আবারো ফিরে এসেছে কৃষ্ণচূড়ার রঙে রাঙা একুশে ফ্রেবুয়ারী। একুশ আমাদের গৌরব। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রদীপ্ত শিখায় উজ্জ্বীবিত হয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে শপথ নেয়ার দিন হল একুশ। ভারতের পশ্চিম বাঙলার একজন বন্ধু একবার মন্তব্য করেছিলেন, “দাদা, বাংলাদেশের বাঙালিদের জন্যই পৃথিবীর বুকে বাংলা ভাষা এখনো টিকে আছে। পশ্চিম বাংলার বাঙালিরা বাংলা ভাষাকে ঝেড়ে মুছে ফেলতে নিজেরাই যেন উঠে পড়ে লেগেছে। কলকাতার বিলবোর্ড ও সাইনবোর্ডে এখন দেখা যায় কেবল হিন্দি ও ইংরেজী। পশ্চিম বাঙলার ট্রেন ষ্টেশনগুলোতে বাংলায় ঘোষণা দেয়া বন্ধ করে দেয়ার পর কলকাতাবাসীদের নির্লিপ্ততা দেখে মনে হয়েছে পশ্চিম বাংলার বাঙালিরা হিন্দি ও ইংরেজীর কাছে পরাজয় মেনে নিয়েছে”। সেদিক দিয়ে বাংলাদেশি বাঙালিদের নিজের ভাষা নিয়ে অহংকার করার মতো আছে অনেক কিছু।
১৯৫২ সালে আমাদের কিছু দামাল ছেলের আত্মত্যাগের ফলেই বিশ্বদরবারে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলা ভাষা। একুশে ফেব্রুয়ারীকে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। তবে এই আর্ন্তজাতিক স্বীকৃতির রূপকার হলেন কানাডা প্রবাসী দুইজন ভাষাযোদ্ধা, রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালাম। ১৯৯৮ সালে তাঁরা ২১শে ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণার আবেদন জানিয়েছিলেন তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে। এরই ফলে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় ২০১০ সালে জাতিসংঘ বাঙালির গৌরব ২১ ফেব্রুয়ারিকে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেন। সেই থেকে অমর একুশকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে সারা বিশ্ব।
প্রবাসে ভিনদেশি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা আমাদের সন্তারদের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক চর্চা ধরে রাখা একটি বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ। এ জন্য বাড়ীতে ও নিজেদের মধ্যে বাংলার পরিবর্তে অন্য ভাষায় কথাবর্তা বলার অভ্যাস দুর করতে হবে। না হলে আমাদের সন্তানদের মুখের ভাষায় বাংলা আর কখনো শোনা যাবেনা।
প্রবাসে বাংলাভাষাকে টিকিয়ে রাখতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে দেশে কমিউনিটির উদ্যোগে ও ব্যক্তিগত অনুদানে বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করে ছেলেমেয়েদের বাংলা শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন দেশে বাংলা পত্রিকা, ম্যাগাজিন, রেডিও ও টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করে বাংলা চর্চার সুযোগ তৈরী করে দিচ্ছেন তাঁরা। ওই সব দেশের সরকারী স্কুলগুলোতেও বাংলা শেখার ও র্চ্চার সুযোগ রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া সিডনী শহরে আমিই প্রথম কমিউনিটি বাংলা রেডিও চালু করি। এর পর বাংলা পত্রিকা প্রকাশনা ও বাংলা শেখানোর স্কুল প্রতিষ্ঠার সাথেও যুক্ত ছিলাম। সন্তানদের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটাতে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান শহরগুলোতে বাংলা স্কুল, গান, নৃত্য এবং নাটক প্রশিক্ষণের কেন্দ্র সহ রয়েছে একুশ ও বাংলা একাডেমি।
