নতুন বছর ২০২০ সালের শুরু হয়েছে। পুরো পরিবার সহ সিডনী যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। জানুয়ারীর ১৫ তারিখ ফ্লাইট। কাতারে প্রায় দীর্ঘ একযুগ পর কাটানোর অস্ট্রেলিয়ার ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। এবারের যাত্রায় পরিবার থেকে যাবে সিডনীতে। আর বছরের মাঝামাঝি কোনো এক সময় আমিও ফিরে যাবো অস্ট্র্রেলিয়া।

জানুয়ারির ৫ তারিখ চীনের উহান শহরে কোভিড-১৯ নামে করোনাভাইরাস সংক্রমনের খবর পেলাম সংবাদ মাধ্যমে। বিষয়টাকে তেমন কোনো বিশেষ গুরুত্ব দেইনি আমরা। বার্ড ফ্লু, সার্স কিংবা মার্স ভাইরাসের মত কিছু একটা হবে হয়তো। কিন্তু এই ভাইরাস যে ধীরে ধীরে সমগ্র বিশ্বকে গিলে খাবে কিংবা বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নেবে, তেমন ভাবনা কারো মাথায় তখনো আসেনি। যথারীতি কাতার এয়ারওয়েজে চড়ে সিডনীতে গিয়ে পৌছলাম। ব্যস্ততায় কাটছিল দিন।

এরই মধ্যে জানুয়ারীর ২৫ তারিখ অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যে, চীনের উহান ফেরত একজন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকের দেহে করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। তবে ভাইরাস নিয়ে তখনো কোথাও অস্থিরতা কিংবা শঙ্কা চোখে পড়েনি। রাস্তায় বেরুলে দু’একজনের মুখে মাস্ক চোখে পড়ছিল, এই যা।
ফেব্রুয়ারীর মাঝামঝি কাতার ফিরে আসলাম। সবকিছুু চলছিল আগের মতই। কিন্তু ২৯ ফেব্রুয়ারী ইরান ফেরত একজন কাতারী নাগরিকের দেহে করোনাভাইরাস সনাক্ত হবার পর বদলে গেলো নিয়মের পৃথিবী, আমাদের চারপাশ। মার্চ মাসের মাঝামাঝি কাতারমুখী সব ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়ে পুরোপুরি লক ডাইনে চলে যায় কাতার।

এদিকে আমার অফিসে হাতে গোনা কয়েকজনকে রেখে বাকী সবাইকে বাড়ী থেকে কাজ করার নির্দেশ দেয়া হল। এভাবে বাড়ীর চার দেয়ালের মধ্যে শুরু হল আমার অবরুদ্ধ জীবন। এপ্রিলে করোনাভাইরাসের তান্ডব শুরু হয় কাতারে। বাংলাদেশ কমিউনিটির বহু পরিচিত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছিলেন। অনেকের মর্মান্তিক মৃত্যু সংবাদও পাচ্ছিলাম। এদিকে সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় পরিবারের সুরক্ষার কথা ভেবে উৎকন্ঠায় কাটছিল প্রতিটি মুহূর্ত। সে এক দুর্বিসহ দিনকাল।

অবশেষে করোনাভাইরাস মহামারীতে আক্রান্ত হয় গোটা বিশ্ব। দ্রুত বদলে যাচ্ছে আমাদের চেনা পৃথিবী, বদলে যাচ্ছে আমাদের দৈনিন্দন জীবনের দৃশ্যপট। মুখোশের অন্তরালে চলে গেছে আমাদের পরিচিত পৃথিবী। মনে হচ্ছে, আমাদের শহরগুলো দখল করে নিয়েছে ভিনগ্রহের মুখোশধারী কিছু প্রাণী। বিশ্বব্যাপী প্লেগ, মহামারীর কথা এতোদিন শুনেছি, পড়েছি বইয়ের পাতায়। এবার আমরা সবাই করোনা সন্ত্রাশের জিম্মী হয়ে কাটাচ্ছি দিন।

 

২৩/০২/২০২০
আজ সকালে অফিসে গিয়ে আবার বাসায় ফিরতে হয়েছে। সরকারী নির্দেশে পঞ্চান্নোর্ধ কর্মচারীদের বাড়ী থেকে কাজ করতে বলা হচ্ছে। অফিসের সব টি-বয় ছুটিতে। কিচেন বন্ধ। ফ্লাস্কে করে কাড়াক চা বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেটাও খাওয়া হয়নি। বাড়ীতে self-quarantine-এ রয়েছি। মাস্ক, আর হাতে গ্লাভস পড়ে বের হই। গ্রোসারী দোকান ছাড়া আর কোথাও যাওয়া হয়না।

কাতারে সব স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দুরবর্তীভাবে পাঠ দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে যাদের পরীক্ষা রয়েছে তাদের ফুল মার্কস দেয়া হবে বলে জানিয়েছে শিক্ষা অধিদপ্তর। অস্ট্রেলিয়ায় প্রাইমারী, হাইস্কুলগুলো কেনো যে এখনো খোলা তা মাথায় ধরছেনা। সিডনীতে আমার স্কুল পড়ুয়া মেয়ের কথা ভেবে বুকের ভেতরটা হীম হয়ে আসছে।

কাতারে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েইে চলেছে। কাতার অভিমুখী সব ফ্লাইট বন্ধ। শুধু কি তাই? হেলথ সেন্টারে ডাক্তারের সাথে সব অ্যাপয়েনমেন্ট/অপারেশন বাতিল। টেলিফোনেই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ সারতে হচ্ছে।

সব ধরণের গনজমায়তে বন্ধ। কিন্তু কাতারের বিভিন্ন শ্রমিক ক্যাম্পে/কম্পাউন্ডে ঠাসাঠাসি করে বাস করছে হাজারো লক্ষ শ্রমিক। বাস ভর্তি শ্রমিকদের দেখছি কাজে যেতে। ওদের কি হবে?

 

২০/০৩/২০
আবারও অবরুদ্ধ কাতার! কাতার জুড়ে আরেপিত হয়েছে লকডাউন। আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে প্রতিবেশী চারটি দেশ কাতারের উপর আরোপ করেছিল পূর্ণ অবরোধ। তবে এবারের অবরোধের সাথে পার্থক্য হচ্ছে করোনাভাইরাসের ভয়াল আক্রমন মোকাবেলা করতে বিশ্বের অন্যান্য বহু দেশের মত কাতার স্বেচ্ছায় এই পথ বেছে নিয়েছে।

আজকের হিসাব অনুযায়ী কাতারে করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪৬০। এদিকে প্রবাসী কয়েকজন শ্রমজীবির শরীরে করোনা সনাক্ত হবার পর সবার মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ বিষয়ে আরব অঞ্চলের সরকারগুলো খবর চেপে না রেখে যে ধরণের স্বচ্ছতা প্রদর্শন করছে, দৈনিক কতজন সংক্রমিত হচ্ছে তার হিসাব দিচ্ছে, তা দেখে রীতিমত বিস্মিত হয়েছি।

কাতারের নির্মাণ খাতে কাজ করছে লাখো শ্রমিক। এছাড়া এখানকার বাড়ী বাড়ী রয়েছে অসংখ্য পরিচারিকা, কাজের মানুষ ও ড্রাইভার। অনেক কাতারীতো নিজের হাতে পানি তুলেও খায়না। সবখানেই কাজ করছে হাজারো সেবক/সেবিকা। যেমন পট্রোল পাম্পগুলোতে শীত-গ্রীষ্ম বলে কথা নয়, সবাই গাড়ীতে ইঞ্জিন চালিয়ে বসে থাকে। গাড়ীর ট্যাংকে তেল ভরে দেয় পেট্রোল সেবকের দল। এসব নিম্ন আয়ের শ্রমজীবিরা বাস করে বিভিন্ন ক্যাম্পে। ক্যাম্পের কোনো কোনো রুমে ঠাসাঠাসি করে তাকে ৬/৭ মন মানুষ। সব ধরণের গন জমায়েত বন্ধ হলেও এইসব ক্যাম্প বসবাসরত শ্রমিকরা রয়েছেন ভীষণ ঝুঁকিতে।

কাতারে কর্মরত শ্রমকিদের একটি বিরাট অংশ বসবাস করে দোহা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া বা সানাইয়া এলাকায়। এই এলাকার সব সড়ক বন্ধ করে দিয়ে সবাইকে বিশেষ নজরদারীতে রাখা হয়েছে। শ্রমিক ক্যাম্পগুলোতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাস্তায় টহল দিচ্ছে অত্যাধুনিক এম্বুলেন্স। খোলা হয়েছে ৭ টি ভাষায় কথা বলার মতো হটলাইন। দোহা মেট্রোসহ সব গনপরিবহন বন্ধ। পুরো কাতারজুড়ে সব ধরনের হোটেল রেস্টুরেন্টে এখন কেবল পার্সেলে খাবার বিক্রি হচ্ছে, গ্রাহকদের বসিয়ে খাওয়াতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

খুব ছোট্ট একটি দেশ হলেও বিপর্যয় মোকাবেলায় কাতারের নীতি নির্ধারকরা বেশ পরিপক্কতা এবং দূরদর্শিতার পরিচয় দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হবার পর কাতার সময় অপচয় না করে তড়িৎ পদক্ষেপ নিয়েছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমন ঠেকাতে সাথে সাথে ১৫টি দেশে থেকে আকাশ পথে যাত্রী আগমন নিষিদ্ধ করা হয়। এখন পুরো দেশটাকেই লকডাউন করা হয়েছে।

অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে প্রাইভেট সেক্টরে ২৫ বিলিয়ন ডলার ঢালছে কাতার সরকার। আতিথেয়তা, পর্যটন, খুচরা খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে ভাড়া মওকুফ, ব্যংক লোনের কিস্তি স্থগিত সহ ছয় মাসের জন্য বিদ্যুৎ ও পানির বিলের অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় টিস্যু রোল কেনার জন্য বাজারে ক্রেতাদের হুড়োহুড়ি বিশ্বের দৃষ্টি আর্কষণ করেছে। প্রবাসে টিভির পর্দায় এসব দেখে বেশ বিব্রত হয়েছি। কাতারে এ ধরণের অনাহুত ঘঠনা যাতে না ঘটে সেজন্য সেনিটাইজারের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার।

কাতারের সপিং সেন্টারগুলোতে এখনো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েনি। আগামী ৬ মাস সকল ধরনের খাদ্যপন্য আমদানির উপর সরকারী শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে। এই কৌশলগত পদক্ষেপ খাদ্য ঘাটি মোকাবলোয় সহায়ক হবে। এছাড়া শুল্ক মওকুফের ফলে জনগণ যাতে সুলভ মূল্যে দ্রব্যসামগী কিনতে পারে সেটাও নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে সরকার। কাতারে এখন স্থানীয়ভাবে বহু ধরনের খাদ্য সামগ্রী উৎপন্ন হচ্ছে। তাই খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলা করতে কাতারের সক্ষমতা আগের চেয়ে এখন অনেক বেশী।

দোহা শহরের সবচেয়ে আকর্ষণ হচ্ছে মুশাইরিব এলাকার ঐতিহাসিক বাজার “সুক ওয়াকিফ”। যাকে আমি দোহার “টাইম স্কয়ার” বলে থাকি। বিকেল হতেই সুকের গলিতে দোকানে, রেস্তোরাঁর উপচে পড়ে ক্রেতার ভীড়। সিসার রমরমা সুগন্ধে মাতোয়ার হয়ে ওঠে চারপাশ। কিন্তু সেই সুক ওয়াকিফ এমনকি সাপ্তাহিক বন্ধের দিনেও প্রয়ান্ধাকার নিঝুমপরী। ঐতিহ্যবাসী ফার্নিচার মার্কেট সুক হারিজ ও সপিং মল সিটি সেন্টারেও এখন সুনসান নিরবতা। যা দেখে চমকে উঠেছি, ব্যথিত হয়েছি।

নিষেধাজ্ঞার কারণে কাতারের অন্যান্য এলাকায় জনসমাগম কমে গেলেও বাংলাদেশি অধ্যুষিত কিছু এলাকার চিত্র এখনো বদলায়নি। করোনা ভাইরাসের কথা ভুলে এখনো বাংলাদেশিরা রাস্তায়, রেস্তোরাঁর সামনে আড্ডা দিচ্ছে। স্বস্থ্য সচেতনতার অভাব এবং দেশে বিদেশে বাংলাদেশিদের নিয়ম অগ্রাহ্য করার প্রবনতা দেখে সত্যিই দুঃখ হয়।

কিন্তু সর্বোপরি কাতারি নাগরিক ও নানা দেশের অভিবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাতারের আন্তরিকতা ও ছাড় না দেয়ার মনোবৃত্তি সত্যিই প্রশংসনীয়। যার একটি নমুনা হল পেট্রাল স্টেশনে যাতে নগদ কিংবা কার্ডে টাকা দিতে না হয় সেজন্য জনসবাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে গাড়ীতে প্রিপেইড মাইক্রোচিপ্স লাগিয়ে ঘরে বসেই পেট্রোল কেনার ব্যবস্থা করেছে কাতার।

 

২২/০৩/২০
আমাদের বড় বড় নির্ঘুম শহরগুলোকে করোনা যখন নিরব নিথর মৃত্যুপুরী বানাতে চলেছে, তখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কিছু গবেষকের দল করোনা প্রতিষেধক তৈরী চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিরলস কাজ করে চলেছেন।

করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেবার পর বিশ্বব্যাপী প্রতি মূহুর্তে দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। এ যেন সময়ের সাথে পাল্লা দেয়ার যুদ্ধ। আরেকটি মানুষ লাশ হবার আগে বের করতে হবে প্রতিষেধক। ভেঙ্গে দিতে হবে করোনার বিষদাঁত।

আশার কথা হল পরীক্ষা-নিরীক্ষার কিছু ধাপ বাকী থাকলেও করোনার প্রতিষেধক খুঁজে পাওয়া গেছে বলে দাবী করেছেন বেশ কিছু গবেষকের দল। সুইজারল্যান্ডের ঔষুধ কোম্পানী রোচে-এর তৈরী বাতের ঔধুষ “অ্যাকটামরা” ফুসফুস থেকে করোনা ভাইরাস সমূলে বিনাশ করতে সক্ষম বলে দাবী করেছে। ইতিমধ্যে চীনের উহানে ভ্যাকসিনটির পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে।

আমেরিকার বায়োটেক কম্পানী মডার্না এবং ন্যাশনাল ইসন্সটিটিউট অফ এলার্জি এন্ড ইনফেকসাচ ডিজিজ (এনআইএআইডি) যৌথ গবেষণার মাধ্যমে তৈরী করেছে “এমআরএনএ-১২৭৩” নামের এটি প্রতিষেধক টিকা। পরীক্ষামূলক প্রথম ডোজ প্রয়োগ করা হয়েছে জেনিফার হ্যালার নামের এক মার্কিন নারীর শরীরে। তবে টিকা কাজ করছে কিনা তা জানতে দুই মাসও লেগে যেতে পারে। পরীক্ষা সফল হলে প্রতিষেধকটি বাজারজাত করা হবে।
ক্যানসাইনো বায়োলজিক্স নামের চীনের একটি প্রতিষ্ঠান চীনা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথ গবেষণার মাধ্যমে তৈরি করেছে একটি প্রতিষেধক। অসুস্থ রোগী নয় এমন ১০৮ স্বেচ্ছাসেবীর দেহে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করা হবে।

নতুন ধরনের ডিএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইনোভিয়ো-এর সানিডয়াগো ল্যাবরেটরিতে ‘আইএনও-৪৮০০’ নামের করোনভাইরাসের একটি প্রতিষেধক তৈরা করা হচ্ছে। আগামী জুনের মধ্যে এটি মানব দেহে প্রয়োগ করা হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

এদিকে অস্ট্রেলিয়ার গবেষকরাও পিছিয়ে নেই। কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানীরা করোনা ভাইরাস নির্মূলে দুটো প্রতিষেধক পেয়েছেন বলে দাবী করেছেন। এ দু’টির মধ্যে একটি হচ্ছে পুরনো এইচআইভির ওষুধ আর অন্যটি ম্যালেরিয়ার চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হতো। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের উপর দুটি ওষুধ খুব ভালো কাজ করেছে বলে জানিয়েছেন কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। অস্ট্রেলিয়ার ৫০টি হাসপাতালে এগুলোর পরীক্ষা চালানো হবে।

চীন জানাচ্ছে, ফ্যাভিপিরাভির নামের জাপানের তৈরী একটি ঔষুধ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমানিত হয়েছে। চিনের সর্বাধিক করোনা প্রভাবিত উহান এবং শেনঝেন প্রদেশে একটি হাসপাতালে ৩৪০ জন রোগীর উপরে এই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছিল।

এদিকে ‘ইন্টারফেরন আলফা টু-বি’ নামে পরিচিত কিউবার একটি ওষুধ কোভিড-১৯ সারাবার ক্ষেত্রে অসাধারণ ফলাফল দিচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। মিডল ইস্ট নর্থ আফ্রিকা ফিনান্সিয়াল নেটওয়ার্ক ও মিন্ট প্রেস নিউজ জানাচ্ছে এটি ব্যবহার করে চীনে দেড় হাজারের বেশী রোগী করোনা মুক্ত হয়েছেন। এরপর থেকে সারা বিশ্ব থেকে ঔধুধ কেনার ফরমাশ পাচ্ছে কিউবা। এরমধ্যে ‘ইন্টারফেরন আলফা টু-বি’র একটি চালান কিউবা ইতালিতে পাঠিয়েছে।

ইবোলা, জিকা, মার্স-এর মতো ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরী করতে গবেষকদের কয়েক বছর লেগে গিয়েছিল। ফলে প্রতিষেধকের অভাবে মারা যায় হাজারো মানুষ। কিন্তু এবার বুদ্ধিমত্তার সাথে চীনা কর্তৃপক্ষ করোনা ভাইরাসের জেনেটিক কোড বিশ্বকে জানিয়ে দেয়ায় ফলে প্রতিষেধক তৈরী কাজ ত্বরান্বিত হয়েছে। আমেরিকান কোম্পানী মডার্না জেনেটিক কোড পাবার মাত্র ৪২ দিনের মধ্যে তৈরী করেছে করোনা প্রতিষেধক। আশা করছি, খুব সহসা বাজারে আসবে করোনো প্রতিষেধক টিকা। নির্মূল হবে করোনা আতঙ্ক, মৃত্যুর করাল থাবা থেকে রক্ষা পাবে হাজারো প্রান।

যদিও এখন অনেক বিশ্বসেরা ল্যাব থেকে শোনা যাচ্ছে যে করোনা ভ্যাকসিন খুব একটা দূরে নয়, তবে মনে হচ্ছে আমাদের করোনার সাথেই বসবাস করতে হবে। ৩০ বছর পরও এইডস-এর ভ্যাকসিন এখনো বের হয়নি। তেমনি ৭৭ বছর পর ডেঙ্গুর ভেকসিন অনুমোদন পেয়েছে গতবছর। এখনো বহু ভাইরাসের কোনো ভ্যাকসিন মানুষ বের করতে পারেনি। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ভাইরাস যেভাবে মিউিটেশন করে রূপ বদলায় তাতে অল প্রুফ কার্যকর ভ্যাকসিন বের করা সম্ভব হয়নি। এজন্য ইনফ্লুয়েঞ্জার ভ্যাকসিন প্রতি বছর নতুর করে বানাতে হয়। এইডস-এর ভ্যাকসিন বের হতে এতো দেরী হবারও এটা অন্যতম কারন। এছাড়া সার্স এবং মার্সের ভেকসিন নিয়ে গবেষনা করতে গিয়ে দেখা গেছে, কোনো সময় ভেকসিনের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। এজন্য ভেকসিন বের করতে এতো সময় লেগে যায়।

 

২৬/০৩/২০
হাত পরিস্কারের জন্য আগে সাবান-পানিই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। অবশ্য করোনা সন্ত্রাশে মোকাবলো করতে এখনও তাই । কিন্তু বাড়ীর বাইরে সব জায়গাতে সাবান-পানি পাবেন কোথায়? এজন্যই বিশ্ব^জুড়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের জন্য চলছে ক্রেজ এবং হাহাকার।

১৯৬৬ সালে আমেরিকার বেকার্সফিল্ড শহরে নার্সিংয়ের ছাত্রী ছিলেন লুপি হার্নান্ডেজ। তিনি ভাবলেন সাবান-পানি না থাকলে বিকল্প হিসাবে অ্যালকোহর ব্যবহার করলে কেমন হয়? তাও যদি থকথকে জেলের মতো হয়? এভাবেই তৈরী হয় অদৃশ্য জীবাণু দানব মারার মোক্ষম অস্ত্র হ্যান্ড স্যানিটাইজার।

শুরুতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার হাসপাতালে, ক্লিনিকে ব্যবহৃত হত। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এর প্রচলন শুরু হয়। বিশেষ করে মহিলাদের হ্যান্ডব্যাগেতো এটা থাকবেই। কিন্তু ৫৪ বছর আগে যার মস্তিষ্কপ্রসূত আবিস্কার এই হ্যান্ড স্যানিটাইজার, তার কথা কি কেউ মনে রাখে?

 

২৭/০৩/২০
করোনা ভাইরাসের সংক্রমন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কাতার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি প্রতিদিনই বিস্তর বিধি-নিষেধ জারী করে চলেছে। যেমন এখন থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত খাবারের দোকান, ফার্মেসী এবং হোম ডেলিভারী ছাড়া সব দোকানপাট বন্ধ থাকবে। এছাড়া হোটেলের সামনে, রাস্তার পাশে, পার্কে কিংবা কোনো খোলা জায়গায় এখন দু’জন দাঁড়িয়ে কথা বলা যাবেনা।

কাতারে করোনা আক্রান্তের বিষয় গোপন করলে কিংবা রিপোর্ট না করলে ২ লাখ রিয়াল জরিমানা এবং তিন বছরের কারাদন্ডের মত কঠিন সাজা দেয়া হবে। উপরোন্তু, সংস্কৃতি ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কিউএফএম ৯৫.৩ ব্যান্ডে এখন করোনাভাইরাস সংক্রান্ত সচেতনামূলক প্রচারনা বাংলায় প্রচার করা হচ্ছে। ফলে কাতারের প্রবাসী বাংলাদেশিরা সরকারের হালনাগাদ কর্মসূচী ও বিধিনিষেধ সম্পর্কিত তথ্য নিয়মিত জানতে পারছেন।

কাতারের শিল্প এলাকা বা সানাইয়া লকডাউন করা হয়েছে প্রায় এক সপ্তাহ হতে চলল। করোনাভাইরাস সংক্রমন রোধে দুই সপ্তাহের জন্য সানাইয়ার ১ থেকে ৩২ নম্বর সড়ক পর্যন্ত এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। কাতারের বিভিন্ন নির্মান প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশি সহ অন্যান্য দেশের হাজারো শ্রমিক এই শিল্প এলাকার ক্যাম্পে বাস করছেন। কাতারে এ পর্যন্ত যতজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই থাকেন ওই শিল্প এলাকায়। তবে ওই এলাকার অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য কাতার সরকার বিভিন্ন কমিউনটি সংগঠনের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। চিকিৎসক ও মেডিক্যাল টিম লকডাইন এলাকার অভিবাসীদের নিয়মিত পরীক্ষা করছেন। প্রয়োজনে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। তবে খাদ্যের চাহিদা বহুগুনে বেড়ে যাওয়ায় এখন সানাইয়ার লকড ডাউন এলাকার দোকানগুলোতে খাবারের মজুদ নিশ্চিত করা হয়েছে এবং নির্ধারিত মূল্যে খাদ্য সামগ্রী পাওয়া যাবে।

গত ২৯ ফেব্রুয়ারী প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হবার পর সময় অপচয় না করে করোনা সংক্রমনরোধে কাতার তড়িৎ পদক্ষেপ নিয়েছে। খুব ছোট্ট একটি দেশ হলেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কাতারের নীতি নির্ধারকরা বেশ পরিপক্কতা এবং দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, যেকোনো ভাইরাস সংক্রমন রোধ করার জন্য কার্যকর শনাক্তরণ প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা রাখে। এজন্য কাতারে ব্যাপক হারে করোনা টেস্ট করা হয়েছে। জনসংখ্যার অনুপাতে যার পরিমাণ উপমাহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বহুগুন বেশী।

 

৩০/০৩/২০০
সম্প্রতি আমেরিকার অ্যাবট ল্যাবরেটরীস একটি টেস্ট কিট তৈরী করেছে যা দিয়ে মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে দেহে করোনাভাইরাসের সংক্রমন শনাক্ত করা যাবে। এই পদ্ধতিতে প্রথমে নাক কিংবা গলা থেকে নেয়া সদির্র স্যাম্পলের সাথে একটি বিশেষ ক্যামিকেলের বিক্রিয়া ঘটিয়ে ভাইরাসের শরীর থেকে আরএনএ আলাদা করা হয়। এরপর মিশ্রনটি টেস্ট কিটে দিয়ে করোনাভাইরাসের এবহড়সব ( জেনিটিক তথ্য) শনাক্ত করা হয়। ফলে কভিড-১৯ ছাড়া অন্য কোনো ভাইরাস থেকে দূষণের সম্ভাবনা থাকেনা।

করোনাভাইরাস শনাক্তে ব্যবহৃত স্ট্যানডার্ড পদ্ধতি হচ্ছে পিসিআর টেস্ট যা ব্যয়বহুল এবং সময় সাপেক্ষ। শরীরে ভাইরাস থাকলে এই টেস্ট করা হয়, এটা দিয়ে ভাইরাস সনাক্ত করা যায়, শরীর ভাইরাস মুক্ত হলে এই টেস্ট কাজ করেনা। শরীরে ভাইরাস সংক্রমণের প্রায় সাথে সাথেই এই টেস্ট পজিটিভ হয় এবং পজিটিভ থাকে যতদিন শরীরে ভাইরাস থাকে। তবে ডট ব্লট পদ্ধতি সরাসরি ভাইরাস শনাক্ত না করে এন্টিবডির উপর কাজ করে বলে এই প্রক্রিয়ার কিছুু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অ্যাবট টেস্ট কিটটি আকারে ছোটো, হালকা এবং যে কোনো জায়গায় ব্যবহার করা সম্ভব। এপ্রিলের প্রথম দিকেই এটা বাজারে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রতিটি জীবের আলাদা আলাদা জেনিটিক সিকোয়েন্স থাকে যা দিয়ে ওই জীবকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়। যেমন মানুষের ডিএনএ এবং ভাইরাসের ক্ষেত্রে আরএনএ। সরাসরি জিনে হাত দিলে শনাক্তকরণে কোনো সংশয় থাকেনা। অন্যদিকে আমাদের দেহে যখন একটি জীবানু প্রবেশ করে তখন তাকে প্রতিরোধ করার জন্য রক্তের শ্বেতকণিকা এন্টিবডি তৈরী করে। কিন্তু সেটা তাৎক্ষনিক ভাবে হয়না। তিন দিনের মত সময় লাগে। তাই পিসিআর টেস্ট যেমন সংক্রমনের ১ম দিনেই ভাইরাসের উপস্থিতি বলে দিতে পারে কিন্তু ডট ব্লট পদ্ধতিতে এন্টিবডি তৈরী হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এছাড়া দেহে আগে থেকে অন্য কোনো ভাইরাস থেকে থাকলেও এন্টিবডি তৈরী হতে পারে। তাই টেস্ট করার সময়কাল, দেহে অন্য কিছুুর উপস্থিতি, দেহের রোগ-প্রতিরোধক ব্যবস্থার (immune system) সক্ষমতা, এন্টিজেনের প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি ডট ব্লট পদ্ধতিকে প্রভাবিত হতে পারে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রোগ থাকা সত্ত্বেও নেগেটিভ ফলাফল (false negative) কিংবা রোগ না থাকা সত্ত্বেও পজিটিভ (false positive) ফলাফল দিতে পারে।

১০/০৪/২০
অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার জন্য ১০০০ ডলার জরিমানা গুনে পদত্যাগ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের শিল্পকলা মন্ত্রী ডন হারউইন। যদিও রাজ্যে এই আইন বলবৎ হবার আগেই তিনি এই ভ্রমন করেছিলেন বলে দাবী করেছিলেন।

সোস্যাল মিডিয়া পাতায় অনেক প্রবাসী বন্ধুরা আক্ষেপ করে লিখছেন, বাংলাদেশে কেনো এমন হয়না? জানতে ইচ্ছে করে, প্রবাসীদের কাউকে নিয়ে গিয়ে যদি মন্ত্রী বানানো হয়, তখন সময় এলে তিনি কি অষ্ট্রেলিয়ার মন্ত্রীটির মত আচরণ করতে পারবেন?

প্রবাসে বাংলাদেশ কমিউনিটির সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর পদের জন্য লড়াই ও বিভক্তি, যে কোনো মূল্যে পদ ধরে রাখার যে সংগ্রাম দেখে আসছি, তাতে কি এমনটা আশা করা যায় ?

 

১৫/০৪/২০
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে দেয়া আর্থিক অনুদান আচমকা বন্ধ করে দিল আমেরিকা। করোনা ক্রান্তিকালে অন্তত এমনটা আশা করেনি কেউ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের ব্যর্থতা ঢাকবার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে যে বলির পাঁঠা বানিয়েছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিরুদ্ধে আমেরিকা কিছ’ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, যেগুলোর কথা না বললেই নয়। যেমনঃ

১. চীনের উহানে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের খবর আসে গত বছরের ডিসেম্বরে। এই ভাইরাস একজনের শরীর থেকে আরকেজনের শরীরে ছড়ায়না বলে চীনের দেয়া ভুল তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রচার করে। বলেছে এটা কোনো ছোঁয়াচে ভাইরাস নয়, তাই করোনা থেকে আতঙ্কিত হবার কিছু নেই।

২. তাইওয়ান চীনের এই তথ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অবহিত করলেও চীনের চাপে পড়ে তা উপেক্ষা করা হয়। কারন চীন তাইওয়ানকে স্বাধীন রাস্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেয়না, নিজের দেশের অংশ বলে মনে করে।

৩. ঠিক ওই সময় প্রায় ৫ মিলিয়ন মানুষ উহান থেকে সরে পড়ে। চীন এতে কোনো বাধা দেয়নি। এদের মাধ্যমেই করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে বলে আমেরিকার ধারনা। চীন থেকে যেসব যাত্রী বিভিন্ন দেশে যাচ্ছিল, তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যাপারেও যথাযথ নির্দেশনা দেয়নি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

৪. আমেরিকার বিশ্বাস, চীন করোনায় আক্রান্ত রোগী ও মৃতের সঠিক সংখ্যা বলছেনা, কম করে দেখাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনের সরকারী পরিসংখ্যানকে অনুসন্ধান না করে মেনে নিয়েছে। ফলে অনেক দেশে এবং দেশের নাগিরকরা করোনা ভাইরাসকে অন্যান্য কম ক্ষতিকারক ভাইরাসের মত হাল্কা ভাবে নিয়েছে। করোনা ভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নেয়ার এটাও একটা অন্যতম কারণ বলে ভাবা হচ্ছে।

৫. করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে বৈশ্বিক মহামারী হিসাবে ঘোষনা দিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনেক দেরী করে ফেলেছে।

তবে সবচেয়ে অদ্ভ’ত ব্যাপার হচ্ছে চীনের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে কাঠগড়ায় তুলেছেন ট্রাম্প অথচ গত ফেব্রুয়ারীতে টুইটারে করোনা বিস্তার ঠেকাতে চীনের আন্তরিক প্রচেষ্টার জন্য প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর প্রশংসায় ছিলেন পঞ্চমুখ। অবশ্য এধরনের দ্বিচারিতা একমাত্র ট্রাম্পের পক্ষেই সম্ভব। এছাড়া তাইওয়ান নিয়ে চীন ও আমেরিকার মধ্যে চলমান দ্বন্দ ও রাজনীতিও ট্রাম্পকে ইন্ধন জুগিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

তবে অপ্রিয় হলেও যে কথা সত্য তা হচ্ছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাজেটের ১৫% শতাংশ আসে আমেরিকার কোষাগার থেকে। যার পরিমান হচ্ছে বছরে ৪০০-৫০০ কোটি ডলার! অন্যদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি হয়েও চীন দিচ্ছে মাত্র ৪০ মিলিয়ন ডলার। এই অসাম্য ব্যবসায়ী ট্রাম্পকে খাপ্পা করে তোলারও একটি অন্যতম কারণ। চীন যদি সত্যিই বিশ্বের আমজনতার কথা ভাবে তাহলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জন্য তাদের আর্থিক অনুদান এখনই বাড়ানো উচিত।

 

২৫/০৪/২০
করোনা যুদ্ধে নারী সেনাপতিরা এগিয়েঃ বিশ্বের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানদের মাত্র ৬.৬ শতাংশ নারী হলেও বর্র্তমান করোনা সংকট মোকাবেলায় পুরুষদেও চেয়ে বহুগুন বেশী দক্ষতা দেখাচ্ছেন নারীরা।

প্রায় ২.৪ কোটি জনসংখ্যার দেশ তাইওয়ানের কতাই ধরা যাক। এ পর্যন্ত তাইওয়ানে করোনা রোগীর সংখ্যা শ’চারেক আর মৃতের সংখ্যা ৬। অথচ করোনা আগ্রাসী থাবার ফন্টলাইনে রয়েছে তাইওয়ান। গত ডিসেম্বরে উহানে ভাইরাস সংক্রমেরন খবর আসতেই চীন, হংকং এবং ম্যাকাউ থেকে আসা সব ফ্লাইটের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ তাইওয়ান। এভাবে সংক্রমনের গোড়াতেই অবহেলা না করে নারী প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েন আক্রমনাত্মক পদক্ষেপ নিয়ে ভাইরাসের আগ্রাসন রুখে দেন।

নিউজিল্যান্ডের নারী প্রধানমন্ত্রী শুরুতেই বহিরাগতদের আগমন নিষিদ্ধ করে পুরো দেশকে এক-মাসের জন্য লব-ডাউনে পাঠিয়ে দেন। যার সুফল এখন পাচ্ছে নিউজিল্যান্ড। ইউরোপেও দেখা যাচ্ছে নারী শাসিত দেশগুলো ভালো করছে।

অন্যদিকে উহানে করোনা সংক্রমনের পর পরই চীনের প্রসেডিন্ট প্রায় ৫ মিলিয়ন অধিবাসীকে উহান ছেড়ে যেতে দিয়ে সমগ্র বিশ্বকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেন। ইউরোপ এবং আমেরিকায় করোনা বিপর্যয়ের জন্য তাই চীনকে দায়ী করা হচ্ছে।

আমেরিকার প্রিেসডন্ট ট্রাম্প করোনার ভাইরাসকে বিরোধীদের চক্রান্ত বলে আখ্যা দিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কীতরণ উপেক্ষা করে শুরুর দিকে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। এদিকে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ছিলেন আরো একধাপ এগিয়ে। তিনি লক-ডাইন আরোপ করতে প্রথমে অস্বীকৃতি জানান এবং আরও বলেন, করোনা ভাইরাস আছে জেনেও হাসাপাতলের রুগীদের সাথে তিনি করমর্দন করতে দ্বিধা করবেন না।

দক্ষিণ কেরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে কিছু পুরুষ নেতারও সক্ষমতা দেখাচ্ছেন। তবে সংখ্যায় নগণ্য হয়েও বিজ্ঞান-মনষ্ক নারী সরকার প্রধানরা করোনা বিপর্যয় মোকাবেলায় যে ধরণের নৈপুণ্য দেখাচ্ছেন, তাতে পৃথিবীর সুরক্ষার কথা ভেবে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে নারীদের প্রাধান্য দেয়াটা কি খুব একটা বেশী চাওয়া হবে?

 

০৭/০৪/২০২০
ইদানিং সোস্যাল মিডিয়ার পাতা এবং ফেবুর ইনবক্স সয়লাব হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের করোনা সংক্রান্ত পোস্টে। এর মধ্যে সচেতনামূলক পোস্ট নেই যে তা নয়, কিন্তু কোনো রকমের যাচাই-বাছাই না করে পোস্ট পাঠানোর প্রতিযোগীতা দেখে বিস্মিত হচ্ছি। অনেকে ভেবে দেখেন না, এই পোস্টটি যাকে পাঠানো হচ্ছে হয় তার কাছে পোস্টটি বেশ ক’বার গিয়ে থাকবে কিংবা তথ্যটি তার আগে থেকেই জানা ।

যেমন – করোনার গ্যারান্টিযুক্ত ঔষুধ, করোনা ভিক্টিমের ভিডিও false positive, বিশেষ দোয়া যা সাথে সাথে ২০ জনকে না পাঠালে সুখবর আসবেনা, পুরোনো চলচ্চিত্র কিংবা ভিডিও ফুটেজ কাট এন্ড পেস্ট করে করোনার বলে চালিয়ে দেয়া ইত্যাদি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য করোনার গ্রাউন্ড জিরো উহানের চীনা ডাক্তার কিংবা বিজ্ঞানীর নামও জুড়ে দেয়া হচ্ছে।

আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রধান প্রফেসর Charles Lieber-এর গ্রেফতারের খবরকে করোনার সাথে যুক্ত কওে সোস্যার মিডিয়ায় একটি পোস্ট এসেছে বার বার। বলা হচ্ছে, এই প্রফেসরের সহযোগীতায় উহানের ল্যাবে করোনা ভাইরাস তৈরা করা হয়েছে। পোস্টে চীনা বিশেষজ্ঞের উদ্ধৃতি দিয়ে আরো বলা হচ্ছে, গরম পানির বাষ্প নিলে করোনা শতভাগ ভালো হয়ে যাবে।

তার মানে, চীনারা যেহেতু ভাইরাস তৈরী করেছে, তাই তার প্রতিষেধক কি হবে সেটাও তারা জানে। আসলে কি তাই? বলা বাহুল্য, শুধু চীন কেনো? আমেরিকা, রাশিয়া সহ বিশ্বের সব পরাশক্তির ল্যাবেই রয়েছে মারাত্মক রাসায়নিক কিংবা জীবানু অস্ত্র সম্ভার। এছাড়া সর্দি, কাশি কিংবা বুকের কফ দুর করার জন্য গরম পানির বাষ্প নেয়ার কথা মানুষ বহু আগে থেকেই জানে। গরম পানির বাষ্প নিলে কিছুটা উপকার হয়। কিন্তু এতে করোনা ১০০ ভাগ সেরে যাবে তার কোনো সুস্পষ্ট প্রমান নেই।

