একজন স্থায়ী অভিবাসী হয়ে অস্ট্রেলিয়া যাবার পর যে বিষয়টি আমাকে মুগ্ধ করে তা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ানদের বদান্যতা ও দানশীলতা। বিভিন্ন দাতব্য সংস্থাগুলোর আহ্বানে সবাই যেভাবে এগিয়ে আসে এবং অর্থ দান করে তা দেখে নিজের দীনতা চোখে পড়ছিল বার বার। তখন আমাদের মতো নবাগত অভিবাসিদের সাহায্য করার জন্য যেসব সংস্থা এগিয়ে এসেছিল তাদের মধ্যে সিডনি সিটি মিশন, সেলভেশন আর্মি, ওয়াইএমসিএ, দ্যা স্মিথ ফ্যামিলি ছিল অন্যতম।
সিডনী সিটি মিশন নুতন অভিবাসিদের পুরোনো ফার্নিচার, ফ্রিজ সহ ঘরের নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ধার দিত। চাল-চুলো-চাকরী বিহীন একজন অভিবাসীর জন্য এটা ছিল বিশাল ব্যাপার। এই আসবাবপত্র যতদিন প্রয়োজন ব্যবহার করে আবার সিটি মিশনে ফেরত দিয়ে দিতে হত। যাতে এগুলো আবার অন্য কাউকে দেয়া যায়। যদিও এই ধরনের বহু দাতব্য সংস্থা খ্রীস্টান চার্চের অধীনে পরিচালিত হয়, তবে শুধু খ্রীস্টান নয় যে কোনো ধর্মাবলম্বীদের সাহায্য করতে তারা এগিয়ে আসে। বাংলাদেশে মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা এতিমখানাতেই মানুষের দান-খয়রাত করার আগ্রহ বেশী দেখা যায়। কিন্তু এখন সময় পাল্টে গেছে। শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সামাজিক সমস্যা সমাধানে নিয়োজিত বিভিন্নœ সংস্থার জন্যও মানুষ এখন সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের কাতারে দাতব্য সংস্থার সংখ্যা খুবই সীমিত। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সবুজ সংকেত না পেলে কোনো কিছু করা যায় না। সন্ত্রাশী তৎপরতার জন্য অর্থ সংগ্রহের পথ বন্ধ করার জন্য সম্প্রতি এনজিও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে খুবই কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কাতারী ধনী শেখরা প্রচুর দান করেন। অনেক সময় ধর্মীয় কারনে দানের কথা প্রকাশ করা হয়না বলে সেটা জানা যায়না।
পবিত্র রমজান আসলেই কাতার সহ মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশে দান খয়রাতের মাত্রাটা অনেক বেড়ে যায়। কাতারী মালিক তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কিংবা অফিসের কর্মচারীদের রমজান মাসে কার্টুন ভর্তি খেজুর, দুধ, দই, জুস সহ নিজস্ব খামারের সব্জি হাদিয়া হিসাবে দান করেন। কাতারী নাগরিকেরা বাজারের চেয়ে প্রচুর কম মূল্যে সরকারী রেশন হিসাবে উন্নত মানের চাল, তেল, ঘি, চিনি ইত্যাদি পেয়ে থাকেন। রমজানে এই চাল এবং তেলেরও কিছু অংশ তারা নিজের কর্মচারীদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। অনেকে নিজের খরচে পালাক্রমে কর্মচারীদের উমরা এবং হজ্জ করিয়ে আনেন। প্রতিবছরই রমজান মাসে যাকাতের টাকা সংগ্রহ জন্য বাংলাদেশের মাদ্রাসা এবং মসজিদ থেকে বহু মানুষ আসেন কাতারে। এদের কেউ নিরাশ হয়ে ফিরে যান না।
পবিত্র রমজানের সময় কাতারের বিভিন্ন এলাকায় কাতারী শেখ এবং ধনী কাতারী নাগরিক সাধারণ মানুষ এবং শ্রমিকদের জন্য বিনা মূল্যে ইফতার বিতরণ করেন। এজন্য ইফতারীর আগে ধনী শেখদের বাড়ীর ফটকে ইফতার সংগ্রহ করার জন্য লম্বা লাইন লেগে যায়। এদের অধিকাংশই হলেন পাকিস্তানী পাঠান এবং প্রবাসী বাংলাদেশি। কে আগে যাবেন সে নিয়ে বিশাল লাইনে অনেক সময় হট্টগোল বেধে যায়। দুঃখজনক হল, লাইনে দাঁড়ানো বাংলাদেশিদের মধ্যেই এই প্রবনতা বেশী দেখা যায়।
