কাতার আগমনের দু’মাসের মাথায় অর্থাৎ ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হলো আমার মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম রমজান। একদিন অফিসের টেবিলে দেখলাম সার্কুলার – রমজানের জন্য পরিবর্তিত অফিস সময়সূচী। এ ক’দিনের ব্যস্ততায় বুঝতেই পারিনি পবিত্র রমজান শুরু হতে কেবল মাত্র সাতদিন বাকী। কাতারে অফিস টাইম হচ্ছে প্রাইভেট সেক্টরে দৈনিক ৯ ঘণ্টা আর সরকারী অফিসে ৭ ঘণ্টা। ব্যাংক, পোস্টঅফিস, টেলিফোন, পানি, বিদ্যুৎ সহ অন্যান্য অনেক সংস্থা দু’বেলা খোলা থাকে যেমন সকাল ৮টা – ১২টা আবার বিকেল ৪টা – রাত ৮/৯টা। ফলে অফিস শেষ করে ব্যাংকিং, বিল দেয়া ইত্যাদি কাজ সেরে ফেলা যায়, যা খুবই উপকারী মনে হল। তবে রোজার আগমনে অফিসের সময়সীমা কমিয়ে আনা হয়। রমজানের কাজের সময় হচ্ছে বেসরকারি সেক্টরে সর্বোচ্চ ছয় ঘণ্টা আর সরকারী মন্ত্রণালয়ে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা, সকাল ৯টা থেকে ২টা। সিডনী থেকে কাতারে এসে এটা ছিল আমার জন্য একটি অপ্রত্যাশিত বোনাস! তবে কাতারী কর্মচারীদের জন্য এটা পোয়াবারো। ওরা আসবে দেরীতে অর্থাৎ সাড়ে ন’টার দিকে আবার যাবে সময়ের অনেক আগে। সাড়ে এগারোটা থেকে শুরু হবে যোহরের নামাজের প্রস্তুতি। বারোটায় যোহরের নামাজ শেষ করেই অফিস থেকে গায়েব! ফলে রমজান মাসে বিশেষ করে সরকারী অফিসগুলো অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে। অন্যদিকে নির্মান খাতে কন্সট্রাকশন সাইটে খুব ভোরে কাজ শুরু হয়ে ১১টার মধ্যেই শেষ। অন্যদিকে প্রয়োজন হলে রাতেও একটা শিফট হয়।
এই প্রথম রোজা কাটাচ্ছি পরিবার থেকে অনেক অনেক দুরে। রমজানে বাসায় বানানো ইফতার খেতে পারবোনা ভাবতেই মনটা বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছিল বারবার। দোহায় এখন দিন বেশ ছোট। জুন জুলাইয়ের প্রচণ্ড গরমের আঁচটাও বেশ কমে এসেছে। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ইফতারের সময় হচ্ছিল। সিডনীতে গ্রীষ্মকালের রোজার তুলনায় বলতে গেলে স্বর্গ। মনে পড়ে গেল নব্বই দশকের কথা যখন সিডনীতে ইফতারের সময় হত পৌনে ন’টার দিকে। চন্দ্র মাসের হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ১১ দিন এগিয়ে আসার সুবাদে অস্ট্রেলিয়ায় রমজান এখন শীতকালে ঢুকে পড়েছে।
কাতারে দেশীয় ইফতারের স্বাদ পেতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ প্রায় প্রতি এলাকাতেই রয়েছে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ। ঢাকার মতই রেস্তোরাঁর সামনে রাস্তার উপর বিক্রি হয় হরেক রকমরে ইফতার । আমার এপ্যার্টম্যান্টের ৩০০ মিটারের মধ্যেই রয়েছে মসজিদ ও বাঙ্গালী রেস্টুরেন্ট। আমি খাবার কিনে এনে রুমে রেখে দিই আর আযান শুনেই ভাঙ্গি রোজা। ইফতার খেতে বসে মন ছুটে যায় সিডনীতে। ভাবতে থাকি বাসায় কি রান্না