি প্রায় ৪ হাজার সৌদি রিয়াল নগদ নিয়েছিলাম। কেনাকাটা ও বাইরে খাওয়াদাওয়ার জন্য নগদ অর্থ বেশ কাজে লেগেছে। কার্ড ব্যবহারে কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চার্জ দিতে হতে পারে, তাই নিজের ব্যাংকের নিয়ম আগে থেকে জেনে নেওয়া ভালো।</p>
<p>আমি Wise International Debit Card-ও সঙ্গে নিয়েছিলাম। এটি দিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ উত্তোলন ও কেনাকাটা করা যায়। তবে বিনিময় হার, উত্তোলন ফি ও অন্যান্য চার্জ কার্ডের শর্ত অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। ভ্রমণের আগে সেগুলো যাচাই করা উচিত।</p>
<p><strong>ম্যাট</strong><strong>, </strong><strong>বালিশ</strong> <strong>ও</strong> <strong>সিম</strong> <strong>কার্ড</strong></p>
<p>মুজদালিফায় রাত কাটানোর জন্য একটি পাতলা ম্যাট, চাদর ও এয়ার পিলো কাজে লাগতে পারে। মক্কার দোকানগুলোতে এসব জিনিস পাওয়া যায়। চাদরটি মিনার তাঁবুতেও ব্যবহার করা যায়।</p>
<p>মক্কার হোটেলে পৌঁছে লাগেজ রাখার পর স্থানীয় সিম কার্ড কেনা সুবিধাজনক। হোটেলের আশপাশে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের সিম বিক্রির দোকান থাকে। সৌদি আরবে STC, Mobily ও Zain বহুল ব্যবহৃত অপারেটর। নেটওয়ার্ক কভারেজ, ডেটা প্যাকেজ ও মূল্য তুলনা করে সিম নির্বাচন করা উচিত।</p>
<p><strong>আরও</strong> <strong>কিছু</strong> <strong>প্রয়োজনীয়</strong> <strong>জিনিস</strong></p>
<p><strong>ব্যাগ</strong><strong>:</strong> বিমান ও বাসে চলাচলের সময় টাকা, পাসপোর্ট এবং জরুরি কাগজপত্র বহনের জন্য কোমরের ব্যাগের তুলনায় কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ আমার কাছে বেশি সুবিধাজনক মনে হয়েছে।</p>
<p><strong>ডিজিটাল</strong> <strong>স্কেল</strong><strong>:</strong> লাগেজের ওজন মাপার জন্য ছোট ডিজিটাল স্কেল কাজে লাগে।</p>
<p><strong>স্যান্ডেল</strong><strong>:</strong> আমি দুই ধরনের স্যান্ডেল নিয়েছিলাম, একটি সাধারণ থং এবং অন্যটি নন-স্লিপ আউটডোর স্যান্ডেল।</p>
<p><strong>পাওয়ার</strong> <strong>ব্যাংক</strong><strong>:</strong> হজের ব্যস্ত দিনগুলোতে মোবাইল ফোনে চার্জ দেওয়ার জন্য পাওয়ার ব্যাংক প্রয়োজন হতে পারে। ১০,০০০ mAh ক্ষমতার একটি পাওয়ার ব্যাংক আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয়েছে। তবে বিমানযাত্রায় পাওয়ার ব্যাংক বহনের নিয়ম আগে থেকে জেনে নিতে হবে।</p>
<p>মিনার তাঁবুতে চার্জ দেওয়ার জন্য সীমিতসংখ্যক বৈদ্যুতিক সংযোগ ছিল। অনেকে মাল্টিপ্লাগ ব্যবহার করতেন, তবে নিরাপত্তা ও ক্যাম্পের নিয়ম মেনে চলা জরুরি। হোটেলে ব্যবহারের জন্য একটি উপযুক্ত কনভার্টার প্লাগও কাজে লাগে।</p>
<p><strong>শুকনো</strong> <strong>খাবার</strong><strong>:</strong> অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রচুর খাবার নেওয়ার প্রয়োজন নেই। স্থানীয় সুপারমার্কেট থেকেও প্রয়োজনীয় খাবার কেনা যায়। তবে কিছু মিউজলি বার বা হালকা শুকনো খাবার সঙ্গে রাখা সুবিধাজনক হতে পারে।</p>
<p>এসব জিনিসের অনেক কিছু অনলাইনে কেনা যায়। আমি কিছু জিনিস Temu থেকে কিনেছিলাম এবং আমার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয়নি।</p>
<p><strong>উপহার</strong> <strong>ও</strong> <strong>জমজমের</strong> <strong>পানি</strong></p>
<p>দেশে ফেরার সময় পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের জন্য উপহার কেনা হজযাত্রীদের একটি পরিচিত অভ্যাস। আমার অভিজ্ঞতায়, মক্কায় কাপড়চোপড় ও বোরকার বৈচিত্র্য বেশি ছিল। কেনাকাটার সুযোগও তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে, খেজুর কেনার জন্য মদিনা ভালো জায়গা বলে মনে হয়েছে।</p>
<p>জেদ্দা বিমানবন্দরে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী জমজমের পানি কেনার ব্যবস্থা ছিল। ২০২৪ সালে জনপ্রতি ১২ রিয়ালে পাঁচ লিটারের একটি বোতল কেনার সুযোগ পেয়েছিলাম। জমজমের পানি ও লাগেজ বহনের নিয়ম সময়ভেদে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই ফেরার আগে এয়ারলাইনস ও বিমানবন্দরের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা উচিত।</p>
<p>অস্ট্রেলিয়ায় ফেরার সময় খেজুর নিয়ে ইমিগ্রেশনে আমার তেমন সমস্যা হয়নি। তবে খাদ্যপণ্য আনার ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার বায়োসিকিউরিটি বিধি মানা জরুরি। প্রয়োজন হলে পণ্য ঘোষণা করতে হবে।</p>
<p><strong>১০</strong><strong>. </strong><strong>২০২৪</strong> <strong>সালের</strong> <strong>হজে</strong> <strong>এত</strong> <strong>মানুষের</strong> <strong>মৃত্যু</strong> <strong>কেন</strong><strong>?</strong></p>
<p>২০২৪ সালের হজে প্রচণ্ড গরমের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। এই মর্মান্তিক ঘটনা বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু আবহাওয়ার দিকে তাকালেই হবে না; হজযাত্রীর সংখ্যা, নিবন্ধনব্যবস্থা, পরিবহন, পানির সরবরাহ, চিকিৎসাসেবা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।</p>
<p><strong>প্রচণ্ড</strong> <strong>গরম</strong> <strong>ও</strong> <strong>জলবায়ু</strong> <strong>পরিবর্তনের</strong> <strong>ঝুঁকি</strong></p>
<p>সৌদি আরবে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকে। জুন মাসে গড় তাপমাত্রা ২৯ থেকে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে এবং কোনো কোনো দিনে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে। রাতেও তাপমাত্রা অনেক সময় ৩০ ডিগ্রির নিচে নামে না।</p>
<p>ইসলামি বর্ষপঞ্জি চান্দ্র মাসভিত্তিক হওয়ায় হজের সময় প্রতি বছর ইংরেজি ক্যালেন্ডারে প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন করে এগিয়ে আসে। ফলে কয়েক বছর পর হজের সময় গ্রীষ্মের তীব্র গরম থেকে তুলনামূলক শীতল সময়ের দিকে সরে যায়। আবার দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে তা গ্রীষ্মকালেও ফিরে আসে।</p>
<p>জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই ভবিষ্যতে হজযাত্রীদের সুরক্ষায় তাপমাত্রার পূর্বাভাস, পর্যাপ্ত পানির সরবরাহ, বিশ্রামের স্থান, ছায়াযুক্ত পথ এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।</p>
<p><strong>অতীতের</strong> <strong>দুর্ঘটনা</strong> <strong>ও</strong> <strong>২০২৪</strong> <strong>সালের</strong> <strong>প্রাণহানি</strong></p>
<p>হজের ইতিহাসে ভিড় ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ১৯৯০ সালে পদদলিত হয়ে সৌদি সরকারের হিসাবে ১,৪৬২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জামারাত এলাকায় পদদলিত হওয়ার ঘটনায় সরকারি হিসাবে ৭৬৮ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়। ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর মসজিদুল হারামের কাছে একটি ক্রেন ভেঙে পড়ে ১১৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল।</p>
<p>২০২৪ সালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড গরমের কারণে প্রায় ১,৩০০ হজযাত্রীর মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। নিখোঁজ ব্যক্তিদের হিসাব এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিবেদন নিয়ে তখন অনিশ্চয়তাও ছিল।</p>
<p>সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, মৃতদের বড় একটি অংশ অনিবন্ধিত হজযাত্রী ছিলেন। হজের প্যাকেজের উচ্চমূল্য এবং বয়সসহ বিভিন্ন কারণে কেউ কেউ অনুমোদিত প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে হজ পালনের চেষ্টা করেন। কিছু অসাধু ব্যক্তি হজের অনুমতি বা পারমিটের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।</p>
<p><strong>অনিবন্ধিত</strong> <strong>হজযাত্রীদের</strong> <strong>দুর্ভোগ</strong></p>
<p>হজের অনুমতি ছাড়া সৌদি আরবে প্রবেশ করে হজের কার্যক্রমে অংশ নেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নিবন্ধিত হজযাত্রীরা সাধারণত নির্ধারিত তাঁবু, পরিবহন, খাবার ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পান। কিন্তু অনিবন্ধিত ব্যক্তিরা এসব সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।</p>
<p>হজের মৌসুমে মিনা ও আরাফাতের তাঁবুতে নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষের থাকার ব্যবস্থা থাকে। অনুমোদিত পরিচয়পত্র না থাকলে এসব স্থানে প্রবেশ করাও কঠিন হতে পারে। ফলে অনিবন্ধিত হজযাত্রীদের অনেককে নিজস্ব উদ্যোগে থাকা, খাওয়াদাওয়া ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হয়।</p>
<p>আরব দেশের কিছু নাগরিক ভাষা ও সংস্কৃতির মিলের কারণে স্থানীয়দের সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারেন। অন্যদিকে, বিদেশি হজযাত্রীরা অনেক সময় ভাষাগত বাধা ও অপরিচিত পরিবেশের কারণে আরও বেশি সমস্যায় পড়েন।</p>
<p>সৌদি সরকার অনিবন্ধিত হজ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। নুসুক কার্ডের মাধ্যমে নিবন্ধিত হজযাত্রীদের পরিচয় যাচাই করা হয়। মক্কায় অবস্থানকালে আমাদেরও একাধিকবার কার্ড পরীক্ষা করা হয়েছিল। জেদ্দা থেকে বাসে মক্কায় যাওয়ার সময়ও বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি করা হয়। আবাসিক ভবনগুলোতেও অভিযান চালানো হয়েছিল বলে জানা যায়।</p>
<p>তবে অনিবন্ধিত হজ বন্ধের উদ্যোগের পাশাপাশি হজের সামগ্রিক ব্যয় ও সুযোগ-সুবিধা নিয়েও ভাবা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত সামর্থ্যবান ও ইচ্ছুক মুসলমানেরা বৈধ প্রক্রিয়ায় হজ পালনের সুযোগ পান।</p>
<p><strong>১০</strong> <strong>জিলহজের</strong> <strong>ভয়াবহ</strong> <strong>অভিজ্ঞতা</strong></p>
<p>২০২৪ সালের হজে ১০ জিলহজ, অর্থাৎ কুরবানির দিনে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বহু হজযাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে সময় তাপমাত্রা ৫১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।</p>
<p>মুজদালিফা থেকে জামারাত এবং জামারাত থেকে মিনায় ফেরার পথে মৃত্যুর বিভীষিকা ছড়িয়ে পড়েছিল। মিনা ও আরাফাতের ক্যাম্পে পানি সরবরাহ থাকলেও দীর্ঘ পথ চলার সময় পর্যাপ্ত পানির অভাব ছিল বলে হজযাত্রীদের কাছ থেকে শুনেছি। প্রচণ্ড রোদে দীর্ঘক্ষণ হাঁটা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং শারীরিক ক্লান্তি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল।</p>
<p>আমাদের মোয়াল্লেম ১০ জিলহজ বড় জামারাতে পাথর নিক্ষেপের পর আমাদের মক্কার হোটেলে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং রাতে আবার মিনার ক্যাম্পে ফিরিয়ে এনেছিলেন। প্রথমে তাঁর এই সিদ্ধান্তে কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন হয়েছিলাম। কিন্তু পরে ১০ জিলহজের প্রাণহানির খবর জানতে পেরে বুঝতে পারি, তাঁর সিদ্ধান্তটি আমাদের জন্য কতটা উপকারী হয়েছিল।</p>
<p>আরাফাত থেকে মুজদালিফার দূরত্ব আনুমানিক আট কিলোমিটার, মুজদালিফা থেকে মিনার দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এবং মিনা থেকে জামারাতের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। তবে তাঁবুর অবস্থান ও নির্ধারিত চলাচলের পথ অনুযায়ী প্রকৃত দূরত্ব কমবেশি হতে পারে।</p>
<p>যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত পরিবহন না থাকলে হজযাত্রীদের প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। হায়দরাবাদের এক হজযাত্রী আমাকে জানিয়েছিলেন, তিনি প্রায় ৪০ কিলোমিটার হেঁটেছিলেন। আমার মোবাইলের স্টেপ কাউন্টারেও সেদিন প্রায় ২৫ কিলোমিটার হাঁটার হিসাব উঠেছিল। আমাদের আরাফাত থেকে মিনার ক্যাম্প পর্যন্ত বাসের ব্যবস্থা থাকায় তুলনামূলকভাবে কম হাঁটতে হয়েছিল।</p>
<p><strong>জামারাতের</strong> <strong>পথে</strong> <strong>পানি</strong><strong>, </strong><strong>ছায়া</strong> <strong>ও</strong> <strong>চিকিৎসার</strong> <strong>সংকট</strong></p>
<p>আরাফাতে অবস্থানের পর মুজদালিফায় রাত কাটিয়ে ফজরের নামাজের পর হজযাত্রীরা জামারাতের দিকে রওনা হন। দিনের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। দীর্ঘ পথে পর্যাপ্ত পানি, ছায়া ও বিশ্রামের সুযোগ না থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।</p>
<p>আমার অভিজ্ঞতায়, জামারাতের দিকে যাওয়ার পথে কিছু স্থানে পানি ও বিশ্রামের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত মনে হয়নি। কোথাও কোথাও পানি ছিটানো হলেও তা প্রচণ্ড গরম থেকে যথেষ্ট স্বস্তি দিতে পারেনি। জামারাতে পৌঁছানোর জন্য অনেক হজযাত্রীকে ওপরের তলায় উঠতে হয়েছিল। দীর্ঘ পথ, সিঁড়ি বা ঢাল বেয়ে ওঠা এবং ভিড়ের মধ্যে চলাচল তাঁদের ক্লান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।</p>
<p>তৃতীয় দিনে পাথর নিক্ষেপের জন্য আমাদেরও তিনতলায় যেতে হয়েছিল। একপর্যায়ে আমার স্ত্রী ক্লান্তি ও অবসাদে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি ও হাইড্রালাইট থাকায় আমরা পরিস্থিতি সামলে পাথর নিক্ষেপ সম্পন্ন করতে পেরেছিলাম।</p>
<p>আমাদের ক্যাম্পে ফিরে অন্য হজযাত্রীদের মুখে পানির অভাবে মানুষের কষ্টের কথা শুনেছি। কেউ কেউ রাস্তার পাশে মানুষকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন। এসব অভিজ্ঞতা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।</p>
<p><strong>ভিড়</strong> <strong>নিয়ন্ত্রণ</strong> <strong>ও</strong> <strong>জরুরি</strong> <strong>চিকিৎসার</strong> <strong>সীমাবদ্ধতা</strong></p>
<p>হজের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ভিড় সামলাতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে দেখেছি। তবে কিছু ক্ষেত্রে এসব ব্যবস্থার প্রয়োগ হজযাত্রীদের জন্য বাড়তি দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছিল বলে আমার মনে হয়েছে।</p>
<p>কোনো কোনো স্থানে হঠাৎ ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ায় মানুষকে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হয়েছে। ক্লান্ত বা অসুস্থ হজযাত্রীরা বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ চাইলেও সব সময় তা পাননি। কিছু জায়গায় নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণও কঠোর মনে হয়েছে।</p>
<p>অসুস্থ মানুষের তুলনায় প্যারামেডিক ও অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা পর্যাপ্ত ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জরুরি সহায়তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে বলে কয়েকজন হজযাত্রীর কাছ থেকে শুনেছি। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে হিটস্ট্রোক ও অন্যান্য গুরুতর অসুস্থতা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।</p>
<p>হজের মতো আন্তর্জাতিক ধর্মীয় সমাবেশে জরুরি চিকিৎসা, দ্রুত উদ্ধার, বিশ্রামের জায়গা এবং পানি সরবরাহের ব্যবস্থা আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।</p>
<p><strong>ভাষাগত</strong> <strong>বাধা</strong> <strong>ও</strong> <strong>পথ</strong> <strong>হারানোর</strong> <strong>সমস্যা</strong></p>
<p>হজে বিশ্বের বহু দেশের মানুষ অংশ নেন। তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা ভিন্ন। অথচ এত বড় আন্তর্জাতিক সমাবেশে দিকনির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সবাই সব ভাষায় দক্ষ হবেন, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তবে অন্তত প্রয়োজনীয় কয়েকটি আন্তর্জাতিক ভাষায় নির্দেশনা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।</p>
<p>জামারাত থেকে ক্যাম্পে ফেরার সময় অনেককে পথ হারিয়ে ফেলতে দেখেছি। কাতারে বসবাসকারী আমার এক বাংলাদেশি বন্ধু, যিনি আরবিতে দক্ষ, তিনিও মিনার ক্যাম্প খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েছিলেন। পুলিশের কাছে সাহায্য চাইলে তিনি কার্যকর দিকনির্দেশনা পাননি বলে জানান।</p>
<p>সৌদি সরকার হজের ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে আমার মনে হয়েছে। বহুভাষিক নির্দেশনা, সহজে বোঝা যায় এমন মানচিত্র, ডিজিটাল পথনির্দেশনা এবং প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা বাড়ানো গেলে অনেক সমস্যা কমানো সম্ভব।</p>
<p><strong>একজন</strong> <strong>বিধবার</strong> <strong>হৃদয়বিদারক</strong> <strong>অভিজ্ঞতা</strong></p>
<p>জামারাত এলাকায় এক কানাডীয় বাংলাদেশি নারী হজযাত্রীর কাছ থেকে তাঁর স্বামীর মৃত্যুর ঘটনা শুনে শিউরে উঠেছিলাম।</p>
<p>জামারাতে যাওয়ার পথে তাঁর স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি স্বামীর হুইলচেয়ার ঠেলে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে জামারাতে পৌঁছান। একপর্যায়ে হুইলচেয়ারটি পাশে রেখে পাথর নিক্ষেপ করতে যান। ফিরে এসে দেখেন, স্বামী সেখানে নেই।</p>
<p>তিনি দিশেহারা হয়ে চারদিকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে পুলিশ স্টেশনে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তাঁর স্বামী মারা গেছেন। তাঁকে মৃত্যুসনদও দেওয়া হয়। কিন্তু কোথায় তাঁর স্বামীকে দাফন করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট তথ্য পাননি বলে ওই নারী আমাকে জানান।</p>
<p>প্রিয়জনকে হারানোর শোকের সঙ্গে শেষবারের মতো তাঁর কবরের অবস্থান জানার অনিশ্চয়তা একজন মানুষের জন্য কতটা অসহনীয় হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।</p>
<p>ঘটনাটি শুনে আমার মনে হয়েছিল, হজের মতো পবিত্র সফরে একজন মানুষের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মৃত্যুর পর তাঁর পরিচয় এবং দাফনসংক্রান্ত তথ্য পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।</p>
<p><strong>হজ</strong> <strong>ব্যবস্থাপনার</strong> <strong>দায়িত্ব</strong></p>
<p>হজযাত্রীরা বিপুল অর্থ ব্যয় করে এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে যান। তাঁদের নিরাপত্তা, যাতায়াত, আবাসন, পানি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হজ ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।</p>
<p>হজ পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করা মানুষের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও সমবেদনা রয়েছে। কিন্তু একজন হজযাত্রীর মৃত্যু যদি প্রতিরোধযোগ্য অবহেলা, অপর্যাপ্ত চিকিৎসা কিংবা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে ঘটে, তাহলে সেই বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। নিবন্ধিত কিংবা অনিবন্ধিত—যে পরিচয়েরই হজযাত্রী হোন না কেন, মানবিক সহায়তা ও জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার তাঁর রয়েছে।</p>
<p>সৌদি আরবের উচিত প্রতিবছরের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা এবং পরবর্তী হজের আগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। হজযাত্রীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসেবার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।</p>
<p><strong>হজযাত্রীর</strong> <strong>সংখ্যা</strong> <strong>ও</strong> <strong>কোটার</strong> <strong>সংকট</strong></p>
<p>২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত হজযাত্রীর সংখ্যার সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১২ সালে রেকর্ডসংখ্যক মানুষ হজ পালন করেছিলেন। সে বছর হজযাত্রীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩১ লাখ ৬১ হাজার। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ২০২০ সালে এই সংখ্যা নেমে এসেছিল প্রায় এক হাজারে। এরপর আবার সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ২০২৪ সালে প্রায় ১৮ লাখেরও বেশি মানুষ হজ পালন করেন।</p>
<p>বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ হজে অংশ নেন। অন্যদিকে, উচ্চমূল্যের কারণে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দকৃত কোটা পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও বিভিন্ন আরব দেশ থেকে হজে যেতে ইচ্ছুক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।</p>
<p>এই পরিস্থিতিতে হজের কোটা নির্ধারণের পাশাপাশি প্যাকেজের মূল্য, নিবন্ধনের সুযোগ এবং হজযাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। চাহিদা ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে সমন্বয় করা গেলে আরও বেশি মানুষ বৈধভাবে হজ পালনের সুযোগ পেতে পারেন।</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><strong>হজযাত্রীদের</strong> <strong>সহায়তায়</strong> <strong>স্বেচ্ছাসেবক</strong></p>