কাতারে বাংলাদেশ কমিউনিটির উদ্যোগে তেমন কোনো প্রচেষ্টা চোখে পড়ছে না এখনো। কাতার সরকারী বেতারে উর্দু ও হিন্দি ভাষার অনুষ্ঠান থাকলেও বাংলা অনুপস্থিত। প্রবাসীদের উদ্যোগে নিয়মিত কোনো পত্রিকা কিংবা ম্যাগাজিন বের হতে দেখা যায় না। সম্প্রতি কাতারের ফানার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ছেলে-মেয়েদের বাংলা শেখানোর জন্য একটি বাংলা ক্লাস চালু হয়েছে। প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যায় এই ক্লাস নেওয়া হয়। এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। কাতারের বাংলাদেশ স্কুলও ছুটির দিনে এ ধরনের বাংলা শেখার ক্লাস চারু করতে পারে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এমন উদ্যোগ নিলে স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক এবং ছাত্র-ছাত্রীর কোনো অভাব হবেনা।
মাতৃভাষা একটি জাতির পরিচয় ও অস্তিত্বের স্মারক। মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। খুব বেশীদিনের কথা নয়, সেই পাকিস্তান আমলে সাহিত্য, সংস্কৃতি, অফিস আদালত, বানিজ্য — সবখানেই উর্দু ভাষা বাঙালি জাতি সত্ত্বার উপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল। কিন্তু মহান একুশের রক্তাক্ত সিঁড়ি বেয়ে আমরা পার হয়েছি সেই বাধার উঁচু পাহাড়।
আমি অন্য ভাষার সাহিত্য ও কবি সাহিত্যিকদের শ্রদ্ধা করি। রুমি, হাফিজ, গালিব, বাহাদুর শাহ জাফরের গজল আমার খুবই প্রিয়। আমি খলিল জিব্রান ও নাজিম হিকমতের কবিতাও পড়ি। কিন্তু কোনো কিছুই আমাদের আব্বাস উদ্দীন, আব্দুল আলীম, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুনদের বাদ দিয়ে নয়। বায়ান্নোর আন্দোলন বিশেষ কোনো ভাষার বিরুদ্ধে ছিলনা; ছিল নিজের মায়ের ভাষার ন্যায্য মর্যাদা আদায়ের জন্য। এর স্মারক রয়েছে সেই কালজয়ী গানে – “ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়” । সেই মুখের ভাষাকে আদরণীয় করে রাখার, নিজের ভাষার অধিকার আদায়ে বাঙালি সফল হয়েছে। সেই সাফল্যের পথ বেয়েই আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। এখন এই স্বাধীন জাতির জন্য তার ভাষাকে বাঁচিয়ে রাকা, তাকে প্রাণিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই বিজাতীয় কোনো ভাষা যাতে আবার আমাদের উপর ভর না কওে, সেজন্য সবাইকেই সচেতন হতে হবে।
আমার জানামতে বাংলাদেশের বাইরে প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয় ব্রিটেনের ওল্ডহ্যাম শহরে, ১৯৯৭ সালে। এরপর ২০০৫ সালে জাপানের টোকিও শহরে তৈরী হয় আরেকটি শহীদ মিনার। অস্ট্রেলিয়ার সিডনির শহরের অ্যাশফিল্ড হেরিটেজ পার্কে ২০০৬ সালে নির্মিত হয়েছে একটি শহীদ মিনার, যাকে বলা হচ্ছে মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ। এটাই হচ্ছে প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ।
মধ্যপ্রচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ওমানে বাংলাদেশে দূতাবাসের উদ্যোগেও একটি শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে। কাতারেও আমাদের প্রাণের শহীদ মিনার গড়ার উদ্যোগ কি আমাদের মান্যবর রাস্ট্রদূত নিতে পারেন না? পারেন নিশ্চয়। এ জন্য এখানকার বাংলাদেশিদের উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে এর প্রয়াজনীয়তাটি তুলে ধরতে হবে। কাতারে বাংলাদেশের রাস্ট্রদূতের মাধ্যমে কাতার সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারির গৌরবের ইতিহাসকে প্রবাসের প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারের লক্ষ্যে স্মারক হিসেবে শহীদ মিনার গড়ে তোলার উদ্যোগটি নিতে হবে সবাই মিলেই।
২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯
