আমাদের বায়ুমন্ডলে ক্ষতিকর গ্রীনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সূর্য থেকে যে তাপ পৃথিবীতে আসে, তার কিছু আর ফিরে যেতে পারে না, যার কারণে পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে। সম্প্রতি আমেরিকার নাসা এবং ন্যাশনাল ওসেনিক এন্ড এটমসফেরিক এডমিন্সট্রেশান এর প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ভূপৃষ্ঠ এবং সমুদ্রতলের তাপমাত্রা গত শতকের নথিভুক্ত সকল বাৎসরিক গড় তাপমাত্রকে ছাড়িয়ে গেছে। এই তথ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ফলে বিশ্বব্যাপী যে সর্বনাশা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে চলেছে, পরিবেশ বিজ্ঞানীদের সেই আশঙ্কাকেই সঠিক প্রমান করেছে।

পরিবহন, বাড়ীঘর, অফিস বিল্ডিং, শপিং মল ইত্যাদি বিভিন্ন স্থাপনায় কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার ব্যবহার, গাড়ীতে অন্তর্দাহী ইঞ্জিনে জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যাপক ব্যবহার কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। আরব উপসাগরীয় বা গাল্ফ অঞ্চলের দেশগুলো বিশেষ করে কাতার ও সৌদি আরবে অবকাঠামো সেক্টরে যেরকম উন্নয়নের জোয়ার চলছে তা কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমন দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছে। জনপ্রতি কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমনকারী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে প্রথম স্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছে কাতার। অথচ ১৯৮০ সালে কাতারের অবস্থান ছিল ৪র্থ। জনপ্রতি কার্বন দূষণকারী দেশ হিসাবে বিশ্বের প্রথম দশটির মধ্যে পাঁচটিই হচ্ছে গাল্ফ অঞ্চলের দেশ। যেমন কাতার (৪৪টন), কুয়েত (৩১.৩টন), ওমান (২০.৪ টন), আরব আমিরাত (১৯.৯ টন), ও সৌদি আরব (১৭ টন)।

অন্যদিকে বায়ুমন্ডলে পুরো দেশের কার্বন নির্গমনের হার বিচার করলে সবার শীর্ষে রয়েছে চীন। উল্লেখ্য, ভারত জাপান এবং রাশিয়াকে ডিঙ্গিয়ে এখন ৩য় কার্বন দূষণকারী দেশে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান, খেলনা, ষ্টীল এবং বৈদ্যুতিক দ্র্র্রব্যাদির অন্যতম রপ্তানীকারক দেশ হচ্ছে চীন। এসব করতে গিয়ে প্রচুর জীবাশ্ম জ্বালানী দহন করার ফলে চীন খুব কম সময়ের মধ্যে দূষণের দিক দিয়ে আমেরিকাকে অতিক্রম করে গেছে।

জনপ্রতি নির্গমনের হার বিশ্বের সর্বোচ্চ হলেও মোট কার্বন দূষণকারী দেশ হিসাবে কাতারের স্থান ৪৯তম, যা আপাতঃদৃষ্টিতে গননার মধ্যেই পড়েনা। তবে এতে স্বস্তির কিছু নেই। কার্বন দুষণকারী হেভিওয়েট দেশেগুলোর তুলনায় কাতারের আয়তন এবং জন্যসংখ্যা নগণ্য হওয়াটাই এর প্রধান কারণ। তাই এখন থেকে সচেতন না হলে তেল সমৃদ্ধ আরব দেশেগুলোর বায়ু দূষণ অচিরেই এমন পর্যায়ে পৌছে যাবে যেখান থেকে আর ফেরার কোনো পথ থাকবেনা।

কার্বন-ডাই-অক্সাইড সহ অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস যেমন মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদির নির্গমনের পরিমান ক্রমাগত বেড়ে যাবার ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বিশ্বব্যাপী বৈরী প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় কখনো বেশী শীত আবার কখনো কম, কখনো গরমের মাত্রা যেমন বেড়ে যাচ্ছে তেমনি তুমুল বৃষ্টিতে ভাসিয়ে যাচেছ সব।

মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোতে এই পরিবর্তন চোখে পড়ছে। তেল সমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর আবহাওয়া মুলতঃ শুষ্ক, এবং উষ্ণ। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে খুব সামান্য বৃষ্টিপাত হয়। যেমন কাতারে বছরে বছরে গড়পড়তা বৃষ্টি হয় মাত্র ১৩-১৫ দিন এবং বৃষ্টিপাতের পরিমান হল মাত্র ৭৭মিলিমিটার। মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত হল গ্রীষ্মকাল। এই সময় তাপমাত্র কখনো ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়।

জাতিসংঘের আইপসিসি’র ভবিষ্যদ্বাণী মতে কাতার সহ গাল্ফ রাষ্ট্রগুলোর উষ্ণতা আগামী ৫০ বছরের মধ্যে ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। তাছাড়া গড়পড়তা বৃষ্টিপাতের পরিমান কমে গেলেও বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বেড়ে যাবে এবং বৃষ্টিপাতের ধারা বদলে যাবে। খরা, তাপদাহ, তীব্র বৃষ্টিপাত, বন্যা, খাদ্যাভাব, ও ধূলিঝড়ের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা বেড়ে যাবে এবং এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