<p>হজের সময় হজযাত্রীদের পথ দেখানো, চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের নিজস্ব কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক দল থাকে। আমার অভিজ্ঞতায়, ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তা হজযাত্রীদের সহায়তায় সৌদি আরবে যান। তাঁদের বিশেষ পোশাক দেখে সহজেই চেনা যায়। মিনা ক্যাম্পেও বিভিন্ন দেশের এমন সহায়তাকারীদের দেখেছি।</p>
<p>তবে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের পাশে সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করছেন, এমন কর্মকর্তা বা স্বেচ্ছাসেবক আমার চোখে খুব একটা পড়েনি।</p>
<p>সৌদি কর্তৃপক্ষ চাইলে বিভিন্ন মুসলিম দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে বহুভাষিক স্বেচ্ছাসেবক দল গড়ে তুলতে পারে। তাঁরা পথনির্দেশনা, জরুরি যোগাযোগ, বয়স্ক ও অসুস্থ হজযাত্রীদের সহায়তা এবং হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের খুঁজে পেতে ভূমিকা রাখতে পারেন।</p>
<p>এ ধরনের উদ্যোগ হজের সার্বিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে সাহায্য করবে বলে আমার বিশ্বাস।</p>
<p><strong>১১</strong><strong>. </strong><strong>হজের</strong> <strong>আধ্যাত্মিক</strong> <strong>শিক্ষা</strong><strong>: </strong><strong>এক</strong> <strong>অন্য</strong> <strong>পৃথিবীর</strong> <strong>সন্ধান</strong></p>
<p>দীর্ঘদিন ধরেই হজে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছি, পরিকল্পনা করেছি, মনে মনে প্রস্তুতি নিয়েছি। কিন্তু নানা কারণে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে সময় লেগেছে। অবশেষে ২০২৪ সালে মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার জীবনে সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্তটি এসেছিল, হজ পালনের সৌভাগ্য হয়েছিল। এর আগে উমরা পালনের সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু সত্যি বলতে কী, হজে অংশ না নিলে হজের ব্যাপ্তি, এর গভীরতা, এর ত্যাগ-তিতিক্ষা আর আধ্যাত্মিক মহিমার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করা অনেকটাই অসম্ভব। বই পড়ে, অন্যের অভিজ্ঞতা শুনে কিংবা ছবি-ভিডিও দেখে হজ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়; কিন্তু কোটি মানুষের সেই মহামিলনে নিজেকে শামিল না করলে এর অন্তর্নিহিত অনুভূতিটুকু যেন অধরাই থেকে যায়।</p>
<p>মক্কায় পৌঁছানোর পর প্রথম কয়েকটি দিন কেটেছিল এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে। মনে হতো, যেন পৃথিবীর পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোনো গ্রহে, অন্য কোনো জগতে এসে পড়েছি। চারপাশে মানুষের ঢল, অগণিত মানুষের পদচারণা, মুখে আল্লাহর জিকির, ঠোঁটে দোয়া, চোখে অশ্রু আর হৃদয়ে এক গভীর আকুলতা। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ ভাষা আলাদা, গায়ের রং আলাদা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও জীবনযাপন আলাদা; অথচ সবার গন্তব্য এক, সবার আরাধ্য এক, সবার প্রার্থনা সেই মহান স্রষ্টার কাছে। জাতি, বর্ণ, ভাষা, দেশ কিংবা আর্থিক অবস্থানের সব ব্যবধান যেন মুহূর্তেই তুচ্ছ হয়ে যায়। মনে হয়, মানবজাতির প্রকৃত পরিচয় তো এটাই, আমরা সবাই মানুষ, সবাই একই স্রষ্টার সৃষ্টি।</p>
<p>আর কা’বা শরিফ! প্রথমবার কিংবা প্রতিবারই তার দিকে তাকালে মনের ভেতর যে অনুভূতির জন্ম হয়, তা বর্ণনা করা কঠিন। চোখের সামনে কা’বা, চারপাশে অসংখ্য মানুষ তাওয়াফ করছেন, কেউ কাঁদছেন, কেউ হাত তুলে দোয়া করছেন, কেউ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছেন পবিত্র ঘরের দিকে। মনে হয়, প্রত্যেকের হৃদয়ে জমে আছে কত না বলা কথা, কত অনুশোচনা, কত আকুতি, কত অপূর্ণ স্বপ্ন আর কত প্রার্থনা! কেউ এসেছেন নিজের গুনাহের ক্ষমা চাইতে, কেউ প্রিয়জনের সুস্থতা ও মঙ্গল কামনায়, কেউ জীবনের দুঃখ-বেদনা থেকে মুক্তির আশায়। আবার কেউ হয়তো কেবল নিজের স্রষ্টার কাছে ফিরে এসে অন্তরের শান্তি খুঁজছেন। সেই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ক্ষুদ্রতা অনুভব না করে উপায় থাকে না। মনে হয়, মানুষের জীবনে অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ আর আত্মগরিমারই বা কতটুকু মূল্য!</p>
<p>মক্কার দিনগুলোতে আরও একটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। মনে হয়েছিল, মানুষের মধ্যে ভালো কাজ করার যেন এক নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। সবাই ছুটছেন কা’বার পানে, চেষ্টা করছেন যত বেশি সম্ভব ইবাদত করতে, সাদাকা দিতে, নেকি অর্জন করতে। কারও যেন অন্যদিকে তাকানোর অবকাশ নেই। অনেকে উদার হাতে দান-খয়রাত করছেন। কেউ জায়নামাজ কিনে মানুষের মধ্যে বিতরণ করছেন, কেউ খাবার বিলিয়ে দিচ্ছেন, কেউ ফোল্ডিং চেয়ার কিনে বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের সুবিধার জন্য দিচ্ছেন, কেউ আবার বোতলজাত পানি কিনে ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত হাজিদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। ছোট ছোট এসব কাজের মধ্যেও যে কত বড় মানবিকতা লুকিয়ে আছে, তা সেখানে গিয়ে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি।</p>
<p>সবচেয়ে ভালো লেগেছিল মানুষের প্রতি মানুষের সহজাত মমতা ও সহমর্মিতার কিছু দৃশ্য দেখে। বাসে ওঠার সময় দেখেছি, অনেকে নিজের আগে অন্যকে ওঠার সুযোগ করে দিচ্ছেন। নিজে একটু অপেক্ষা করেও অন্যের সুবিধার কথা ভাবছেন। কারও বয়স বেশি, কেউ হাঁটতে কষ্ট পাচ্ছেন, কেউ ক্লান্তিতে অবসন্ন, তাঁদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে অনেকেই দ্বিধা করছেন না। অপরিচিত মানুষও যেন মুহূর্তের মধ্যে আপন হয়ে উঠছেন। কেউ কাউকে চেনেন না, জানেন না তাঁর নাম কিংবা পরিচয়; তবু বিপদে-আপদে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে পাশে দাঁড়াচ্ছেন। এমন দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে, মানুষের ভেতরের সুপ্ত মানবিকতাকে জাগিয়ে তোলার এক অসাধারণ পরিবেশ তৈরি হয় হজের পবিত্র ভূমিতে।</p>
<p>তখন বারবার মনে হয়েছে, আহা! পৃথিবীটা যদি চিরকাল এমন থাকত! যদি মানুষ প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে অন্য মানুষের জন্য এভাবে ভাবতে পারত! যদি আমাদের সমাজে একটু জায়গা ছেড়ে দেওয়া, একটু অপেক্ষা করা, অন্যের কষ্ট বোঝা কিংবা বিপদে পাশে দাঁড়ানোকে দুর্বলতা নয়, বরং মহত্ত্ব বলে বিবেচনা করা হতো! যদি আমরা নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দিতে শিখতাম, তাহলে পৃথিবীটা কত সুন্দর হতে পারত! হজের সেই দিনগুলো আমাকে যেন নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে, মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার সম্পদে, পদমর্যাদায় কিংবা বাহ্যিক পরিচয়ে নয়; বরং তার আচরণে, সহমর্মিতায়, বিনয়ে এবং অন্যের জন্য কিছু করার মানসিকতায়।</p>
<p>তবে বাস্তবতার আরেকটি দিকও চোখ এড়ায়নি। সব জায়গায়, সব সময় এই সৌহার্দ্য ও সংযম বজায় থাকতে দেখিনি। প্রচণ্ড ভিড়, দীর্ঘ অপেক্ষা, শারীরিক ক্লান্তি, গরম আর মানসিক চাপের মধ্যে কিছু মানুষকে ধৈর্য হারাতে দেখেছি। বিশেষ করে তাওয়াফের সময় কখনো কখনো এমন আচরণ চোখে পড়েছে, যা সত্যিই কষ্ট দিয়েছে। কেউ কেউ সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ধাক্কাধাক্কি করছেন, অন্যের চলার পথ আটকে দিচ্ছেন, এমনকি সামান্য বিষয়েও তর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। পবিত্র ইবাদতের মুহূর্তে এমন দৃশ্য দেখে মনে প্রশ্ন জেগেছে, আমরা কি কখনো ভেবে দেখি, যে ইবাদত করতে গিয়ে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাইছি, সেই ইবাদতের পথেই যেন অন্য কারও কষ্টের কারণ হয়ে উঠছি না?</p>
<p>অবশ্যই হজের সময় প্রচণ্ড ভিড় ও প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলানো সহজ নয়। লাখ লাখ মানুষের একসঙ্গে চলাচলের মধ্যে ধৈর্য ধরে থাকা, নিজের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্যের অসুবিধার কথা বিবেচনা করা সত্যিই কঠিন। কিন্তু সেই কঠিন পরিস্থিতিই তো আমাদের ধৈর্য, সহনশীলতা ও আত্মসংযমের পরীক্ষা। হজ কেবল নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করার নাম নয়; এর ভেতরে রয়েছে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার শিক্ষা, নিজের অহংকারকে বিসর্জন দেওয়ার শিক্ষা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করার শিক্ষা। নিজের সুবিধার জন্য অন্যকে ধাক্কা দেওয়া, সামান্য কারণে উত্তেজিত হওয়া কিংবা তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়া, এসব আচরণ আমাদের সেই শিক্ষার কতটা কাছাকাছি নিয়ে যায়, তা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।</p>
<p>আমার মনে হয়েছে, তাওয়াফের সময় আমরা যদি আরও একটু ধৈর্যশীল হতে পারতাম, অন্যের প্রতি একটু বেশি সহনশীলতা দেখাতে পারতাম, তাহলে এই পবিত্র ইবাদত সবার জন্য আরও স্বস্তিকর ও প্রশান্তিময় হয়ে উঠত। মনে রাখতে হবে, আমাদের পাশের মানুষটিও আমার মতোই একজন হাজি। তিনিও হয়তো বহু বছরের স্বপ্ন, দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, অগণিত ত্যাগ আর বুকভরা আকুতি নিয়ে পবিত্র ভূমিতে এসেছেন। তিনিও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে, তাঁর রহমত পেতে এবং জীবনের ভুলত্রুটি থেকে মুক্তি পেতে এসেছেন। তাহলে তাঁর কষ্টের কারণ হয়ে আমি কীভাবে নিজের ইবাদতের পূর্ণতা খুঁজব? অন্যকে কষ্ট না দেওয়া, অসহায়কে সাহায্য করা, দুর্বলকে সুযোগ করে দেওয়া এবং উত্তেজনার মুহূর্তেও নিজেকে সংযত রাখা—এসবও তো ইবাদতের চেতনারই অংশ।</p>
<p>হজের প্রকৃত শিক্ষা আমার কাছে তাই শুধু কা’বা শরিফের চারপাশে তাওয়াফ করা কিংবা নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হজের শিক্ষা হলো ত্যাগ স্বীকার করা, নিজের আগে অন্যের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া, মানুষের সেবা করা, ধৈর্য ধারণ করা, ক্ষমা করতে শেখা এবং অহংকার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করা। হজের সাদা পোশাক যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীর বাহ্যিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান, সম্পদ ও ক্ষমতার পার্থক্য একদিন মুছে যাবে। শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একই স্রষ্টার সামনে দাঁড়াব। সেই উপলব্ধি যদি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আচরণ ও চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটাতে না পারে, তবে হজের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কতটা শিক্ষা নিতে পারলাম, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।</p>
<p>হজ থেকে ফিরে এসে আমার মনে হয়েছে, পবিত্র ভূমিতে অর্জিত অনুভূতি ও শিক্ষা শুধু স্মৃতির পাতায় ধরে রাখার বিষয় নয়; সেগুলোকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশে ফিরে পরিবার, প্রতিবেশী, সহকর্মী কিংবা সমাজের অন্য মানুষের সঙ্গে আচরণে যদি আরও একটু বিনয়ী হতে পারি, কারও বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারি, কারও অধিকার ক্ষুণ্ন করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারি, তাহলে হয়তো হজের সেই শিক্ষা আমাদের জীবনে সত্যিকার অর্থে প্রতিফলিত হবে। কারণ হজের সৌন্দর্য কেবল পবিত্র ভূমিতে অবস্থান করার মধ্যে নয়; সেই ভূমি থেকে ফিরে এসে আমরা কতটা ভালো মানুষ হতে পারলাম, তার মধ্যেও এর সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়।</p>
<p>আজও মক্কার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে হৃদয় আবেগে ভরে ওঠে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে কা’বা শরিফ, অসংখ্য মানুষের তাওয়াফ, চারপাশে প্রতিধ্বনিত দোয়া ও জিকির, আর অপরিচিত মানুষের প্রতি অপরিচিত মানুষের নিঃস্বার্থ সহমর্মিতা। মনে পড়ে, কত মানুষ নিজের আরাম বিসর্জন দিয়ে অন্যের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছেন। আবার কিছু মুহূর্ত মনে করিয়ে দেয়, আমাদের আরও অনেক কিছু শেখার বাকি আছে—বিশেষ করে ধৈর্য, সংযম, বিনয় এবং অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে।</p>
<p>হজের সেই অভিজ্ঞতা আমাকে বারবার ভাবায়, আমরা যদি পবিত্র ভূমিতে শেখা ভালোবাসা, সহমর্মিতা, ত্যাগ ও মানবিকতার শিক্ষা নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারি, তাহলে শুধু আমাদের ব্যক্তিগত জীবনই নয়, আমাদের পরিবার, সমাজ এবং পৃথিবীও আরও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।</p>
<p>মহান আল্লাহর কাছে আমার একান্ত প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের সবাইকে হজের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করার, এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা জীবনে ধারণ করার এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে চলার তৌফিক দান করেন। <strong>আমিন</strong><strong>।</strong></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://mamoon.net/opinion/1394/feed</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>চাঁদ দেখা নিয়ে বিভাজন</title>
		<link>https://mamoon.net/opinion/881</link>
					<comments>https://mamoon.net/opinion/881#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[admi@mamoo252]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 13 Sep 2026 01:56:55 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Opinion]]></category>
		<category><![CDATA[Religion & Philosophy]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://mamoon.net/?p=881</guid>

					<description><![CDATA[চাঁদ দেখা নিয়ে মুসলিম সমাজের মধ্যে বিতর্কের যেনো শেষ নেই। প্রবাসে যেসব দেশে মুসলিম সম্প্রদায় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতো রমাজানের চাঁদ দেখা না-দেখার বিষয়টি মুসলিমদের মধ্যে যে বিভাজন এনে...]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>চাঁদ দেখা নিয়ে মুসলিম সমাজের মধ্যে বিতর্কের যেনো শেষ নেই। প্রবাসে যেসব দেশে মুসলিম সম্প্রদায় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতো রমাজানের চাঁদ দেখা না-দেখার বিষয়টি মুসলিমদের মধ্যে যে বিভাজন এনে দেয়, তা সত্যিই দুঃখজনক।</p>
<p>মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম অধ্যুষিত দেশে এটা কোনো সমস্যা নয়। কারণ রমজানের শুরু সরকারই নির্ধারণ করে দেয়। ফলে বিতর্কের সুযোগ থাকেনা। কাতারের কথাই ধরা যাক। কাতারে, সৌদি আরবে চাঁদ দেখার খবর পাওয়া গেলেই রমজান শুরু করার ঘোষনা দেয়া হয়। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া সহ ইউরোপে সরকারী পর্যায়ে কোনো নির্দশনা না থাকায় কমিউনিটির ইমাম এবং স্থানীয় মসজিদ কমিটির সিদ্ধান্তের দিকে সবাই তাকিয়ে থাকেন। সারাবছর নিরবিচ্ছিন্ন দিন কাটালেও, ইমাম/মুফতিদের ভিন্নমত এবং আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারনে ওইসব দেশে বসবাসরত বিশাল মুসলিম সম্প্রদায় রমজান ও ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে অযাচিত বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে।</p>
<p>দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সুবাদে খুব কাছ থেকে এই বিভক্তি দেখার সুযোগ হয়েছে, যা কখনো মন থেকে মেনে নিতে পারিনি। সারা বছর ধর্ম নিয়ে কোনো রকম উদ্বেগ না থাকলেও রমজান আসলে ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে আড্ডায়, ইফতার মাহফিলে উঠে তর্কের ফোয়ারা। রমজান ও ঈদ আসে বৃহত্তর মুসলিম সমাজকে একীভূত করার জন্য। কিন্তু যখনই দেখি বিভেদ ও মতদ্বৈতের জালে জড়িয়ে পড়ছে সবাই, তখন এই বিভক্তির গ্লানি আমাকেও গ্রাস করে।</p>
<p>অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি চাঁদ দেখা নিয়ে মুসলিমরা তিন ধরনের মতবাদ নিয়ে দ্বিধা-বিভক্ত। যেমন: (১) কেবল চর্মচক্ষু দিয়ে চাঁদ দেখা; (২) জ্যোতির্বিদ্যা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে গণনার মাধ্যমে চাঁদের অবস্থান ও কখন চাঁদ দেখা যেতে পারে ইত্যাদি নির্ধারণ করা; (৩) বিশে^র সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়কে একটি বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহ মনে করে যেকোনো মুসলিম দেশে প্রথম চাঁদ দেখে গেলে সেটাকে গ্রহন করা, যা গ্লোবাল সাইটং নামে পরিচিত।</p>
<p>এই তিনটি মতামতের উপর ভিত্তিতে করেই মুসলিমরা রমজান শুরু করে। অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি ধারী বহু উচ্চ শিক্ষিত ইমাম রয়েছেন। তাঁরা চাঁদ দেখা ও গননার বিষয় নিয়ে জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ লিখেছেন এবং তাদের যুক্তির স্বপক্ষে কোরআন-হাদিসের দলিল রয়েছে বলে দাবী করেছেন। প্রত্যেকেই নিজের পদ্ধতির ব্যাপারে নিশ্চিত। যদিও তারা অন্য ইমামের উল্লেখিত পদ্ধতি ভুল কি শুদ্ধ সেকথা কৌশলে এড়িয়ে চলেন, কিন্তু বিভক্তি থেকেই যায়। এমন পরিস্থিতিকে সামাল দেয়ার জন্য যতদূর মনে পড়ে, একবার অস্ট্রেলিয়ার প্রধান ইমামদের নিয়ে সন্মেলনের আয়োজন করা হয়। কিন্তু তাতেও কোনো সফলতা আসেনি। কারণ, কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজী নন।</p>
<p>এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের বংশোদ্ভূত মুসলিমদের একটি অংশ নিজ নিজ কমিউনিটির মসজিদের ইমামদের নির্দেশনা মেনেই রমযান শুরু করে থাকেন। যেমন পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশি মুসলিমরা দেশে কখন রমযান শুরু হচ্ছে সেটার খোঁজ নেন। অন্যদিকে আরব মুসলিমরা মধ্যপ্রাচ্যের খবর নিতে উদগ্রীব থাকেন।  উপরের কোন ধারনাটা সঠিক তা নিয়ে আমি বিতর্কে যেতে চাইনা। তবে একজন সাধারন মুসলিম হিসাবে বিভিন্ন মুসলিমদের সাথে আলাপচারিতায় যা জেনেছি তা এখন তুলে ধরছি।</p>
<p>চর্মচক্ষু দিয়ে চাঁদ দেখার কথা যারা বলেন, তাদের মনে রাখা দরকার আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে চাঁদ দেখার সময়ও চর্মচক্ষু ব্যবহার করা হয়। তাহলে কেবল চর্মচক্ষু দিয়ে চাঁদ দেখার সাথে এর পার্থক্য কোথায়? বিশে^র কিছু এলাকা আছে, যেখানে আবহাওয়াজনিত কারনে এক নাগাড়ে বেশ কিছুদিন চক্ষু দিয়ে চাঁদ দেখা সম্ভব নাও হতে পারে। আবার অন্য দিকে ধরুন আপনি একটি দ্বীপে আছেন, যেখানে কোনো আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা মুঠোফোনও নেই। তখন কেবল চর্মচক্ষু দিয়েই চাঁদ দেখতে হবে।আরেকটি উদাহরন অনেকেই দিয়ে থাকেন তা হল, ইসলামের শুরু থেকে ঘড়ি আবিস্কারের আগ পর্যন্ত সূর্যের অবস্থান দেখে প্রাত্যহিক নামাজের সময় নির্ধারণ করা হত। কিন্তু এখন আধুনিক জোতির্বিদ্যা, ঘড়ি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে নামাজের সময়সূচী নির্র্ধারণ করা হচ্ছে এবং ঘড়ির কাঁটা ধরে মসজিদে আযান দেয়া হচ্ছে। নামাযের ক্ষেত্রে লাঠির ছায়ার দৈর্ঘ্য মাপার কিংবা আকাশের লালিমার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয় না। তেমনি চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সাহায্য নিতে অসুবিধা কোথায়?</p>
<p>বর্তমান প্রযুক্তির সাহায্যে নতুন চাঁদের জন্মের সময় নিঁখুতভাবে নির্র্নয় করা যায়। তবে পৃথিবী থেকে চাঁদ দেখা মূলতঃ সূর্য-পৃথিবী-চাঁদের মধ্যবর্তী কোণ (elongation angle) কতটুকু তার উপর নির্ভর করে।  এই কোণের মান যখন শূন্য ডিগ্রী তখন চাঁদের জন্ম হয়। চাঁদের এই অবস্থানকে বলা হয় Conjunction of moon or birth of new moon.  ধীরে ধীরে কৌণিক দুরত্ব যখন বাড়তে থাকে তখন চাঁদ বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে। সরু কাস্তের মত আকার থেকে এই কোনের মাত্রা যখন ১৮০ ডিগ্রী হয় তখন গোল পূর্নিমার চাঁদ আমরা দেখতে পাই।</p>
<p><img loading="lazy" decoding="async" class="alignnone size-medium wp-image-884" src="https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/09/চাদ-300x112.jpg" alt="" width="300" height="112" srcset="https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/09/চাদ-300x112.jpg 300w, https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/09/চাদ-1024x383.jpg 1024w, https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/09/চাদ-768x287.jpg 768w, https://mamoon.net/wp-content/uploads/2026/09/চাদ.jpg 1100w" sizes="(max-width: 300px) 100vw, 300px" /></p>
