অবরুদ্ধ কাতারে এবার দ্বিতীয় ঈদ। গত বছরের পবিত্র রমজান মাসেই কাতারের উপর নেমে এসছিল অবরোধের খড়গ। জল, স্থল, ও আকাশপথ রুদ্ধ করে দিয়েছিল ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিবেশী ক’টি দেশ। দিন গড়িয়ে একটি বছর পেরিয়ে গেছে। আবারও আমাদের দ্বারে ফিরে এসেছে ঈদ-উল ফিতর। গতবারের তুলনায় এবারের ঈদে কাতারের মানুষের মধ্যে তেমন কোনো অনিশ্চয়তার রেশ দেখতে পাচ্ছিনা। ব্যবসা-বানিজ্য, কর্মস্থলে এবং বাজারে ফিরে এসেছে মানুষের আস্থা। তবে কাতারে স্বস্তি ফিরে আসলেও ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও ইয়ামেনে মৃত্যুর মিছিল, এবারের ঈদের আনন্দকে ফিকে করে দিচ্ছে বারবার। একদিকে আমরা ধুমধাম করে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। অন্যদিকে সিরিয়ার বাড়ী বাড়ী চলছে স্বজন হারা মানুষের আহাজারি। ঈদের নামাজ পড়তে পারবেন কিনা সেটাও জানেনা ওরা।

ঈদ নিয়ে কি লিখবো? বাংলা একাডেমী বানানের হুলিয়া পাল্টাতে যেরকম উঠে পড়ে লেগেছে, তাতে শত বছরের ব্যবহৃত শব্দ “ঈদ” বানান কিভাবে লিখবো সে নিয়ে দ্বিধাদন্ধে কেটে গেছে বহুক্ষণ। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকা, সামাজিক মাধ্যমে বয়ে গেছে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়। ঈদ একটি বিদেশী শব্দ। বানানের নিয়েমের প্যাচে ফেলে এই শব্দ লিখতে গেলে অর্থেরও বিকৃতি ঘটতে পারে। তাই এক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম হলে অসুবিধা কোথায়?

যা বলছিলাম, এখন জীবনের এমন একটা সময় পার করছি যখন ঈদের মানেটা অন্ততঃ আমার কাছে অনেকের চেয়ে আলাদা। নিজের পরিবার, পরিজনদের মুখে কিভাবে ঈদের খুশীর রং মেখে দিতে পারি সে ভাবনাতেই বিভোর থাকতে হয় সব সময়। পরিবারের জন্য খরচ করতে পারলেই যেনো নিজের তৃপ্তি মেটে। ছোটোবেলায় ঠিক ছিল তার উল্টো। রমজানের শুরুতেই ঈদে এটা কিনে দাও, ওটা কিনে দাও এ ধরণের বায়না ধরতাম। কিন্তু প্রবাসে আমার সন্তানদের মুখে তেমন কোনো আবদার শুনিনি। জামা-কাপড় একটা দিলেই হলো, তাতেই খুশী। দেশের সত্যিকার ঈদের আমেজ ওদের ছুঁতে পারেনা বলেই হয়তো ঈদ আসলে তেমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখায়না। বন্ধুদের মুখে শুনি, দেশে ছেলে-মেয়েদের ঈদের প্রধান বয়না হচ্ছে মুঠো ফোনের সেট, ট্যাবলেট এবং ভিডিও গেম্স।

ঈদ আসলে এখন দু’টো জিনিসের শূন্যতা অনুভব করি। সে দু’টো হচ্ছে – ঈদ কার্ড এবং ঈদ সাহিত্য সংখ্যা। এক সময় ঈদ কার্ডের আদান-প্রদান ছিল ঈদ আনন্দেরই একটি অন্যতম অংশ। ফলে ঈদের অনেক আগে থেকেই আনন্দের ছোঁয়া পেতো সবাই। রমজানের শুরু থেকেই ঈদ কার্ড কেনার ধুম পড়ে যেতো। শহর কিংবা গ্রামের দোকানে চলতো ঈদ কাডের রমরমা ব্যবসা। দেশে বিদেশে, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের আমরা পাঠাতাম নানা রঙের বর্নিল কার্ড। এর পর চলতো ডাকে প্রিয়জনদের কাছ থেকে ঈদ কার্ড পাওয়ার জন্য অপেক্ষার পালা। অনেকে আবার নিজ হাতে এঁকে যত্ন করে তৈরী করতেন শৈল্পিক ঈদ কার্ড। কারো পাঠানো সুন্দর ডিজাইনের ঈদ মুবারক লিখা কোনো কার্ড যখন হাতে আসতো, তখন বুকের মধ্যে উঠতো খুশীর ফোয়ারা।

কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে, ঈদ কার্ডের প্রচলন নেই বললেই চলে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে সেই ঐতিহ্য। এখন সমাজিক মাধ্যমে, কিংবা মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়েই শুভেচ্ছা জানানোর কাজ সের ফেলছে সবাই। ঈদের আগমনে বিভিন্ন এনিমেশন ও ভিডিও ম্যাসজে ভর্তি হয়ে যায় ম্যাসেঞ্জারের ইনবক্স। একটা সুন্দর কিছু পেলে, অনেকে সেটা বার্তা কপি করে বন্ধুদের গনহারে পাঠাতে থাকেন। যা আমার কাছে সত্যিই বিরক্তিকর মনে হয়। ফেসবুকের পাতায় সবাইকে শুভেচ্ছার স্টাট্যাস দিতে থাকেন বন্ধুরা। এতে শুভেচ্ছা হয়তো জানানো হয় ঠিকই, কিন্তু তাতে আন্তরিকতার ছোঁয়া থাকেনা। সময়ের সাথে যুগ পাল্টে গেছে এ কথা মানি। তা বলে গুগল থেকে ছবি কপি করে পাঠাতে হবে কেনো? নিজে দু-একটা শব্দ লিখে সামাজিত মাধ্যম দিয়েই বার্তা পাঠালে ক্ষতি কি?

এখন ঈদ আসলে দেশের বড় বড় পত্রিকা এবং জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনগুলো বড় আকারের ঈদ সংখ্যা বের করে। আমাদের সময় বিচিত্রা, রোববার, সচিত্র সন্ধানীর মতো সাপত্মাহিক ম্যাগাজিনের ঈদ সংখ্যা খুব জনপ্রিয় ছিল। সংখ্যাগুলো ঈদের সপ্তাহখানেক আগে বের হত। দামও ছিল মোটামুটি সহনীয়। দেশের প্রায় সব প্রধান কবি, লেখকদের লেখা থাকতো ওইসব সংখ্যায়। অন্তহীন অপেক্ষায় থাকতাম কখন বেরুবে স্মারক সংখ্যা। দু’টো কিনলেই কিনলেই মোটামুটি কয়েক মাসের পড়ার খোরাক জুটে যেতো। বারবার পড়তাম পছন্দের গল্প, ও কবিতা। প্রবাসে বসে ঈদ সংখ্যার পড়ার সেই আনন্দ ফিরে পেতে খুব ইচ্ছে হয়।

কিছুদিন ধরে বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে দেখছি ঈদ ফ্যাশনের বিজ্ঞাপন। কাতারে বসেই কেনা যাচ্ছে দেশের হাল ফ্যাশনের রং বেরংয়ের ঈদের পাঞ্জাবী, শাড়ী, সেলোয়ার কামিজ ইত্যাদি। সামাজিক মাধ্যমের এই ভালো দিকটার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। অবশ্য ফেসবুক না থাকলে এটা সম্ভব হতনা। এছাড়া অনেকে এখন থেকেই সামজিক মাধ্যমে গ্রুপ করে ঈদের দাওয়াতের আয়োজন করছেন।

এখন টেলিফোন করে আর কেউ আসতে বলেন না। আমিও পেয়েছি তেমন বেশ কয়েকটি ডিজিটাল নিমন্ত্রণ। কিছু নিমন্ত্রণ পড়ে গেছে একই দিনে, একই সময়ে। কোনটা ছেড়ে কোথায় যাবো ভেবে পাচ্ছিনা। আমি জানি, আমার মতো আপনাদের অনেকেই এরকম সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। তবে যেখানেই যান কিংবা থাকুন না কেন, প্রবাসীদের ঈদের দিনটি আনন্দ ও অনাবিল প্রশান্তিতে কানায় কানায় ভরে উঠুক, সেই প্রার্থনাই করছি।

 

১৪ জুন, ২০১৮