কোরবানীর ঈদ এবং গ্রীষ্মের দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে স্বদেশ থেকে বিশ্বের দেশে দেশে কর্মস্থলে ফিরেছেন প্রবাসীরা। শুরু হয়েছে আবার প্রবাস জীবনের সংগ্রাম। তবে এবার যারা ঢাকায় ঈদ করেছেন, তাদের দিন কেটেছে ডেঙ্গু-আতঙ্কে। কাছের স্বজনদের সাথে কোরবানীর ঈদ করার জন্য প্রবাসীদের অনেকেই সাথে করে নিয়ে গিয়েছেন পরিবার। ফলে পরিবারের শিশু সন্তানদের এডিস মশার আক্রমন থেকে কিভাবে রক্ষা করা যায় সে নিয়ে সবার চরম উৎকন্ঠায় দিন কেটেছে। এজন্য সবাই সাথে করে নিয়ে গেছেন বিভিন্ন ধরনের স্প্রে এবং ক্রিম। বাংলাদেশে অবস্থানকালে কাতার প্রবাসী কয়েকজন বাংলাদেশীর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার খবর শুনেছি। অবশ্য তাঁরা সুস্থ হয়ে নিরাপদে কাতারে ফিরে এসেছেন। ঢাকায় আমার খুব কাছের জানাশোনার মধ্যে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ধরনের অকাল মৃত্যু মেনে নেয়া সত্যিই কষ্টকর।

গত বছর এই সময় ঢাকাবাসীকে ভুগিয়েছে চিকনগুনিয়া। আর এ বছর আতংক ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু। চিকুনগুনিয়ার ভাইরাসবাহী এক ধরণের এডিস মশার কামড়ে মানুষের মধ্যে এই রোগটি ছড়ায়। ডেঙ্গুর জীবানু বহনের জন্যও এডিস মশাকে দায়ী করা হয়। খুব কম ক্ষেত্রেই চিকুনগুনিয়া মৃত্যুর কারণ হয়। কিন্তু ডেঙ্গুর কারণে ঝরে পড়ছে বহু সম্ভাবনাময়ী প্রান। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেখা গেছে, যারা একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন তারাই সবচেয়ে বেশী মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছেন।

দেশে অনেকের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে, ডেঙ্গু যেনো কেবল বাংলাদেশেই ছড়াচ্ছে। আসলে তা সঠিক নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় চল্লিশ কোটি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে রক্তপ্রদাহজনিত কারণে মৃত্যু হচ্ছে পচিঁশ হাজারেরও বেশী মানুষের। বিশ্বের গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চল যেমন ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে সাধারণত বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ দেখা দেয়। গেল কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেক বেশী এবং তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মূলত ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ডেঙ্গু এবার মফস্বল শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ফিলিপাইন। ফিলিপাইনে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় হাজার খানেক মানুষ প্রান হারিয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য ওই দেশে জরুরী অবস্থা জারী করা হয়েছে। মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরেও বহু মানুষের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার খবর এসেছে। তাতে অনেকের মৃত্যুও হয়েছে। ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড প্রদেশে গ্রীষ্মপ্রধান উত্তারঞ্চলের বেশ কিছু শহরে বহু মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। কিন্তু এরপর গত এক দশকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ন্ত্রণে ছিল ডেঙ্গু। তবে কিছুদিন আগে সেই কুইন্সল্যান্ড প্রদেশে একজন অস্ট্রেলিয়া নাগরিকের দেহে ডেঙ্গু ভাইরাস ধরা পড়েছে। কর্তৃপক্ষের মতে, অস্ট্রেলিয়ার বাইরের কোনো দেশে মশার কামড়ই এজন্য দায়ী। জানা গেছে, ঈদের ছুটি শেষে অস্ট্রেলিয়া ফেরত প্রবাসীদের অষ্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিমান বন্দরে অন্যান্য যাত্রীর কাছ থেকে আলাদা করে নিয়ে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

