এখন মধ্যপ্রাচ্যে গ্রীষ্মের দাপট তুঙ্গে, চারদিকে গা-পোড়ানো উত্তাপ। দুই বছর আগে জুনের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে প্রথমবারের মতো কাতারের দোহায় এসে যেন এক ভিন্ন জগতে পা রেখেছিলাম। সিডনির প্রায় শূন্য ডিগ্রির কনকনে শীত ছেড়ে দোহার মাটিতে নামতেই মনে হয়েছিল, যেন হঠাৎ করে রুটি সেঁকার তন্দুরের ভেতরে ঢুকে পড়েছি।
মধ্যপ্রাচ্যে এর আগে কখনো আসা হয়নি। প্রচণ্ড গরমের গল্প অনেক শুনেছিলাম, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল না। তাই প্রথমদিকে এই তীব্র উত্তাপ খানিকটা বিস্মিতই করেছিল। তবে আরও বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিল সামনে। সেপ্টেম্বর পার হতেই ধীরে ধীরে প্রকৃতির সেই তপ্ত উনুন যেন বদলে যেতে লাগল এক মনোরম উদ্যানে। ঝলসে দেওয়া রোদ হয়ে উঠল কোমল, সন্ধ্যার বাতাসে মিশল প্রশান্তির ছোঁয়া, আর শহরজুড়ে নেমে এলো এক উপভোগ্য আবহ।
সত্যি বলতে কি, প্রকৃতির এমন রং বদলের খেলা দোহায় না এলে দেখা হতো না। দোহায় না এলে হয়তো জানা হতো না, একই শহর কী আশ্চর্য দক্ষতায় কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দহনময় মরু থেকে আরামদায়ক বসবাসের পরিসরে নিজেকে রূপান্তরিত করতে পারে।
কাতারে বলতে গেলে রয়েছে কেবল দু’টো ঋতু – গ্রীষ্ম এবং শীত কাল। এপ্রিলের শুরু থেকেই প্রকৃতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। আর জুন/জুলাই মাসে তা ভয়ংকর আকার ধারণ করে। ওই সময় দিনের তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যে উঠা-নামা করতে থাকে। অথচ সিডনীতে তখন ঠিক তার উল্টো অর্থাৎ মাঘের শীত। এ সময়ে কাতারীরা গরম থেকে বাঁচতে ইউরোপ ও অন্যান্য দেশে যেমন বেড়াতে যান, তেমনি প্রবাসীদের অনেকেই তাদের পরিবারকে কয়েক মাসের জন্য দেশে পাঠিয়ে দেন।
নভেম্বর/ডিসেম্বর মাসে সিডনীর তাপমাত্রাও কম যায়না। যা কখনো ৪৫ ডিগ্রীও পার হতে দেখেছি। মনে পড়ে আশির দশকের শেষের দিকে সিডনী সিটিরেলের বেশ কিছু লাইনে চলতো লাল রংয়ের প্রথম জেনারেশনের ট্রেন। এসব ট্রেনে ছিলনা কোনো শীততাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। সবার কাছে এগুলো রেড র্যাটলার্স নামে পরিচিত ছিল। গ্রীষ্মের খরতাপে এই ট্রেনে চড়ে সিডনী শহরে চলতে গিয়ে মনে হতো গরমে যেন সেদ্ধ হয়ে গেলাম। অবশ্য ১৯৯৩ সালের দিকে এই ট্রেনগুলো উঠে যায়। তবে অস্ট্রেলিয়ার সাথে কাতারের পার্থক্য হচ্ছে, সিডনী শহরে গ্রীষ্মকালে দিনের তাপমাত্রা কখনো ৪০ ডিগ্রী ছাড়িয়ে গেলেও সন্ধ্যায় তা ২০-২৫ ডিগ্রীতে নেমে আসে। কিন্তু কাতারের তাপমাত্রা, দিন বলুন কি রাত, প্রায় সমান থাকে। ফলে রাতের বেলাতেও তাপদাহ থেকে নিস্তার পায়না কেউ।