<p>চাঁদ দেখা, অন্য আরো বেশ কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যেমন একজন পর্যবেক্ষকের দৃষ্টির দিগন্তে চাঁদের অবস্থান (elevation angle), সূর্যাস্তের সময়, চাঁদের প্রস্থ, চন্দ্র পৃষ্ঠের উজ্জ্বলতা, তাপমাত্রা, বায়ুমন্ডলের চাপ, আর্দ্রতা, মেঘ, বায়ুমন্ডলের দূষণ মাত্রা, বাড়ি-ঘর, গাড়ী ও রাস্তা থেকে বিচ্ছ’রিত আলো, মানুষের দৃষ্টিশক্তির তারতম্য ইত্যাদি। নতুন চাঁদের জন্ম হবার পর একটি নির্দিষ্ট সময় অবিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তা দেখা যায়না। জন্মের পর পরিণত বা পরিপক্ক হওয়ার জন্য কমপক্ষে ১৫ ঘণ্টার সময়ের (lag time) দরকার। তার মানে কেউ যদি চাঁদ জন্ম হবার পর কমপক্ষে ১৫ ঘন্টা অতিবাহিত হবার আগে চাঁদ দেখেছে বলে দাবী করে তাহলে বুঝতে হবে কোথাও কোনো সমস্যা আছে।</p>
<p>ধরুন ঢাকায় ঈদের চাঁদ দেখো গেছে বলে দাবী করা হল। ঢাকা থেকে আরো পশ্চিমে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ঢাকার চেয়ে পাচ ঘন্টা পর সূর্য ডোবে।  তার মানে ঢাকার চেয়ে ইস্তান্বুলে চাঁদ দেখা যাবার সম্ভাবনা বেশী কারণ সূর্যাস্তের সময় ইস্তাম্বুলে চাঁদের বয়স ঢাকার চেয়ে বেশী ছিল।  তেমনি ঢাকা থেকে যতই পশ্চিমে যাওয়া যাবে ততই চাঁদ দেখার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে। আকাশ পরিস্কার থাকার পরও ঢাকা থেকে আরো পশ্চিমের কোনো দেশে বা জায়গায় চাঁদ দেখার সংবাদ পাওয়া না গেলে সেটা সন্দেহজনক বলে ধরতে হবে। তাই বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে চাঁদ দেখা নিশ্চিত করতে হলেও অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয় বৈকি।</p>
<p>যারা ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিপক্ষে তারা বলছেন, নামাজ আর রমযান/ঈদের চাঁদ দেখাকে এক করে ফেলা ঠিক নয়। নামাযের সময় নির্ধারণ করার ব্যাপারে গণনা করার ঈঙ্গিত আছে। এক্ষেত্রে স্বচোখে দেখতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নামাজের সময় যেকোনোভাবে মাপা যাবে কারণ এখানে entrance of time  এর কথা বলা হয়েছে। সুর্যের অবস্থানের উপর শর্তসাপেক্ষে নামায হয় কিন্তু রমযান কিংবা ঈদ শুরু করার ব্যাপারে চর্মচক্ষু দিয়ে দেখাকে মানদন্ড হিসাবে নিতে হবে। কারণ রোজার মাস শুরুর শর্ত হিসাবে বাঁকা চাঁদ (crescent moon) দেখার কথা বলা হয়েছে astronomical new moon নয়। চাঁদ দেখাটা মুসলিমদের উপর খোদার বাধ্যবাধকতা হিসাবে আরোপ করা হয়েছে, রাসুলের সময়কার মানুষ গননা জানতোনা বলে নয়। তাই মানুষ যদি গননা করতেও শেখে তবুও চোখে দেখার বিষয়টি রদ হবেনা। ফলে কেউ যদি গননার আশ্রয় নেয়, সেটা হবে বিদা (modern innovation).</p>
<p>অন্যদিকে গণনার পক্ষে যাঁরা তাঁরা বলছেন, সুন্নাহ অক্ষরিক অর্থে পালন করলেই হবে না বরং প্রেক্ষাপট, স্থান-কাল-পাত্র বুঝে বাস্তবার নিরিখে এর প্রয়োগ করতে হবে। খালি চোখে চাঁদ দেখা যে একমাত্র মাধ্যম তা ধর্মে নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। তাদের যুক্তি হল, টেলিস্কোপের মত যন্ত্র আমজনতার কাছে থাকার নয়, তাই খালি চোখে চাঁদ দেখা সাধারণ মানুষের উপর টেলিস্কোপ জোগাড় করার জন্য অন্যাবশ্যক চাপ সৃষ্টি করেনা। এছাড়া ওই সময় মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যোগ্যতা সম্পন্ন জোর্তিবিজ্ঞানী কিংবা প্রযুক্তি ছিলনা যা দিয়ে চন্দ্রমাসের শুরু নির্ধারণ করা যেতো। খালি চোখে দেখাটাই মানুষের একমত্র অবলম্বন ছিল বলেই হাদিসে সে কথা বলা হয়েছে। এছাড়া জোর্তিবিদ্যার সাথে জ্যোতিষশাস্ত্রকে গুলিয়ে ফেলার কারণে অনেক ইসলামিক পন্ডিত গননাকে নিষিদ্ধ করেছেন বলে মনে করা হয়। দুই পক্ষেরই স্বপক্ষের যুক্তি আঁকড়ে থাকার বিষয়টি এখানে লক্ষ্যণীয় ।</p>
<p>বাংলাদেশে চাঁদ দেখা কমিটিই সাধারনত চাঁদ দেখার ঘোষনা দিয়ে থাকে। ইদানিং দেখছি চাঁদপুর সহ দেশের কিছু মানুষ এটা না মেনে সৌদি আরবকে অনুসরন করে রমযান ও ঈদ পালন করছে। এদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বলেই মনে হচ্ছে। সরকারী নির্দেশনা উপেক্ষা করে একই দেশের মুসলিম সমাজের মধ্যে এই বিভক্তি গ্রহনযোগ্য নয়। দেশের সব মুসলিমকে একতাবদ্ধ করার জন্য কর্তৃপক্ষকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত।  না হলে আগামীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।</p>
<p>মুনসাইটিং ডট কমের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের ১১২টি দেশের মধ্যে ৪৪টি দেশের মুসলিমরা রোজা ও ঈদ করার ক্ষেত্রে সৌদি আরবকে অনুসরণ করে, ৩৫টি দেশের মুসলিমরা স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে, ১৮টি দেশের মুসলিমরা নিজস্ব পদ্ধতি অনুসরণ করে, ১৫টি দেশ তুরস্কের গণনাভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৪০ শতাংশ দেশ সৌদি আরবকে অনুসরণ করছে যার মধ্যে রয়েছে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার, মধ্য এশিয়ার বেশ কিছু দেশ। অন্যদিকে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া সহ পাক ভারত উপমহাদেশের দেশগুলো স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখাকে অনুসরণ করে।</p>
<p>সৌদি আরবের চাঁদ দেখার ঘোষণা মুসলিম বিশ্বকে প্রভাবিত করে। এ নিয়ে সৌদি আরবের খামখেয়ালপিনা মুসলিম বিশে^ অনশ্চিয়তার সৃষ্টি করছে।  অনেক সময় সৌদি আরবে যখন চাঁদ দেখার দাবী করা হয় তখন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। যেসব দেশে সৌদি আরব থেকে ১৮/১০ ঘন্টা সুর্যাস্ত হচ্ছে সেখান থেকে চাঁদ দেখার খবর না আসাতে তখন সন্দেহ আরো ঘণিভূত হয়। সৌদি আরবে রয়েছে মুফতি ও জোর্ত্যিবিদদের সমন্বয়ে গঠিত ছয়টি সরকারী চাঁদ দেখা কমিটি। কিন্তু অনেক সময় সৌদি জাষ্টিস ডিপার্টমেন্ট, এই সব কমিটির মতামতকে অগ্রাহ্য করে কোনো একজন মুসলিমের সাক্ষ্য গ্রহন করে চাঁদ দেখা গিয়েছে বলে ঘোষণা দিয়ে দেয়।</p>
<p>শুধু মুসলিম নয় হিন্দু, ইহুদি, চাইনিজরাও চন্দ্র ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে থাকে। সৌদি আরবে সরকারীভাবে চন্দ্রমাসভিত্তিক আরবী ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হয়। জ্যোতির্বিদদের মতে খালি চোখে চাঁদ দেখে মাসের হিসাব কষলে চাঁদের ঘূর্ণনের গতিবেগ, পৃথিবী ও সূর্য্যরে সাথে চাঁদের আপেক্ষিক দুরত্বের কারণে কোনো মাস ২৮ দিনেও শেষ হতে পারে। অথচ চন্দ্র মাস কখনো ২৮ কিংবা ৩১ দিনে শেষ হতে পারেনা। মক্কাকে মেরিডিয়ান হিসাবে ধরে মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি ক্যালেন্ডার তৈরী করার প্রস্তাব আসলেও সৌদি সরকারের সহযোগীতার অভাবে তা সম্ভবপর হয়নি।</p>
<p>কাতারে এসে রমজানের শুরু এবং ঈদ পালন করে বেশ স্বত্বি পাচ্ছি যা অস্ট্রেলিয়ায় কখনো পাইনি। অনেক সময় অস্ট্রেলিয়ায়, রমজান একসাথে শুরু করলেও ঈদ নিয়ে মতের ভিন্নতা থেকেই যায়। ফলে মাত্র হাতে গোনা কয়েকবার সব মতালম্বীদের একই দিনে ঈদ পালন করতে দেখেছি।  অনেক সময় ঈদের দিন বন্ধুর বাসার বেড়াতে গিয়ে দেখেছি তারা সেদিন রোজা রেখেছে, ঈদ করবে পরের দিন। এমনও হয়েছে, একজন রোজা শুরু করেছিলেন চাঁদ দেখা দলের সাথে। সেই হিসাবে তার ত্রিশ রোজা হবার কথা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অন্য দলের সাথে যোগ দিয়ে ঈদ করে ফেললেন।</p>
<p>ভিন্ন ভিন্ন দিনে রমযান শুরু এবং ঈদ উদযাপনের  জন্য মুসলিম সংখ্যালঘু দেশের মুসলিম সমাজ বহু রকমের সমস্যার সন্মুখীন হচ্ছে। ঈদের ছুটি নিতে গেলেই বাধে গোল। দেখা গেলো আমি যেদিন ছুটির নিতে চাইলাম আমার সাথে কর্মরত অন্য একজন মুসলিম ছুটি চাইছেন পরের দিন। এভাবে মুসলিম এবং ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। ধরা যাক, পশ্চিমা কোনো দেশ সিদ্ধান্ত নিল মুসলিমদের জন্য ঈদ উপলক্ষ্যে একদিন সরকারী ছুটি দেয়া হবে। মুসলিম ইমামদের সাথে আলোচনা করে কোনদিন ছুটি দেয়া যেতে পারে সেই সিদ্ধান্ত কি কর্তৃপক্ষ কখনো নিতে পারবে?</p>
<p>আমরা যতই লেখালেখি করি না কেনো এই বিষয়ে আলেম-ওলামারা ঐক্যমতে না আসলে কোনো সুরাহা হবেনা।  চাঁদ দেখা না-দেখা, গননা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও সৌদিকে অনুসরণ করা ইত্যাদি সেটা যা-ই হোকনা কেন, তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ, ওলমারাই সিদ্ধান্ত নেবেন কোনটা গ্রহন করা উচিত। মুসলিম সম্প্রদায় ইমামদের দিকনির্দেশনা নিয়েই চলে। তাই সমাধান তাঁদের কাছ থেকেই আসতে হবে।</p>
<p>বিশ্বের প্রবাসীদের মুসলিমদের একটি বিরাট অংশ প্রতিবছর চাঁদ দেখা না-দেখা নিয়ে সমস্যার সন্মুখীন হচ্ছেন। একজন সাধারণ মুসলিম হিসাবে আমার চাওয়া হল, যে দেশেরই বংশোদ্ভূত মুসলিম হোক না কেন, কমিউনিটির সবাই মিলে ও একাত্ম হয়ে পবিত্র রমযান ও ঈদ পালন করুক। আমাদের ছেলেমেয়েরা তাদের বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে একই দিন, একই সাথে ঈদের আনন্দ উপভোগ করুক।</p>
<p>&nbsp;</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://mamoon.net/opinion/881/feed</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>ঘরের শত্রুর সাথে মুসলিমদের বোঝাপড়া</title>
		<link>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/622</link>
					<comments>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/622#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[admi@mamoo252]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 25 Aug 2026 14:55:11 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Religion & Philosophy]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://mamoon.net/?p=622</guid>

					<description><![CDATA[আবু হামজা, একজন আরব মুসলিম। আশির দশকে ডাক্তারী পড়তে যায় বসনিয়ায়। এরই মধ্যে শুরু হয় বসনিয়ার লড়াই। একদিন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসে সার্ব বাহিনীর হাতে ধর্ষিতা একজন মা ও তার...]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>আবু হামজা, একজন আরব মুসলিম। আশির দশকে ডাক্তারী পড়তে যায় বসনিয়ায়। এরই মধ্যে শুরু হয় বসনিয়ার লড়াই। একদিন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসে সার্ব বাহিনীর হাতে ধর্ষিতা একজন মা ও তার ১৩ বছরের কন্যা। ঘাতকের দল মেয়েটির বাবাকে হত্যা করার পর তার চোখের সামনে মাকে ধর্ষণ করে এবং এরপর তাকেও ছাড়েনি। মেয়েটি শোকে বোবা হয়ে গেছে। এই ঘটনা আবু হামজার বিবেকের উঠোনে ঝড় তোলে। যারা এমন কাজ করতে পারে তারা মানুষ হতেই পারে না। তাই সেই পশুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আবু হামজা ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে তীব্র তাগাদা অনুভব করতে থাকে। অবশেষে বসনিয়ানদের সাথে কাঁধে কাঁধ রেখে সার্ব বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়ে আবু হামজা। লড়াই শেষ হবার পর তিন সন্তানের জননী বসনিয়ার এক বিধবাকে বিয়ে করে আবু হামজা সারিয়েভোতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। </p>
<p>বসনিয়া সরকার যুদ্ধে অবদান রাখার জন্য তাকে বসনিয়ার নাগরিকত্ব দান করেছে। কিন্তু ৯/১১ সবকিছু বদলে দিয়েছে। আমেরিকার চাপে পড়ে বসনিয়ান সরকার আবু হামজার নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কিন্তু আবু হামজা তাতে বিচলিত নয়। সে বলল, ‘আমি একজন মানুষ এবং মুসলিম। আমি যুদ্ধ করেছি ন্যায়ের জন্য, কোনো পার্থিব পুরস্কারের লোভে নয়। আমার কাজের পুরস্কার দেবেন আল্লাহ।’ আল-জাজিরা টেলিভিশনে বসনিয়ার যুদ্ধ নিয়ে প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে আবু হামজার কাহিনী আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। যে ধর্ম ও বিশ্বাস মানুষকে নিজের জীবন বাজী রেখে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে শেখায়, যৌবনের চাওয়া পাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে একজন টগবগে যুবককে তিন সন্তানের জননী বিয়ে করতে উদ্বুদ্ধ করে, আজ সেই ধর্মের বিশ্ব¦াসীদের কেউ কেউ কেন সন্ত্রাসের পথে যাচ্ছে? </p>
<p>মুসলিম জনতার একটি ক্ষুদ্র অংশের সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়ার যেসব প্রধান কারণ আমরা উল্লেখ করে থাকি সেগুলি হলো, মুসলিম অধ্যুষিত দেশে পশ্চিমা শক্তিবর্গের আগ্রাসন এবং যার ফলশ্রুতিতে লাখো নিরপরাধ জনতার মৃত্যু, বৃহৎশক্তি কতৃক দীর্ঘদিনের শোষণ ও বঞ্চনা ইত্যাদি। অথচ বর্তমান অবস্থার জন্য মুসলিমরাও যে অনেকাংশে দায়ী সে নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি বলে মনে হয় না। দেখা যায়, অধিকাংশ মুসিলমই নিজেদের সমস্যার জন্য ঢালাওভাবে তৃতীয় কোনো শক্তিকে দায়ী করছেন। মুসলিমদের চিন্তা-ভাবনায় পশ্চিমাশক্তি কিংবা ইহুদিদের কন্সপিরেসী থিউরি খুব বেশি কাজ করে। পশ্চিমাশক্তি ও তাদের দোসররা যদি মুসলিমদের শত্রু হয় তাহলে ওদের আনুকুল্য মুসলিমরা আশা করে কিভাবে? মনে রাখতে হবে, অন্যের দিকে একটি আঙ্গুল যখন তোলা হয় তখন হাতের তিনটি আঙ্গুল নিজের দিকেই তাক করা থাকে। </p>
<p>অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, মুসলিমদের নিয়ে কোনো বিতর্কের সূত্রপাত হলে মুসলিম কমিউনিটির নেতারা উটপাখির মতো বালিতে মাথা গুজে অপেক্ষা করতে থাকেন, কখন বিতর্কের অবসান হবে। নিজের কমিউনিটির মধ্যে যে সমস্যা রয়েছে সেটা তারা কখনো স্বীকার করেন না কিংবা সমস্যার মোকাবেলা করতে চান না। ইসলাম ও মুসলিমদের উত্থান থামানোর লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদী মোর্চার যে কালো নকশা আছে, সে ব্যাপারে আমার কোনো দ্বিমত নেই। তবে আগ্রাসন যে সব সময় বাইরে থেকে আসছে তাও নয়। একটু মনোযোগ দিয়ে চলমান বিশ্বের ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করলে দেখা যায়, মুুসলিমদের আসল শত্রু কিন্তু মুসলিমরা নিজেই। প্রচলিত ভাষায় যাকে বলা যায় ঘরের শত্রু বিভীষণ। </p>
<p>২০০৮-২০০৯ সালে গাজ্জার যুদ্ধে প্রায় ১৪০০ প্যালেস্টাইনী প্রাণ হারান। জানা যায়, গাজ্জায় ইসরাইলী হামলার নেপথ্যে প্যালেস্টাইনী প্রেসিডেন্ট আব্বাসের আশীর্বাদ ছিল। হামাসের সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যতই থাকুক না কেন, দেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে নিজের জনগণকে যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দিয়ে আব্বাসের হাত কি রক্তে রাঙা হয়নি? মুসলিমরা মুসলিমদের সর্বনাশ করতে কতটা সিদ্ধহস্ত তার কিছু নমুনা উঠে এসেছে উইকিলিক্সের নথি থেকে। সৌদি আরব, আমিরাত ও বাহরাইনের শাসকরা ইরানের উপর হামলা চালাতে বারবার তাগাদা দিয়েছে আমেরিকাকে। জর্জ বুশকে ইরাক আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করেছে এই আরব মুসলিম শাসকরাই। আজ যদি প্রতিবেশী ইরানে যুদ্ধ শুরু হয়, তার আঁচে আমেরিকা নয়, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলিই আগে পুড়বে। ইরাক, ইরান ও আফগানিস্তানে যুদ্ধের ফলে যে লক্ষ লক্ষ বেসামরিক জনগণের মৃত্যু হচ্ছে আর সন্ত্রাসের কালো থাবা ধীরে ধীরে গ্র্রাস করছে মুসলিম সমাজকে, সে জন্য নিজেদের দায়ভার কি মুসলিম সমাজ এড়াতে পারে?</p>
<p>মুসলিম অধ্যুষিত দেশে আজ কি হচ্ছে চারিদিক? ধর্মরক্ষার নামে সন্ত্রাস ও বোমবাজীতে হাট-বাজার, ধর্মীয় সমাবেশ ও মসজিদে হত্যা করা হচ্ছে হাজারো নিরীহ মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশু। স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, এমনকি সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়ও রক্ষা পাচ্ছে না এই হত্যাযজ্ঞ থেকে। দখলদার বাহিনীর সাথে লড়াই কিংবা ধর্মযুদ্ধের সাথে এর সম্পর্ক কোথায়? দুঃখজনক হলো, যারা এইসব তান্ডব চালাচ্ছেন তারা নিজেদের ইসলামের সত্যিকার অনুসারী বলেই দাবি করছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘একজন নিরপরাধ মানুষ খুন করা মানে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার সমতুল্য (৫ : ৩২)। আল্লাহ তায়ালা মুসলিম হয়ে অন্য মুসলিমকে হত্যা করা নিষিদ্ধ করেছেন (৪ : ৯২-৯৩)। </p>
<p>আমরা নিরপরাধ মুসলিমদের হত্যার জন্য আমেরিকা ও তার সহযোগীদের কঠোর সমালোচনা করি, কিন্তু মুসলিমরা যখন নিরপরাধ মানুষ ও অন্য মুসলিমদের হত্যা করে তখন তাদের সমালোচনা করতে আমরা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ি। মুসলিমদের অপকর্ম ও মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে আমরা ততটা সোচ্চার হই না। গ্যাস দিয়ে সাদ্দাম যখন নিজের মুসলিম নাগরিকদের হত্যা করে, কুয়েত ও ইরানে আগ্রাসী হামলা চালায় তখন আমরা বলি এর পেছনে পশ্চিমা শক্তির ইন্ধন আছে। কিন্তু উপনিবেশিক শক্তির প্ররোচনায় প্রলুব্ধ হয়ে যারা অপকর্ম করছে তারাও একই দোষে দোষী নয় কি?</p>
<p>সন্ত্রাসের কথা উঠলেই আমরা বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরে তৃপ্তি পাই। যেমন, আত্মঘাতী হামলা প্রথম শুরু করে শ্রীলংকার তামিল টাইগার, মুসলিম দ¦ারা সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনা অন্য ধর্মীয় গোষ্ঠিদের চেয়ে কম, খ্রিষ্টানরা আরও বেশি হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে (যেমন হিটলার, বিশ্বযুদ্ধ) ইত্যাদি। এসবই সত্য, কিন্তু ওরা করছে বলে মুসলিমদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার লংঘন কিংবা জঙ্গী কার্যকলাপ কোনোভাবেই বৈধতা পায় না। এ ধরনের মানসিকতা আত্মপ্রবঞ্চনারই শামিল। সংখ্যা যাই হোক না কেন, নিরপরাধ মানুষ হত্যা ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না, সেটাই হচ্ছে মূল কথা (কুরআন ৬ : ১৫১, ১৭ : ৩৩)। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ড্রোনের আঘাতে ন্যাটো বাহিনীর নিরীহ মানুষ হত্যা এবং মুসলিম কতৃক মসজিদে প্রার্থনারত মুসল্লিদের হত্যার মধ্যে কোনো পার্থক্য আমি দেখি না। </p>
<p>মুসলিম সমাজ আজ বিভিন্ন মত ও উপগোষ্ঠিতে বিভক্ত। কুরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যাতে সনাতন ইসলামের উদারতা ও সহিষ্ণুতার দেখা মেলে না। নিজের ভাবাদর্শগত ও রাজনৈতিক পার্থক্য মেটাবার জন্য ফতোয়া ও পাল্টা ফতোয়া দেয়া, কোনটা নিষিদ্ধ কোনটা হালাল, কে কাফের কে মুরতাদ, এইসব বিতর্কেই আমাদের ধর্মীয় নেতাদের শক্তি প্রায় নিঃশেষ। পরিবেশ, খাদ্য সমস্যা, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, শিল্প, দর্শন নিয়ে ভাববার সময় কোথায়? আমাদের উপমহাদেশেরই সুন্নী মুসলিমের দু’টি উপগোষ্ঠি বেরেলভী ও দেওবন্দীপন্থীরা একে অন্যকে মুসলিম বলেই মনে করে না। ভারতের উত্তরপ্রদেশে এক দেওবন্দী ইমামের পেছনে জানাজার নামাজ পড়ার ফলে প্রায় ২০০ বেরেলভিপন্থী মুসল্লী কাফের হয়ে গেছে বলে ফতোয়া দেন তাদের ইমাম। ফলে কলেমা পড়ে তাদের আবার মুসলিম হতে হয়। শুধু তাই নয়, মৌলবী ডেকে তাদের স্ত্রীর সাথে পুনরায় বিয়ে পড়াতে হয়, এর মধ্যে ৮০ বছরের বুড়ো বুড়ীরাও রয়েছেন। (সূত্র: দি টাইমস অব ইন্ডয়া, সেপ্টেম্বের ৬, ২০০৬) </p>
<p>২০০৫ সালে জার্মানিতে ফুটবল বিশ্ব¦কাপের ঠিক আগে সৌদি আরবের আল-ওয়াতান পত্রিকায় নামবিহীন একজন শেখের ফুটবল সংক্রান্ত একটি ফতোয়া পড়ার পর সৌদি আরবের একটি বিখ্যাত ফুটবল ক্লাবের তিনজন খেলোয়াড় ফুটবল খেলা ইসলামে নিষিদ্ধ ভেবে ক্লাব ছেড়ে আল-কায়দায় যোগ দেয়। ওদেরই একজন কিছুদিন পর ইরাকে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানোর সময় ধরা পড়ে। ওই শেখের ফতোয়ামতে, কাফেরদের তৈরি নিয়মে ও পরিভাষা ব্যবহার করে ফুটবল খেলা সিদ্ধ হবে না। যেমন চারটি দাগের মধ্যে খেলা, কর্নার কিক্, গোল, ফাউল পরিভাষা ব্যবহার করা ইত্যাদি। সৌদি সরকারের মুফতিরা এই ফতোয়া প্রত্যাখ্যান করে যারা ফতোয়া প্রকাশ করেছেন তাদের শারিয়া কোর্টে বিচারের সুপারিশ করেন। যদিও এই ফতোয়া আরব জনসংখ্যার উপর তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি, কিন্তু নামবিহীন একজন মুফতির ফতোয়া কিভাবে একজন পেশাদার খেলোয়াড়কে রাতারাতি আত্মঘাতী বোমাবাজে পরিণত করতে পারে সেটা আমাদের ভেবে দেখা দরকার। তাই ঘটনা যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন, উড়িয়ে দেয়া যায় না। </p>
<p>ফতোয়াটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ফুটবলকে জিহাদের সাথে সম্পৃক্ত করা। ফতোয়ায় বলা হয়, ‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য শরীরকে প্রস্তুত করার উদ্দেশ্য নিয়েই ফুটবল খেলতে হবে। খেলার সময় বল নিয়ে দৌড়, আক্রমণ, পিছু হটা ইত্যাদি জিহাদের মাঠের কার্যকর ট্রেনিং বলেই গণ্য করতে হবে।’ মুসলিমদের ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টানদের অনুকরণ করা উচিত নয় বলে বর্ণিত রাসুলের (সা.) হাদিসটির ওপর ভিত্তি করেই ফতোয়াটি দেয়া হয়েছে বলে পত্রিকায় দাবি করা হয়। কিন্তু হাদিসের অর্থকে কিভাবে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা হলো উপরের ঘটনাটি হচ্ছে তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। </p>
