কাতারের বাংলাদেশ কমিউনিটি বেশ কিছু দিন ধরে একটি কঠিন ও জটিল ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। কাতারে অবস্থানরত কিছু বাংলাদেশি বিভিন্ন অপরাধমূলক এবং বেআইনি কাজে জড়িয়ে পড়ার জন্যই এই অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অতীতে, আমাদের কমিউনিটি এমন সঙ্কটপূর্ণ অবস্থার মধ্যে পড়েছিল কি না, আমার জানা নেই।
দীর্ঘদিন কাজের সন্ধান না পেয়ে চরম হতাশায় কিংবা অর্থ উপার্জনের জন্য বেপরোয়া হয়ে আইন-বিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ছেন কিছু বাংলাদেশী নাগরিক। দোহা শহরের নাজমা, সুক হারিজ, দোহা জাদিদ, মুশাইরিবের পুরানো এলাকা, আলআতিয়া পুরোনো মার্কেট ও সেহলিয়ার মত কিছু এলাকার রাস্তার ফুটপাত এবং বাংলাদেশী রেস্তোরাঁর সামনে প্রচুর বাংলাদেশী নগরিককে কাজের সন্ধানে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের সমাবেশ কাতার কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করে। তাই এরকম জটলা থেকে বহু মানুষকে নিয়ে জেলে ভরা হচ্ছে কিংবা সরাসরি দেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের কড়া আইনের কথা জানা সত্ত্বেও আমাদের প্রবাসী শ্রমিক ভায়েরা কোনো যে অশুভ ও আত্মঘাতি পথে যাচ্ছেন জানি না। কাতারের বাংলাদেশিরা এখন দোহা শহরের এইসব এলাকায় যেতে রীতিমত ভয় পাচ্ছেন।
সুক হারিজের রাস্তায় অনেকে ভাসমান ব্যবসা খুলে বসেছেন, যা কাতার আইনবিরোধী। স্বদেশে পাড়ায় পাড়ায় এলাকার আধিপত্য নিয়ে যেমন বিভিন্ন দলের মধ্যে সংঘাত হয়, ঠিক তেমনি জেলা ভিত্তিক গোষ্ঠির মধ্যে এই ধরনের সংঘাত এখন দোহা শহরেও শুরু হয়েছে। কিছু বাংলাদেশি জুয়া খেলা, গাঁজা এবং ইয়াবার মত মাদক দ্রব্যের নেশা ও বেচাকেনায় মেতে উঠেছে। এইসব অবৈধ কার্যকলাপ এবং সংঘাতের জের ধরে সম্প্রতি একজন নেপালী নাগরিক নিহত হবার পর কাতারী পুলিশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরদারীতে রয়েছে বাংলাদেশ কমিউনিটি। মাত্র হাতে গোনা কয়েকজনের জন্য পুরো কমিউনিটির উপর শাস্তির খগড় নেমে এসেছে। কাতারে অন্য কমিউনিটির কিছু মানুষও অবৈধ কাজে লিপ্ত রয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অন্য কেউ অপরাধ করছে বলে আমাদের অবৈধ কাজ বৈধতা পায়না।
গত আগস্ট মাসে তিন থেকে চার মাসের বকেয়া বেতনের দাবীতে দুটো বড় বড় নির্মান প্রতিষ্ঠানের হাজারো বাংলাদেশি শ্রমিক বিক্ষোভ করতে রাস্তায় নামেন এবং শাহানিয়া এলাকার দুখান মহাসড়ক অবরোধ করে বসেন। দূতাবাস, বাংলাদেশ কমিউনিটি এবং কাতারী কর্তৃপক্ষের সমন্বিত চেষ্টায় অবশেষে সমস্যার সুরাহা করা হয়। মালিক পক্ষকে অবিলম্বে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হয়। স্বস্তির কথা হল, অবরোধে অংশগ্রহনকারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