কাতারে সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে প্রকৃতিতে নেমে আসে প্রশান্তি। তাপমাত্রা ক্রমশঃ কমে গিয়ে নভেম্বর/ডিসেম্বরে ১০-১৫ ডিগ্রিতে নেমে আসে। সিডনীর বন্ধুদের বলে রাখি, এই সময়টা হল কাতার ভ্রমণের শ্রেষ্ঠ সময়। তবে কাতারে যে কদাচিৎ বৃষ্টিপাত হয় তা এই সময়টাতেই হয়ে থাকে। বৃষ্টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবার কারণ নেই। কাতারে সারা বছরে মাত্র নয় থেকে দশদিন বৃষ্টি হয়ে থাকে। আর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বছরে গড়ে মাত্র ৮০ মিলিমিটার যা সিডনীর তুলনায় নস্যিই বলা চলে।
কাতারে গ্রীষ্মকাল হলো খেজুরের মৌসুম। এই সময় রাস্তায় লাগানো সারিবদ্ধ খেজুর গাছে দেখা যায় থোকা থোকা খেজুরের সমাহার। লাল রঙয়ের পাকা খেজুর দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। এ ধরনের স্থানীয় খেজুর একটু পরিপক্ক হলেই বাজারে বিক্রি হয়। রাস্তায় চলার সময় হাত বাড়ালেই খেজুরের নাগাল পাওয়া যায়। ইচ্ছে করলে হাত দিয়ে পেড়ে খেতে বাধা নেই।
সিডনী থেকে আমার কাতারে আগমন হল সবচেয়ে কঠিন সময়ে অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের গ্রীষ্মকালে। যা অনেকটা সিডনীর জুন মাসের হিমাগার থেকে তপ্ত উনুনে আগুনে ঝাপ দেয়ার মত। তেমনি এক আগুন ঝরা দিনে আমাকে সরকারী মন্ত্রণালয়ের অফিসে মিটিং-এ যেতে হল। আমার অফিস থেকে মন্ত্রণালয়ের দূরত্ব খুব একটা বেশী নয়। কিন্তু বিধি বাম। সরকারী অফিসের কাছাকাছি আসতেই একটা বিকট আওয়াজ শুনে টের পেলাম আমার গাড়ীর টায়ারে হাওয়া নেই। পাংচার! তাড়াতাড়ি রাস্তার পাশে গাড়ী থামালাম। বাইরের তাপমাত্রা তখন ৫০ ডিগ্রীর উপরে। এখানে সিডনীর মত রোড সার্ভিস নেই যে সাহায্যের জন্য ডাকবো। আমার গলায় টাই ও গায়ে কোট, হাতে ল্যাপটপ আর দুটি বিশাল আকৃতির অফিস ফোল্ডার। সবকিছু হাতে নিয়ে অবশেষে হাঁটতে শুরু করলাম। সমস্যা হল অফিসটার সঠিক স্থানও ঠিক মত জানা ছিলনা। ভেবেছিলাম গাড়ী নিয়ে খুঁজে নেবো। কিন্তু এখন তা পায়ে হেটে করতে হবে ভেবে রীতিমত শঙ্কিত হলাম।
রাস্তায় পথচারীরাও ঠিকানা বলতে পারছিলনা। এভাবে বহুক্ষণ হাঁটার পর মনে হল বোধহয় আমি জ্ঞান হারাবো। উপায়ন্তর না দেখে তাড়াতাড়ি রাস্তার ধারে এক গাড়ীর ডিলারের দোকানে ঢুকে পড়লাম আর ওদের কাছে পানি চাইলাম। আমার অবস্থা দেখে ওরা পানি দিয়ে বসার জায়গা দিল। পানি খেয়ে ওদের দিক নির্দেশনা নিয়ে আবার রওয়ানা দিলাম। আরো ২০ মিনিট হেঁটে অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছলাম। কাতারে এটাই ছিল অফিসের বাইরে আমার প্রথম মিটিং। কিন্তু সেটাও মিস করলাম। নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা পরে পৌঁছে দেখি ওরা মিটিং বাতিল করে দিয়েছে। তবে আমার রক্তাভ চেহারা দেখে ও পুরো ব্যাপারটা জানার পর আমার জন্য কিছুটা সহানুভূতিও প্রকাশ করল।
দোহা শহরে পা রাখার পর থেকেই দেখছি ভাঙা-গড়ার খেলা। দুই দিন আগে রাস্তার মোড়ে যে দালানটি দেখলাম, আজ দেখি সেটা নেই। বুলডোজার দিয়ে উপড়ে ফেলা হয়েছে, তোলা হচ্ছে আকাশছোঁয়া স্কাই-স্ক্রেপার। প্রায় প্রতিটি রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে চলছে খোঁড়াখুঁড়ির কারবার, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন হাইওয়ে, ফ্লাইওভার। রং বদলের রংমাখা দোহার নিত্যনতুন সাজ দেখে মনে হয়, এ কি দুই বছর আগে দেখা দোহা নাকি অন্য কোনো শহর!
পঞ্চাশের দশকের একটি ঘুমন্ত জেলেপাড়া দোহা, আজ প্রায় ১০ লাখ মানুষের আধুনিক শহর, বিশে^র সেরা শহরগুলোর একটি হওয়ার নেশায় ছুটে চলেছে ক্লান্তিহীন গতিতে। কাতার আজ বিশে^র অন্যতম ধনী দেশ। দুবাই ক্রাশের পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতির যখন নড়বড়ে অবস্থা, তখন কাতার হুমড়ি খেয়ে পড়েনি। দেশের অবকাঠামোর উন্নয়ন, বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট সেক্টরে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করার ফলে কাতার বিশ^ অর্থনৈতিক মন্দার কালো গহ্বর থেকে মোটামুটি অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসে।
এ বছর কাতারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৯ শতাংশেরও বেশি। আর মাথাপিছু আয় প্রায় ৭০ হাজার আমেরিকান ডলার, যা বিশে^র দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কাতারের অর্থনীতির এই ঊর্ধ্বগতির মূল উৎস হলো প্রাকৃতিক গ্যাস (খঘএ)। শুধু তা-ই নয়, সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আরব দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশ হলো কাতার। ২০১০ সালের বিশ^ শান্তি সূচকের (এচও) র্যাঙ্কিংয়ে ১৪৯ দেশের মধ্যে কাতারের স্থান ১৫। সবার শেষে রয়েছে ইরাক, ইসরায়েল ও আফগানিস্তান। বাংলাদেশের স্থান ৮৭, আমেরিকা ৮৫ ও সৌদি আরব ১০৭। রাজনৈতিক স্থিতি, অপরাধ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপসহ আরও বেশ কিছু কারণের ভিত্তিতে এই সূচক মাপা হয়েছে। তবে ২০০৭ সালের ৩০তম অবস্থান থেকে মাত্র তিন বছরের মাথায় কাতারের পনেরো ধাপ এগিয়ে যাওয়াটা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
কাতারে শান্তির সুবাতাস বইলে কী হবে, দোহার রাস্তায় সেই স্বস্তির দেখা পেলাম না। সিডনি থেকে দোহার রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে রীতিমতো ঘাবড়ে গেলাম। উন্নত দেশের আদলে তৈরি করা হয়েছে কাতারের পথঘাট অথচ ট্রাফিক আইনের প্রতি কারও তেমন শ্রদ্ধা আছে বলে মনে হলো না।