এছাড়া রাস্তা-ঘাটে গাড়ীর থামিয়ে অনেকে পথচারীদের মধ্যে ইফতার বিতরণ করেন। মহাসড়কে চলমান ভারী যানবাহনের চালকদের নিয়মিত ইফতার সামগ্রী বিতরণ করে কাতারের ট্রাফিক বিভাগ। ইফতারের আগে চালকদের তাড়াহুড়োর কারনে মহাসড়কে যানজট সৃষ্টি এবং দুর্ঘটনা এড়াতেই এই কার্যকমে শুরু করেছে ট্রাফিক বিভাগ।
কাতারে যত্রতত্র পার্কিং করার প্রবানতা এখনো মানুষের যায়নি। মসজিদে পার্কিং করতে গিয়েও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। একবার তারাবীর নামাজ শেষ করার পর আমার গাড়ী ঠিক পেছনে অন্য একজন গাড়ী রেখে যাওয়ায় বের হতে পারছিলাম না। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর দেখি গাড়ীর মালিক আসলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করতে তিনি বললেন, নামাজে ব্যস্ত ছিলেন বলেই তার আসতে দেরী হল। তাঁর মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হল যেহেতু তিনি নামাজ পড়তে গিয়েছেন তাই তিনি এভাবে পার্কিং করতেই পারেন। আমিতো হতবাক! অন্যের গাড়ী বেরুবার রস্তা অবরুদ্ধ করে রাখা আইনত অপরাধ। নামাজ পড়তে যাবার আগে দেশের প্রচলিত আইন ভঙ্গ করলে কিংবা অন্য মানুষের জন্য সমস্যা তৈরী করে গেলে সেই নামাজ আল্লাহর কাছে কতটুকু গ্রহনযোগ্য হবে সেটা কি আমরা কখনো ভাবি? একটু সময় নিয়ে সঠিক জায়গায় গাড়ী রেখে গেলে তিনি হয়তো আল্লাহর অনুগ্রহ আরো বেশী পেতেন।
জুমার নামাজের সময় প্রায়ই দেখা যায়, মুসল্লিরা বহুতল আবাসিক দালান থেকে বেরুবার রাস্তা অবরুদ্ধ করে কিংবা রাস্তায় যেখানে সেখানে গাড়ী রেখে নামাজে পড়ছেন। একটি আবাসিক ভবনে মুসলিম ছাড়াও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষ থাকেন। নামাজ চলাকালিন কারো জরুরী কাজ কিংবা যদি হাসপাতালে যাবারও প্রয়োজন হয়, তখন এই অসস্থায় দালান থেকে বের হবে কি করে? এজন হৃদরোগীর জন্য কয়েক মিনিটের ব্যবধান জীবন ও মৃত্যু নির্ধারণ করে দিতে পারে। অন্য কারো অসুবিধার কারন হয়ে যে ইবাদাত করা হয় সেটা আল্লাহর কাছে কতটুকু গ্রহনযোগ্য হবে সেটা বুঝতে কারো মুফতি কিংবা আলেম হাবার প্রয়োজন নেই।
মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হলেও নামাজ পড়ার সময় দেশের প্রচিলত আইন মনে চলতে হবে। নামাজের জন্য যদি রাস্তা বন্ধ রাখতে হয় তাহলে গাড়ী চলাচলের জন্য নূন্যতম জায়গা রাখতে হবে। আমাদের এ ধরনের আচরণের জন্য দেশে দেশে ইসলাম ও মুসলিমদের ভাবমূর্তি ক্ষন্ন হচ্ছে। বিশেষ করে আমাদের পাশে পাশে অন্য ধর্মাবলম্বীদের অনুভ’তি ও সুযোগ সুবিধার প্রতিও আমাদের খেয়াল রাখতে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনী শহরেও জুমার নামাজের সময় মুসলিদের মানুষের বাড়ী থেকে রেরুবার পথে গাড়ী রেখে মসজিদে চলে যেতে দেখেছি। ওই সব দেশে এভাবে গাড়ী রাখা গুরুতর অপরাধ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ ক্রেইন দিয়ে গাড়ীগুলোকে সরিয়ে নেয় এবং গাড়ী চালককে জরিমানা করন। এধরনের খেয়ালী ও বেআইনি আচরণের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় মসজিদ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রবল প্রতিরোধের সন্মুখীন হতে হয়েছে। তারা ভাবে মুসলিমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
২৬ মে, ২০১৯