সমস্যা হল, ডেঙ্গুর কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা কিংবা টিকা এখনো বের হয়নি। ফ্রান্সের একটি ঔষধ কোম্পানী ডেঙ্গভেক্সিয়া নামের একটি ডেঙ্গু প্রতিরোধক টিকা বের করলেও, সেটির কার্যকারিতা নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন । তাই বিশ্ব বাজারে সেই ঔষধ এখনো ছাড়া হয়নি।

ইদানিং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ে বিভিন্ন ধরণের স্ট্যাটাস এবং ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে। সরকারী কর্মকর্তা, সাংসদ, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের বক্তব্য নিয়ে তাদের বিদ্পরূকরা হচ্ছে, ট্রল করা হচ্ছে। রাজনীতিবিদরাও একে অন্যকে দোষারোপ করে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কয়েকটি ক্ষেত্রে দেখলাম, অনেকের বক্তব্যের আংশিক তুলে দিয়ে পুরো অর্থকেই বিকৃত করা হচ্ছে । উদ্দেশ্য, মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা। বিদ্রুপ নয়, জনসচেতনামূলক স্ট্যাটাসই জীবন রক্ষা করতে পারে। বৃষ্টির মৌসুম আসার বেশ আগে থেকে কর্তৃপক্ষ ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপযুক্ত ব্যবস্থা নিলে হয়তো আজকের এই ভয়ংকর পরিস্থিতির হয়তো সৃষ্টি হত না, রক্ষা পেতো বহু প্রান।

তবে এখন ডেঙ্গু পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। টেলিভিশন, রেডিওতে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার এবং রাস্তায় পৌরসভার পক্ষ থেকে পোস্টার ও ব্যানার লাগিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় বাড়ীতে বাড়ীতে সরকারী, বেসরকারী এবং একক উদ্যোগে মশা প্রতিরোধক ঔষধ ছিটানো এবং ধোঁয়া দেওয়ার কাজ চলছে সকাল-বিকেল।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধে প্রশাসনকে আরো সচেতন হতে হবে। অন্যের উপর দোষ না চাপিয়ে কিংবা মিথ্যে অজুহাত না দেখিয়ে নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হতে হবে। এডিস মশা মানুষের মধ্যে পেশা, জাতিগত শ্রেণীভেদ বুঝে কামড়ায় না। যাকেই সামনে পাবে সুযোগ বুঝে তার মধ্যেই ডেঙ্গুর বিষ ঢেলে দেবে এডিস মশা। এজন্য দেখা যাচ্ছে, সমাজের উচ্চ পদে সমাসীন মানুষরাও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। দু:খজনক হল, এবার বেশ কয়েকজন ডাক্তারও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তবে বিভিন্ন হাসপাতালে ডাক্তারদের ভূমিকা সত্যিই প্রসংসার দাবী রাখে। হাসপাতালে কর্তব্যরত ডাক্তাররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সত্যি বলতে কি, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি রয়েছে আমাদের হাতে। আমরা যদি আমাদের পারপাশ, ও পরিবেশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে না পারি, তাহলে আসছে বছর ডেঙ্গু আরো তীব্র হয়ে আঘাত হানবে তাতে, কোনো সন্দেহ নেই।

ডেঙ্গু আতঙ্কে কিনা জানি না, এবার কোরবানীর পর পর ঢাকা শহরের পরিচ্ছন্ন চেহারা দেখে খুবই ভালো লেগেছে। কোরবানীর পর দিন ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে রাস্তা-ঘাট, নালা-নর্দমায় রক্ত, হাড়গোড় কিংবা মাংসের উচ্ছিষ্ট তেমন একটা চোখে পড়েনি। এবার সবাই উদ্যোগী হয়ে যে রকম দ্রুত ময়লা পরিস্কার করে ফেলেছেন, তা আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। তার মানে, চাইলে আমরা সবই পারি। ভাবছিলাম, বছরের প্রতিটা দিনই যদি আমরা এমন সচেতন হতে পারতাম?

 

আগষ্ট ২০১৯