হচ্ছে আজ ? আমার প্রিয় খাবার হালিম কিংবা ডিপ ফ্রাইড সবজি ?? তবে দোহায় পবিত্র রমজান পালন করতে গিয়ে যেন দেশের আমেজ ফিরে পাচ্ছি। দিনে পুরো শহরটা ঘুমিয়ে থাকে আর রাত ১০টার পর জেগে ওঠে। জমে ওঠে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও শীশা খানা। গভীর রাত পর্যন্ত শহরতলির রাস্তায় গাড়ি, শপিং মল এবং রেস্তোরাঁয় থাকে মানুষের ভিড়। দোকান-পাট রাত আটটা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। ফাস্ট ফুডের দোকানগুলো আয়োজন করে বিশেষ ইফতারের।
মুসলিম-অধ্যুষিত দেশের তুলনায় মুসলিম সংখ্যালঘু দেশে রমজানের আমেজ পুরোপুরি ভিন্ন। সিডনি শহরের কথাই ধরা যাক। মুসলিম-অধ্যুষিত মহল্লায় না থাকলে আশপাশের মানুষ ও পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় নেই যে পবিত্র রমজান মাস চলছে। কোয়েকার্স হিলের প্রথম দিকের দিনগুলোতে এলাকার বেশ কিছু বাংলাদেশি পরিবার মিলে পালাক্রমে বিভিন্ন বাড়ীতে আমরা তারাবীর নামাজ পড়তাম। একদিন বিশিষ্ট লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন সিডনীর শিক্ষক কাইউম পারভেজ ভাই ইউনিভার্সিটির কোয়েকার্স হিল ক্যাম্পাসে নামাজ পড়ার জন্য একটি রুমের ব্যবস্থা করলেন। তখন থেকে আমরা ওখানেই নামাজ পড়েছি।
সিডনিতে অফিস থেকে বাসায় ফিরতে দেরি হতো বলে প্রায় সিটি ট্রেনে বসেই ইফতারি সেরে নিতাম। তাই দেশের রমজান মাসের দিনগুলোর কথা ভেবে বেশ কষ্ট পেতাম। কিন্তু দোহায় এসে মনে হচ্ছে, যা হারিয়েছি তার কিছুটা হলেও এখন যেন ফিরে পাচ্ছি। তবে প্রবাসীদের কাছে সবচেয়ে সেরা হলো স্বদেশের রমজান। কোনো কিছুর সঙ্গেই যে এর তুলনা নেই। রমজান মাস এলে, বিশেষ করে কৈশোরের সেই সোনালি দিনগুলো আমাকে ভীষণ নাড়া দেয়। ভাবি, আহা! রোজার সেই দিনগুলো যদি আবার ফিরে আসতো?
রমজানের আগমনে কাতারের দোহা শহরের বিশেষ জায়গায় স্থাপন করা হয় কামান। ইফতারের সময় হলে এসব কামানের তোপধ্বনি নগরবাসীকে ইফতারের সময় জানিয়ে দেয়। কাতার টেলিভিশন চ্যানেলেও কামানের তোপধ্বনি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। কাতারের ঐতিহ্যবাহী এই রীতি সত্যিই উল্লেখ করার মতো।
কাতারে সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবুতে ব্যাচেলর, শ্রমিক এবং নিম্নবিত্ত প্রবাসীদের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয়। এটা সবার জন্য থাকে উন্মুক্ত, ফলে অনেক অমুসলিমও এই ইফতারে শরিক হয়। ইফতারের সময় মুসলিম কিনা এ নিয়ে কোনো রকমের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় না। ইফতারির জন্য খেজুর, পানীয় ছাড়াও বড় থালাতে পোলাও-এর সাথে মুরগির রোষ্ট কিংবা আরবি স্টাইলে রান্না করা মাটনের তরকারী দেয়া হয়। থালাতে যে পরিমাণ খাবার পরিবেশন করা হয় তা নূন্যতম চারজন থেকে ছয় জন রোজাদার খুব সহজে পেট পুরে খেতে