একথা প্রায় সবারই জানা, আমেরিকা ও উন্নত দেশের প্রযুক্তি অনুকরণ করে কিংবা অনেক সময় চুরি করে নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়েছে চীন। এজন্য আমেরিকার হাইটেক কোম্পানীগুলোর প্রচুর ক্ষতি হচ্ছে বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের কাছে অভিযোগ করে আসছেন। সম্প্রতি চীন ও আমেরিকার মধ্যে বানিজ্য-যুদ্ধ শুরু হবার এটাও একটি অন্যতম কারন।

দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক গবেষণায় সময় এবং অর্থ ব্যয় না করে লাফ দিয়ে সবাইকে ডিঙ্গিয়ে যাবার জন্য চীন একটি বিশেষ কৌশল বা সর্টকাট ব্যবহার করে আসছে। তাহল উন্নত দেশের বিজ্ঞানীদের ব্যবহার করে গোপনে তথ্য উপাত্ত যোগাড় করা। এজন্য চীন বিশ্বের ৪০ জন সেরা বিজ্ঞানী ও গবেষকের তালিকা তৈরী করে তাদের বড় অঙ্কের বেতন, অনুদানের প্রলোভন দেখিয়ে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে আসছে।

রসায়নবিদ্যার বর্তমান সময়ের সেরা বিজ্ঞানী, অত্যন্ত মর্যাদা সম্পন্ন ডড়ষভ চৎরুব বিজয়ী প্রফেসর চার্লস ছিলেন এই তালিকার শীর্ষে। এছাড়া ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইলেকট্রনিক্স, জীববিজ্ঞান এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের সমন্বয় করার বিশ্ব গুরু বলে মানা হয় প্রফেসর চার্লসকে। ন্যানো প্রযুক্তি আয়ত্ব করার জন্য চীন যে কোনো মূল্যে প্রফেসর চার্লসকে হাতের মুঠোয় আনার চেষ্টা করতে থাকে।

বিশাল অংকের বেতন ও অনুদানের লোভ সামলাতে পারেননি বিজ্ঞানী চার্লস। অবশেষে উহান ইউনিভার্সিটি অফ টেকনলজিতে গবেষনাগার স্থাপন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে পেটেন্ট তৈরী করার কাজে সাহায্য করতে তিনি সম্মত হন। কিন্তু বিষয়টি হার্ভার্ড কর্তৃপক্ষের কাছে গোপন রাখার কারনেই তাকে অভিযুক্ত করা হয়। অন্য কোনো অভিযোগ তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি।

এই ঘটনাটি ঘটে জানুয়ারীর ২৯ তারিখ। কিন্তু হঠাৎ করে দু’মাস পর করোনার রং মাখিয়ে খবরটি চাওর করার উদ্দেশ্য এখন খুবই পরিস্কার। করোনাকালে খবরটি উহান বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে হওয়াতেই অনেকে সুযোগটি নিচ্ছে।

২০১৮ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে বিজ্ঞানে নোবল বিজয়ী জাপানী বিজ্ঞানী তাসুকু হোঞ্জোকে নিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় একটি চরম গুজব ছড়ানো হয়। তা হচ্ছে, নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানীর মতে করোনাভাইরাস চীনের গবেষণাগারে তৈরী একটি কৃত্রিম ভাইরাস। এই দাবী মিথ্যা প্রমান করতে পারলে বিজ্ঞানী তাসুকু নাকি নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে দেবেন। শত শত ফেববুক পেজে জডন খানেক ভাষায় এই গুজব প্রচারিত হয়। শহিদুল ইসলাম নামের একজনের ফেববুক পোস্টেও উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়াতে এই গুজব প্রচার করা হয়। বিজ্ঞানী তাসুকু এই মিথা প্রচারণার তীব্র প্রতিবাদ জানান।

করোনাকালের অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে অনেক পুরোনা গুজবগুলোকেও এখন সামনে টেনে আনা হচ্ছে। আল্লাহর ৯৯টি নাম নিয়ে এবং হজ্জ নিয়ে দুটি গান মাইকেল জ্যাকসনের গাওয়া বলে পোস্ট দেয়া হচ্ছে। আল্লাহর নাম নিয়ে গানটি ওমর ইসার গাওয়া। আর হজ্জ নিয়ে গানটি ইরফান মাক্কির গাওয়া। ওদের গলা মাইকেল জ্যাকসনের মত বলেই এটা অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।

আমি জানিনা কারা এই রটনা শুরু করেছে। তবে কোনো মুসলিম যদি এটা করে থাকে, তাহলে সেটা হবে খুবই দুঃখজনক। মিথ্যের উপর ভর করে ধর্মের প্রচার হয়না। বিভিন্ন সেলেব্রটিকে জোর করে মুসলিম বানানোর প্রক্রিয়া মুসলিমদেরই বেশী ক্ষতি করছে।

এও বলা হচ্ছে হজ্জ গানটি নাকি আমেরিকা প্রকাশ করতে দেয়া হয়নি। ট্রাম্পের আমেরিকা আর যাই হোক সৌদি আরব নয়। ওখানে কোনো গান রিলিজ করার জন্য সরকারের অনুমতি লাগেনা। আর মাইকেল জ্যাকসন যদি সত্যিই গান রিলিজ করতে চান তাহলে বিশ্বের যে কোনো দেশের মিউজিক লেবেল থেকে তা প্রকাশ করতে পারতেন।

সুন্দর গান শেয়ার করা যেতেই পারে। কিন্তু মাইকেল জ্যাকসনের ট্যাগ লাগাতে হবে কেনো? তবে হ্যাঁ, মাইকেলের সহোদর ভাই Jermaine Jackson বাহরাইনে থাকাকালীন মুসলিম হয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের অন্যান্যরা Jehovah’s Witness  এর অনুসারী।

এছাড়া স্বয়ং মাইকেল জ্যাকসন এবং চাঁদে পা রাখা প্রথম মানব নীল আর্মস্ট্রং-এর মুসলিম হবার মিথ্যে খবরও করোনকালে সোস্যাল মিডিয়ায় বারবার দেখতে পেলাম।

কলি যুগে কোনটা আসল আর কোনটা নকল বোঝা সহজ নয়। ইনবক্সে কিছু এলে তাই সেটা অন্য কাউকে পাঠানোর আগে সূত্রগুলো একটু ঘেটে দেখা উচিত। করোনা ক্রান্তিকালে বেহুশ হয়ে পোস্ট দেয়ার এই প্রতিযোগীতা গুজব এবং আতংক ছড়াচ্ছে। যা হিতে বিপরীত হতে পারে।

 

০৩/০৫/২০
করোনাভাইরাস বিস্তার রোধে এখন দেশে দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে কভিডসেফ মোবাইল অ্যাপস। ব্লুটুথের মাধ্যমে এই অ্যাপসটি করোনা সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করে থাকে।

অ্যাপস ব্যবহারকারীকে চিহিৃত করার জন্য সবাইকে একটি করে ইউনিক কোড দেয়া হয়। যেমন ধরুণ আপনি কারো সাথে দেখা করলেন। আপনাদের দু’জনের মোবাইলে যদি এই অ্যাপস থাকে তাহলে দেড় মিটার দুরত্বের মধ্যে আসলেই কভিডসেফ ওই ব্যক্তির ইউনিক কোড সনাক্ত করে তারিখ, সময়, দুরত্ব এবং কতক্ষণ ধরে আপনারা একে অপরের সংস্পর্শে ছিলেন তা ফোনে সংরক্ষণ করবে। এই তথ্য ফোনে ঢুকে কেউ দেখতে পারবে না এবং ২১ দিন পর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিলিট হয়ে যাবে। আবার করোনামুক্ত মোবাইল ব্যবহারকারী করোনা পজিটিভ ব্যক্তির ‘খুব কাছে’ ১৫ মিনিটের বেশি সময় পার করলে নোটিফিকেশন যাবে।

এভাবে কভিডসেফ দিয়ে একজন করোনা পজিটিভ রোগীর সংস্পর্শে কারা এসেছিল তা খুব তাড়াতাড়ি বের করা যায়। ফলে এই অ্যাপস ব্যবহারকারী কেউ করোনা পজিটিভ হলে অে স্ট্রলিয়ার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সাথে সাথে যারা রোগীর সংস্পর্শে এসেছিল তাদের সতর্ক করে দিয়ে কি করতে হবে তা জানিয়ে দেয়।

অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, ইংল্যান্ড ও জার্মানী সহ আরো বেশ কিছু দেশ এই ধরনের অ্যাপস ব্যবহার করছে। একই পথ ধরে এখন কাতারেও চালু হয়েছে কভিড অ্যাপস EHTERAZ. এখন অফিস-আদালত, সপিং মল ইত্যাদিতে ঢোকার আগে দেহের তাপমাত্রা পরীক্ষার পাশাপাশি অ্যাপসের সবুজ সঙ্কেতও দেখাতে হয়। লকডাউনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে মানুষকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফিরিয়ে আনার জন্য কভিড অ্যাপস বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

 

২০/০৫/২০
করোনা সারাবিশ্বকে বদলে দিয়েছে। আমাদের চোখের সামনে এনে দিয়েছে অনেক মর্মান্তিক, বেদনাময় অধ্যায়। চট্টগ্রামে ফিল্ড হাসপাতালে করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন এক ব্যক্তি। তার সাত বছরের সন্তান এসে বাবাকে শেষবারের বিদায় দিতে কপাল স্পর্শ করলো। কিশোর সন্তানের শব্দহীন এই স্পর্শ, বুকের মধ্যে গভীর কান্নার ঢেউ তোলে।

