সেদিন সামাজিক মাধ্যমে সিডনীর এক ছোটো ভাইয়ের ক্ষুদে বার্তা পেলাম। সে আবদারের সুরে লিখেছে, “ভাই, কাতারে ২০২২ সালের বিশ্বকাপের জন্য আপনার গেস্ট রুমটা এখন থেকেই বুকিং দিলাম”। রাশিয়ায় বিশ্বকাপ ফুটবলের বিদায়ের ঘন্টা বেজে গেছে ঠিকই, কিন্তু ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের আগমনী সুর এখন একটানা বেজে চলেছে কাতারে। বিশ্বের চোখ এখন কাতারের দিকে। কাতারে বসে সেই উত্তেজনার তাপ অনুভব করছি সবাই।
ইতিমধ্যে আগামী বিশ্বকাপের সময়সূচি ঘোষণা করেছে ফিফা। জুন-জুলাই মাসে কাতারের অসহনীয় গরমের অজুহাত তুলে যেসব দেশ ছোট্ট এই দেশটিতে বিশ্বকাপ আয়োজনের বিরোধীতা করেছিল, সেসব হিংসুটে দেশগুলোর জন্য এটি দুঃসংবাদই বটে। এই প্রথমবারের মতো শীতকালে ফুটবলের আসর বসবে কাতারে। যদিও কাতারী কর্তৃপক্ষ তাদের নবনির্মিত সবগুলো স্টেডিয়ামে আধুনিক শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করেছে, কিন্তু খেলার মাঠের বাইরে অসংখ্য ফুটবল ফ্যানদের এই তীব্র গরম থেকে স্বাচ্ছন্দ্য দেয়ার জন্যই আসন্ন ফুটবল আয়োজনকে শীতকালে নিয়ে আসা হলো।
২০২২ সালের ২১ নভেম্বরে শুরু হয়ে ফাইনাল খেলা হবে ১৮ ডিসেম্বর। জুন-জুলাই মাসে কাতারের গরমের তীব্রতা থাকে তুঙ্গে। তাপমাত্রা কখনো ৫০ ডিগ্রী ছাড়িয়ে যায়। এই জুন মাসেই সিডনী থেকে আমার কাতারে আগমন। তাই কাতারের গ্রীষ্ম আমার স্মৃতিতে এখনো অমলিন। তবে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে তাপমাত্রা কমতে শুরু করে এবং নভেম্বর-ডিসেম্বরে ২০ থেকে ২৪ ডিগ্রির মধ্যে উঠানামা করে। কখনো রাতে তাপমাত্রা ১০-১২ ডিগ্রীতেও নেমে আসে। বিশেষ করে জুন-জুলাই মাসের অসহনীয় গরমের পর কাতারের শীতকাল যে কতটা উপভোগ্য তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
রাশিয়ায় বিশ্বকাপ হলেও দোহা শহরের বিভিন্ন জায়গায় মির্নিত “ফ্যান জোনের” সৌজন্যে কাতারে বসেই ফুটবল সমর্থকদের গগন বিদারী শ্লোগানে মুখরিত স্টেডিয়ামের উন্মাদনার কিঞ্চিত স্বাদ পেলাম। স্টেডিয়ামে যারা যেতে পারবেন না তারা পরিবার পরিজন নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে যাতে খেলা উপভোগ করতে পারেন সেজন্য নির্মিত হয়েছে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুুবিধা সম্বলিত ফ্যান-জোন। সমগ্র কাতার জুড়ে এমন আরো ত্রিশটিরও বেশী ফ্যানজোন তৈরী হচ্ছে। যা আগামী ২০২২ সালে বিশ্বকাপের সময় চালু হবে।
ফ্যানজোনে বিশ্বকাপের খেলা দেখতে গিয়ে রীতিমত মুগ্ধ হয়েছি। ফ্যানজোনে ঢোকার মুখে ছিল অসাধারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইডি কার্ড দেখিয়ে কম্পিউটারে নিবন্ধন করে কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে সবাইকে ঢোকানো হচ্ছিল। ঢোকার পথে ব্যাজদারী গাইড সবাইকে পথ দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা আর সারিবদ্ধভাবে দর্শকদের স্টেডিয়ামে প্রবেশের মধ্য দিয়ে কাতার আগামী বিশ্বকাপ আয়োজনের সীমিত মহড়াও যেন হয়ে গেল এই সুযোগে।
ফ্যানজোনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে মনে হলো যেনো কোনো ফুটবল স্টেডিয়ামে প্রবেশ করলাম। সারি সারি গ্যালারি ভর্তি দর্শক খেলা দেখছেন। ম্যাগা পর্দায়, দর্শকদের করতালি এবং চিৎকারের মধ্যে খেলা দেখার সময় মনে হচ্ছিল আমি কাতারে নয়, যেনো রাশিয়ার কোনো স্টেডিয়ামে হাজারো দর্শকের সারিতে বসে আছি।