পারবেন। ইফতারের এক ঘণ্টা আগেই এসব তাঁবুতে মানুষের সমাগম শুরু হয়, তাই দেরি করলে জায়গা পাওয়া সম্ভব নয়। খুব সুশৃঙ্খলভাবে তাঁবুতে সবাইকে বসানো হয়। ইফতারের জন্য একটি বড় আকারের থালাতে পোলাও-এর সাথে মুরগির রোস্ট কিংবা আরবি স্টাইলে রান্না করা মাটনের তরকারি দেয়া হয়। এছাড়া থাকে খেজুর ও জুস কিংবা লাচ্ছির মতো শরবত, যা এখানে ‘লাবান’ নামে পরিচিত। অনেকে বাড়ী থেকে সাথে করে দু’একটি কাঁচা মরিচ, পিয়াজ কিংবা বাটিতে করে সালাদও নিয়ে আসেন।
কাতারে প্রতি রমজান মাসের একটি দিন আমি ওই তাবুতে যেয়ে আম-জনতার সাথে ইফতারি করি। একবার বেশ কয়েকজন বন্ধুকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম এমন একটি তাবুতে। তাবুর ভেতর ঢুকে দেখি হাউজ ফুল। চেহারা দেখে ও কথা শুনে মনে হলো রোজাদারদের অধিকাংশই হলো বাংলাদেশি। কোথাও বসার চেষ্টা করছিলাম। বেশ কিছু থালাতে দেখি মাত্র তিনজন করে বসে আছে। ওখানে বসতে চাইলে ওরা বলছিলেন, ভাই বসা যাবেনা, এই জায়গার মানুষটি একটু বাইরে গেছেন এখনই এসে পড়বেন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, পরে দেখলাম তাদের কথামত যিনি বাইরে গেলেন তিনি আর ফিরে আসলেন না। তারা হয়তো ভাবছিলেন, যে খাবার রয়েছে তা হয়তো তিনজনের জন্য যথেষ্ট নয়। বাড়তি কেউ বসলে হয়তো খাবারে ঘাটতি পড়ে যাবে।
অথচ খাবার শেষে দেখলাম প্রায় অনেক থালাতে প্রচুর খাবার পড়ে আছে। যাইহোক খুব জড়সড় হয়ে একটা থালার পাশে বসে পড়লাম। ওখানে বসা বাকী চারজন বাংলাদেশি তেমন একটা কিছু বললেন না। অবাক হয়ে দেখলাম, বেশ কিছু মিসরি ও আরব মাত্র দু’জন করে খাবারের থালা দখল করে আছে। ওখানে এমনকি তৃতীয় কাউকেও বসতে দিচ্ছেনা। এসব দেখে বিষণ্ণতায় ভরে গেলো মন। মনে হলো, আমার পবিত্র উদ্দীপনাতে কেউ যেন ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিলো। পবিত্র রমজানের মূল মন্ত্র হলো আত্মসংযম, আর রিপুর চাহিদাকে বলিদান দেয়া। কিন্তু পাঁচ তারা হোটেলের উচ্চবিত্তের ইফতার পার্টি বলুন কিংবা নিম্নবিত্তের জন্য নির্ধারিত তাবুই হোক; কোথায় খুঁজে পেলামনা রমজানের সহমর্মিতা।
রমজান মাসে স্থানীয় কাতারি নাগরিক এবং ধনী শেখেরা অকুণ্ঠচিত্তে দান-খয়রাত করেন। প্রতিটি মসজিদে বাংলাদেশের মতো মহল্লা-বাসী ইফতারি ও খাবার সরবরাহ করেন। আমি একটি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর কথা জানি, যেখানে রমজান মাসের ৩০ দিন বিনা মূল্যে সবাইকে ইফতারি পরিবেশন করা হয়। রেস্তোরাঁর কাতারি মালিক ইফতারের যাবতীয় খরচ নিজে বহন করেন। তিনি এটা জাকাত নয়, বরং বাড়তি সোয়াবের জন্যই করেন।
কাতারে দোহা শহরের বিশেষ জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে কামান। ইফতারের সময় হলে এসব কামানের তোপধ্বনি নগরবাসীকে ইফতারের সময় জানিয়ে দেয়। কাতার টেলিভিশন চ্যানেলেও কামানের তোপধ্বনি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। কাতারের ঐতিহ্যবাহী এই রীতি সত্যিই উল্লেখ করার মতো।