<p>উগ্রপন্থীরা সংখ্যায় গুটিকতক হলেও এখন আর ওদের উপেক্ষা করা যায় না। কারণ ওদের জন্যই ইসলাম ও ১.৬ বিলিয়ন মুসলিম বিশ্বের কাছে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হচ্ছে। নিজের কায়েমী স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য ইসলামের বাণীর বাঁকা ব্যাখ্যা করে ধর্মরক্ষার নামে যারা ইসলামের ভাবমূর্তিকে হাইজ্যাক করছে, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আমাদের দ্বিধা; শুধু উগ্রপন্থী নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছে ইসলাম ও মুসলিম সম্পর্কে ভুল বার্তা পাঠাচ্ছে। </p>
<p>অন্যের ঘাড়ে দোষ না চাপিয়ে আবু হামজার মতো হাজারো ধর্মভীরু ও সচেতন মুসলিমদের চেতনা যাতে সঠিকপথে প্রবাহিত হয়, সেজন্য ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতা ও উগ্রতার বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে বিশেষ করে ইসলামি পন্ডিতদের পরিষ্কার অবস্থান নিতে হবে। মসজিদের খুতবাতে যদি কাজ না হয় তাহলে রেডিও, টিভি ও ইন্টারনেট মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে কুরআন ও হাদিসের আলোকে উগ্রপন্থীদের যুক্তি খন্ডন করতে হবে। এখন সময় এসেছে, সবার আগে মুসলমানদের নিজের ঘরের শত্রুর সাথে বোঝাপড়া করার। আধুনিক ও সভ্য জাতি হিসাবে বর্তমান বিশ্বে এগিয়ে যেতে হলে এছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/622/feed</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>ঈদের খুশি দেশে দেশে</title>
		<link>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/613</link>
					<comments>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/613#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[admi@mamoo252]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 24 Aug 2026 04:04:10 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Religion & Philosophy]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://mamoon.net/?p=613</guid>

					<description><![CDATA[দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ আসে এক ভিন্ন ধরনের উচ্ছ্বলতা, মুক্ততা ও আনন্দের আমেজ নিয়ে। ইসলাম আনন্দ উৎসবকে পুরোপুরি বাদ দেয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিন নুতন পোশাক পরিধান...]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ আসে এক ভিন্ন ধরনের উচ্ছ্বলতা, মুক্ততা ও আনন্দের আমেজ নিয়ে। ইসলাম আনন্দ উৎসবকে পুরোপুরি বাদ দেয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিন নুতন পোশাক পরিধান করে বেড়াতে এবং আনন্দ করতে উৎসাহিত করেছেন। কিন্তু সেই আনন্দে থাকবে পরিশীলতা, থাকবে না আনন্দের নামে অশ্লীলতা কিংবা যথেচ্ছাচারিতা। রাসুলুল্লাহর (সা.) মৃত্যুর পর ইসলাম আরব উপত্যকা পেরিয়ে ধীরে ধীরে বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিমদের স্থানীয় সামাজিক আচার, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে ঈদ উৎসব দেশে দেশে তাই ভিন্ন আঙ্গিকে উদযাপিত হয়। </p>
<p>জীবিকার তাগিদে মধ্যপ্রাচ্যের মরুর দেশ কাতারে আসার সুবাদে আরবদের ঈদ পালনের রীতিনীতি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। আরব অঞ্চলে রমজানের শুরু থেকেই উত্তেজনার ভাব লক্ষ্য করা যায় যেটা পুরো মাস ধরে চলে। ফলে আমাদের দেশের মতো ঈদের দিনে আবেগ ও আনন্দের বিস্ফোরণ সচারচর ঘটতে দেখা যায় না। আরবরা ইফতারির পর থেকে সেহরির সময় পর্যন্ত অনেকেই বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় আসা যাওয়া করেন। তারাবিহ নামাজের পর চলে রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা, শিশা পান ও খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি। </p>
<p>প্রতি বছর রোজার মরশুমে অর্থাৎ ঈদের আগেই কাতারীরা সাধারণত বাড়ির ফার্নিচার বদল করে নতুন ফার্নিচার দিয়ে ঘর সাজান। ফলে কাতারের ফার্নিচার মার্কেট ‘সুক হারেজে’র বাংলাদেশী ফার্নিচার ব্যবসায়ীদের জন্য রমজান হচ্ছে রমরমা ব্যবসার মাস। </p>
<p>কাতারে ঈদের নামাজের সময় দেখে ভড়কে গেলাম। নামাজ হয় খুব ভোরে ফজর নামাজের আনুমানিক এক ঘন্টা পর। ফলে আমাদের দেশের মতো দলবদ্ধ হয়ে পরিবার পরিজনসহ ঈদের জামাতে যাবার দৃশ্য এখানে তেমন একটা চোখে পড়ে না। গরম আবহাওয়ার জন্যই হয়তো সূর্যের তাপ বাড়ার আগেই নামাজ শেষ করে ফেলার এই নিয়ম। এখানে প্রায় সব বড় মসজিদ এবং সরকারি স্কুল প্রাঙ্গনে ঈদের জামায়াতের আয়োজন করা হয়। নামাজ শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ পর এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দেখি সবাই টানা ঘুম দিচ্ছেন। বন্ধু ঘুম থেকে উঠে দরোজা খুলে দিয়ে আমাকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, ভোরে নামাজ পড়ে এসে আবার একটু ঘুমিয়ে নেবার পরই শুরু হয় তাদের ঈদের দিন। </p>
<p>যারা পরিবার নিয়ে কাতারে আছেন, দেশের মতো এ বাড়ি ও বাড়ি বেড়িয়ে জমিয়ে পালন করেন ঈদ উৎসব। তবে ব্যাচেলরদের জন্য তেমন কিছু নেই। নামাজ শেষে বাসায় খাবার দাবার সেরে সবাই দল বেঁধে বেরিয়ে পড়েন। ভালো লাগার জায়গাগুলো হচ্ছে রাজধানী দোহা শহরের কর্নিশ, দুখান কিংবা ওয়াকরার মতো সমুদ্র সৈকত। কানে হেডফোন লাগিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত ফেলে আসা পরিবার পরিজনদের সাথে ফোনালাপ সেরে তবেই বাড়ি ফেরেন। </p>
<p>দুই দশকেরও বেশি সময় অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরে কাটিয়েছি। মুসলিম-অধ্যুষিত দেশের তুলনায় মুসলিম সংখ্যালঘু দেশে ঈদ ও রমজানের আমেজ পুরোপুরি ভিন্ন। অস্ট্রেলিয়ায় ঈদের দিনে কোনো সরকারি ছুটি নেই। অনেকেই অফিস থেকে ছুুটি নিয়ে ঈদ পালন করেন। যাদের কাজের তাড়া আছে তারা নামাজ সেরেই আবার অফিসে ফিরে যান। ঈদ যদি সাপ্তাহিক বন্ধের দিন অর্থাৎ শনি কিংবা রবিবারে পড়ে যায় তাহলে সত্যিকার জমে উঠে ঈদের আনন্দ। ঈদের পরের সপ্তাহে বিভিন্ন এলাকায় আয়োজন করা হয় ঈদ মেলা। তবে মুসলিম-অধ্যুষিত মহল্লায় না থাকলে আশপাশের মানুষ ও পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় নেই যে আনন্দের বারতা নিয়ে এসেছে ঈদ। সেই তুলনায় কাতারে প্রায় সপ্তাহখানেক ঈদের ছুটিকে বিধাতার আশীর্বাদের মতোই মনে হয়েছে। </p>
<p>সিডনি শহরের অন্যতম মুসলিম এলাকা হচ্ছে ল্যাকেম্বা। যা একসময় লেবানিজ মুসলিমদের আখড়া হিসাবে বিখ্যাত ছিল। কিন্তু এই এলাকা এখন বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ানদের দখলে। রমজানের সময় এই এলাকার ফুটপাতে বসে ইফতারের হাট। ল্যাকেম্বার গেলে মনে হয় যেন বাঙালি পাড়াতে ঢুকেছি। সিডনি শহরের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত হয় ল্যাকেম্বার বড় মসজিদে। অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, প্রভাবশালী সিনেটর ও মন্ত্রী ঈদের নামাজে আসেন মুসলিমদের শুভেচ্ছা জানাতে। </p>
<p>ঈদের নামাজ মূলত মসজিদে পড়ানো হলেও ইদানিং এলাকার খেলার মাঠেও নামাজ পড়ার অনুমতি দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশি কমিউনিটিও বিভিন্ন এলাকায় তৈরি করেছেন বেশ কিছু মসজিদ। অনেক ক্ষেত্রে খ্রিষ্টানদের গির্জা কিনে সেটাকে মসজিদে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এর বাড়তি সুবিধা হচ্ছে ধর্মীয় কার্যক্রম করার জন্য গির্জার অনুমোদন থাকায় মজিদের জন্য নতুন করে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হয় না।</p>
<p>তবে স্বদেশের ঈদের সাথে অন্য কিছুর তুলনা হয় না। দেশে ঈদের চাঁদ দেখার মধ্য দিয়েই শুরু হতো ঈদ-আনন্দ যাত্রা। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবার মধ্যে ঈদের চাঁদ দেখার জন্য দেখা যেতো টান-টান উত্তেজনা। কোন জায়গায় দাঁড়ালে ঈদের চাঁদ দেখা যেতে পারে সে নিয়ে চলতো গবেষণা। ছোটোবেলায় চাঁদ দেখার জন্য দল-বল নিয়ে আমরা কোনো উঁচু বিল্ডিংয়ের ছাদে কিংবা খোলা মাঠে গিয়ে দাঁড়াতাম। কোনো কারণে চাঁদ দেখতে না পেলে যেমন কষ্টে ভেঙ্গে পড়তাম তেমনি আবার চাঁদ দেখতে পেলে দিকে দিকে উপচে পড়তো আনন্দের ফোয়ারা। সাইরেন, আতশবাজির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠতো চারদিক। </p>
<p>ঈদের আগমনী বার্তা শোনার পর সারারাত ধরে বাড়িতে চলতো বিভিন্ন ধরনের ক্রিয়াকলাপ। যেমন ঘরবাড়ি ধুয়ে মুছে পরিস্কার করা, দর্জির দোকান থেকে আনা নতুন জামা কাপড় ইস্ত্রি করা, মেহেন্দী লাগানো ইত্যাদি। ওদিকে মা-খালারা বিভিন্ন পদের সেমাই ও রান্নার কাজে থাকতেন ব্যাতিব্যস্ত। ইদানিং হাই-রাইজ বিল্ডিংয়ের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছে বলে খালি মাঠ তেমন চোখে পড়ে না। রিয়েল স্টেটের দালান-বাড়িগুলো যেন অসুরের মতো গ্রাস করে নিয়েছে সমস্ত সবুজ মাঠ। </p>
<p>ঈদের দিন ভোরে কে আগে বাথরুম দখল করবে সে নিয়ে বাড়িতে চলতো প্রতিযোগিতা। গোসল সেরে চোখে সুরমা লাগিয়ে নতুন পায়জামা, পাঞ্জাবী ও নাগরা পায়ে দিয়ে ছুটতাম সবাই ঈদগাহের পানে। চট্টগ্রামের লালদীঘির মাঠেই হতো তখন ঈদের সবচেয়ে বড় জামাত। এখন অবশ্য পলো-গ্রাউন্ড কিংবা জামায়াতুল ফালাহ’র মাঠে বড়সড় জামাত হয়। নামাজ শেষে বাড়ি এসে শুরু হতো সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব, সালামী নেবার পালা। বড়দের সালাম করলে সালামী পেতাম। </p>
<p>বাবা ঈদের সালামী দেবার জন্য ব্যাংক থেকে নিয়ে আসতেন কড়কড়ে নতুন নোট। নতুন নোটের সুগন্ধটাই ছিল অন্যরকম। কে কত বেশি সালামী যোগাড় করতে পারে সে নিয়ে চলতো দুরন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বাড়িতে সালাম নেয়া শেষ হলে পাড়াতো চাচা, খালারাও সালামীর দাবি থেকে রেহাই পেতেন না। দিন শেষে পকেটে কত জমা হলো তার উপর ভিত্তি করে ঠিক করতাম সালামীর টাকা নিয়ে কি করা যায়। এমন করে এ বাড়ি ও বাড়ি বেড়ানোতে সারাটা দিন কেটে গেলেও কখনো ক্লান্ত মনে হতো না। তখন নিয়েছি সালামী আর এখন উল্টো সালামী দিচ্ছি। সালামী নেয়ার চেয়ে দেয়াতে যে কতটা আনন্দ তা এখন বুঝতে পারছি। </p>
<p>হাইস্কুলে পড়ার সময় ঈদের দিনের একটি নিয়ম ছিল বন্ধুদের নিয়ে সিনেমা দেখা। ওই একটি দিন সিনেমা দেখার জন্য বাড়িতে থেকে কোনোরকম ছাড়পত্র লাগতো না। লালদীঘি মাঠের অদূরে ছিল চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সিনোম হল রঙ্গম। এখানে আঁতেল কিংবা এলিট শ্রেণীর লোকজনেরা সিনেমা দেখতে আসতেন না। পাকিস্তান আমলের কথা। ঈদের দিনের এই সিনেমা হলে ঘটা করে মোহাম্মদ আলী কিংবা ফাইটিং স্টার সুধিরের মারদাঙ্গা ছায়াছবি রিলিজ দেয়া হতো। শহরের সহজ সরল আম-জনতা অধীর উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে এই ধরনের ছবি উপভোগ করতেন। অন্যান্য সিনেমা হল বাদ দিয়ে নির্ভেজাল আনন্দের জন্য এই সিনেমা হলকেই আমরা বেছে নিতাম। তবে মাঝেমধ্যে আনন্দের সাথে ছাড়পোকার কামড়ও খেতে হতো। </p>
<p>একবার রঙ্গমে গিয়েছি সিনেমা দেখতে। চলছে খুবই জনপ্রিয় ছবি নবাব সিরাজউদ্দৌলা। সিনেমার শেষ পর্ব। নবাব যুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন। নবাবরূপী কিংবদন্তি অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের জ্বালাময়ী সংলাপ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল সবাই। চারদিক পিনপতন নিরবতা। সিনেমা শেষ হবার পর বিষন্ন মনে সবাই বের হচ্ছিলেন হল থেকে। হঠাৎ শুনতে পেলাম আমার সামনের সারিরই একজন দর্শকের মন্তব্য। উনি তার বন্ধুকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলছিলেন, ‘পলাশীর মাঠে নবাব সিরাজের পাশে যদি সুধির (জনপ্রিয় ফাইটিং অভিনেতা) থাকতো তাহলে নবাব কখনোই যুদ্ধে পরাজিত হতেন না। সুধীর একাই ইংরেজদের কাবু করে ফেলতো।’ বুঝুন অবস্থা! দর্শকটির কথা শুনে হাসিতে দম আটকে যাচ্ছিল। কিন্তু পাছে বিমর্ষ দর্শকদের রোষানলে পড়ি সেই ভয়ে কোনো রকমে হলের বাইরে এসে আমরা সবাই বাঁধভাঙ্গা হাসিতে ফেটে পড়লাম। রঙ্গমে শোনা এই মন্তব্য এখনো আমার স্মৃতিতে এক চিলতে রৌদ্দুর হয়ে ভালো লাগার দীপ্তি ছড়ায়।</p>
<p>ঈদ আসে ঈদ যায়। প্রবাস জীবনের ভালোমন্দ মিশিয়ে মোটামুটি ভালোই কাটে ঈদের দিনগুলো। তবুও দেশের ফেলে আসা স্মৃতিগুলো মনে পড়লে এলোমেলো হয়ে যাই। মনে হয় কোথাও যেন রয়ে গেছে একটুখানি অপ্রাপ্তি আর শূন্যতা, ‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না, সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।’</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/613/feed</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি ও ভবিষ্যতের রোডম্যাপ</title>
		<link>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/604</link>
					<comments>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/604#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[admi@mamoo252]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 22 Aug 2026 15:18:28 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Religion & Philosophy]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://mamoon.net/?p=604</guid>

					<description><![CDATA[দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর অবশেষে বাংলাদেশ সরকার কওমি মাদরাসাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন দাওরায়ে হাদিসের সনদকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স ডিগ্রির (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমানের বলে গন্য করা হবে। বাংলাদেশে...]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর অবশেষে বাংলাদেশ সরকার কওমি মাদরাসাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন দাওরায়ে হাদিসের সনদকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স ডিগ্রির (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমানের বলে গন্য করা হবে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৫ লক্ষাধিক ছাত্র-ছাত্রী আনুমানিক ৭৫ হাজার কওমি মাদরাসা থেকে লেখাপড়া শেষ করে বেরুচ্ছেন। এত বড় একটি জনগোষ্ঠী মূলধারা থেকে দূরে থাকায় দেশের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছিল। তাই কওমি মাদরাসার শিক্ষাকে সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে মূলধারায় নিয়ে আসাটা ছিল সময়ের দাবি। কওমি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা এবং সনদের স্বীকৃতি খুবই আশাব্যঞ্জক। তবে এই সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে কওমি মাদরাসাগুলোর দায়িত্ব এখন আরো বহু গুণ বেড়ে গেল।</p>
<p>সমতার প্রশ্নে ধর্মীয় বিষয়ে জ্ঞানার্জনকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, শিক্ষার অবস্থান ইত্যাদি বিবেচনা করে প্রচলিত কওমি শিক্ষা পাঠ্যক্রমকে আধুনিকায়ন করার ভবিষ্যত রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। স্নাতকোত্তর ডিগ্রির মূল ভিত্তি হচ্ছে এসএসসি, এইচএসসি এবং স্নাতক কোর্স। তাই স্নাতকোত্তরের আগের শিক্ষার স্তরগুলোর মান উন্নত করে কিভাবে মূলধারার সমপর্যায়ে আনা যায়, সেটাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। </p>
<p>মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা এখন ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। অন্যদিকে কওমি মাদরাসায় পড়ানোর খরচ নেই বললেই চলে। ফলে মাদরাসায় সাধারণ শিক্ষার খরচ বহন করতে পারে না এমন দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের আধিক্য দেখা যায়। ব্যয়বহুল শিক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানকে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা দিতে চান। তাই মাদরাসা শিক্ষায় আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়ছে।</p>
<p>মাদরাসা থেকে পাশ করলে একমাত্র মসজিদের ইমাম কিংবা মুয়াজ্জিন হওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই, এমন একটি ধারণা আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে। মাদরাসায় মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের ইতিহাস পড়ানো হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মাদরাসার পাঠ্যক্রম, শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষের পরিষ্কার ধারণা নেই। তাই অনেক বাবা-মা ইচ্ছে থাকলেও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাদের মাদরাসায় পাঠাতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। ফলে অধিকাংশ মেধাবী ছাত্ররা মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার দিকেই ঝুঁকে পড়ে। তবে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পাশ করা অনেক ছাত্র-ছাত্রী নিজ মেধা এবং চেষ্টায় সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে গেছেন। ইংল্যান্ড, আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় এমন অনেকের কথা জানি, যারা প্রথমে মসজিদের ইমাম হিসাবে এলেও পরে পিএইচডি সম্পন্ন করে শিক্ষকতা করছেন। </p>
<p>বিশ্বজুড়ে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন খাতে মাদরাসা থেকে পাশ করা গ্রাজুয়েটদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সরকার পরিচালিত মসজিদে ইমাম ও মুয়াজ্জিনের পদে বহু বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে তাঁদের সফলতা দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনছে। ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে ক্রমবর্ধমান মুসলিম জন্যসংখ্যার কারণে মসজিদ এবং ইসলামিক সেন্টারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। ফলে ওইসব দেশে ইমাম ছাড়াও শিক্ষকতা, ইসলামিক ব্যাংকিং, বিমা, হালাল খাবারের তদারকি এবং সার্টিফিকেশনসহ বিভিন্ন সংস্থায় মাদরাসা শিক্ষিত জনশক্তির ব্যাপক চাহিদা আছে। </p>
<p>দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ার থাকার সুবাদে ওই দেশের কিছু অভিজ্ঞতার কথা এখন তুলে ধরছি। অস্ট্রেলিয়ার অধিকাংশ মসজিদ বিভিন্ন মুসলিম কমিউনিটির সংঘবব্ধ প্রচেষ্টায় ব্যক্তিগত অনুদান সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠা করা হয়। নব্বই দশকের প্রথম দিকে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে সিডনি শহরের ‘সেফটন’ এলাকায় একটি পুরোনো গির্জা ক্রয় করে মসজিদে রূপান্তরিত করা হয়। এই মসজিদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজের সাথে আমি সংযুক্ত ছিলাম। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে ইমামের দায়িত্ব পালন করার জন্য গভীর ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় দখল থাকাটাও খুব জরুরি। দেখা গেছে, অনেক সময় নিজ মাতৃভাষায় দেয়া ইমামের খুতবা এবং বক্তব্যের অনুবাদ বিকৃত হয়ে মিডিয়ায় তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করে। এতে ইসলাম এবং মুসলিমদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। </p>
<p>ইংরেজি ভাষায় অদক্ষ একজন ইমাম অস্ট্রেলিয়ার বড় হওয়া মুসলিম তরুণ এবং যুবক সমাজের কাছে যৌক্তিকতার মাধ্যমে ইসলামের বার্তা তুলে ধরতে ব্যর্থ হন বলে তাদের অনেকেই মসজিদ ও ধর্মবিমুখ হয়ে পড়ে। কেউ আবার উগ্রপন্থী মুসলিম সংগঠনের সাথে সংযুক্ত হয়ে সন্ত্রাসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করার লক্ষ্যে অস্ট্রেলিয়ান ইমাম কাউন্সিল এখন নবাগত ইমামদের জন্য ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছে। অস্ট্রেলিয়ার জীবনধারা এবং মূল জনগোষ্ঠীর মূল্যবোধ সম্পর্কে এখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এখন অস্ট্রেলিয়ায় ইমামের চাকরি নিয়ে যেতে হলে দক্ষ ক্যাটাগরিতে অভিবাসনের প্রার্থীদের মতো ইংরেজি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ফলে প্রার্থীর ইংরেজি দক্ষতা নিয়ে এখন আর ভাবতে হয় না।</p>
<p>মসজিদে খুতবা দেয়া ও নামাজ পড়ানোর পাশাপাশি একজন ইমামকে সমাজের বিভিন্ন পেশা ও স্তরের মানুষকে ধর্মীয় অনুশাসনের ভিত্তিতে সঠিক নির্দেশনা ও পরামর্শ দেয়ার গুরুদায়িত্বও পালন করতে হয়। একজন ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ডাক্তারকে তাদের পেশাদার কাজ চালানোর জন্য ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ না হলেও চলে। কিন্তু একজন ইসলামিক চিন্তাবিদ বা ইমামকে ধর্মীয় গন্ডীর বাইরের বহু বিষয় সম্পর্কে জানতে হয়। এজন্য কওমি মাদরাসায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ চলমান বিশ্বের প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো সম্পর্কে পাঠদানের সুযোগ রাখতে হবে। এর ফলে মাদরাসা থেকে পাশ করা একজন ইমাম বর্তমান বিশ্বের আর্থ-সামাজিক এবং জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম হবেন।</p>