গাড়িচালকদের যথেচ্ছাচারের মধ্যে রয়েছে লেনের মধ্যে গাড়ি না রাখা, হঠাৎ করে সংকেত ছাড়া গা ঘেঁষে লেন বদলে ফেলা, ফুটপাতের ওপর দিয়ে এসে কিউ জাম্পিং, টেইলগেটিং ইত্যাদি। কারণে অকারণে হর্ন ও হাইবিম দেওয়ার বাতিক দেখলাম সবার মধ্যে। বিশেষ করে, রাতের বেলায় পেছন দিক থেকে হাইবিম দেওয়ার ফলে চোখ ধাঁধিয়ে গিয়ে অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে এখানে। সিটবেল্ট না লাগিয়ে মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালানো খুবই স্বাভাবিক এখানে।
তবে দোহার ড্রাইভারদের আরও কিছু ভয়ংকর বদভ্যাসের কথা না বলে পারছি না। যেমন কোলের মধ্যে শিশুসন্তানকে বসিয়ে বাবার গাড়ি চালানো, মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা পড়তে পড়তে স্টিয়ারিং হুইল নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদি। তবে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছি কাঁচি দিয়ে নাসিকার কেশ কর্তন করতে করতে একজন দোহাবাসীকে নির্বিকার ভঙ্গিতে গাড়ি চালাতে দেখে।
দোহার রাস্তায় যেসব গাড়িচালক দেখেছি, তার মধ্যে কেবল দুটি দলের কথাই উল্লেখ করবো। প্রথম দলটি রাস্তায় গাড়ি চালানোর নিয়মকানুন সম্পর্কে পুরোপুরিই অজ্ঞ। দেখে মনে হয়, তারা আগে কখনো গাড়িতে পা দেননি। দ্বিতীয় দলটি উদ্ধত ও অহংকারী, নিজেদের আইন-কানুনের ঊর্ধ্বে মনে করে থাকে।
পৃথিবীর সব দেশের গাড়িচালকদের মধ্যে সুযোগ সাপেক্ষে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা দেখা যায়। সিডনিতেও তাই দেখেছি। কিন্তু ওসব দেশে পুলিশ খুবই সচেতন বলে মানুষ নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য হয়। কারণ তারা জানে, নিয়ম ভাঙলে দেশের প্রধানমন্ত্রীরও রক্ষে নেই। শুধু আইন থাকলেই হবে না, সেটার বলিষ্ঠ প্রয়োগ করতে হবে। দোহার রাস্তায় পুলিশের গাড়ি দেখা যায় অনেক কিন্তু পুলিশকে মূলত সিগন্যালে গাড়ি নিয়ন্ত্রণেই বেশি ব্যস্ত দেখি।
দোহার ট্রাফিক জরিমানা পশ্চিমা দেশের তুলনায় অনেক অনেক বেশি মনে হলো। যার শুরুই হলো ৫০০ রিয়াল থেকে। আর ট্রাফিক সিগন্যালের লালবাতিতে আপনার গাড়ি ক্যামেরাবন্দী হলে দিতে হবে ৬ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার রিয়াল! অস্ট্রেলিয়ান ডলারে দুই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার ডলার জরিমানার কথা শুনে তো আমার আক্কেলগুড়ুম হওয়ার দশা। জানতে পারলাম, ট্রাফিক সিগন্যালে কাতারিদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো রোধ করতেই এই আকাশচুম্বী জরিমানা। কিন্তু অনেক সময় নিম্ন আয়ের প্রবাসী কর্মচারীরা কোম্পানির গাড়ি নিয়ে তাড়াহুড়ো করে চলতে গিয়ে বিশাল অঙ্কের জরিমানায় ফেঁসে যায়। জরিমানার টাকা কর্মচারীর বেতন থেকে পর্যায়ক্রমে কেটে রাখে কোম্পানি। এ দেশে প্রবাসীদের দুর্দশার যেন কোনো সীমা নেই।
জুলাই, ২০১০