বহুদনি ধরে বেতন না পাওয়ায় বিপর্যস্ত শ্রমিকরা হয়তো অনেকটা নিরুপায় হয়ে এই পথে নেমেছে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, হরতাল, সড়ক অবরোধ, কাতারে সম্পূর্ণ অবৈধ। দাবি পূরণের জন্য স্বাগতিক দেশের আইন ভঙ্গ করে কখনোই এই ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত নয়। এতে সাময়িক সুবিধা পাওয়া গেলেও, তা সমগ্র কমিউনিটির উপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সম্প্রতি দোহা এক্সিবিশান এন্ড কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হল নির্মান খাতের একটি বিশাল মেলা। ওই মেলায় একটি জনশক্তি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের স্টলে অনুসন্ধান করে জানা যায়, তারা বাংলাদেশ থেকে কোনো শ্রমিক আনতে আর আগ্রহী নন। ওদের কথা শুনে মনে হয়েছে, এই ব্যাপারে তারা হয়তো উপর থেকে নির্দেশনা পেয়েছে। এটা বাংলাদেশী শ্রমকিদের সড়ক অবরোধেরই ফলাফল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বকাপ ফুটবলকে সামনে রেখে আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমের চোখ এখন কাতারের দিকে। কাতার সরকার তাই নির্মান খাতে যাতে শ্রমিক অসন্তোষ না হয়, সেই ব্যাপারে খুবই সচেতন। কোনো রকমের অভিযোগ পেলেই তড়িত ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। তবে পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যাওয়ার আগে যদি প্রতিরোধক ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে বিক্ষোভ, অবরোধের মত ঘটনা এড়ানো সম্ভব। এই ব্যাপারে বাংলাদেশ কমিউনিটি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে।
যেমন প্রতিটি বড় বড় ক্যাম্পে কর্মরত বাংলাদেশীদের সাথে আমাদের কারো না কারো যোগাযোগ রয়েছে। একটু সক্রিয় হলে খুব সহজেই শ্রমিক ক্যাম্পগুলোতে কোনো অস্থিরতার পূর্বাভাষ আমরা পেতে পারি। একই সঙ্গে বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত অপরাধী, তাদের ইন্ধনদাতা এবং পৃষ্ঠপোষকদের পরিচয় আমাদের অনেকেরই জানা। দেশের স্বার্থের কথা ভেবে নিরব না থেকে, এইসব অপকর্মাদের পরিচয়, দূতাবাস এবং কাতারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেয়া উচিত।
বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্যানুযায়ী, দুই শতাধিক বাংলাদেশী নাগরিক এখন কাতারের জেলে রয়েছেন, যাদের ৮০ শতাংশ মাদক সম্পৃক্ত অপরাধে জড়িত থাকার কারণে সাজা খাটছেন। কারাভোগী অনেকর বয়স মাত্র ২৫-৪০ বছরের মধ্যে। এদের কেউ আবার যাবজ্জীবন কারাদন্ড ভোগ করছেন। এদের অধিকাংশ মাদক দ্রব্য সেবন, বেচা-কেনা এবং ফ্রি ভিসায় এসে অবৈধভাবে কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। অনেকে জাল ভিসা এবং আইডির মেয়াদ শেষ হওয়াতে জেল খাটছেনএতো কম বয়সে জীবনের সোনালী দিনগুলো প্রবাসে কারাগারের অন্তরালে বিলীন হয়ে যাবে ভাবলেই বেদনাক্লিষ্ট হয় মন।
ইতিমধ্যে কারাগারে গিয়ে সাজাপ্রাপ্তদের সাথে সরাসরি কথা বলছেন দূতাবাসের কর্মকর্তারা এবং তাদের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তবে অনেক সময় কারাগারের বন্দিরা অপরাধের সাথে জড়িত পুরো ঘটনা কর্মকর্তাদের খোলাসা করে বলছেন না বলে দূতাবাস কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
প্রবাসে সংশ্লিষ্ট দেশেই জাতীয় পরিচয় পত্র (এনআইডি) দেওয়া, প্রবাসীদের একটি দীর্র্ঘদিনের দাবী। এ নিয়ে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে বলে জানাল দূতাবাস। সিঙ্গাপুরে প্রথম এনআইডি দেয়ার কাজ শুরু হচ্ছে। এর পরই কাতারে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে। এছাড়া কাতার প্রবাসী বাংলাদেশী পেশাদজীবিদের জন্য পাসপোর্ট ও কনসুলার সার্ভিস আরো উন্নত ও সহজতর করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে দূতাবাস।