<p>এমন একটা সময় ছিল যখন জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা থেকে শুরু করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখাতেই মুসলিম বিজ্ঞানীরা ছিলেন সবার শীর্ষে। দশ শতকের আরব বিজ্ঞানী ইবনে আল-হাইথামকে বিশ্বের প্রথম পরিপূর্ণ বিজ্ঞানী হিসাবে মানা হয়। একাধারে গাণিতিক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও দার্শনিক আল-হাইথাম নিউটনের ৬০০ বছর আগে গতিদ্যিার প্রথম সূত্রের ধারণা অবিষ্কার করেন। এছাড়া অপটিক্স বা আলোকবিদ্যার জনক হচ্ছেন তিনি। তাঁর সূত্র ধরেই তৈরি হয়েছে আধুনিক ক্যামেরা। আজকের চিকিৎসাশাস্ত্রে ব্যবহৃত বহু আবশ্যকীয় যন্ত্রপাতির আবিষ্কারক হচ্ছেন দশ শতকের মুসলিম বিজ্ঞানী আল-জাহরাবি। কিন্তু এখন বিজ্ঞানের প্রসারে মুসলিমরাই সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে। মুসলিম সমাজের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের দূরত্ব যেন বেড়েই চলেছে। আমরা বলি বিজ্ঞানময় কুরআন। অথচ ফরাসি চিকিৎসাবিদ মরিস বুকাইলকে লিখতে হলো কুরআনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। মুসলিম বিশে^ আরেকজন আল-হাইথাম যে কবে জন্ম নেবেন জানি না।</p>
<p>কওমি মাদরাসার সিলেবাসে উর্দু ও ফারসি ভাষার ওপর যেরকম জোর দেয়া হয়, বাংলা এবং ইংরেজিচর্চার ওপর তেমন একটা গুরুত্ব দেয়া হয় না। মাদরাসার অধিকাংশ পাঠ্যবই উর্দু ও ফারসি ভাষায় হওয়াটাই হয়তো এর কারণ। বর্তমান বিশ্বের বিজ্ঞানের আবিষ্কার ও অধিকাংশ গবেষণাই ইংরেজিতে প্রকাশিত হচ্ছে। তাই উচ্চতর গবেষণার জন্য ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা খুবই দরকার। মাদরাসার পাঠ্য এবং রেফারেন্স বইগুলো যাতে মাতৃভাষা বাংলা এবং ইংরেজিতে অনূদিত হয় সে বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।</p>
<p>ইসলামিক বিশেষজ্ঞ হতে হলে কুরআন এবং হাদিসের ভাষা আরবিতে ভাষাগত ব্যুৎপত্তি থাকা আবশ্যক। মাদরাসার সিলেবাসে আরবি ভাষা বুঝা এবং লেখার সক্ষমতা অর্জনের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। দেখা গেছে, মাদরাসা থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বের হওয়ার পরও অনেক শিক্ষার্থীর আরবি ভাষাজ্ঞান পর্যাপ্ত নয়। এজন্য কওমি শিক্ষাবোর্ডের তত্ত্বাবধানে ভাষা শিক্ষার ট্রেনিং সেন্টার খোলা যেতে পারে, যেখানে কোনো ছাত্র চাইলে ভাষা শিক্ষার জন্য বিশেষ কোর্স করতে পারে। এছাড়া স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের গবেষণায় সহায়তা করার জন্য মাদরাসায় রেফারেন্স লাইব্রেরি গড়ে তুলতে হবে। এখন আর আগের মতো লাইব্রেররর তাকে বই রাখার দরকার নেই। ডিজিটাল সংযোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই প্রয়োজনীয় বই এবং গবেষণাপত্রের নাগাল পেতে পারে। </p>
<p>কওমি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীরা এখন অন্যান্যদের সাথে সরকারি চাকরির জন্য অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। তাই কওমি শিক্ষার্থীদের মসজিদ ও মাদরাসার মতো গতানুগতিক পেশায় না গিয়ে অন্য পেশায় যাবার কথাও এখন ভাবতে হবে। এই স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে সমাজে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিতে হবে। আমার বিশ্বাস, ইসলামি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ কওমি শিক্ষিতরা দুর্নীতি, প্রতারণায় ও সংঘাতে ভরা আমাদের আজকের এই সমাজকে অবক্ষয়ের দ্বার থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে। তবে সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে যাতে তারা অবদান রাখতে পারে সেজন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করার দায়িত্ব আমাদের সবার। </p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/604/feed</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>গ্রিনউইচ না মক্কা?</title>
		<link>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/601</link>
					<comments>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/601#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[admi@mamoo252]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 22 Aug 2026 15:06:56 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Religion & Philosophy]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://mamoon.net/?p=601</guid>

					<description><![CDATA[পবিত্র কাবাঘরের অদূরে স্কাইস্ক্রেপার আবরাজ আল-বাইতের শিখরে রমজানের শুরুতেই চালু হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘড়ি Makkah Clock. লন্ডনের বিগবেন ঘড়ির চেয়ে ছয় গুণ বড় এই ঘড়ি ১৩৬ বছর ধরে প্রচলিত...]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>পবিত্র কাবাঘরের অদূরে স্কাইস্ক্রেপার আবরাজ আল-বাইতের শিখরে রমজানের শুরুতেই চালু হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘড়ি Makkah Clock. লন্ডনের বিগবেন ঘড়ির চেয়ে ছয় গুণ বড় এই ঘড়ি ১৩৬ বছর ধরে প্রচলিত Greenwich Mean Time (GMT) কে Makkah Time (MT) দিয়ে প্রতিস্থাপন করার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে গন্য করা হচ্ছে। সৌদি সরকার আশা করছে, গ্রিনউইচের বিকল্প হিসাবে মক্কা একদিন বিশ্বে প্রতিষ্ঠা পাবে।</p>
<p>প্রথমেই প্রশ্ন জাগতে পারে GMT কি? GMT কি সেটা বুঝতে হলে আমাদের Greenwich Meridian সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। Greenwich Meridian হল একটি কাল্পনিক মধ্যরেখা, যা পৃথিবীর উত্তর মেরু থেকে শুরু হয়ে গ্রিনউইচ রাজকীয় মানমন্দিরের (Royal Observatory, Greenwich) মধ্য দিয়ে এন্টার্কটিকা হয়ে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত। গ্রিনউইচ মধ্যরেখায় দ্রাঘিমার (Longitude) মান হল শূন্য ডিগ্রি। এই গ্রিনউইচ মধ্যরেখাই পৃথিবীকে পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধে দু’ভাগ করেছে। ১৮৮৪ সালে ওয়াশিংটনে ২৫টি দেশের একটি সম্মেলনে গ্রিনউইচ মেরিডিয়ানকে মানদন্ড হিসাবে গ্রহণ করা হয়। গ্রিনউইচ রাজকীয় মানমন্দিরে মাপা সময়ই হল Greenwich Time, যা Universal Time নামেও পরিচিত। গ্রিনউইচ মেরিডিয়ানের ঠিক উল্টো দিকে অর্থাৎ ১৮০০ দ্রাঘিমা বরাবর প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য দিয়ে টানা হয়েছে International Date Line, এই রেখা অতিক্রম করলে তারিখ বদলে যায়। </p>
<p>২০০৮ সালে কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসলিম বিজ্ঞানী ও মুফ্তিদের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন Mecca: The Center of the Earth, Theory and Practice. এই সম্মেলনে গ্রিনউইচের বদলে মক্কাকে কেন্দ্র করে সময় গণনা করার আহ্বান জানানো হয়। সম্মেলনের বক্তারা মক্কাকে Global Meridian হিসাবে গ্রহণ করার পক্ষে যুক্তি ও প্রমাণ তুলে ধরেন। আধিপত্যের জোরেই ব্রিটেন ও পশ্চিমা শক্তি গ্রিনউইচকে বিশ্বের উপর চাপিয়ে দিয়েছে বলে সম্মেলেনের বক্তারা দাবি করেন।</p>
<p>প্রকৃতিতে, মানুষের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে, DNA, গাছপালা, মানব ইতিহাসের বিখ্যাত চিত্র ও স্থাপত্যকর্ম থেকে শুরু করে এমনকি মহাশূন্যের গ্যালাক্সির গঠনেও একটি বিশেষ ধ্রুবকের সন্ধান পাওয়া যায়, যাকে বলা হয় Golden Ratio. এই ধ্রুবকের মান হল ১.৬১৮০. নিখুঁত সৃষ্টির (Perfect Design) জন্য এই অনুপাত ব্যবহৃত হয় বলে এটাকে অনেকে উরারহব জধঃরড় বলে থাকেন। হিসাব করে দেখা গেছে, মক্কা থেকে দক্ষিন মেরু এবং মক্কা থেকে উত্তর মেরুর দূরত্বের অনুপাত (12348.32 km/7631.6 km) হল Golden Ratio অর্থাৎ ১.৬১৮০।  আবার উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু এবং মক্কা থেকে দক্ষিণ মেরুর মধ্যেকার দূরত্বের অনুপাত (19980km/7631.6 km) হল ১.৬১৮০, সেই Golden Ratio. তাই মুসলিম বিশেষজ্ঞদের মতে পৃথিবীর Golden Mean Point হল মক্কা। </p>
<p>Phi Matrix নামক একটি কম্পিটার সফ্টওয়্যার গ্রাফিক ডিজাইনে Golden Mean Point (GMP) নির্ণয় করতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই Phi Matrix সফ্টওয়্যারেই পৃথিবীর দ্বি-মাত্রিক ম্যাপ বসিয়ে দেখা গেছে পৃথিবীর এগচ হল মক্কা। কুরআনেও এর ইঙ্গিত রয়েছে বলে দাবি করা হয়। সুরা আল ইমরানের (৩ : ৯৬) ৯৬ নাম্বার আয়াতে বাক্কা (মক্কার আদি নাম) শহরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতে যতগুলি অক্ষর রয়েছে তার Golden Mean হল ৪৭/১.৬১৮ = ২৯। আর উক্ত আয়াতের শুরু থেকে বাক্কা শব্দটি পর্যন্ত সব ক’টি অক্ষরের যোগফল হল ২৯, তার মানে বাক্কা বা মক্কা, আয়াত ৯৬ এর Golden Mean Point  এ অবস্থান করছে। </p>
<p>কানাডিয়ান ইসলামিক কংগ্রেসের জন্য ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক Dr. Len Guelke, পৃথিবীর একটি নতুন মানচিত্র তৈরি করেছেন। তাঁর মতে, গোলকাকৃতি পৃথিবীর প্রচলিত দ্বি-মাত্রিক মানচিত্রে পৃথিবীর আকারের সঠিক প্রতিফলন ঘটে না, তাই দু’টি স্থানের মধ্যকার দূরত্বের মাপে কিছুটা বিকৃতি থাকে। কিন্তু ড. লেনের তৈরি এই মানচিত্রে মক্কা থেকে পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের দূরত্ব সরল রেখায় নিপুণভাবে মাপা যায়। এই নতুন ম্যাপ থেকে যে বিস্ময়কর তথ্য বেরিয়ে আসে তা হলো, পানির ভাগ বাদ দিলে পৃথিবীর সমগ্র স্থলভাগের কেন্দ্র হলো মক্কা শহর। মক্কার পক্ষে মুসলিমরা এমনি আরো অনেক যুক্তি/প্রমাণ উপস্থাপনা করে থাকেন। তবে বিরুদ্ধবাদীদের মতে, মক্কার ঠিক উল্টো দিকে পৃথিবীর অন্য পৃষ্ঠে মক্কার মতো একটি জায়গা পাওয়া যাবে যা Golden Ratio’র সব শর্ত পূরণ করবে। </p>
<p>বিশ্বের মুসলিমরা যদি শত বছরের পুরোনো গ্রিনউইচের জায়গায় মক্কাকে প্রতিস্থাপনের দাবি করেই থাকেন, তবে সেই দাবিকে আমি অযৌক্তিক বলে মনে করি না। কারণ গ্রিনউইচ মেরিডিয়ান হলো এটি কাল্পনিক রেখা যা কিছু দেশের সহমতের ভিত্তিতে রচিত হয়েছিল। আর সমগ্র বিশ্ব একই সাথে গ্রিনউইচকে গ্রহণ করেনি। যেমন ফ্রান্স ১৮৮৪ সালের মেরিডিয়ান সম্মেলেনে ভোটদান থেকে বিরত থাকে এবং দীর্ঘদিন পর্যন্ত ফ্রান্সের ম্যাপে প্যারিস মেরিডিয়ান ব্যবহৃত হয়। প্যারিস ছাড়া অন্যান্য যে সব মেরিডিয়ান প্রচলিত ছিল সেগুলির মধ্যে অন্যতম হল ব্রাসেল্স, আলেকজান্দ্রিয়া, গিজার পিরামিড, জেরুজালেম, রোম, ওয়াশিংটন ডিসি, স্টকহোম ইত্যাদি। তাই নতুন একটি মেরিডিয়ান চালু করার প্রস্তাবে আমি দোষের কিছু দেখি না। তবে ধর্মীয় কারণে মুসলিমদের কাছে মক্কার যে রকম গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, অমুসলিম ও পশ্চিমা বিশ্বের কাছে মক্কা একই ধরনের মূল্য পাবে এমন ভাবাটা হবে মারাত্মক ভুল। তাই ধর্মীয় আবেগ নয় বরং একুশ শতকের বাস্তবতা, পরাশক্তির ক্ষমতার বলয় ইত্যাদির ওপর নির্ভর করবে প্রস্তাবিত নতুন মেরিডিয়ানের সফলতা। </p>
<p>গ্রিনউইচ মেরিডিয়ানের বদলে একটি নতুন মানদন্ড চালু করলে সমগ্র বিশ্বের নৌ/বিমান পরিবহন, জিপিএস, স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ আরো অনেক ক্ষেত্রে বিশাল প্রভাব পড়বে। বিশ্বের তাবৎ ভৌগলিক পরিসংখান ও তথ্য যাবে বদলে। উল্লেখ্য, গ্রিনউইচ ভিত্তিক IDL প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু মক্কা ভিত্তিক আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা যাবে (IDL) কানাডা ও আমেরিকার মধ্য দিয়ে, ফলে কানাডা ও আমেরিকায় একই সাথে দুটি দিনের সৃষ্টি হবে। পৃথিবীর একমাত্র পরাশক্তি আমেরিকা এটা খুব সহজেই মেনে নেবে বলে মনে হয় না। তাই আদৌ এই পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন আছে কিনা তা মুসলিম বিশেষজ্ঞ সমাজকে গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।</p>
<p>গ্রিনউইচ মেরিডিয়ানকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি চাপিয়ে দিয়েছে বলে দোহা সম্মেলনে যে যুক্তি দেখানো হয়েছে তা আমার কাছে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। এটা অনস্বীকার্য যে ১৮ শতকে জ্যোতির্বিদ্যা ও নৌপরিবহনের ক্ষেত্রে ব্রিটন অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল। আর যদিও গ্রিনউইচ মেরিডিয়ান মূলত চালু হয় ১৮৫১ সালে, কিন্তু দেখা গেছে, ১৮৮৪ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ জাহাজের মানচিত্রে গ্রিনউইচ মেরিডিয়ান নির্দেশিকা হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ফলে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের ডিঙিয়ে গ্রিনউইচ সহজেই আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভ করে। </p>
<p>তাই মক্কাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে প্রথমে আরব ও মুসলিম বিশ্বকেই তাদের সরকারি মানচিত্রে গ্রিনউইচের বদলে মক্কা মেরিডিয়ান প্রতিস্থাপন করে বিশ্বকে দেখাতে হবে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, জ্ঞান বিজ্ঞানে পিছিয়ে থাকা একুশ শতকের মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমা প্রযুক্তির উপর এতই নির্ভরশীল যে মক্কা মেরিডিয়ানের সফলতা নিয়ে অনেকেই এখন সন্দিহান। তবে চেষ্টা করে দেখলে দোষের কি? সভ্যতার উত্থান-পতন হলো জগতের স্বাভাবিক রীতি। তাই আগামী কোনো একদিন মুসলিম সভ্যতার যে পুনরুত্থান হবে না সেই ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না। কে জানে তখন হয়তো মক্কা পৃথিবীর মূল মধ্যরেখা হিসাবে সমগ্র বিশ্বের স্বীকৃতি পাবে। </p>
<p>যে স্কাইস্ক্রেপারের চূড়ায় বসানো হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘড়ি, এবার সেই আবরাজ আল-বাইত টাওয়ারের কথায় আবার ফিরে আসি। অবাক করা কথা হলো, দেশে দেশে বিশাল টাওয়ার নির্মাণের সাথে অর্থনৈতিক মন্দার এক অদ্ভুত সম্পর্ক লক্ষ্য করা গেছে যা উল্লেখ না করে পারছি না। নিচে কয়েকটি উদাহরন দিচ্ছি।</p>
<p>এম্পায়ার এস্টেট বিল্ডিং, নিউ ইয়র্ক: ৪৫০ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট এই টাওয়ারের নির্মাণ সম্পন্ন হয় ১৯৩১ সালে, আর ১৯২৯ সালে আমেরিকার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ওয়াল স্ট্রিটে ধ্বস্ নামার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয় যা সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এই মন্দা Great Depression  নামে পরিচিত।</p>
<p>ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার (টুইন টাওয়ার), নিউ ইয়র্ক: নির্মাণ সম্পন্ন হয় ১৯৭১/৭২ সালে। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও ব্যবসায় স্থবিরতা সব মিলিয়ে আমেরিকার অর্থনীতি বিপাকে পড়ে যা সত্তর দশকের Stagflation নামে খ্যাত। আর এই টুইন টাওয়ার ধ্বংসের জের ধরে আমেরিকার অর্থনীতিতে আবার ধ্বস্ নামে। প্রেসিডেন্ট ওবামা কিছুদিন আগে ৭০০ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ দিয়ে অর্থনীতিকে চাঙা করার চেষ্টা করছেন। </p>
<p>পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার, মালয়েশিয়া: ১৯৯৭ সালে নির্মিত হবার পর পরই পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয় যা মালয়েশিয়াতেও আঘাত হানে। </p>
<p>বুর্জ খালিফা, দুবাই: বিশ্বের সর্বোচ্চ দালান বুর্জ খালিফা নির্মিত হবার সময় দুবাই ক্রাশের কথা আমাদের সবারই জানা।<br />
তাই ভাবছি, পবিত্র কাবাঘরের মাত্র ৫০ মিটারের মধ্যে নির্মিত মক্কার আবরাজ টাওয়ার সৌদি আরবের জন্য কোনো দুঃসংবাদ বয়ে আনবে কিনা।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/601/feed</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>পবিত্র কুরআন বুঝে পড়া</title>
		<link>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/597</link>
					<comments>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/597#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[admi@mamoo252]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 20 Aug 2026 14:38:35 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Religion & Philosophy]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://mamoon.net/?p=597</guid>

					<description><![CDATA[পবিত্র রমজান মসে দেশের প্রায় প্রতিটি মসজিদেই তারাবিহ নামাজে কুরআন খতম দেয়া হয়। উদ্দেশ্য, বছরে অন্তত একবার নামাজরত অবস্থায় শুদ্ধভাবে পবিত্র কুরআন শোনা এবং কুরআন থেকে আল্লাহর দেয়া নির্দেশনা গ্র্রহণ...]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>পবিত্র রমজান মসে দেশের প্রায় প্রতিটি মসজিদেই তারাবিহ নামাজে কুরআন খতম দেয়া হয়। উদ্দেশ্য, বছরে অন্তত একবার নামাজরত অবস্থায় শুদ্ধভাবে পবিত্র কুরআন শোনা এবং কুরআন থেকে আল্লাহর দেয়া নির্দেশনা গ্র্রহণ করা। আল্লাহ তায়ালা সুরা বাকারায় বলেছেন, ‘রমজান মাসই হলো সে মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।’ (২ : ১৮৫, অনুবাদ: মুহীউদ্দিন খান)। </p>
<p>কিন্তু হাফেজ সাহেবের তেলাওয়াত থেকে আমরা যা শুনছি তার কতটুকু আমরা বুঝতে পারি? কুরআন এসেছে আমাদের সঠিক পথ দেখানোর জন্য। সেই কুরআনের বাণীর মর্ম উপলব্ধি করতে না পারি তাহলে শুধু পাঠ করে কিংবা শ্রবণ করে কি আমরা আল্লাহর দেয়া দিক-নির্দেশনার সন্ধান পাবো?</p>
<p>মুসলিম হিসাবে ছোটোবেলায় আরবি পড়া ও লেখা শিখেছি। কিন্তু ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক অর্থাৎ ভাষার অর্থ বুঝে পড়াটাই শেখা হয়নি। তাই তারাবিহ নামাজ পড়তে গিয়ে মনে হয়, কুরআন খতম করে নেকি অর্জন করাটাই যেন মূল বিবেচ্য বিষয়। কেবল কুরআন তেলাওয়াত করলে সোয়াব পাওয়া যায়, হাদিস ও কুরআনে এর স্বপক্ষে দলিল রয়েছে (কুরআন ২৯ : ৪৫, হাদিস নং ১০০৩, তিরমিজি)। </p>
<p>কিন্তু মানবজাতির কাছে কুরআন পাঠানোর উদ্দেশ্য কি কেবল নেকি অর্জন করা? আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে প্রতিটি মুসলিমকে কুরআনের অর্থ বুঝে তার মর্মার্থ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার সুষ্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। ‘তারা কি কুরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?’ (৪৭ : ২৪, অনুবাদ: মুহীউদ্দিন খান)। বিশ্বের মুসলিম জনসংখ্যার মাত্র ১৫ ভাগ হলো আরব। আরবি জানেন এমন অনারব মুসলিমদের বাদ দিলে দেখা যায়, মুসলিম জনতার প্রায় ৮০ ভাগই আরবি জানেন না। ফলে কুরআন বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত পুস্তক হলেও দুঃখজনকভাবে সর্বাধিক না বুঝে পড়া গ্রন্থও বটে! </p>
<p>কুরআনের অর্থ শতভাগ অনুবাদ করা সম্ভব নয়। কবি নজরুলের একটি বিখ্যাত কবিতা হলো ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’। এই কবিতা বিদেশি কোনো ভাষায় যতই সতর্কতার সাথে অনুবাদ করা হোক না কেন কবিতার পংক্তিমালায় উৎসরিত আবেগ, বেদনার রং কি মূল কবিতার মতো পাঠকের হৃদয় ছুঁতে পারবে? পবিত্র কুরআনের ক্ষেত্রেও তাই। কুরআনের সঠিক ভাব ও মর্মার্থ বুঝা একমাত্র আরবি ভাষাতেই সম্ভব। নামাজ পড়ার সময় আমরা অনেকটা কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে ইমামের তেলাওয়াত শুনে যাই কিন্তু কিরাতের অর্থ বুঝতে পারি না বলে আল্লাহর বাণী আমাদের হৃদয়কে আলোড়িত করতে পারে না। নামাজের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে মনোনিবেশ করতে না পারার এটাও একটা অন্যতম কারণ বলে আমি মনে করি। অথচ রাসুলের (সা.) সাহাবিদের নামাজে মগ্ন হয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেবার ঘটনা আমরা শুনেছি। নামাজের মধ্যে মনোনিবেশ করে তারা তুষ্টি পেতেন, আল্লাহর সান্নিধ্য পেতেন। নামাজের মধ্যে কি আমরা সেই তৃপ্তি খুঁজে পাই? তাই কুরআন বুঝতে হলে আরবি ভাষা শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তবে কুরআনের বিশদ ব্যাখ্যা করার জন্য কেবল আরবি ভাষা জানাটাই যথেষ্ট নয়। কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হবার প্রেক্ষাপট, যেমন প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এবং হাদিস সম্পর্কেও বিস্তারিত জানতে হবে। আর এ জন্য আলেম, উলামা কিংবা কুরআন বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। কিন্তু তাই বলে কুরআন বুঝে পড়ার দায়িত্ব কোনো মুসলিম এড়িয়ে যেতে পারেন না। বাড়তি কিছু ভাষা জানা থাকা কখনোই ক্ষতিকারক নয়। তবে ভাষা শেখার সর্বোত্তম সময় হল শিশুকাল। ভাষাবিদদের মতে একজন শিশু একই সাথে ৫টি ভাষা রপ্ত করতে পারে। তবে ইচ্ছে থাকলে বয়সটা বাধা হবার কথা নয়। </p>
<p>এছাড়া আরবি খুবই কঠিন ভাষা, শিখবো কি করে? এ ধরনের একটি ভীতি আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে। ধরা যাক অফিসের সিইও বললেন, ছয়শ পাতার একটি নতুন ডিজাইন ম্যানুয়াল এসেছে অফিস লাইব্রেরিতে। ছয় মাসের মধ্যে সেটা রপ্ত করতে পারলে বেতন বেড়ে যাবে দুই গুণ। এই ঘোষণার পর ম্যানুয়ালের প্রতিটি শব্দ মগজে ঢুকিয়ে নিতে অফিসের কর্মচারীদের মধ্যে কি ধরনের তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি বাড়িতে স্ত্রী হয়তো বলবেন, ম্যানুয়াল রপ্ত করতে বেশি বেশি সময় দাও, অন্যান্য কাজ আমি সামলাবো। অথচ যে গ্রন্থে বর্তমান এবং পরকালের মুক্তির ফর্মুলা আছে বলে মুসলিমদের বিশ্বাস, সেই কুরআনের মর্মার্থ উদ্ধার করতে আমরা কতটুকু উদ্দীপ্ত হই? কুরআন বুঝে পড়ার গুরুত্ব নিয়ে অধিকাংশ মুসলিমদের মধ্যে কোনো সংশয় না থাকলেও কুরআনের ভাষা শিখার জন্য তারা সেরকম সচেষ্ট নন। </p>