কাতারে সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবুতে ব্যাচেলর, শ্রমিক এবং নিম্নবিত্ত প্রবাসীদের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয়। এটা সবার জন্য থাকে উন্মুক্ত, ফলে অনেক অমুসলিমও এই ইফতারে শরিক হয়। ইফতারের সময় মুসলিম কিনা এ নিয়ে কোনো রকমের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় না।
ইফতারের এক ঘণ্টা আগেই এসব তাঁবুতে মানুষের সমাগম শুরু হয়, তাই দেরি করলে জায়গা পাওয়া সম্ভব নয়। খুব সুশৃঙ্খলভাবে তাঁবুতে সবাইকে বসানো হয়। ইফতারের জন্য একটি বড় আকারের থালাতে পোলাও-এর সাথে মুরগির রোস্ট কিংবা আরবি স্টাইলে রান্না করা মাটনের তরকারি দেয়া হয়। এছাড়া থাকে খেজুর ও জুস কিংবা লাচ্ছির মতো শরবত, যা এখানে ‘লাবান’ নামে পরিচিত। এটা খুবই প্রসংশনীয় উদ্যোগ বলে আমার মনে হয়েছে।
রমজান মাসে স্থানীয় কাতারি নাগরিক এবং ধনী শেখেরা অকুণ্ঠচিত্তে দান-খয়রাত করেন। প্রতিটি মসজিদে বাংলাদেশের মতো মহল্লাবাসী ইফতারি ও খাবার সরবরাহ করেন। আমি একটি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর কথা জানি, যেখানে রমজান মাসের ৩০ দিন বিনা মূল্যে সবাইকে ইফতারি পরিবেশন করা হয়। রেস্তোরাঁর কাতারি মালিক ইফতারের যাবতীয় খরচ নিজে বহন করেন। তিনি এটা জাকাত নয়, বরং বাড়তি সোয়াবের জন্যই করেন।
দোহার রেস্টুরেন্টের সামনে বাংলাদেশের মতো হরেক রকমের ইফতারি সাজিয়ে রাখা হয়। দোহার ন্যাশনাল এলাকাতেই বসে বাঙালিদের আড্ডা। ইফতারি কেনার জন্য তাই আমি ন্যাশনালেই ছুুটে যেতাম। কিন্তু সেই ন্যাশনাল এখন ঠাঁই নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। ভেঙে ফেলা হয়েছে ন্যাশনালের সবচেয়ে ব্যস্ত এলাকা। এখন সেখানে দেখি কেবল কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপ আর দানবাকৃতি ক্রেনের সারি। এই ধ্বংসস্তূপের ওপর গড়ে উঠছে অত্যাধুনিক মুশাইরিব শহর। আধুুনিকতার কাছে অবশেষে পরাজিত হলো ঐতিহ্য। ওই এলাকার পাশ দিয়ে যখনই যাই, কিছু একটা হারিয়ে ফেলার বেদনা মনটাকে খামচে ধরে। মনে হয়, নীলিমায় এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে প্রাণচঞ্চল ন্যাশনাল এলাকার গুঞ্জন।
দোহাকে যেভাবে ভেঙেচুরে নতুন করে গড়া হচ্ছে, তাতে ইতিহাস বলে আর কিছু রইবে না। ন্যাশনালের বাঙালি হোটেল ‘বনফুল’ এখন ব্যবসা জমিয়েছে শিল্প এলাকায়। কিন্তু ‘সোনাগাজী’ হোটেলের মালিক ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ারই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সোনাগাজী হোটেলের চা এতই প্রসিদ্ধ ছিলো যে কাতারের স্বয়ং আমির ও তাঁর স্ত্রী শেখা মওজা সোনাগাজীর চা খেতেন।