করোনায় মারা যাওয়া মানুষের দাফনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্বজনদের তীব্র অবহেলার কথা নিয়মিত খবরে দেখছি। ফেসবুকের পাতায় নওগাঁর নিয়ামতপুরের বন কর্মকর্তা শফিউর রহমানের শেষ যাত্রার করুণ কহিনী পড়ে নিজেকে চিমটি কাটছিলাম, আমরা সত্যিই কি মানুষ? না অন্যকিছু।

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের চারজন সদস্য খাটিয়াসহ লাশ বইতে পারছিলেন না। মৃতের ভাইকে খাটিয়া বইতে সহায়তা করতে বলামাত্র সেখান থেকে এক প্রকার দৌঁড়ে চলে গেলেন! আর এলেন না। চারপাশে কোন আত্মীয় স্বজন নেই। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের চারজন সদস্য লাশের খাটিয়া উঠানোর চেষ্টা করছে। উঠানোর পর এগুতে পারছেনা। আবার নামিয়ে ফেলছে। সদ্য প্রয়াত শফিউর রহমানের দ’ুটো সন্তান কেঁদেই চলেছে। ওরা কাছেও আসতে পারছে না। বড় ছেলে নাসিম চিৎকার করে লাশবহনকারীদের বলছিল ‘ভাই ভারী মনে হলে একটু নামিয়ে নিয়েন, তবু আব্বু যেন পড়ে না যায়!’

নারায়ণগঞ্জে গলাচিপা এলাকায় করোনার উপসর্গ নিয়ে বাড়ির সিঁড়িতে পড়েই মারা যান এক ব্যবসায়ী। তার শারীরিক অবস্থা যখন খারাপ হয় তখন আশপাশের ফ্ল্যাটে থাকা তার বন্ধুদের এবং পরিচিত আত্মীয় স্বজনদের সাহায্য চাওয়া হয়েছিল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কেউ তার ডাকে সাড়া দেয়নি। পরে স্ত্রী ও ছোট দুই মেয়েই বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে নামিয়ে আনছিলেন। তবে নামানোর পথে সিঁড়িতেই তিনি মারা যান। তবে নির্মম এই মৃত্যুর পর মরদেহ ছুঁয়েও দেখেনি তার আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

ভারতের কাটোয়া এলাকার একটি বাড়িতে করোনাভাইরাস সন্দেহে স্বামীকে ঘরে ঢুকতে দিলনা স্ত্রী। চিকিৎসকরা করোনামুক্ত ঘোষণা না করা পর্যন্ত ঘরে ঢুকতে দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়ে দরজা আটকে দেন তিনি।

ফেনীর সোনাগাজিতে ঘরে একা রেখে বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে স্বজনরা সরে পড়ার পর মারা গেলেন সাহাব উদ্দিন নামে করোনা আক্রান্ত এক বক্তি। তার স্ত্রী ও সন্তানরা বাড়িতে তার কক্ষের বাইরে ছিটকিনি দিয়ে দ্বিতীয় তলায় চলে যান। এক সময় শ্বাসকষ্ট ও কাশি বেড়ে গেলে চিৎকার করে তিনি খাবার ও পানি চাইলেও কেউ দেয়নি। ছোট ছেলে এগিয়ে যেতে চাইলে তাকেও বোনেরা বাধা দেয়। এভাবে চিৎকার করতে করতে ওইদিন রাত ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

করোনা সন্দেহে মাকে সখীপুরের বনে ফেলে গেছেন সন্তানেরা। অন্যদিকে সুনামগঞ্জে অন্য জেলা থেকে আসা গার্মেন্টকর্মীর বাড়িতে যাওয়ায় করোনা হয়েছে সন্দেহ করে বৃদ্ধা মাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন সন্তানরা।

টাঙ্গাইলের সখীপুরে করোনা সন্দেহে এক নারীকে জঙ্গলে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে তার স্বামী-সন্তানেরা। পঞ্চাশোর্ধ্ব মা সংসারের বোঝা ছিলেন না। ছেলে, দুই মেয়ে, মেয়েদের জামাই, নাতি-নাতনিদের রান্না করে খাওয়াতেন। সেই মায়ের জ্বর-স্বর্দি-কাশি হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে পরীক্ষা করারও প্রয়োজনবোধ করলেন না সন্তানেরা। নিজের পেটে ধারণ করা সন্তানরা সন্ধ্যার সময় মা-কে নিয়ে বনের মধ্যে ফেলে আসলেন।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে সাভারে এক বৃদ্ধা মাকে ফেলে পালিয়েছে তার সন্তানরা। সমাজের কাছে হেয় হবেন এই ভয়ে সন্তানদের পরিচয়ও প্রকাশ করছেন না এই মা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি অসুস্থ পিতাকে মাঠের মাঝখানে রেখে যাওয়ার ঘটনা। পরে সেখানেই তার মৃত্যু হয়েছে। টঙ্গীতে এক নারী অসুস্থ হয়ে রাস্তায় মারা গেলেও করোনা সন্দেহে তার মরদেহ ধরেনি সন্তানসহ এলাকাবাসী। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সড়কেই পড়েছিল ওই নারীর লাশ। আরও বেশ কিছু ঘটনায় মৃত স্বজনের লাশ রেখে চলে গেছে আত্মীয়রা।

করোনার ভয়ে সন্তান যখন মা-বাবাকে রাস্তায়-মাঠে-চরে ফেলে যাচ্ছে, মৃতদেহ গ্রহণ করতে, দাফন করতে অস্বীকার করছে তখন মা-বাবার স্নেহের কাছে পরাজিত হয়েছে করোনা। চট্টগ্রামের পটিয়ায় করোনা আক্রান্ত ছয় বছর বয়সী শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। হাসপাতাল থেকে তার লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সে মৃত সন্তানের শিয়রে বসে থাকা মা আনমনে মৃত সন্তানকে মাথায়, কপালে হাত বুলাচ্ছিলেন। চরম ঝুঁকির মাঝেও সন্তানকে ছেড়ে না গিয়ে আদর করার এই দৃশ্য অনেকের চোখ ভিজিয়ে দিয়েছে।

মৃত শিশুটির হতভাগ্য বাবাও সন্তানটিকে ছেড়ে যেতে পারেননি। দাফন করার সময় বুকে আগলে লাশ নিয়ে যান কবরে। অথচ আদরের সন্তানের লাশের ভেতরে ঘাতক করোনা লুকিয়ে আছে। কোনও সুরক্ষা ছাড়াই শেষবারের মতো সন্তানকে বুকে আগলে ধরেছিলেন বাবা।

করোনাভাইরাসের প্রকোপে গোটা ভারত যখন লকডাউনে তখন প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে অন্ধ্র প্রদেশ আটকে পড়া ছেলেকে ফেরাতে স্কুটি চড়ে প্রায় ১৪০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ছেলেকে ফিরিয়ে আনেন তেলঙ্গানা রাজ্যের এক মা রাজিয়া সুলতানা। ভারতের কেরালার অসুস্থ ছেলেকে দেখতে নিজেই গাড়ি চালিয়ে ২ হাজার ৭০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে যোধপুর গেলেন পঞ্চাশ বছর বয়সী মা সিলাম্মা ভাসান। ছেলের গুরুতর অসুস্থতার কথা জানার পর মা কেরালা থেকে তামিলনাড়ু, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র ও গুজরাট রাজ্য ঘুরে তিন দিন ধরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাজস্থানে অসুস্থ ছেলের কাছে পৌঁছান।

বিপন্ন প্রায় একজন মানুষের প্রতি আর একজন মানুষ কতটা সহানুভূতিসম্পন্ন হতে পারে, কিছু মানুষ তার অনন্য উদাহরণ যেমন সৃষ্টি করে চলেছেন তেমনি আর কিছু মানুষ এরকম সংকটকালে নিজেদের হীন ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে মনের অজান্তেই নরকের কীটে পরিণত হচ্ছেন।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতীর ভিক্ষুক নজিমউদ্দিন তার ভিক্ষালব্ধ ১০ হাজার টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দান করেছেন। তিনি নিজের থাকার ঘর তৈরির জন্য ভিক্ষা করে এ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। নজিমউদ্দিনের উদারতা দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। অন্যদিকে একশ্রেণির স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে বিপন্ন মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত চাল এবং গম চুরির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এসব মানুষের স্বার্থপরতা দেখে ধিক্কার জানানোরও ভাষা খুঁজে পাওয়া যায়না।

চোখের সামনে মৃত্যুর ভয়াল রূপ দেখার পরও কিছু ডাক্তার, পুলিশ, নার্স, সরকারী কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট সহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ নিজের পরিবার ও জীবনের মায়া ভুলে সামনে থেকে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছেন।

তারা কখনো করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তিদের দাফন বা সৎকার করতে ছুটছেন, কখনো খাবারের থলি নিয়ে ছুটছেন অসহায়, দুস্থ নিন্ম কিংবা মধ্যবিত্তদের বাড়ি বাড়ি। আবার কখনো লকডাউন নিশ্চিত করতে পথে প্রান্তরে ছুটছেন। কখনো অসাধু ব্যাবসায়ীদের কবল থেকে মানুষকে রক্ষায় বাজার মনিটরিং বা ভ্রাম্যমাণ আদালত বসাচ্ছেন। গুজব রুখতে নজর দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তেমন একজন করোনা যোদ্ধা হলেন নরসিংদীর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহ আলম মিয়া। গর্ভবতী স্ত্রী ও বৃদ্ধা মাকে ঘরে রেখে সাধারণ মানুষের সুরক্ষার জন্য দিনরাত নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এভাবে নরসিংদীতে সবার মাঝে হয়ে উঠেছেন একজন ‘বাস্তব জীবনের সুপার হিরো’।

একজন পুলিশ সদস্যের কথা জানি, যিনি সন্তানের ছুড়ে ফেলা মায়ের মৃতদেহ তুলে নিয়ে সৎকারের ব্যবস্থা করেছেন। তেমনি আরেকজন বৃদ্ধ ভ্যানচালক অসহায় করোনা রোগীকে নিয়ে বারবার প্রত্যাখ্যাত হবার পরও রাতের অন্ধকারে ছুটে যাচ্ছেন এক হাতপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। ফ্রন্ট লাইলের এসব যোদ্ধাদের অনেকে করোনার পরাজিত হয়ে মৃত্যুকে করছেন আলিঙ্গন।

 

২০/০৫/২০
সূর্যে লকডাউনঃ সূর্য আরেকটি সোলার মিনিমাম-এর দিকে এগুচ্ছে খবর দিয়েছে নাসা। তার মানে আগের তুলনায় সূর্য শীতল হয়ে আসছে। মিডিয়ায় সোলার মিনিমামকে সূর্য লকডাউনে যাচ্ছে বলে আখ্যা দিয়ে বলা হচ্ছে এর ফলে বিশ্বজুড়ে ভূমিকম্প ও দুর্ভিক্ষের মতো ভয়ংকর দুর্যোগ দেখা দেবে। করোনাকালে দিশেহানরা মানুষের কাছে আতঙ্কের অপর নাম হচ্ছে লকডাউন। তাই সূর্যে লকডাউনের এই খবর চারদিক ত্রাসের সঞ্চর করেছে। আসলেই কি তাই?

সোলার মিনিমাম একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা ১১ বছর অন্তর হয়ে থাকে। এই অবস্থা নূন্যতম চয় মাস স্থায়ী হয়। একজন মানুষ নিজের জীবদ্দশায় অনেক সোলার মিনিমামের মধ্য দিয়ে যায় যা টেরও পান না। সোলার মিনিমাম পরিস্থিতিতে সূর্যের তাপ উৎপাদনের মাত্রা হ্রাস পায়। সোলার ফ্লেয়ার ও সোলার স্পটের সংখ্যাও কমে যায়। সোলার মিনিমামের সময় সূর্যের চৌম্বকীয় শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে বলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে ক্ষতিকর রশ্মির পরিমাণ বাড়তে পারে। যা মেরুঅঞ্চল ও নভোচারীদের এক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

১৮১৬ সালে সোলার মিনিমামের সময় একবার প্রবল ভ’মিকম্প হয়েছিল। ওই সময় পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় খাদ্যাভাব দেখা দেয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, যা কিছু ঘটেছে তা ইন্দোনেশিয়ার টাম্বোরা আগ্নেয়গিরিতে প্রবল অগ্নুৎপাতের কারণেই ঘটেছে, এর সাথে সোলার মিনিমামের কোনো সম্পর্ক ছিলনা।

সোলার মিনিমামের ফলে যে পরিমাণ তাপমাত্রায় পরিবর্তন হবে সেটি পৃথিবীতে খুব একটা পারির্বতন আনতে পারবেনা বলেই ধারনা করছেন বৈজ্ঞানিকরা। কারণ সোলার মিনিমামের কারণে ১১ বছরে পৃথিবী যে পরিমান শীতল হবে তার চেয়ে কার্বন নিঃসরণের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রার ছয়গুন বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া সোলার মিনিমাম যদি আরো একশ বছরও স্থায়ী হয় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী শিথিল না হয়ে আরো উষ্ণতর হবে।

তারমানে জলবায়ুর যা ক্ষতি করার তা আমরা আগেই করে ফেলেিেছ। জাতিসংঘের আইপিসিসি’র রিপোর্টে বলা হয়েছে পৃথিবীকে আবাসযোগ্য রাখতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রীর নীচে রাখতে হবে। আর এজন্য কার্বণ নিঃসরণ ৪৫ শতাংশ কমিয়ে ২০৫০ সালের মধ্যে শূন্যে নিয়ে আসতে হবে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দূষণকারী দেশ আমেরিকা ট্রাম্পের নের্তৃত্বে প্যারিস চুক্তি থেকে সরে আসার পর এটা কি সম্ভব?

জলবায়ু পরির্বনের কারণে এই শতকের শেষে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সর্বোচ্চ ১ মিটার পর্যন্ত বাড়বে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক কথা হল, কার্বন নিঃসরণ এই মুহূর্তে পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেও এ পর্যন্ত যে পরিমান কার্বন বায়ুমন্ডলে নির্গত হয়েছে তার প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অগামী কয়েক শতাব্দী ধরে বেড়েই চলবে। এভাবে আমরা একটি অপরির্তনীয় (irreversible) অবস্থার দিকে এগিয়ে চলেছি।

কারোনাকাল বায়ুদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ কমিয়েছে ঠিকই কিন্তু এটার সুফল সাময়িক। পৃথিবী ছন্দে ফিরলে আবারও বিষাক্ত ধূয়োয় ভরে যাবে বিশ্ব। মনে হচ্ছে, আমাদের পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য অনূজীবের আক্রমন না হলেও প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশ্বকে স্বেচ্ছায় লকডাউনে রাখতে হবে।

 

২২/০৫/২০
করোনাভাইরাসের সাড়াঁশি আক্রমনে মুখ থুবড়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। বিভিন্ন দেশ যে লকডাউন কার্যকর করেছে তাতে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড কমে গেছে। যান চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে, লোকজন ঘরে বসে আছে এবং বৈশ্বিক চাহিদা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

তেলের বাজারে নেমেছ ধ্বস নেমেছে। ১৯৯১ সালে পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের পর বিশ্ব বাজারে তেলের দরে এত বড় পতন আগে দেখা যায়নি। আমেরিকান তেলের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেল প্রতি মাইনাস ৩৭ ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে।

করোনা ভাইরাসের ঘায়ে নতজানু হয়ে অবশেষে সৌদি আরব আগামী জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে ভ্যাটের পরিমান তিন গুন বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করছে। এছাড়া চাকুরীজীবিদের বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও সুযোগ সুবিধা স্থগিত করে দিচ্ছে। আরব্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং বাহরাইন ২০১৮ সাল থেকে ৫% ভ্যাট চালু করেছে।

তবে ভ্যাট চালু না করলেও, অর্থনীতির উপর চাপ কমাতে কাতারের সরকারী মন্ত্রণালয়গুলোতে যে করেই হোক ৩০% ব্যয় কমানোর নির্দেশ এসেছে। সরকারী খাতের সাথে সাথে বেসরকারী খাতেও ব্যাপক হারে কর্মী ছাটাই করা হচ্ছে। প্রায় সব সেক্টরে কর্মচারীদের বেতন ১৫ -৩০ শতাংশ কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। চাকুরীর চুক্তিপত্রে থাকার পরও অন্যান্য ভাতা, সুযোগ সুবিধা, বাৎসরিক দেশে যাতায়তের টিকেটও বাতিল করা হচ্ছে। তবে ছাটাই ও বেতর কমানোর খড়গ নেমে আসছে কেবল প্রবাসীদের উপর। কাতার গড়ার জন্য শ্রম, মেধা সবকিছু দেয়ার পরও প্রবাসীদের এভাবে বলির পাঁঠা বানানোর সিদ্ধান্ত খুবই দুঃখজনক। এই দেশটা যাদের, সেই কাতারী নাগরিকরা যদি স্বদেশের সুরক্ষার জন্য কিছুটা হলেও আত্মত্যাগ না করে, তাহলে করবে কারা?

২৭/০৭/২০২০
করোনা যুদ্ধোত্তর বিশ্বের দিনকাল শুরু হয়েছে। একে বলা হচ্ছে New Normal. এই নতুন পৃথিবীতে সবাই সুরক্ষা-বিধি মেনে নিজেদের ঢেকে রেখেছে মুখোশের অন্তরালে। কাতারে দৈনিক করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দুই থেকে তিস শ’র মধ্যে নেমে এসেছে। অফিস আদালতে উপস্থিতির সংখা শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশী। বিধি-নিষেধ মেনে সপিং সেন্টার, রেস্তাঁরা খুলেছে। কোনো কারণে সামান্য জ্বর কিংবা সাথে কোভিড আ্যাপ্স না থাকলে, মন্দ কপাল। কোত্থাও ঢোকা যাবেনা।

উড়োজাহাজে যাত্রীদের দুরত্ব-বিধি মেনেই সিট দেয়া হচ্ছে। আমার সেজদা সেদিন আমিরাতে চড়ে সিডনী থেকে ঢাকা ফিরলেন। সিডনী থেকে দুবাই পর্যন্ত সুরক্ষা-বিধি মেনে চলা হল। কিন্তু দুবাই থেকে ঢাকা রুটে আগের মতই যাত্রীদের পাশাপাশি বসানো হল। কষ্ট পেলাম জেনে।

বিশ্বের বহু দেশেই এখন সংক্রমনের হার ধীরে ধীরে কমে আসছে। কাতারেও করোনা সংক্রমনের হার নিম্নমুখী। বেশ কিছুদিন ধরে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা পাঁচশ’র আশেপাশে উঠানামা করছে। আর মৃত্যুর হার হচ্ছে ০.১৫ শতাংশ, যা উপসাগারীয় অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় সবচেয়ে কম।

অনাদিকাল থেকে সংক্রামক ব্যাধি সঙ্গী হয়েছে আমাদের। বিভিন্ন সময়ে আবির্ভূত মহামারীতে মারা গেছে লাখো কোটি মানুষ। আজ থেকে ৫০০ বছর আগে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মধ্য আমেরিকার মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এর পর ১৯১৮ সালে ভয়ংকর স্প্যানিশ ফ্লুতে মাত্র এক বছরের মধ্যে প্রানহানি হয়েছিল প্রায় পাঁচকোটি মানুষের। সেই তুলনায় করোনায় আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুর হার অনেক কম।

বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, করোনা রোগে আক্রান্ত প্রায় ১% রোগীর মৃত্যু হবার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বাকী ৯৯% যারা বেঁচে থাকবে তারা সবাই কি পরিপূর্ণ সুস্থ থাকবে? এই বিষয়টিই গবেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ অন্যান্য ভাইরাসের মত মানুষের শরীরে করোনা ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এখনো সম্পূর্ন নিশ্চিত নন।

জার্মান মিসল্স নামে পরিচিত হাম হচ্ছে একটি ভাইরাস জনিত রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আনুমানিক ০.২% মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু হাম, আক্রান্ত রোগীদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা কিংবা মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। অনেককে হামের কারণে বধির হতেও দেখা যায়। অন্যদিকে পলিও নামের অন্য একটি ভাইরাস জনিত রোগের পার্শ^-প্রতিক্রিয়ার কারণে অনেকেই পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হচ্ছেন। আর পলিওতে আক্রান্ত ৭০% মানুষের মধ্যে কোনো উপসর্গ দেখা যায়না। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যাচ্ছে, করোনা ভাইরাসও কোনো রকম উপসর্গ না দেখিয়ে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে।

করোনার আক্রান্ত বহু রোগীদেও দীর্ঘসময় ধরে আইসিইউ কিংবা ভেন্টিলেশনে থাকতে হচ্ছে। লম্বা সময় আইসিইউতে থাকাটা শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ভেন্টিলেশন করোনার রোগীদের জীবন রক্ষা করলেও, দীর্ঘায়িত ভেন্টিলেশন ব্যহার করার ফলে আলসার, বাকটেরিয়া সংক্রমন সহ অন্যান্য জটিল স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনকি যেসব করোনা রোগী আইসিইউতে যাননি, তাদের অনেকের কিডনী সহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মধ্যে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এছাড়া মানসিক রোগেও আক্রান্ত হচ্ছেন অনেক করোনা রোগী। তাই কেবল মৃত্যু সংখ্যা নিয়ে করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা বিচার করা সঠিক হবেনা। মানুষের শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এই ভাইরাসের দীর্র্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাবও গভীরবাবে বিবেচনা করতে হবে।

একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, একবার করোনা সংক্রমনের পর শরীরে যে প্রতিরোধক শক্তি বা এন্টিবডি তৈরী হয় তার স্থায়িত্ব মাত্র কয়েক মাস। তাই করোনায় পুনঃসংক্রমনের সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। ইদানিং অস্ট্রেলিয়া, চীন ও আমেরিকায় কোভিড ভাইরাস যেভাবে আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে তা খুবই উদ্বেগজনক। এর ফলে করোনা ভ্যাক্সিন কতটা ফলপ্রসূ হবে সে নিয়ে অনেকেই সন্দিহান।

দীর্ঘদিন ধরে সুরক্ষা-বিধির মেনে চলতে গিয়ে অবসাদগ্রস্থ হয়ে অনেকে সরকারী নিষেধাজ্ঞা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইছেন। তাই দীর্ঘসময় ধরে সুরক্ষা-বিধি মনে না চললে করোনা ভাইরাসের সংক্রমন আবারো ফিরে আসতে পারে।

করোনা সংক্রমনের শুরুতে আমরা জানলাম কতটা ভয়ংকর হতে পারে করোনা নামের এই অতিক্ষুদ্র অনূজীব। এরপর সংক্রমনরোধের জন্য চলল গবেষণা, হল বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষা-বিধি সহ দুরত্ব-বিধির আগমন। এখন চলছে মানুষকে আবারো সচল করে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলার প্রক্রিয়া। আমরা এখনো জানিনা, কি হতে পারে এর পরিনাম কিংবা এজন্য কতটা মূল্য দিতে হবে আমাদের।

 

২৭/০৭/২০
কাতার সরকার আমার বয়সী মানুষদের বিনামূল্যে করোনা টেস্ট করানোর জন্য আমন্ত্রণ পাঠাচ্ছে। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে Drive-in Swab টেস্ট করালাম। গাড়ী থেকে বেরুতে হয়নি। গাড়ীর জানালা দিয়েই গলা এং নাক থেকে স্যাম্পল সংগ্রহ করলেন বিনয়ী নার্স । আজ রেজাল্ট পেলাম – নেগেটিভ। আলহামদুলিল্লাহ! কভিড-১৯ ভেক্সিন ও টেস্ট নিয়ে বেশ লেখালেখি করেছি। এবার নিজেই কেরোনা টেস্টের বৈতরণী পার হলাম।

৩০/০৫/২০
অনাদিকাল থেকে সংক্রামক ব্যাধি সঙ্গী হয়েছে আমাদের। বিভিন্ন সময়ে আবির্ভূত মহামারীতে মারা গেছে লাখো কোটি মানুষ। আর আজ একুশ শতকে সারাবিশ্বে নেমে এসেছে মরণঘাতি মহামারি কোভিড-১৯। এ পর্যন্ত করোনা মহামারীতে আক্রান্তের সংখ্যা ২ কোটি এবং মৃতের সংখ্যা ৭ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে পরিবহনব্যবস্থা ১৯১৮ সালের তুলনায় অনেক উন্নত এবং দ্রুততর। ফলে একটি ভাইরাস দ্রুত গতিতে বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তার মরণ থাবা বিস্তার করতে পারে। করোনাভাইরাস ধনী, গরীব, উন্নত, অনুন্নত বলে কোনো বৈষম্য করছেনা। বিশ্বের ক্ষমতাধর পরাশক্তিগুলোও আজ বিপর্যস্তত্ম। যেসব দেশে আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যেমন আমেরিকা, ইকে, ইটালী, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানী, তারাই সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ।

মহামারীর আঘাতে মৃত্যুর মিছিল যেমন বাড়ছে, ঠিক তেমনি দুঃস্বপ্নের চোখে চোখ রেখে এক নতুন সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্নও দেখাচ্ছে। প্রকৃতির কোনও লকডাউন নেই। বিশ্বজুড়ে যখন চলছে লকডাউন, তখন আমাদের চারপাশে মহাসমারোহে সেজে উঠেছে প্রকৃতি। করোনাভাইরাস আক্রান্ত পৃথিবীতে পরিবেশ দূষণ হঠাৎ করে সাংঘাতিক হারে কমে গেছে। করোনা নামের অতিক্ষুদ্র একটি অনূজীবের বিশ্বজুড়ে ডাকা হরতালে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে গোটা পৃথিবী। রাস্তায় গাড়ী নেই, উধাও হয়ে গেছে জানযট, কারখানার চিমনীতে ধূয়ো নেই, বাতাসে নেই ডিজেলের পোড়া গন্ধ। শহরের বড় বড় চৌরাস্তার মোড়ে, অফিস পাড়ায়, ক্যাফে ও চায়ের দোকানে আড্ডার যায়গাগুলোতে এখন শ্মশানের নিরবতা। সারা বিশ্বের সকল শহরে জনকোলাহলের তরঙ্গে যেনো বাঁধ দেওয়া হয়েছে। রূপকথার গল্পের মত করোনা যাদুতে শহরতলীর জনমানব অদৃশ্য হয়ে গেছে।

করোনার প্রভাবে বিশ্বের ল্যান্ডস্কেপে বদলে গেছে। বায়ু দূষণ এতই কমেছে যে, দীর্ঘ ৩০ বছর পর এই প্রথম পাঞ্জাব থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে শুভ্র হিমালয় পর্বতমালা খালি চোখে দেখা যাচ্ছে। ভর দুপুরে ব্যস্ত শহরের অরণ্যে শোনা যাচ্ছে পাখির কলতান। সমুদ্র সৈকতে বসেছে লাল কাকঁড়ার মেলা, সাগর তীরে আবার ফিরে এসেছে ডলফিন। দূরপাল্লার মহাসড়কে পরম নির্ভয়ে গা এলিয়ে দিচ্ছে বন্য প্রানীর দল। এমন দুঃসাহস আগে কখনো দেখায়নি প্রানীক’ল। করোনাকাল যেনো প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিয়েছে তার হারানো যৌবন।

করোনাকালে আমরা সবাই এখন নিজ গৃহে বন্দি। তবে এই গৃহবন্দী অবস্থায় আমরা শিখেছি অনেক কিছু। নীল আকাশ আর চার পাশের পরিবেশ কতটা সুন্দর যা আগে ভাবিনি। শিখেছি সঞ্চয়ের মূল্য, সম্পর্ককে আরও আঁকড়ে রাখতে হয় কী ভাবে, কী ভাবে স্বল্পে মেলে বিস্তরের আনন্দ। ছোট্ট ঘরের মধ্যে যে এত ছোট্ট-ছোট্ট অমূল্য মুহূর্ত আছে আগে কখনও ভেবে দেখার সুযোগ মেলেনি। অবসরের জীবন আর প্রকৃতি কী অনবদ্য আনন্দ আনতে পারে আগে বুঝিনি এমন করে।

করোনা মহামারী মানুষকে আরও বিনয়ী হতে শিখিয়েছে। শিখিয়েছে অন্যের প্রতি দরদী ও সহানুভ’শীল হতে। জীবন-যাপনের দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টিয়ে দিয়েছে। আমার বিশ্বাস, পৃথিবী একদিন সেরে উঠবেই, করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হবে মানুষ। তবে অতিগ্রাসী মানবজাতিকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে মানবজীবনের। সন্মান করতে হবে প্রকৃতিকে। শিখতে হবে নতুন জীবনযাত্রার।