<p>পবিত্র কুরআনে অল্লাহ তায়ালা বার বার বলেছেন, (আল-কামার ৫৪ : ১৭, ২২, ৩২, ৪০) ‘আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, কোনো চিন্তাশীল আছে কি?’ (অনুবাদ : মুহীউদ্দিন খান)। কুরআনের এই আয়াতটি পড়ার পর আপাতঃদৃষ্টিতে মনে পড়ে, যাদের মাতৃভাষা আরবি নয় তাদের জন্যও কুরআন বুঝা কেমন করে সহজ হতে পারে? তার মানে আল্লাহর এই বাণীতে এমন কোনো ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে যা আমরা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছি। </p>
<p>ভারতের ভূ-পদার্থবিদ এবং বিশিষ্ট কুরআন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আজিজ আব্দুর রহীম দীর্ঘ ২০ বছর গবেষণা করে কুরআন শিক্ষার যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রণয়ন করেছেন তার মাধম্যে যে কোনো সাধারণ মুসলিমের পক্ষে খুব সহজেই কুরআনের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব। ভারতের হায়দ্রাবাদ শহরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘আন্ডারস্ট্যান্ড কুরআন একাডেমি’ (understandquran.com)। বিদেশি ভাষা দ্রুত শেখার জন্য বর্তমান বিশ্বের সেরা মনোবিজ্ঞানী এবং ভাষাবিদদের তৈরি অত্যন্ত শক্তিশালী পদ্ধতি TPI (Total Physical Interaction প্রয়োগ করে তিনি তৈরি করেছেন কুরআন শিক্ষার কোর্স। এবারে ড. আব্দুল আজিজের কুরআন বুঝার জন্য আরবি ভাষা শেখার পদ্ধতি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি। </p>
<p>মদিনা শরিফ ও মক্কার মসজিদুল হারামে যে কুরআনের কপি পাওয়া তা ‘মদিনা মুসহাফ’ নামে পরিচিত। এই মদিনা মুসহাফের পাতার সংখ্যা হল ৬০০, যার প্রতিটি পাতার রয়েছে ১৫টি লাইন এবং প্রতিটি লাইনে রয়েছে গড়ে নয়টি করে শব্দ। সেই হিসাবে কুরআনের মোট শব্দ সংখ্যা হল প্রায় ৭৮,০০০। ড. আব্দুল আজিজ গবেষণা করে দেখেছেন, আমরা নিয়ত থেকে শুরু করে নামাজের মধ্যে যে সব দোয়া-দরুদ, সুরা ফাতিহাসহ কুরআনের শেষ পারার ছোট ছোট সুরা এবং কুরআনের সুপরিচিত আয়াত হামেশা তেলাওয়াত করি, তাতে যতগুলো শব্দ রয়েছে সেগুলো কুরআনে ৫৫,০০০ বার এসেছে। যা কুরআনের মোট শব্দ সংখ্যার ৭০ শতাংশ! </p>
<p>কুরআনে একই শব্দ বার বার ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন نَحْنُ هُوَ، هُمْ، أَنْتَ، أَنْتُمْ، أَنَا ইত্যাদি শব্দ ১২৯৫ বার কুরআনে এসেছে। কেবল সুরা ফাতিহায় ব্যবহৃত শব্দগুলো কুরআনে এসেছে ৭৫০০ বার! আরবি ভাষার প্রতিটি ক্রিয়া এবং নামপদের মূলে রয়েছে একটি করে তিন অক্ষর বিশিষ্ট মৌলিক শব্দ। এই মৌলিক শব্দের সাথে এক বা অধিক অক্ষর যোগ করে লিঙ্গ, বচন এবং কালের প্রকারভেদে ভিন্ন ভিন্ন অর্থের অসংখ্য শব্দ তৈরি করা যায়; যা বাংলা কিংবা ইংরেজি ভাষায় সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, আরবি শব্দ দারস (درس)-এর মানে হল পাঠ বা Lesson। পাঠের সাথে সম্পর্কযুক্ত অন্য দুটো শব্দ হলো শিক্ষক (Teacher) এবং বিদ্যালয় (School)। আরবিতে যার অর্থ হল যথাক্রমে মুদাররিস المدرس এবং মাদরাসা مدرسة। লক্ষণীয়, আরবি ভাষার এই তিনটি শব্দেরই মূল হচ্ছে দাল-রা-সা এই তিন অক্ষরের একটি মৌলিক শব্দ। বাংলা কিংবা ইংরেজিতে পাঠ, শিক্ষক, বিদ্যালয় বোঝাতে আমাদের তিনটি নতুন শব্দ শিখতে হচ্ছে; অথচ আরবিতে একটি মূল মৌলিক শব্দ জানলেই সামান্য রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন শব্দ জানা যাচ্ছে।</p>
<p>কুরআনের মোট মৌলিক শব্দের সংখ্যা হচ্ছে প্রায় ১৮৫০। ড. আব্দুল আজিজের হিসাবমতে মাত্র ২৫০টি মৌলিক শব্দ শিখতে পারলেই কুরআনের ৭০ শতাংশ শব্দ জানা হয়ে যায়। সবচেয়ে আনন্দেন কথা হলো, নামাজের প্রয়োজনীয় দোয়া ও সুরা পড়তে গিয়ে আমরা প্রায় ৫০টি বাক্য তেলাওয়াত করি। যার মধ্যে রয়েছে আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০টি শব্দ। কেবল এই বাক্যগুলো বোঝার চেষ্টা করলেই বাড়তি কোনো পরিশ্রম ছাড়া আরবি ভাষার কাঠামো সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে। ড. আব্দুল আজিজ হিসাব কষে দেখিয়েছেন, মনোযোগ ও আন্তরিকতার সাথে তার পদ্ধতি অনুসরণ করলে মাত্র ২০০ ঘন্টার মধ্যে পুরো কুরআনের অর্থ আয়ত্তে আনা যায়। কেউ যদি সপ্তাহে কুরআন শিক্ষার জন্য মাত্র ৪ ঘন্টা করে সময় বের করতে পারেন তাহলে এক বছরের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জন করার সম্ভব। আরো বিস্তারিত জানার জন্য উৎসাহী পাঠকদের অন্তর্জলে understandquran.com ওয়েবসাইটি দেখতে অনুরোধ করছি। </p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/597/feed</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>মহানবীকে নিয়ে কার্টুন : দ্রোহ না উপেক্ষা?</title>
		<link>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/588</link>
					<comments>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/588#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[admi@mamoo252]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 19 Aug 2026 06:07:08 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Religion & Philosophy]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://mamoon.net/?p=588</guid>

					<description><![CDATA[মহানবীকে (সা.) নিয়ে ২০০৫ সালে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশ করে ডেনমার্কের একটি পত্রিকা। এর প্রতিবাদে মুসলিম বিশ্ব ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিশ্বব্যাপী দাঙ্গা হাঙ্গামা ও পাকিস্তানে আত্মঘাতী হামলায় অনেক প্রাণহানি ঘটে। এই...]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মহানবীকে (সা.) নিয়ে ২০০৫ সালে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশ করে ডেনমার্কের একটি পত্রিকা। এর প্রতিবাদে মুসলিম বিশ্ব ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিশ্বব্যাপী দাঙ্গা হাঙ্গামা ও পাকিস্তানে আত্মঘাতী হামলায় অনেক প্রাণহানি ঘটে। এই সুযোগে মহানবীকে নিয়ে আঁকা কুর্ট ওয়েস্টারগার্র্ডের কার্টুনের মূল্য আকাশ ছুঁয়ে যায়। কার্টুনের মূল কপি বিক্রি হয় প্রায় দুই লক্ষ ডলারে! </p>
<p>ডেনিশ কার্টুন সংকটের সময় অনেক মুসলিম দেশ ডেনমার্কের তৈরি পণ্য বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। দেখা গেছে, এতে কিছু ডেনিশ কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি হলেও ডেনমার্কের মূল অর্থনীতি মোটামুটি অক্ষত থেকে যায়। অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জের হিসেবে পর্যটন শিল্পের উপর নির্ভরশীল মিসরে স্ক্যান্ডিনেভিয়েন দেশগুলি থেকে আসা পর্যটকের সংখ্যা ৩০ শতাংশ কমে যায়। ফলে মিসরের অর্থনীতি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। পশ্চিমা পর্যটকদের ফিরিয়ে আনার জন্য মিসরকে মরিয়া হয়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে হয়। </p>
<p>এরপর ফ্রান্সের রম্য সাময়িকী শার্লি এব্দো ২০১৫ সালে মহানবীকে (সা.) নিয়ে সিরিজ কার্টুন প্রকাশ করে। এটি প্রকাশের পর প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় পত্রিকাটির ১২ সাংবাদিক নিহত হন। </p>
<p>২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসের শহরতলী এলাকায় এক স্কুল শিক্ষককে গলা কেটে হত্যা করা হয়। হামলাকারী চেচেন জাতিগোষ্ঠীর একজন মুসলিম এবং জন্ম রাশিয়ার মস্কোতে। নিহত ওই শিক্ষক রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়াতেন। ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ ক্লাসে তিনি শিক্ষার্থীদের মহানবীর (সা.) কার্টুন দেখিয়ে ছিলেন। তারপর তাকে হত্যা করা হয়। বলাবাহুল্য, মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত লাগবে বলে কার্টুন প্রদর্শনের আগে ওই শিক্ষক ক্লাসের মুসলিম ছাত্রদের ক্লাস ছেড়ে চলে যাবার পরামর্শ দেন। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। </p>
<p>মহানবীর (সা.) কার্টুন বন্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় ফ্রান্সের সব ধরনের পণ্য বয়কটের ডাক দেয় কুয়েত। ফ্রান্সের পণ্য বয়কটের ডাক দিয়ে হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা। তাদের এ আন্দোলনে প্রথমে ব্যাপক সাড়া মিললেও বয়কটের ডাক ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায়।</p>
<p>উপরের ঘটনা থেকে দুটো বিষয় সামনে চলে আসে। প্রথমত মহানবীকে ব্যাঙ্গ করার প্রতিবাদ করতে গিয়ে মুসলিমরা দেশের প্রচলিত আইন না মেনে হিংসার পথ বেছে নিচ্ছে। দ্বিতীয়ত মুসলিমরা পণ্য বয়কটের ডাক দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ঐক্যের অভাবে পুরোপুরি সফল হতে পারছে না।</p>
<p>পশ্চিমা বিশ্বের বহু দেশে আমাদের মতো অসংখ্য মুসলিমের বসবাস। এদের মধ্যে একটা বড় অংশ মানবিক কারণে কিংবা জীবনের নিরাপত্তার জন্য শরণার্থী হয়ে ওইসব দেশে আশ্রয় পেয়েছেন। কারণ যেটাই হোক না কেন, আমরা স্বেচ্ছায় পশ্চিমা দেশগুলোতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই একজন সুনাগরিক হিসাবে আমাদের উচিত ওই দেশের আইন-কানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। প্রতিবাদ করতে হলে নিয়মের আওতায় থেকে শান্তিপূর্ণভাবে তা করা। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মানুষ হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিবাদের নামে সহিংসতার আশ্রয় নিয়ে পক্ষান্তরে আমরা ইসলাম সম্পর্কে বহির্বিশ^কে ভুল ধারণা দিচ্ছি। </p>
<p>আমি জীবিকার খাতিরে এক যুগেরও বেশি মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশ কাতারে থেকেছি। এসব দেশে আইন ভেঙ্গে কিছু করার কথা ভাবাই যায় না। মুসলিম দেশ হলেও ধর্ম সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় রূপরেখার বাইরে কোনো কথা বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বেতনের মতো ন্যায্য দাবি নিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বহু প্রবাসীকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরাসরি দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আর এধরনের কর্মকাণ্ডে যদিও খুব অল্পসংখ্যক মানুষ অংশ নেয় কিন্তু তাতে শান্তি পায় পুরো কমিউনটি। ফ্রান্সে স্কুলের শিক্ষকের হত্যাকাণ্ডের পর পুরো মুসলিমসমাজকে ভাবা হচ্ছে জঙ্গী। প্রসাশন তাদের দেখছে বাঁকা চোখে। ইসলাম ধর্মকে জঙ্গীবাদের কালিমায় কলুষিত করা হচ্ছে। </p>
<p>যে ১৮ বছরের যুবক ফ্রান্সে হত্যাকাণ্ড ঘটালো সে চেচনিয়া থেকে আসা একজন শরণার্থী। একজন আশ্রয়হীন মানুষকে যেই দেশ মাথা গুজবার ঠাঁই দিল, সেই দেশের আইনকে অগ্রাহ্য করে একজন নাগরিক হত্যা ওই দেশের প্রশাসন ও জনগণ কিভাবে দেখেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফ্রান্স একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। ইসলাম ও মুসলিদের প্রতি তারা ততটা সহানুভূতিশীল নয়। কিন্ত এর পরও মানবতার কথা বিবেচনা করে ২০১৮ সালে ফ্রান্স এক লক্ষ ২২ হাজার ৭৪৩ জন শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে যাদের ৩৫% হল মুসলিম। </p>
<p>এখনো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনিক বহু মুসলিম অধ্যুষিত দেশের হাজারো নির্যাতিত মুসলিম ফ্রান্সে প্রবেশের জন্য নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। এইসব মুসলিমদের আর্তনাদ শুনতে যখন অধিকাংশ মুসলিম দেশগুলো ব্যর্থ হচ্ছে, তখন জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো তাদের আশ্রয় দিতে এগিয়ে এসেছে। তবে প্রতিবাদ করতে গিয়ে সহিংসতার আশ্রয় নিলে ইউরোপের দেশগুলো মুসলিমদের আশ্রয় দেয়ার আগে ভেবে দেখবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।</p>
<p>প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে পণ্য বর্জনের ডাককে আমি সমর্থন করি। বিশে^র ১.৭ বিলিয়ন মুসলিম যদি সংঘবদ্ধ হয়ে পণ্য বর্জনে অংশ নেয় তাহলে যে কোনো দেশের অর্থনীতিকে বিকল করে দেয়া সম্ভব। কিন্তু ডেনমার্ক ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে মুসলিদের পণ্য বয়কটের ডাক কি সফল হয়েছে? কুয়েত ফ্রান্সের বিরুদ্ধে পণ্য বয়কটের ডাক দিয়েছে ঠিকই কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব অবস্থাপন্ন আরবদের ফ্রান্স, আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রয়েছে বাড়ি কিংবা অ্যাপার্টমেন্ট। গ্রীষ্মকালের একটা বড় অংশ ওইসব বিলাস বাড়িতে তারা সময় কাটায়, আয়েশ করে। প্রতিটি তেল সমৃদ্ধ আরব দেশে রয়েছে ফ্রান্স চেইন ডিপার্টমেন্ট স্টোর Carrefour. প্রতিবাদ করতে গিয়ে এই ডিপার্টমেন্ট স্টোরের শাখাগুলো কি তারা এখনো বন্ধ করতে পেরেছে? সত্যি বলতে কি, মুসলিমরা এতটাই বিভক্ত যে, এ পর্যন্ত কোনো বয়কটের ডাকেই তারা সফল হতে পারেনি।</p>
<p>ফেসবুকে দেখেছি মহানবীকে (সা.) নিয়ে হ্যাশটাগের ছড়াছড়ি। কিন্তু হ্যাশট্যাগ করার পাশাপাশি নিজেদের জীবনে নবীর চরিত্রের প্রতিফলন ঘটাতেই আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। এতেই নবীর আসল সম্মান বাড়বে। আমরা যদি সত্যই নবীর সম্মান রক্ষা করতে চাই তাহলে মুসলিমদের চুরি, দুর্নীতি ও পাপকাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। একমাত্র তখনই মানুষ বুঝতে পারবে আমরা আমাদের নবীকে সত্যিকার ভালোবাসি। </p>
<p>মহানবীর সম্মান রক্ষার নামে আমরা যে ধরনের সন্ত্রাসী খেলায় মেতে উঠেছি তা দেখে কি নবী সত্যিই খুশি হতেন? মানুষকে যখন খুনই করা হয় তখন তার প্রত্যাবর্তনের পথই বন্ধ করে দেয়া হয়। কার কখন পরিবর্তন আসবে সেটা কেবল আল্লাহই বলতে পারে। ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, চেঙ্গিস খানসহ ভারতের বহু হিন্দু রাজার উত্তরসূরী পরবর্তীতে মুসলিম হয়ে ইসলামের প্রসার ঘটিয়েছেন। </p>
<p>ফেইসবুক ও টুইটারের মতো সামজিক মাধ্যম মুসলিমদের স্বার্থরক্ষায় খুব একটা সোচ্চার নয়। ফেইসবুকের নীতিমালায় জাতি, ব্যক্তি বিদ্বেষী কোনো পোস্টিং করা যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। দেখা যাক ফেসবুক নীতিমালা কি বলেঃ<br />
Article 3. Safety<br />
   Clause 6 &#8211; You will not bully, intimidate, or harass any user.<br />
   Clause 7 &#8211; You will not post content that: is hateful, threatening, or pornographic; incites violence; or contains nudity or graphic or gratuitous violence.</p>
<p>এছাড়া আর্টিকেল ৫, মানুষের অধিকার রক্ষার কথা বললেও প্রায় দুই বিলিয়ন মুসলিম সমাজের ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করার জন্য ফেসবুকে যে পাতা খোলা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বাকস্বাধীনতার সাফাই গেয়ে বরং আত্মপক্ষ সমর্থন করেছে। বিশেষত মুসলিমদের ক্ষেত্রে ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ ডেনিশ সংকটের সময় স্পষ্ট ধরা পড়ে। ২০০৫ সালে ডেনমার্কের যে পত্রিকা মহানবীর কার্টুন ছাপে ২০০৩ সালে সেই একই পত্রিকা যিশুকে নিয়ে আঁকা কার্টুন ছাপাতে অস্বীকৃতি জানায়। ২০০৬ সালে ভিয়েনার রাস্তার বিলবোর্ডে রানী এলিজাবেথ, জর্জ বুশসহ একটি নগ্ন নারীর পোস্টার টাঙানো হয়। প্রতিবাদের মুখে ওই পোস্টারগুলি কর্তৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে ফেলে। ধর্মবিদ্বেষী ও উষ্কানিমূলক কাজ ইউরোপে নিষিদ্ধ। অথচ যে কার্টুন বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ মানুষকে সন্ত্রাসী বলে কটাক্ষ করল তা ডেনমার্কের আইনে অপরাধ বলে বিবেচিত হয়নি। </p>
<p>ইসলামোফোবিয়া ও দ্বিমুখী নীতি মুসলিমদের মনে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করছে, এটা আমি স্বীকার করি। কিন্তু তাই বলে আবেগের বশবর্তী হয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামার পথ বেছে নিয়ে মুসলিমরা ইসলামবিদ্বেষীদের পাতা ফাঁদেই পা দিচ্ছে বারবার। ফ্রান্সে ম্যাকরনের মতো হিংসাবাদী যেমন আছে, মানবতাবাদী মানুষও আছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, মুসলিমরা ম্যাকরনের নিজ স্বার্থ হাসিলের খেলায় তার পক্ষ হয়েই খেলছে। এই ধরনের আচরণ কোনোভাবেই মুসলিমদের জন্য সুফল বয়ে আনবে না। যার কিছু নমুনা ইউরোপে ইতিমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি। যেমন হিজাব ও মসজিদের মিনার নিষিদ্ধকরণ। ফ্রান্সে বহু মসজিদ বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে সরকার। ভবিষ্যতে আরো যে কি হবে কে জানে!</p>
<p>মনে রাখতে হবে, ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রমাণের দায় দায়িত্ব কিন্তু মুসলিমদের, খ্রিষ্টান কিংবা ইহুদিদের নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলিমবিদ্বেষীদের গায়ে পড়া উস্কানির মোকাবেলা করার জন্য যে ধৈর্য্য, সহনশীলতা ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন তা মুসলিম বিশ্বে অনুপস্থিত। ফলে বারবার বিজয় হচ্ছে ইসলামবিদ্বেষীদের। তারা আঙ্গুল তুলে বলছে ইসলামে সহনশীলতা বলে কিছু নেই। ইন্টারনেটের যুগে কোনো রকম নিষেধাজ্ঞায় কাজ হয় না। যে কোনো তথ্য কিংবা বই পিডিএফ করে অন্তর্জালে ছেড়ে দিলেই হল। কিছু কার্টুন দেখে, রুশদীর বই পড়ে যারা ইসলাম ছেড়ে চলে যেতে চান তাদের যেতে দেয়াই ভালো। এমন ঠুনকো বিশ্বাসীদের ইসলামে প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আর তাই যদি হত ৯/১১ পর আমেরিকা ও ইউরোপে মুসলিম হবার ঘটনা শোনা যেত না। অথচ বাস্তবে ঘটছে ঠিক তার উল্টো।</p>
<p>কার্টুনের পর মুসলিমবিদ্বেষীরা আরো সংঘবদ্ধ হয়ে উস্কানিমূলক কা- ঘটিয়ে যাবে এটা নিশ্চিত। ইতিমধ্যে নিউ ইয়র্কের কিছু বাসের গায়ে একটি বিজ্ঞাপন দেখা গিয়েছে Leaving Islam? Fatwa on your head? Is your family threatening you? মুসলিমদের জন্য নিঃসন্দেহে এটা আরেকটি দুঃসংবাদ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে একজন মুসলিমের প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত? উত্তর হবে, আমাদের মহানবী এমন পরিস্থিতিতে কী করতেন তা সবার আগে অনুসন্ধান করে দেখা। সঙ্গে সঙ্গে কুরআন ও হাদিসে কী নির্দেশনা রয়েছে তা ঘেটে দেখা। একটু ভেবে দেখুন, কার্টুন দিয়ে ব্যাঙ্গ করে মহানবীর সত্যিকারের কোনো ক্ষতি করা কি সম্ভব? সৌদি স্কলার আল-গাইনের মতে, যারা এসব করছে তারা যেন সূর্যের দিকে কিছু বালি ছুড়ে মারছে যা আবার তাদের মুখেই এসে পড়বে। </p>
<p>মহানবী ইসলাম প্রচারের সময় মক্কায় চরম আবমাননা ও বিদ্বেষের মুখোমুখি হয়েও কখনো সংঘাতের পথ বেছে নেননি। একপর্যায়ে তিনি মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনা হিজরত করেন। তায়েফের ঘটনা আমরা জানি। তায়েফবাসীদের হাতে চরম লাঞ্ছিত হবার পরও তিনি তাদের অজ্ঞতার কথা ভেবে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আল্লাহর রোষানল থেকে তায়েফবাসীদের রক্ষা করার জন্য প্রার্থনা করেছেন। মক্কা বিজয়ের পর শত্রুদের নতজানু পেয়েও সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।</p>
<p>রাসুল (সা.) যখন মদিনায় তখন মক্কার কুরাইশগণ তাঁর চরিত্র হননে মেতে ছিল। মহানবীকে ব্যাঙ্গ ও বিদ্রুপ করে রচিত হচ্ছিল কবিতা ও গান। নবীকে যখন উপহাস করা হচ্ছিল কখন তিনি বলতেন, ওদের কল্পনায় আমি যা, আমি তো আসলে তা না। আমি জানি আমি কে। মক্কা বিজয়ের পর মহানবী এদের সবাইকে ঢালাওভাবে হত্যার নির্দেশ দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।</p>
<p>মুসলিমরা জানে মহানবী কে। তাই কিছু মূর্খ মানুষের সমালোচনা নিয়ে মুসলিমদের এতটা বিচলিত হতে হবে কেন? এসবের জবাব শান্তিপূর্ণ উপায়ে দিতে হবে। মানুষ হত্যা করে যদি আমরা মনে করি, ফ্রান্স নমনীয় হবে, নবীর সম্মান বাড়বে, সেটা ভুল। জোর জবরদস্তি করে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করা যায় কিন্তু সম্মান ও ভালোবাসা তো আদায় করা যায় না।</p>
<p>নবীকে অসম্মান করা হলে কী করা উচিত তার নির্দেশনা কুরআনের বেশ কিছু আয়াতে পাওয়া যায়। সেগুলো হলো, সুরা আ’রাফ (৭ : ১৯৯), সুরা নাহল (১৬ : ১২৫), ও সুরা কাসাস্ (২৮ : ঃ৫৪-৫৬)। আল্লাহর নির্দেশ হলো, মূর্খদের অসার কর্মকা- উপেক্ষা করে চলা আর ভালো দ্বারা মন্দের মোকাবেলা করা। বুখারি শরিফে উদ্ধৃত হাদিসে মহানবীর একই ধরনের নির্দেশনা পাওয়া যায়। </p>
<p>বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত কুসংস্কার ও ভুল ধারণাই খ্রিষ্টান অধ্যুষিত পশ্চিম বিশ্বে মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাবের মূল কারণ। ইতিহাসের পাতা থেকে এই তত্ত্বের সমর্থন মেলে। হিটলার খ্রিষ্টান ধর্মান্ধ কিনা জানি না, তবে খ্রিষ্টান সংস্কৃতিতে চরম ইহুদিবিদ্বেষ হিটলারকে ইহুদিনিধনে ইন্ধন যুগিয়েছে বলে অনেকের ধারণা। ইসলামে যিশুর স্থান হল একজন নবী হিসাবে। পবিত্র কুরআনে যিশুর নাম এসেছে ২৮ বারেরও বেশি। অন্যদিকে মুসা নবীর কথা এসেছে ১৩৬ বারেরও বেশি। কিন্তু হজরত মুহাম্মদকে (সা.) খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা কখনোই নবী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে ইসলামের শুরু থেকেই খ্রিষ্টান শাসক গোষ্ঠী ও চার্চ এস্টাব্লিশমেন্ট ইসলাম ও মহানবীর নামে কুৎসা রটনা ও বিভিন্ন ধরনের প্রোপাগান্ডা চালিয়ে এসেছে। </p>