কাতারে একজন নেপালী নাগরিক খুন হওয়ার পর স্বাগতিক কাতারী সমাজে বাংলাদেশিদের নিয়ে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরী হয়েছে, তা দূর করার জন্য কমিউনিটির সবাই মিলে সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন মান্যবর রাষ্ট্র্রদূত। আর এই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে বেতার মাধ্যম। কাতার ব্রডকাস্টিং সার্ভিসের আওতায় উর্দু, হিন্দি ভাষায় নিয়িমিত অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হচ্ছে। কিন্তু জনসংখ্যার বিচারে কাতারের দি¦তীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠি বাংলাদেশিদের জন্য বাংলা ভাষার কোনো অনুষ্ঠান নেই। এই ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসকে আমি অনুরোধ জানিয়েছি।
দূতাবাসের সেবার মান বৃদ্ধিসহ দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসের আন্তরিক প্রচষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। ভিসা এবং বিভিন্ন কারনে প্রতারিত প্রবাসীদের সাথে বিস্তারিত আলাপ করে সমস্যার মূলে যাওয়ার চেষ্টা করছে দূতাবাস। এছাড়া কোনো অনিয়ম বা অবৈধ কাজের সাথে মালিক পক্ষের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেলে সেটাও কর্র্তৃপক্ষে নজরে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস। কোনো সমস্যা পড়লে তাৎক্ষণিক সাহায্যের জন্য খোলা হয়েছে হটলাইন । আশা করছি, দূতাবাসের এমন স্বেচ্ছাপ্রনোদিত উদ্যোগ এবং স্বচ্ছ কার্যক্রম আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।
খুব বেশদিনের কথা নয়, কাতার দূতাবাসেও একটি অনাকাংখিত ঘটনা ঘটে। একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে একজন বক্তার বক্তব্যকে কেন্দ্র কওে হাতাহাতি ও চেয়ার ছোড়াছুড়ি হয়। ফলে দূতাবাস পুলিশ ডাকতে বাধ্য হন। ঘটনাটি খুব খারাপের দিকে মোড় না নিলেও কাতারে দেশের ভাবমূর্তিও অপার ক্ষতি হয়। কাতারে যাতে কুয়েতের মত ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সেজন্য কাতারের বাংলাদেশ কমিউনিটি এবং দূতাবাসের সমন্বয়ে প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজ বিশেষ করে শ্রমিকদের মধ্যে সচতেনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক কর্মসূচী হাতে নিতে হবে।
রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আঞ্চলিক সব মিলিয়ে কাতারে প্রবাসী বাংলাদেশি সংগঠনের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। কিন্তু দেখা গেছে, অধিকাংশ সংগঠনের কার্যক্রম দোহা শহর ও আশেপাশের এলাকায় সীমাবদ্ধ। ফলে যাদের জন্য সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করা উচিত, তাদেরই অনুষ্ঠানে আসার সুযোগ থাকেনা। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বিভিন্ন শ্রমিক ক্যাম্পে গিয়ে অনুষ্ঠান না করলে কার্যক্রম ফলপ্রসু হবে না।
তাই কেবল কমিউনিটি সংগঠনের উপর ছেড়ে না দিয়ে, দেশের স্বার্থে দূতাবাসকেই এ ব্যাপারে অগ্রনী ভ’মিকা নিতে হবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সবাইকে কোনো না কোনো উপলক্ষ্যে দূতাবাসে যেতে হয়। তাই দূতাবাসে আসা শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ কার্যকর হতে পারে।
১০ অক্টোবর, ২০১৯