গত দু’শতকের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গাল্ফ অঞ্চলের দেশগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ লক্ষ্যণীয় হারে বেড়ে চলেছে। ২০০৯ সালে সৌদি আরবের জিদ্দায় ভয়াবহ বন্যায় ১২২ জনের মৃত্যু হয়, ভাসিয়ে নিয়ে যায় ৩০০০ হাজারেরও বেশী। তবে বেসরকারী হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান আরো অনেক বেশী বলে জানা যায়। ওমানে ভয়ংকর জনু সাইক্লোনে ২০০৭ সালে ৮০ জনের প্রানহানি ঘটে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমান ছিল প্রায় ৪.৪ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া জর্দান, ইয়ামেন, সৌদি আরব, লেবানন ও ফিলিস্তিনের সাম্প্রতিক বন্যা ভবিষ্যতে অশণী সঙ্কতেরই ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য একদিকে ভুপৃষ্ট ও বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি সমুদ্রের পানির তাপগত স্ফীতিও ঘটছে। ফলে গ্রীনল্যান্ড এবং এন্টার্কটিকার বরফ গলে সমুদ্রস্তরের উচ্চতাকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। বায়ুমন্ডলে যে কার্বন নিঃসরণ হয় তার একতৃতীয়াংশ সমুদ্রের পানি শুষে নেয়। কিন্তু উষ্ণতা বেড়ে যাবার ফলে সমুদ্রের পানির কার্বন গ্যাস ধারণ করার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, ফলে যে সব কার্বন গ্যাস পানিতে দ্রবিভ’ত ছিল তা আবারো বায়ুমন্ডলে ফিরে আসছে।

আইপিসিসি’র নতুন জলবায়ু মডেলের হিসাব মতে এই শতকের শেষে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সর্বোচ্চ ১ মিটার পর্যন্ত বাড়বে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক কথা হল, কার্বন নিঃসরণ এই মুহূর্তে পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেও এ পর্যন্ত যে পরিমান কার্বন বায়মন্ডলে নির্গত হয়েছে তার প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অগামী কয়েক শতাব্দী ধরে বেড়েই চলবে।

জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা যদি ১ মিটার বাড়ে তাহলে ২১ শতকের সমাপ্তিকালের মধ্যে গাল্ফ অঞ্চলের প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং আরব অঞ্চলের উক’লবর্তী প্রায় ৪২,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জলমগ্ন হবে। দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনামূলক বিচারে আরব আমিরাত, কাতার এবং বাহরাইন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কাতারের নগর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একটি গবেষনায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৭০ থেকে ২১০০ সালের মধ্যে কাতারের বার্ষিক ২৪ ঘন্টার সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গেলে উপক’লবর্তী বিভিন্ন অবকাঠামো যেমন সমুদ্র বন্দর, পাওয়ার ষ্টেশন, ও শিল্প প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি আক্রান্ত হবে। শুধু তাই নয়, বাহরাইন, কোমোরোস এবং মনুুষ্য তৈরী কৃত্রিম দ্বীপ যেমন কাতারের লুসেইল, পার্ল, আরব আমিরাতের জুমাইরা ও প্লামের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। সমুদ্রপৃষ্টর উচ্চতা বেড়ে গেলে ভ’গর্ভস্থ পানির লবনাক্ততাও বেড়ে যাবে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবনাক্ত পানি অনুপবেশের ফলে কৃষিখাতে উৎপাদন ব্যাহত হবে। খাদ্য ঘাটতি দেখা দেবে যা স্বাস্থ্য ও অর্থণীতিতে প্রভাব ফেলবে। সমুদ্রের লবনাক্ত পানিকে বিশুদ্ধ করেই কাতারের ৯৯ শতাংশ খাবারের পানি সরবাবহ করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গেলে লবনাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কারখানা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। ফলে সুপেয় পানির সঙ্কট দেখা দেবে।

তৈল উৎপাদনকারী আরব দেশসমূহের কার্বন নিঃসরণের হার বিশ্ব গড়পড়তা থেকে তিনগুন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘ, কাতার সহ বেশ কিছু গাল্ফ রাষ্ট্রকে জলবায়ু পরিবর্তনে ফলে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসাবে চিহিৃত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী প্রভাবের ঝুঁকি এখন চলমান বিশ্বের সন্ত্রাশী কর্মকান্ডের চেয়েও বেশী ভয়ংকর বলে দেখা হচ্ছে। তাই এই ঝুঁকি নিরসনের জন্য এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে।

কাতার এবং তার প্রতিবেশী দেশগুলো বায়ুমন্ডলে কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য নবায়নযাগ্য জ্বালানী থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ভাবছে; পরিবেশবান্ধব নতুন জ্বালানী উদ্ভানের জন্য গবেষণা চালাচ্ছে। সৌর শক্তি হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানীর প্রধান উৎস। আগামী বছর চালু হতে যাচ্ছে কাতারের প্রথম সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন এই সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র আগামী ২০২০ সালের মধ্যে কাতারে প্রায় ৭০ হাজার বাড়ীকে আলোকিত করতে সক্ষম হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশির প্রায় সত্তর শতাংশ কাজ করেন মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোতে। যাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা সচল রেখেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। বৈরী পরিবেশের কারনে গাল্ফ অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে তার প্রভাবও পড়বে স্বদেশের অর্র্থনীতিতে।

 

ডিসেম্বর, ২০১৫