<p>৭ম শতকে রোমান শাসিত আফ্রিকার বহু দেশ ও খোদ ইউরাপের স্পেন মুসলিমদের হাতে চলে এলে খ্রিষ্টান সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার ভয়ে সেই প্রোপাগান্ডা ও বিদ্বেষ আরো ভয়ংকর রূপ নেয়। মুসলিমদের অগ্রযাত্রা বন্ধ করার জন্য তারা উঠে পড়ে লাগে। মুসলিমসমাজ এবং মহানবীকে জঙ্গী বলে বই-পুস্তক ও ইতিহাসের পাতায় কুৎসা রটানো হয়। যা পরবর্তীতে ইউরোপের দোরগাড়ায় অবস্থিত তুরস্কে মুসলিম সুপারপাওয়ার উসমান সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনের পর থেকে খ্রিষ্টান সমাজের চিন্তা ও চেতনায় গেঁড়ে বসে। পশ্চিমা দেশের মূল ধারার ইতিহাসে ৮ম শতকের মাঝামাঝি থেকে ১৩ শতক পর্যন্ত ইসলামের যে স্বর্ণযুগ ছিল বলে আমরা জানি তার কোনো উল্লেখই নেই। ফলে ছোটবেলা থেকে মুসলিম সভ্যতা সম্পর্কে ওইসব দেশের নাগরিকদের কোনো সম্যক ধারণা থাকে না বললেই চলে। যার ফলশ্রুতিতে মুসলিমদের নিয়ে যুগ যুগান্তরের লালিত জুজুর ভয় ওদের তাড়িয়ে বেড়ায়। পশ্চিমা বিশে^র অনেক সহকর্মীদের সাথে আমার কথাবার্তায় এই অজ্ঞতা ও ভীতি আমি লক্ষ্য করেছি। </p>
<p>মুহাম্মদকে (সা.) একজন মুসলিম যে রকম ভালোবাসবে, একজন অমুসলিমের কাছ থেকে সেরকম ভালোবাসা আশা করাটা একবারেই অবান্তর। কিন্তু যারা মহানবীর জীবনচরিত নিয়ে বিস্তারিত লেখাপড়া করেছেন, তারা সবাই তাঁর উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কখনো দ্বিমত পোষণ করতে পারেননি। লিও তলস্তয়, গ্যাটে, ইরভিং, বানার্ড শ, এডওয়ার্ড গিবনের মতো এমন বহু পশ্চিমা চিন্তাবিদ রয়েছেন যারা মহানবীকে মানবজাতির ইতিহাসের একজন সফল এবং শ্রেষ্ঠ মানব হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। </p>
<p>ইসলামফোবিয়ার জন্য একতরফাভাবে পশ্চিমা বিশ্বকে দায়ী না করে কিভাবে এই ফোবিয়া দূর করা যায় সেটা নিয়ে মুসলিমদের এখন ভাবতে হবে। ইদানিং পশ্চিমা বিশ্বেও বড় হওয়া বেশ কিছু মুসলিম তরুণ ইন্টারনেটে বিভিন্ন উগ্রপন্থি মুসলিম নেতাদের বক্তৃতা শুনে বিভ্রান্ত হচ্ছে। ফলে তারা খুব সহজেই সন্ত্রাসের পথে পা বাড়াচ্ছে। এ ব্যাপারে মুসলিম সমাজকে সচেতন হতে হবে। </p>
<p>একজন মুসলিমের কার্যকলাপ, আচার-ব্যবহার দেখেই ইসলাম ও মহানবীর শিক্ষা সম্পর্কে অমুসলিম সমাজ সম্যক ধারণা পাবে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশে বসবাসরত মুসলিমদের দায়িত্ব অন্যান্য মুসলিমদের চাইতে অনেক বেশি বলে আমি মনে করি। মুসলিমসমাজ ও ইসলাম নিয়ে অজ্ঞতা ও জুজুর ভয় দূর করতে হলে মুসলিমদের নিজস্ব কম্যুনিটির চার দেয়ালের বাইরে এসে ওইসব দেশের আমজনতার সাথে মিশতে হবে, গড়ে তুলতে হবে সম্প্রীতির সেতু বন্ধন, দেখিয়ে দিতে হবে মুসলিমরাও অন্য দশজনের মতো শান্তিপ্রিয় মানুষ। সহিংসতা নয়, ইসলামবিদ্বেষীদের কর্মকা-কে উপেক্ষা করে তাদের কাছেই মহানবীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, মহত্ত্ব ও অন্যান্য গুণাবলী তুলে ধরাটাই হবে মহানবীকে ব্যাঙ্গ করে আঁকা কার্টুনের সর্বোত্তম জবাব। </p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/588/feed</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>কাবার পথে : শেষ পর্ব</title>
		<link>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/585</link>
					<comments>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/585#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[admi@mamoo252]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 19 Aug 2026 05:54:45 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Religion & Philosophy]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://mamoon.net/?p=585</guid>

					<description><![CDATA[নবীর শহরে কিছুক্ষণ (এপ্রিল ১৬, ২০০৯): বৃহস্পতিবার সকালে আল-হাতিম হোটেল থেকে বাস ছাড়ল মদিনার পথে। মদিনার আসল নাম ছিল ‘ইয়াতসরিব’। কিন্তু মহানবীর আগমনে শহরের নাম হয় মদিনাতুন্নবী অর্থাৎ নবীর শহর।...]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>নবীর শহরে কিছুক্ষণ (এপ্রিল ১৬, ২০০৯): বৃহস্পতিবার সকালে আল-হাতিম হোটেল থেকে বাস ছাড়ল মদিনার পথে। মদিনার আসল নাম ছিল ‘ইয়াতসরিব’। কিন্তু মহানবীর আগমনে শহরের নাম হয় মদিনাতুন্নবী অর্থাৎ নবীর শহর। মক্কা শহর ছেড়ে যাবার সময় কেন জানি না মনটা খচ্ খচ্ করছিল। কোথায় জানি একটু ব্যথা অনুভব করছিলাম। একটানা আট দিন থাকার পর মক্কাকে নিজের অজান্তেই নিজের শহর বলে মনে হচ্ছিল। শহরের রাস্তাঘাট অনেক কিছুই যেন অনেক দিনের চেনা। বাস চলতে শুরু করল দ্রুতগতিতে। চার ঘন্টার মধ্যেই মদিনার কাছাকাছি চলে এলাম। মদিনার যতই কাছে আসছি ততই দু’পাশে সবুজের সমারোহ দেখতে পাচ্ছিলাম যা মক্কার পরিবেশ থেকে বেশ ভিন্ন। প্রথমে বাস এসে থামল মসজিদুল কুবায়।</p>
<p>মক্কা থেকে হিজরতের ১২তম দিনে রাসুলুল্লাহ মদিনা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত কুবা এলাকায় উপস্থিত হন। এই কুবাতেই রাসুলুল্লাহ তৈরি করেন ইসলামের প্রথম মসজিদ। কুবা মসজিদের ডিজাইনও তাঁর নিজের করা। এই মসজিদের পাশেই ছিল হজরত আলী ও ফাতেমার বাড়ি। বিয়ের পর পর এ বাড়িতেই তাঁরা থাকতেন। অন্যান্য জায়গার মতো এই বাড়িটিকেও গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। মসজিদে কুবার পর গেলাম মসজিদে কিবলাতাঈনে। এখানেই নামাজ চলাকালীন রাসুলুল্লাহ বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে ঘুরে গিয়ে কাবার দিকে কিবলা নির্ধারণ করেন। </p>
<p>এরপর এলাম ওহুদের ময়দানে। এই যুদ্ধের ময়দানে মুসলিমরা পরাজিত হয়েছিল। মহানবীর (সা.) সাথে অন্যান্য নবীর পার্থক্য হচ্ছে, তিনি শুধু ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, ছিলেন একাধারে সামজিক ও রাজনৈতিক নেতা, সফল শাসনকর্তা ও ব্যক্তিগত জীবনে পরিবারের কর্তা, যুদ্ধক্ষেত্রে একজন বিচক্ষণ সেনাপ্রধান। যুদ্ধ পরিচালনা ও পরিকল্পনায় তিনি ছিলেন অসাধারণ। ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি যুদ্ধে (বদর, ওহুদ ও খন্দক) তাঁর রণকৌশল ছিল আরবের প্রচলিত কৌশলের চেয়ে ভিন্ন ও উন্নত। ফলে প্রতিটি যুদ্ধেই কুরাইশ বাহিনীকে অপ্রত্যাশিত কৌশলের সম্মুখীন হতে হয়েছে। যেমন বদরের প্রান্তরে যে দুটি পানির কূপ ছিল, তা দখল করে নিয়ে মুসলিমবাহিনী অবস্থান নেয়। মরুভূমির রুক্ষ পরিবেশে পানির অভাবে শুরুতেই কুরাইশ বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। অন্যদিকে পরিখার যুদ্ধে সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে পারস্যে প্রচলিত যুদ্ধ কৌশলের অনুকরণে পরিখা খননের সিদ্ধান্ত নেন রাসুল (সা.)। </p>
<p>আরবদের পরিখা সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। গভীর পরিখা পার হতে ব্যর্থ হওয়ায় কুরাইশ সৈন্যবাহিনীর মূল চালিকাশক্তি অশ্বারোহী বাহিনী অচল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ওহুদের যুদ্ধের সময় রাসুল (সা.) মদিনা শহরের ভেতরে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধ করার পক্ষে ছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, এ লড়াই বদরের চেয়ে হবে অনেক কঠিন। কিন্তু তিনি নবী হয়েও সবার সাথে যুদ্ধের কৌশল নিয়ে পরামর্শ করেন এবং সাহাবিদের মতামত জানতে চান। কিছু অতি উৎসাহী সাহাবি যারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, রাসুলের নেতৃত্বে মদিনার বাইরে গিয়ে কুরাইশদের প্রতিহত করার প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ফলে অনেকটা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্যান্য সাহাবির মতামতের মর্যাদা দিয়ে শহরের বাইরে ওহুদের প্রান্তরে গিয়ে তিনি যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। দেখা গেছে, ওহুদে তাঁকে ৩০০০ কুরাইশ বাহিনীর মুকাবেলা করতে হয় যাদের ছিল ২০০ অশ্বারোহী সৈন্য। অথচ মুসলিম সেনাবাহিনীর সংখ্যা ছিল ১০০০ আর অশ্বারোহী সৈন্য ছিল মাত্র চার জন। আর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ৩০০ জন ফিরে গেলে মুসলিম সৈন্য সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭০০।</p>
<p>যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি মুসলিমবাহিনীর জন্য বেছে নেন কৌশলগত দিক থেকে সবচেয়ে ভালো অবস্থান। মুসলিমবাহিনী ওহুদ পাহাড়কে পেছনে রেখে দাঁড়ায়। ফলে সারাসরি পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। তবুও শেষ রক্ষাকবচ হিসাবে তিনি একটি মাঝারি আকারের পাহাড়ের উপর (ছবি দেখুন) ৫০ জন (মতান্তরে ৭০ জন) তীরন্দাজকে বসিয়ে রাখেন, যাতে মুসলিম সৈন্যবাহিনী সামনে এগিয়ে গেলে পেছন দিক থেকে শত্রুবাহিনী অতর্কিতে হামলা করতে না পারে। তিনি জানতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানদের এটাই হল সবচেয়ে দুর্বল স্থান। তাই তিনি তীরন্দাজদের নির্দেশ দেন, জয় পরাজয় যেটাই হোক না কেন, কোনো অবস্থাতেই যেন তারা নিজস্ব স্থান পরিত্যাগ না করে। পরে দেখা যায়, এই তীরন্দাজ বাহিনী তাদের অবস্থান থেকে সরে গেলেই বিপর্যয় নেমে আসে। যুদ্ধে রাসুল (সা.) গুরুতর আহত হন। নিহত হন মুসলিমবাহিনীর প্রধান জেনারেল কুরাইশ বীর হামজা। </p>
<p>ওহুদের যুদ্ধে রাসুলকে হত্যা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায় কুরাইশবাহিনী। একপর্যায়ে তারা মহানবীর খুবই কাছে চলে আসে। পশ্চাত দিক থেকে কুুরাইশ অশ্বারোহী বাহিনীর আকস্মিক আক্রমণের মুখে মুসলিমবাহিনী হতবাক হয়ে যায়। এই বিশৃংখল অবস্থায় কে কার বিরুদ্ধে লড়াই করছে তাও বোঝা মুশকিল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ঘটনার আকস্মিকতায় ঘাবড়ে গিয়ে কিছু সাহাবি আত্মরক্ষায় জন্য রাসুলকে ছেড়ে চলে যান। ফলে মহানবীর নিরাপত্তা অরক্ষিত হয়ে পড়ে। </p>
<p>ইতিমধ্যে রাসুলের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে মুসলিমদের মনোবল আরো ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু রাসুলের মৃত্যুসংবাদ সহসা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। ফলে যেসব সাহাবি রাসুলকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তাঁরা আবার ফিরে এসে রাসুলের চারপাশে নিজের শরীর দিয়ে দুর্ভেদ্য ব্যুহ রচনা করে ধীরে ধীরে ওহুদ পাহাড়ের একটি গুহার নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে লড়াই করতে করতে এগুতে থাকেন। অন্যদিকে কুরাইশবাহিনীও মরিয়া হয়ে রাসুলকে হত্যার জন্য তীর, বর্শা ও পাথর ছুড়তে থাকে।  রাসুলের দিকে ছুড়ে দেয়া তীর ও বর্শার আঘাত নিজের শরীরে তুলে নিয়ে এইসব সাহাবি একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকেন কিন্তু তবুও রাসুলের নিরাপত্তাকে এতটুকু ক্ষুন্ন হতে দিলেন না। কুরাইশদের ছুড়ে মারা পাথরের আঘাতে রাসুল (সা.) একপাশে ঢলে পড়ে যান, কেটে যায় তাঁর ঠোট। আর রাসুলের মুখে ঢুকে যাওয়া মাথার হেলমেটের দুটি চেইনস্ট্র্যাপ তোলার সময় তাঁর দুটো দাঁতও উঠে আসে। এছাড়া কুরাইশবাহিনীর খোড়া চোরা গর্তে পড়ে গিয়েও তিনি আঘাত পান। </p>
<p>প্রতিকূলতার মুখেও আবস্থানগত সুবিধার কারণে মুসলিমবাহিনী পেছনে সরে এসে ওহুদ পাহাড়ের উপরের দিকে উঠে এসে অবস্থান নিতে সমর্থ হয়। কুরাইশ অশ্বারোহী বাহিনী পাহাড়ের উঁচুতে আরোহন করতে না পারায় মুসলিমদের আর তাড়া করতে পারেনি এবং পরে তারা যুদ্ধ জয়ের স্বাদ নিয়ে ফিরে যায়। কিন্তু একজন অসাধারণ কমান্ডার ইন চিফ রাসুল (সা.) কুরাইশবাহিনী যাতে বিধ্বস্ত মুসলিমবাহিনীকে ফের আক্রমণ করতে না পারে সে জন্য শত্রুবাহিনীকে তাড়া করার জন্য একদল সৈন্য বাহিনী পাঠান। কুরাইশবাহিনী ভাবে, মুসলিমরা এখনো সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তাই আর ফের আক্রমণ চালাতে সাহস করেনি। না হলে এই ওহুদের প্রান্তরেই হয়তো নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত ইসলাম। </p>
<p>ওহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের পরাজয় হলেও পরে সেটা পরিপূর্ণ বিজয়ের সহায়ক হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপ্রধানের কথা অমান্য করলে কী পরিণাম হতে পারে তা অনুধাবন করল মুসলিমবাহিনী। এই ওহুদের যুদ্ধেই আত্মপ্রকাশ ঘটে পরবর্তীকালের শুধু মুসলিম নয় মানব ইতিহাসের অন্যতম সফল জেনারেল খালিদ বিন ওয়ালিদের, যিনি একাধারে ১০০টি যুদ্ধ জয়লাভ করেন যা বিশ্বের যুদ্ধ ইতিহাসে বিরল। ওহুদ যুদ্ধে তিনিই ছিলেন কুরাইশদের বিজয়ের অন্যতম রূপকার। মুসলিম তীরন্দাজদের তাদের জায়গা থেকে সরে যাওয়াটা তিনিই লক্ষ্য করেন এবং বাকি যে কয়জন তীরন্দাজ তখনো জায়গা ছেড়ে যাননি, তাদের সহজেই খতম করে তিনি মুসলিমদের পেছন থেকে আক্রমণ করেন। </p>
<p>ওহুদের প্রান্তরে গিয়ে ইতিহাসের খেই ধরতে পারছিলাম না। বিরাট প্রাচীর ঘেরা কবরস্থান এবং তীরন্দাজদের পাহাড় ছাড়া আর কিছুই বোঝার উপায় নেই। এই ছোট পাহাড়ের পাদদেশেই বর্শার আঘাতে শহীদ হন বীর হামজা। জানা যায়, এই পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে গিয়ে হামজার বক্ষ বিদীর্ণ করে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ। এখন এই পাহাড় ফেরিওয়ালাদের দখলে। এভাবে চললে কিছুদিন পর এই পাহাড়ও ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ইচ্ছা থাকলেও ওহুদের পাহাড়ের যে গুহায় রাসুল (সা.) আহত হবার পর বিশ্রাম নিয়েছিলেন সেখানে যাবার আর সময় হল না।  </p>
<p>ওহুদের প্রান্তরে নওমুসলিম সমাজ চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। অথচ আজ ওহুদের সেই সমরক্ষেত্রের এই করুণ দশা দেখে ১৪০০ বছর আগে মুসলিম যোদ্ধারা কী ধরনের প্রতিকূলতার মুখে যুদ্ধ করেছিলেন আর রাসুলকে (সা.) কী অবর্ণনীয় কষ্ট ও আঘাত সহ্য করতে হয়েছিল, তা অনুধাবন করা অসম্ভব। আমি মনে করি, ওহুদ যুদ্ধক্ষেত্রের পুরো এলাকাটা সংরক্ষণ করে গাইডেড ট্যুরের ব্যবস্থা করা উচিত। </p>
<p>ওহুদের প্রান্তর থেকে বাস আমাদের হোটেলে নিয়ে এলো। মদিনার হোটেলের অবস্থা বিশেষ সুবিধার মনে হলো না। ম্যানেজার আরবি ছাড়া কিছুই বলতে পারে না। যাই হোক, থাকব মাত্র দু’টো রাত তাই এ নিয়ে আর মাথা ঘামালাম না। হোটেলে আসার পর পরই আছরের আজান শুনতে পেলাম। দেরি না করে রাস্তায় বের হলাম। আমাদের হোটেল থেকে বের হয়ে বা দিকে সোজা জান্নাতুল বাকির দেয়াল ঘেঁষে হেঁটে গেলে প্রায় ৫০০ মিটার দূরেই মসজিদে নববী। মসজিদে নববী অনেকটা মক্কার মসজিদুল হারামের আদলে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। </p>
<p>মসজিদের বাইরে রয়েছে বিশাল খোলা চত্বর, রয়েছে অনেক মোটরচালিত ছাতা, দুপুরের কড়া রোদ থেকে মুসল্লিদের বাঁচাতে ওই ছাতাগুলি খোলা হয়। আমি সরাসরি মসজিদের নববীর যে অংশে রাসুলের কবর রয়েছে সেখানে চেষ্টা করলাম ঢুকতে। প্রচন্ড ভীড়। রওজা নামে যে জায়গাটাকে বেহেস্তের অংশ বলা হয় সেখানে গিয়ে নামাজ পড়া সম্ভব হলো না। কারণ কেউ নিজের জায়গা ছাড়তে রাজি নন। মহিলাদের রওজাতে যাবার জন্য একটা সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে তখন পুরুষদের ঢুকতে দেয়া হয় না। ভাবলাম, ফজরের নামাজের পর আবার রাসুলুল্লাহর কবর জিয়ারত করার চেষ্টা করব। আছরের নামাজ শেষ করে জান্নাতুল বাকিতে গেলাম।</p>
<p>জান্নাতুল বাকি: এটি শুধু একটি সমাধিক্ষেত্র নয়, এর ধুলোবালিতে মিশে আছে দীর্ঘ ১৪০০ বছরের ইতিহাস। কিছু পাথরের টুকরো ছাড়া কবরের কোথাও কোন চিহ্ন নেই। কয়েকজন বাঙালিকে জিজ্ঞেস করলাম, তারাও কিছু বলতে পারছিলেন না কার কবর কোনটা। কিন্তু ইরানি, তুর্কি হাজ্জীদের সবার কাছেই দেখলাম জান্নাতুল বাকির একটা ম্যাপ যাতে বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের নাম লেখা রয়েছে। মনে হলো, একটা ম্যাপ সাথে না এনে ভুলই করলাম। এভাবে অন্ধের মতো জিয়ারত করার কোনো মানে হয় না। কী করব ভাবছিলাম, হঠাৎ দেখলাম আমার ঠিক সামনে একটি কেরালা হাজ্জীদের দল। তাদের দলনেতা বিস্তারিত বলছেন মালায়ালম ভাষায়। যদিও কী বলছেন পুরোটা বুঝতে পারছিলাম না কিন্তু কার কবর সেই নামটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। তাই সেই কেরালা হাজ্জীদের গ্রুপের সাথে মিশে গিলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলাম। জান্নাতুল বাকিতে ঢোকার মুখেই ডান পার্শ্বে রয়েছে রাসুলল্লাহর পরিবারবর্গের কবর আর তাঁরা হলেন, বিবি ফাতেমা, ইমাম হাসান, ইমাম জয়নাল আবেদীন, ইমাম বাকের, ইমাম জাফর ও রাসুলুল্লাহর চাচা হজরত আব্বাস। এখানে দেখলাম শিয়া হাজীদের প্রচন্ড ভীড়। এই এলাকাটা গ্রিল দিয়ে ঘেরাও করা, কাছে যাওয়া যায় না। সৌদি সেনাবাহিনীর সদস্যদের এখানে টহল দিতে দেখলাম। </p>
<p>তবে রাসুলের কন্যা বিবি ফাতেমার কবর এখানে কিনা সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেকের মতে, তাঁকে তাঁর নিজের ঘরেই দাফন করা হয় যা এখন মসজিদে নববীর অন্তর্ভুক্ত। জান্নাতুল বাকিতে আরো যাদের কবর রয়েছে তাঁরা হলেন, রাসুলের তিন কন্যা, রাসুলের নয় জন স্ত্রী, রাসুলের চাচী, ইমাম মালিক, রাসুলের শিশু পুত্র ইবরাহিম, রাসুলের দুধমাতা বিবি হালিমা, ইসলামের তৃতীয় খলিফা ওসমানসহ আরও অনেকে। হজরত উসমানের সমাধির কাছে এসে থমকে দাঁড়ালাম। মগজের ভেতর ঝড়ো গতিতে উল্টে যাচ্ছিলাম ইতিহাসের পাতা। </p>
<p>ইসলামের তৃতীয় খলিফার কবর জান্নাতুল বাকিতে ঢোকার মুখ থেকে বেশ দূরে যা দেখে একটু খট্কা লাখে। তবে ইতিহাসের ঘটনাবলী থেকে এর কারণ জানা যায়। মুসলিমদের প্রথম গৃহযুদ্ধের শিকার হজরত উসমান। বিদ্রোহীরা উসমানের বাড়ি ঘিরে ফেলে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখে এবং তাঁর পদত্যাগ দাবি করতে থাকে। তিনি পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। তাঁকে গোপনে মক্কা কিংবা সিরিয়ায় সরে যাবার পরামর্শ দেয়া হলেও মদিনা ছাড়তে তিনি রাজি হননি। অবশেষে বিদ্রোহীরা গৃহে প্রবেশ করে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তাঁর মৃতদেহ তিন দিন এভাবে পড়ে থাকার পর রাতের অন্ধকারে জান্নাতুল বাকির বাইরে দাফন করা হয়। সে সময় জান্নাতুল বাকির পরিধি ছিল অনেক ছোট। পরবর্তীতে সম্প্রসারণের ফলে হজরত ওসমানের সমাধি জান্নাতুল বাকির সীমানায় মধ্যে চলে আসে। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে জান্নাতুল বাকি থেকে বের হয়ে এলাম। </p>
<p>পরদিন শুক্রবার ফজরের নামাজ পড়েই নবীর কবর জিয়ারতের চেষ্টা করলাম। হাজ্জীদের তিনটি লাইন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু এতই ভীড় যে সবার চাপে পিষ্ট হয়ে অনেকটা স্রোতে ভেসে কখন যে মসজিদ থেকে বের হয়ে এলাম টেরই পেলাম না। যাই হোক, মসজিদে নববীতে জুমার নামাজ আদায় করলাম আর আছরের পরে রাসুলের সমাধির মূল দরজার উল্টো দিকে কাছে যাবার সুযোগ পেলাম। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে আধো আঁধারে খুব বেশি কিছু দেখা যাচ্ছিল না। মনে হলো, সমাধির চারপাশ ঘিরে আরো একটি দেয়াল তোলা হয়েছে। </p>
<p>রাতে এশার নামাজ শেষ করে হোটেলে ফিরে এলাম। ভোর ছয়টায় নবীর শহর ছেড়ে যাত্রা শুরু করল আমাদের বাস। স্বল্প সময়ের মধ্যে মক্কা ও মদিনা শহর হৃদয়ের গভীরে এতাটা জায়গা করে নেবে ভাবিনি। বিদায়ের ঘন্টা বাজছে। সবার মনটা ভারাক্রান্ত। ফিরে যাচ্ছি কাতারের নিশ্চিত গন্তব্যে। তবে মনে হচ্ছিল, কাবার পথে আমাদের যাত্রার এ যেন কেবল শুরু।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/585/feed</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>কাবার পথে ৩</title>
		<link>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/582</link>
					<comments>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/582#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[admi@mamoo252]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 18 Aug 2026 02:31:14 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[Religion & Philosophy]]></category>
		<guid isPermaLink="false">https://mamoon.net/?p=582</guid>

					<description><![CDATA[মক্কার পথে পথে: মক্কায় আমাদের তিন দিন থাকা হবে। এই অল্প সময়ের মধ্যে শহরের প্রধান ঐতিহাসিক জায়গাগুলো ভালো করে ঘুরে দেখার পরিকল্পনা শুরু করলাম। আমাদের হোটেল থেকে একটু বামদিকে নেমে...]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>মক্কার পথে পথে: মক্কায় আমাদের তিন দিন থাকা হবে। এই অল্প সময়ের মধ্যে শহরের প্রধান ঐতিহাসিক জায়গাগুলো ভালো করে ঘুরে দেখার পরিকল্পনা শুরু করলাম। আমাদের হোটেল থেকে একটু বামদিকে নেমে গেলেই পড়ে জান্নাতুল মওলা। জান্নাতুল বাকির পরেই ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবরস্থান হল এই জান্নাতুল মওলা। এখানে রাসুলের নিকটাত্মীয় থেকে শুরু করে রয়েছে অসংখ্য সাহাবি, ইমাম ও ইসলামিক চিন্তাবিদদের কবর। তবে কোন চিহ্ন না থাকায় কবর শনাক্ত করবার উপায় নেই। উল্লেখ করার মধ্যে রয়েছে বিবি খাদিজা, নবীর পুত্রসন্তান কাসিম, আসমা বিনতে আবু বকর, আবু তালিব, আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর, রাসুলুল্লাহর পূর্বসুরী আব্দুল মানাফ, হাশিম, রাসুলের দাদা আব্দুল মুত্তালিবসহ আরো অনেক পারবারিক সদস্যের কবর। </p>