গ্যালারির সবচেয়ে উপরের সারিতে রয়েছে কাঁচের দেয়াল ঘেরা ভিআইপি জোন। খেলা চলাকালিন যাতে খাবারের রসনা মেটানো যায় সেজন্য রয়েছে বিভিন্ন ধরণের খাবারের স্টল। এছাড়া আছে বাচ্চাদের রকমারী খোলাধূলোর সরঞ্জাম সমৃদ্ধ একটি বিশাল কিডস-জোন। রয়েছে টেবিলটপ ফুটবল, ভিডিও গেম, ভার্চুয়াল রিয়্যেলিটি ফুটবল, ফেস পেইন্টিং সহ ফুটবল চ্যালেঞ্জ গেম্স। দর্শকদের মনোরঞ্জণের জন্য বিভিন্ন দিন কাতারের বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পীদের নিয়ে কনসার্টেরও আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া দেখলাম নামাজের জায়গা, ফার্স্টএইড রুম ও পর্যাপ্ত সংখ্যক টয়লেট। সব মিলিয়ে ফ্যানজোনে গিয়ে মনে হল কাতার আগামী বিশ্বকাপের জন্য সত্যিই প্রস্তুত। যে সব নিন্দুকেরা কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজনের সামর্থ্য নিয়ে কটু কথা বলছে তার উপযুক্ত জবাব হচ্ছে এই ফ্যানজোন।
বিশ্বের প্রথম কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ৪০ দর্শক ধারণ ক্ষমতার খলিফা স্টেডিয়ামে। বিশ্বকাপ শুরু হবার চার বছর আগেই প্রস্তুত খলিফা স্টেডিয়াম। কিছ’দিন আগে কাতার জাতীয় দলের সাথে এই স্টেডিয়ামে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ খেলেছে ব্রাজিল। এই স্টেডিয়ামেও তৈরী হয়েছে একটি ফ্যানজোন।
কোয়ার্টার ফাইনালের একটি খেলা দেখতে গেলাম খলিফা স্টেডিয়ামের ফ্যানজোনে। খেলা শুরু হবে কাতারের সময় বিকেল পাঁচটায়। গ্রীষ্মের এই দিনে তাপমাত্রা তখনও ৪২ ডিগ্রী ছুুঁই ছুুঁই করেছে। এতো গরমে স্টেডিয়ামে যাবো কিনা সে নিয়ে ধন্দে ছিলাম। কিন্তু স্টেডিয়ামের গেইট পেরুতেই শীতল হাওয়ার পরশে চমকে উঠলাম, জুড়িয়ে গেলো শরীর। দেখলাম হাজার হাজার ফুটবল দর্শকের উপস্থিতিতে খলিফা স্টেডিয়ামের গ্যালারীর একটি অংশ কানায় কানায় পরিপূর্ণ। অত্যাধুনিক আর অভিনব শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো স্টেডিয়ামকে শীতকালীন তাপমাত্রায় নিয়ে আসা হয়েছে। স্টেডিয়ামের ঠিক উপরে দুপুরের তপ্ত সূর্য্য দেখা যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু তীব্র গরমের পরিবর্তে হাজারো দর্শক গা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া হিম শীতল বাতাসে ফুটবল খেলাটি উপভোগ করছেন। মনে হল, সাথে করে গায়ের জ্যাকেটটা নিয়ে এলে ভালো হত।
বিশ্বকাপের বেশ আগেই অবকাঠামো এবং স্টেডিয়াম নির্মাণ কাজ শেষ করার জন্য কোনো কোনো নির্মাণক্ষেত্রে দিন-রাত ২৪ কাজ চলছে। দোহা শহরের দিকে দিকে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে মেট্রো রেল স্টেশন। আরো হচ্ছে ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস, স্কাইস্ক্রেপার, সে এক এলাহী কারবার! কাতারের উপর জল, স্থল, ও আকাশপথে চারটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আরোপিত অবরোধের ১৫ মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এই অবরোধ, অর্থনৈতিক মন্দা সব কিছুকে ডিঙ্গিয়ে অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে চলেছে কাতার, লক্ষ্যস্থল ২০২২, বিশ্বকাপ ফুটবল।
উল্লেখ্য, কাতারকে কেনো এককভাবে বিশ্ব^কাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হল সেটাও কিন্তু হিংসুটে প্রতিবেশী দেশগুলোর মাথাব্যথার অন্যতম একটি কারন। মিলিয়ন ডলার খরচ করে বড় বড় লবিস্ট নিয়োগ করে প্রতিবেশী দেশগুলো দুর্নীতি একং গরমের অজুহাত দেখিয়ে কাতার থেকে বিশ্বকাপ সরিয়ে নেয়া যায় কিনা সেজন্য দুর্নিবার প্রচষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু তারা সফল হয়নি। লক্ষ্য, প্রচেষ্টা আর দেশপ্রেম অটুট থাকলে যে কোন অসাধ্যকে জয় করা যায় – কাতার সেটি প্রমাণ করে দেখিয়েছে।
২৮ জুন, ২০১৮