<p>জান্নাতুল মওলাতে নতুন ও পুরাতন দুটো ভাগ রয়েছে। পুরনো ভাগে রয়েছে উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গের কবর এবং ওখানে আর কোন নতুন কবর দেয়া হয় না। মহানবী (সা.) নিয়মিত জান্নাতুল মওলা জিয়ারত করতে আসতেন। একটু সামনেই রয়েছে মসজিদে জ্বিন। মসজিদের দু’পাশ ঘেঁষে রয়েছে দোকানপাট, ফলে কাছে না গেলে বোঝার উপায় নেই যে এটা ইসলামিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ। </p>
<p>এর পর গেলাম রাসুলুল্লাহর জন্মস্থান দেখতে। মসজিদুল হারামের মারওয়া পাহাড়ের দিক থেকে বের হলেই এটা চোখে পড়বে। একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, সেই যুগে মক্কার পুরো বসতি গড়ে উঠেছিল কাবাঘরকে ঘিরে। ফলে দেখা যায়, কুরাইশ ও অন্যান্য বংশের সব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের বসতবাড়ি কাবার এক কিলোমিটারের মধ্যে। রাসুলের জন্মস্থানে একটি লাইব্রেরি নির্মাণ করা হয়েছে যা প্রায়ই বন্ধ থাকে। দিনের বেলায় দেখলাম, দরজার একপাটি খোলা কিন্তু প্রবেশ পথ এক টুকরো কাঠ দিয়ে আগলে রাখা হয়েছে কেউ যাতে ঢুকতে না পারে। লাইব্রেরি বিল্ডিংসহ এলাকার অবস্থা খুবই করুণ। বিল্ডিংয়ের দেয়ালে দেখলাম অনেক আঁকাজোঁকা। সিঁড়িতে জমে আছে ময়লা। লাইব্রেরির দরজার পাশেই কাঁথা কম্বল নিয়ে শুয়ে আছে একজন ছিন্নমূল মানুষ। মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবের জন্মস্থানের এই করুন পরিণতি দেখে বিস্মিত ও ব্যথিত হলাম।    </p>
<p>মসজিদুল হারামের অদূরে রয়েছে একটি কবরস্থান যেখানে মক্কায় ইসলাম প্রসার হওয়ার আগে মেয়ে শিশুদের জ্যান্ত কবর দেয়া হত। অবাক করা ব্যাপার হল, কাবার খুব কাছে হলেও এই জায়গায় কোনো বিল্ডিং তোলা হয়নি, এখনো খালি রয়েছে। আমার ধারণা এখানে কুরাইশ নেতাদেরও কবর রয়েছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কবরস্থানের দিকে তাকাতেই শরীরটা শীতল বরফের মতো হিম হয়ে যাচ্ছিল। </p>
<p>মনে হলো, এই তো এইখানে কত শিশু আসতো বাবার হাত ধরে। ভাবত, বাবার সাথে যাবে অনেক দূর বেড়াতে। কিন্তু কখনো কি জানত বাবার যে হাতটা পরম নির্ভরতায় ধরে সে হাঁটছিল সেটাই দানব হয়ে তাকে গ্র্রাস করবে? এ কেমন নিষ্ঠুরতা? একজন বাবা কি করে এতটা পাষন্ড, নির্দয় হতে পারে? মনে হচ্ছিল এই নীলিমায় হয়ত এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে হাজারো শিশুর আর্তনাদ, বুকফাটা কান্না, বাঁচার আকুতি। এভাবে না জানি হঠাৎ করে থমকে গেছে কত সম্ভাবনামুখর জীবন। বেশিক্ষণ ওখানে দাঁড়াতে পালামনা। সেলীর মনটাও দেখলাম বেশ খারাপ। সেদিনের মতো হোটেলে ফিরে গেলাম। হোটেলে গিয়ে আমার মেয়ে মুনিরাকে বুকের মধ্যে টেনে নিলাম। মুনিরা বলল, কি হয়েছে বাবা তোমার? বললাম, কিচ্ছু না।</p>
<p>পরদিন আবার বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। ট্যাক্সি নিলাম। সারাদিনের ভাড়া ১০০ রিয়াল। ক্যাব ড্রাইভার বাঙালি, নাম হাবীব। কিছুদুর যাবার পর জানতে পারলাম, হাবীব কক্সবাজারে আমার খালাম্মার পাশের বাড়িতে থাকে। অবাক হলাম কাকতলীয়ভাবে এমন দেশের বাড়ির একজনকে পাওয়াটা। হাবীব ২৪ বছর ধরে মক্কায়। আর চিন্তা রইল না। হাবীব সময় নিয়ে আমাদের মক্কা শহর ঘুরিয়ে দেখালো আর বিভিন্ন জায়গার কিছু ঐতিহাসিক তথ্যও দিল। </p>
<p>হাবীব আমাদের নুর ও সওর পাহাড়, মিনা, মুজদালিফা থেকে শুরু করে অনেক জায়গায় নিয়ে গেল। দেখলাম, হাজার বছরের পুরানো বেলাল মসজিদ ভেঙ্গে কিভাবে প্রাসাদ গড়ে উঠেছে। এ নিয়ে হাবীবের আফসোসের অন্ত নেই। শুধু হাবীব নয়, এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই একটা চাপা ক্ষোভ দেখলাম। কিন্তু কি করার আছে! আরাফাত পাহাড়ে গেলাম যাকে জাবালে রাহমাতও বলা হয়ে থাকে। এই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে মহানবী বিদায় হজ্জের ভাষণ দেন। এখানেই নাকি হজরত আদম ও হাওয়া নিজেদের খুঁজে পান। আর তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে বলতে হয় এটা হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানেও দেখলাম কর্তৃপক্ষের নিদারুন অবহেলা। জাবালে রাহমাত ছোট্ট একটি পাহাড়, উঠতে লাগে ১০ মিনিটেরও কম সময়। কিন্তু পুরো পাহাড়টা দেখলাম মূলত ফেরিওয়ালাদের দখলে।</p>
<p>পাহাড়ের উপরে রয়েছে ছোট আকারের সমতল ভূমি যার মধ্যখানে একটি সাদা মিনার। কিন্তু দর্শনার্থীদের পাশাপাশি ফেরীওয়ালাদের ভিড়ে কোন কিছু দেখার কিংবা অনুভব করা জো নেই। অথচ পুরো ব্যপারটাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য খুব বেশি কিছু নয় শুধু ফেরীওয়ালা ও ভিক্ষুকদের নিরাপদ দূরত্ব রাখলেই চলত। আরাফাতে যাবার পথে রাস্তার পাশেই পাহাড়ের উপর দেখলাম ছোট্ট কংক্রিটের তৈরি একটি চিহ্ন। হাবিব বলল, এই জায়গাতেই নাকি হজরত ইবরাহিম তাঁর সন্তান ইসমাইলকে কোরবানি দিয়েছিলেন। ওই পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে সৌদি বাদশাহর বিশাল প্রাসাদ। ক’দিন পরে ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন বুলডোজারের আঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে এতে কোন সন্দেহ নেই। আরাফাতের সীমানা ঘেঁষে রয়েছে একটি ব্রীজ। এই ব্রীজের কাছেই নাকি কাবা ধ্বংস করতে আসা আবরাহার বাহিনী আবাবিল পাখির ছুুড়ে দেয়া পাথরের আঘাতে কুপোকাত হয়েছিল। </p>
<p>হেরা গুহার সন্ধানে (এপ্রিল ১৩, ২০০৯): নুর পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হেরা গুহা। আমার কন্যা মুনিরাকে সাথে নিয়ে আছরের নামাজ পড়েই নুর পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। দেরি না করে শুরু করে দিলাম হেরা গুহার সন্ধানে পথ চলা। </p>
<p>আমাদের আশেপাশে বেশ কিছু তুর্কি হাজ্জীর দল দেখলাম। নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল ১৪০০ বছর আগে মহানবীর হেঁটে যাওয়া পথ বেয়ে চলতে পেরে। যেতে যেতে দেখলাম মানুষের উঠার সুবিধার জন্য পাথর দিয়ে সিঁড়ি তৈরি করে দেয়া হয়েছে ফলে পথ খুঁজে পেতে অসুবিধা হচ্ছিল না। নুর পাহাড়ের চূড়ায় উঠে আবার একটু নেমে গেলেই পাওয়া যাবে হেরা গুহা। হেরা গুহার কাছেই রয়েছে একটি দোকান, ঠান্ডা পানীয় ও স্যুভেনিয়র বিক্রি হয় এখানে। পাকিস্তানী পাঠান কিংবা ভারতীয় কাস্মিরী মুসলিমরা চালাচ্ছে এই দোকান। জানতে পারলাম, স্থানীয় উপমহাদেশের স্বেচ্ছাসেবকেদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে তৈরি করা হয়েছে পাহাড় বেয়ে উঠার সরু রাস্তা। </p>
<p>উঠতে গিয়ে মনে হচ্ছিল এই তো এই পথ দিয়েই হয়ত মহানবী (সা.) পাহাড় বেয়ে উঠতেন। হয়তো ওই পাথরটাতে বসে কখনো জিরিয়ে নিতেন। কিছুদূর উঠার পর আমার বেশ শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল কিন্তু মুনিরাকে বেশ সতেজ মনে হল। প্রচুর পানি খাচ্ছিলাম আর ঘন ঘন জিরিয়ে নিচ্ছিলাম। একটু পরেই হেরা গুহা ফেরত একজন হাজ্জী জানালেন, পানির বোতল সাবধানে রাখতে কারণ বেবুনের দল পানির বোতল ছিনিয়ে নিতে পারে। শুনে মুনিরা ভয় পেয়ে গেল। যাই হোক পানির বোতলগুলি প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে ভালো করে মুড়িয়ে নিলাম। অবশেষে প্রায় ৪০ মিনিটের মধ্যে পাহাড়ের চূড়ায় চলে এলাম। দেখলাম বেশ বড় সড় টিনের ছাউনি ও পাথরের গাঁথুনী দিয়ে তৈরি একটি দোকান। চাও বিক্রি হচ্ছে। অনেকে বেঞ্চে বসে জিরিয়ে নিচ্ছে অবার কেউবা চা কিংবা পেপসি খাচ্ছে। নুর পাহাড় শৃঙ্গের উচ্চতা প্রায় ২,৫০০ ফুট। হেরা গুহার অবস্থান নূর পাহাড়ের ঠিক চূড়াতে নয়। তাই আর দেরি না করে আমরা পাহাড়ের চূড়া বেয়ে হেরা গুহার দিকে নামতে থাকলাম। নামার পথ খুবই খাঁড়া। </p>
<p>একটু পরেই চলে এলাম হেরা গুহায় মুখে। তবে ঢোকার মুখেই রয়েছে একটি বিশার পাথর ফলে এপাশ থেকে বোঝার উপায় নেই যে ওপাশে রয়েছে গুহা। পাথরটির দু’পাশে রয়েছে খুবই সরু দু’টো পথ যা বেশ অন্ধকার ও ভয়ংকর মনে হল। ওই সরু পথ দিয়ে বের হলেই চোখে পড়ল হেরা গুহা। তখন গুহার মুখে বেশ ভীড়। চারদিক তাকিয়ে দেখে অবাক হলাম। দূরে দেখা যাচ্ছিল ধুয়োর আচ্ছাদনে ঢাকা মক্কা শহরের স্কাইলাইন ও মসজিদুল হারামের পাশের সেই বিশাল টাওয়ার। হেরা গুহার অবস্থান এমন যে, ভেতরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে কেবলামুখী হয়ে নামাজ পড়া যায়। গুহাটি বেশ ছোট, দৈর্ঘ ও প্রস্থে যথাক্রমে ৬ ও ১২ ফুট হবে আর উচ্চতায় একজন মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াবার মতো জায়গা নেই। ভাবছিলাম ১৪০০ বছর আগে এটা ছিল জনমানবহীন একটি দুর্গম পাহাড়। সৃষ্টিকর্তাকে জানার অদম্য আগ্রহ নিয়ে এই পাহাড় বেয়ে নিয়মিত উঠে রাতের গহীন অন্ধাকারে হেরা গুহার নির্জনতায় বসে ধ্যান করা একজন মানুষের পক্ষে কি করে সম্ভব তা ভেবে কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না। রাসুল (সা.) একজন অসাধারণ মানুষ বলেই এটা সম্ভব হয়েছিল। মনে হল, এত বই পুস্তক পড়ার পরও হেরার গুহায় নিজে না গেলে এই সত্য অনুধাবন করা কখনোই সম্ভবপর ছিল না।</p>
<p>নুুর পাহাড় ও হেরা গুহা কর্তৃপক্ষের চোখের আড়ালে বড্ড অবহেলায় পড়ে আছে। পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে বিভিন্ন ভাষায় লেখা বিশাল এক সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডে যদিও পাহাড়ে আরোহণের ব্যপারে রাসুলুল্লাহর নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে কিন্তু ঐতিহাসিক সূত্রমতে জানা যায়, রাসুল নিজেও পরবর্তীকালে সাহাবিদের সাথে নিয়ে নুর পাহাড়ে এসেছেন। শুনেছি হেরা গুহা ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করেছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। সাইনবোর্ডের লেখা দেখেই বোঝা যায় কর্তৃপক্ষ চায় না মানুষ এখানে আসুক। মানুষ যাতে ইসলামবিরোধী কাজ করতে না পারে সে জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য কয়েকটি পুলিশ কিংবা সিকিউরিটি গার্ড দিলেই কাজ হয়ে যেতো। </p>
<p>মানুষ ধর্মবিরোধী কাজ করতে পারে সেই ভয়ে সব কিছু ভেঙ্গে ফেলে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে এ কেমন কথা? প্রতিটি জাতির বিশেষ করে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য তাদের অতীত ইতিহাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের ফেলে আসা নিদর্শন ও ইতিহাস থেকে একটি জাতি সামনে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা ও দিক নির্দেশনা খুঁজে পায়। যে জাতির অতীত নেই তার ভবিষ্যত থাকবে কি করে? দুঃখজনক হলেও সত্য সৌদি কতৃপক্ষ ধর্ম রক্ষার নামে ইতিহাস মুছে ফেলে নিজেদের সাথে সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের সামনে চলার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। </p>
<p>সৌদি সরকারের অনেক পদক্ষেপ স্ববিরোধী। মসজিদুল হারামের চতুর্দিকের গেইটগুলোর ঐতিহাসিক নাম বদলে দেয়া হচ্ছে। মসজিদুল হারামে প্রবেশের সবচেয়ে বড় গেইটের নামকরণ করা হয়েছে সৌদি বাদশাহের নামে যেটা ইসলামের অন্যতম খলিফা হজরত উমরের নামে যে গেইট রয়েছে তার প্রায় ১০ গুণ বড়।</p>
<p>শিরিকের আশংকায় ইসলামিক ইতিহাসের চিহ্ন মুছে ফেলা হচ্ছে অথচ সৌদি বাদশাহের বিশাল প্রতিকৃতি ঝুলিয়ে রাখতে কোন বাধা নেই। কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি হাজ্জীদের আচরণ দেখেও হতাশা ও ক্ষোভে ভরে গেল মন। হাজ্জীদের ছুড়ে ফেলা বোতল ও ক্যানে সমস্ত পাহাড় যেন একটা খোলা ময়লার বিনে পরিণত হয়েছে। পুণ্য করতে আসা মানুষের এই আচরণ সত্যিই বেদনাদায়ক। আবর্জনা ফেলার জন্য কিছু গার্বেজ বিন দেয়া যেতো। কিন্তু সমস্যা হল এই বিন নিয়মিতভাবে পরিস্কার করবে কারা? সওর ও নুর পাহাড়ের সবকিছুই চলছে কিছু স্বেচ্ছাসেবকদের প্রচেষ্টাতে। এ নিয়ে কতৃপক্ষের কোন মাথাব্যথা আছে বলে বলে মনে হল না। </p>
<p>সওর পাহাড়ে হিজরত গুহা: চোখের পলকে সাতটি দিন কিভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারিনি। আগামীকাল (এপ্রিল ১৬, ২০০৯) বাস যাবে মদিনায়। তাই আজই যেতে হবে সওর পাহাড়ে। আমার মেয়েকে সাথে নিয়ে বিকেল ৪ টার দিকে সওর পাহাড়ে চলে এলাম। রোদের আঁচ তখনো কমেনি। খাঁ খাঁ করছে চারিপাশ। পাহাড়ে উঠার রাস্তার কোনো হদিস পাচ্ছিলাম না। আমরা বাপ-বেটি তাই অনেকটা ফ্যাল ফ্যাল করে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কাছেই রয়েছে একটি ভ্যারাইটি স্টোর। দোকানদার আমাদের লক্ষ্য করছিল। পাকিস্তানী কিংবা ভারতীয় হবে হয়ত। আমাদের দ্বিধা দ্বন্দ্ব দেখে ভদ্রলোক কাছে এসে বললেন চিন্তার কারণ নেই সোজা চলে যাও রাস্তা দেখতে পাবে। তখন একটু সাহস পেলাম। বিসমিল্লাহ বলে রওনা দিলাম। নুর পাহাড়ের তুলনায় উঠার রাস্তা অনেক প্রশস্ত ও ভালো মনে হল। উঠতে শুরু করলাম। কিছদূর এগুনোর পর মুনিরাকে বেশ ক্লান্ত মনে হল। কিন্তু এবার আমার ততটা অসুবিধা হচ্ছিল না। সওর পাহাড়ের উচ্চতা সম্পর্কে তেমন সঠিক ধারণা ছিল না। ভেবেছিলাম হয়তো নুর পাহাড়ের চেয়ে কিছুটা বেশি হবে। কিন্তু উঠছি তো উঠছিই, পথ যে ফুরোয় না। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখি পাহাড়ের চূড়াতে একটি সাদা চিহ্ন, দেখে মনে হচ্ছিল এই তো এসে গেলাম বলে। কিন্তু পেচানো পথের যে আরো অনেক বাকি!</p>
<p>পাহাড়ের বিভিন্ন স্তরে রয়েছে নামাজ পড়ার জন্য কার্পেট বিছানো সমতল জায়গা। পাহাড়ের মাঝামাঝি উচ্চতায় গিয়ে দেখলাম নুর পাহাড়ের মতন একটি খাবারের দোকান, অদূরেই থাকার জন্য ছাপরা জাতীয় দুটো ঘর। অবশেষে প্রায় সোয়া ঘন্টা পর কাংখিত স্থানে এসে পৌছলাম। মুনিরার মুখে হাসি দেখলাম, ক্লান্তির রেশ মুছে গেছে নিমিষেই। সওর গুহাকে ঘিরেই দেখলাম একটি খাবারের দোকান। গুহার ঐতিহাসিক কোনো নিদর্শন আর নেই। তবে গুহার মুখে লেখা উচ্চতা দেখে চক্ষু চড়াক গাছ! সওর পাহাড়ের উচ্চতা হল ৫,৪০০ ফুট! নুর পাহাড়ের উচ্চতার দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। এখন বুঝতে পারলাম কেন উঠার পথ এত দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। </p>
<p>গুহায় তাকিয়ে দেখি পেছনের দিকটা খোলা, যা হবার কথা নয়। দোকানের ভদ্রলোক বললেন, ঢোকার সুবিধার জন্য পেছনের দিকটা কেটে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এর কাছেই দেখলাম আরেকটি গুহা, কিন্তু মনে হল প্রথমে মানুষ ভুল করে ওটাকেই সওর গুহা ভেবেছিল। তবে এটা এখন যাচাই করা দুঃসাধ্য কাজ। সওর পাহাড়ের শৃঙ্গে অবস্থিত এই গুহাটিও ইসলামিক ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ৬২২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মহানবী (সা.) আবু বকরসহ গোপনে মক্কা ছেড়ে মদিনার পথে পা বাড়ান আর এই গুহাতে তিন দিন লুকিয়ে কাটান। বাইরে তাকিয়ে দেখি সন্ধ্যা সমাগত প্রায়। দেরি না করে নামতে শুরু করলাম। </p>
<p>কিছুদূর নামতেই দেখি দু’জন তুর্কি অশীতিপর বৃদ্ধ লাঠি হাতে নিয়ে উঠে আসছেন। তাদের দেখে নিজেই লজ্জা পেলাম। অর্ধেক পথ নামতেই মাগরিবের সময় হয়ে গেল। পাহাড়ের উপর নামাজ সেরে নিলাম। ৪০ মিনিটের মধ্যেই নেমে আসলাম রাস্তায়। অন্য রকম এক অনুভূতি কাজ করল চেতনায়। পরিতৃপ্ত মনে হল নিজেকে। এতদিন ধরে মনের মধ্যে যে ইচ্ছে লালন করে আসছিলাম তার কিছুুটা হলেও আজ পূর্ণ হল। </p>
<p>মক্কায় ঐতিহাসিক নিদর্শনের সমাধি: ইতিহাসের প্রতি আমার সীমাহীন আকর্ষণ ছোটবেলা থেকেই। ছেলেবেলায় দেখা বগুড়ার মহাস্থান গড়, নাটোরের রাজবাড়ি, চাটগাঁর ওয়ার সিমেট্রি কিংবা কুমিল্লার কোটবাড়ির ঐতিহাসিক নিদর্শন এখনও আমাকে টানে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে মাত্র ১০০ বছরের পুরোনে নিদর্শন ধরে রাখার জন্য কর্তৃপক্ষের যে প্রচেষ্টা দেখেছি। অথচ মক্কার হাজারো বছরের ঐতিহ্যকে রক্ষা করার জন্য সরকারের তেমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়ল না। যা আমাকে হতাশ করেছে।  </p>
<p>মসজিদুল হারাম নিয়েই শুরু করা যাক। মসজিদুল হারামের মাত্র ১০০ মিটারের মধ্যে গড়ে উঠেছে আকাশচুম্বী অট্টালিকা, বহু তারকা খচিত হোটেল ও বাদশার প্রাসাদ। ১নং গেইটের ঠিক উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছে ‘আবরাজ আল-বাইত’ টাওয়ার যা মনে হয়েছে বিশাল দানবের মতো গ্রাস করছে কাবাকে। মসজিদুল হারামের অভ্যন্তরে বসে কাবার দিকে তাকালে চোখ কেড়ে নেয় এই টাওয়ার, হিল্টন, ইন্টার কন্টিনেন্টালসহ আরো অনেক স্কাইস্ক্রেপার। মসজিদুল হারামের তুলনায় আবরাজ টাওয়ার এতই বিশাল যে মানুষ কাবাঘর বাদ দিয়ে ওই স্কাইস্ক্রেপারের ছবি তুলতে ব্যস্ত। মসজিদুল হারামের ভিতর প্রবেশ না করলে দূর থেকে এখন বুঝার উপায় নেই যে কাবার কাছে এসেছি। </p>
<p>হাজ্জীদের থাকার জন্য হোটেল ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রয়োজন আছে কিন্তু তা ইতিহাসকে ধ্বংস করে নয়, কাবার আধ্যাত্মিক আত্মাকে গ্রাস করে নয়। মসজিদুল হারামকে ঘিরে এক কিলোমিটারের মধ্যে আকাশছোঁয়া অট্টালিকা যাতে না ওঠে সেদিকে খেয়াল রেখে উচ্চতার ব্যাপারে বিধি নিষেধ আরোপ করে অনায়াসেই বিল্ডিং নির্মাণ করা যেতো। আমার মনে হয়েছে কিভাবে মুনাফা করা যায় সেটাই হল কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য। পরিবেশ, ইতিহাস ও পুরোনো স্থাপত্য কোন বিবেচনায় নেই। কাবার কাছে ধারের জায়গাগুলি হল রিয়েল এস্টেটের মানদন্ডে সবচেয়ে মূল্যবান। তাই ঐতিহাসিক মন্যুমেন্ট উপড়ে ফেলে কাবার পাশেই বিগ ব্রাদারের মতো গড়ে তোলা হয়েছে এই সব দালান বাড়ি। সম্প্রতি মসজিদুল হারাম সম্প্রসারণের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্টের কাজ চলছে। এই প্রজেক্টের আওতায় মসজিদুল হারামের গা ঘেঁষে তৈরি হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ তলার হোটেল ও অ্যাপার্টমেন্ট। </p>
<p>আল্লাহর নির্দেশে তৈরি কাবার চতুর্পাশ পরিণত হচ্ছে মানুষের তৈরি ইট পাথরের তৈর পার্কিং লট, যাতে চাকচিক্য থাকবে অনেক কিন্তু থাকবে না শুধু মহান সৃষ্টিকর্তার প্রাণ। মাত্র তিন বছর আগেও জমজম কূপের কাছে যাওয়া যেতো। এখন কংক্রিট স্ল্যাবে ঢেকে দেয়া হয়েছে পুরো এলাকা। সাফা পাহাড়ের কাছেই ছিল ছোট্ট একটি ঘর যেখানে রাসুল (সা.) ইসলামের দাওয়াত দিতেন এবং এইখানেই হজরত ওমর ইসলাম গ্রহণ করেন। চিহ্নস্বরূপ এই জায়গায় ছিল দারে-আরকাম নামে একটি গেইট। অনেক খুঁজেও তা পেলাম না। </p>
<p>যতদূর জানা যায়, রাসুলল্লাহর সময়কার মাত্র ২০টির মতো ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ এখনো টিকে আছে। তবে এগুলি যে কোন সময়ে বুলডোজারের ঘায়ে হারিয়ে যেতে পারে। মহানবীর মাতা আমিনা বেগমের কবর বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করে পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। রাসুলল্লাহর জন্মস্থানে এখন যে লাইব্রেরিটা রয়েছে সেটা ভেঙ্গে ফেলে গাড়ির পার্কিং তৈরি করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। রাসুলুল্লাহর জন্মস্থানের পাশেই তৈরি হয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং। এখানেই ছিল আবু তালিবের উপত্যকা যেখানে ইসলাম প্রচারের প্রথম যুগে রাসুল (সা.), তাঁর পরিবার ও অনুসারীদের সমাজ থেকে আলাদা করে দিয়ে অনেকটা নির্বাসনে রাখা হয়েছিল। এছাড়া বিবি খাদিজার বাড়ি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে, হজরত আবু বকরের বাড়ি ভেঙ্গে তৈরি হয়েছে হিল্টন হোটেল। </p>
<p>সাফা পাহাড়ের কাছেই হল জাবালে কুবাইস যা ভেঙ্গে মসজিদুল হারামের ১৫০ মিটারের মধ্য তৈরি হয়েছে সৌদি রাজার প্রাসাদ। এই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে রাসুল (সা.) প্রথম খোলামেলাভাবে কুরাইশদের ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। সেই ঘটনার কথা অনেকরেই জানা। তাছাড়া এই পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে রাসুলের চন্দ্র দু’ভাগ করার ঘটনা মানুষ দেখেছিল। জাবালে কুবাইসেই ছিল বিলাল মসজিদ, কিন্তু সেটাও রাজপ্রাসাদের নিরাপত্তার কারণে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। আগামী ক’বছরের মধ্যে হয়তো আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। </p>
<p>ঐতিহাসিক নিদর্শন রক্ষার জন্য সৌদি পত্র পত্রিকায় সে দেশের অনেক প্রতœতত্ত্ববিদ ও বিজ্ঞানীদের লেখা আমি পড়েছি। কিন্তু তাঁদের আকুতি সৌদি কর্তৃপক্ষের কানে গিয়েছে কিনা জানি না। উমরা করার পর মনে হয়েছে, এ বছর যা দেখলাম আগামী বছর তার হয়তো অনেক কিছুই থাকবে না। নিজেকে ধিক্কার দিলাম আরো আগে না আসার জন্য।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://mamoon.net/opinion/religion-philosophy/582/feed</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
	</channel>
</rss>