মাত্র কদিন হলো আমার বাড়ির কাছেই চালু হয়েছে নতুন বাঙালি রেস্টুরেন্ট। সুখের কথা হলো, সোনাগাজীর চায়ের কারিগর রয়েছে এই হোটেলে। তারাবি শেষ করে ফেরার পথে দেশের মতো হোটেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে চা খেতে না পারলেও গাড়িতে বসেই নিয়মিত চায়ের পর্বটা সেরে ফেলি।
দোহার প্রায় প্রতিটি মসজিদেই ৮ কিংবা ২০ রাকাত তারাবির নামাজ হয়ে থাকে। তবে খতমে তারাবি পড়ানো হয় এমন মসজিদের সংখ্যা আগের চেয়ে এখন অনেক কমে গেছে। খতমে তারাবির কথা বলতে গেলে মুশাইরিব এলাকার বুখারি মসজিদের কথা বলতেই হয়। মসজিদের ইমাম বাংলাদেশি। ইমাম ও তাঁর ছেলে দুজন মিলেই খতমে তারাবি পড়ান। তাঁদের সুললিত কণ্ঠের কেরাত ও শুদ্ধ উচ্চারণ মন কেড়ে নেয়।
সম্প্রতি জুমার খুতবায় তারাবি নামাজ নিয়ে দোহার একজন ইমামের মন্তব্য বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। তিনি খুতবায় যাঁরা ২০ রাকাত নামাজ পড়েন, তাঁদের যেভাবে উড়িয়ে দিলেন তা শুনে রীতিমতো ঘাবড়ে গেলাম। তাঁর মতে, এশার পরে তারাবি পড়াটাই শুদ্ধ নয়। কারণ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম নাকি কেবল গভীর রাতে তাহাজ্জুদের বদলে তারাবির নামাজ পড়তেন। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা না রেখে এভাবে কথা বলাটা সত্যিই দুঃখজনক।
দেশে যখন ছিলাম তখন তারাবি কত রাকাত পড়তে হবে, সে নিয়ে কখনো বিতর্ক হতে দেখিনি। ইদানীং এই বিতর্কে দেশের মানুষও জড়িয়ে পড়ছেন বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের টেলিভিশনেও দেখলাম এ নিয়ে কথা হচ্ছে। চ্যানেল আইয়ের ‘কাফেলা’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপকের মতে, যাঁরা আট রাকাতের পক্ষে বলছেন, তাঁরা মূলত এজিদের চক্রান্তই বাস্তবায়ন করে চলেছেন। কী অদ্ভুত কথা!
এদিকে মিসরভিত্তিক ইসলামিক টেলিভিশন ‘চ্যানেল হুদা’র প্রশ্নোত্তর পর্বেও একই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করছিলেন শ্রোতারা। অনেকের প্রশ্ন ছিলো, খোদ হারাম শরিফ ও মসজিদে নববিতে যদি ২০ রাকাতের খতম তারাবি হয়, তাহলে ২০ রাকাত পড়তে অসুবিধা কোথায়? যাঁরা ২০ রাকাত অথবা কম পড়ছেন, দুই পক্ষের কাছেই হাদিসের দলিল রয়েছে। পার্থক্য হলো, কে কীভাবে হাদিসের ব্যাখ্যা করছেন।
হুদা টেলিভিশনের মুফতিরা কারও প্রতি বিষোদ্গার না করে যেভাবে উত্তর দিয়েছেন, সেটা ভালো লেগেছে। হাদিস নিয়ে আলোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়, তাই সেদিকে যেতে চাই না। তবে ঈদের চাঁদের মতো তারাবি নিয়েও আমরা যেভাবে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছি, তা আমাকে ভাবিয়ে তোলে। অন্যের দিকে আঙুল না তুলে নিজে যেটাকে শুদ্ধ মনে করি, সেটা শান্তিপূর্ণভাবে কি আমরা পালন করতে পারি না?
এবারের রমজানে দোহায় বোরকাবৃত মহিলা ভিক্ষুকদের উৎপাত লক্ষ করা যাচ্ছে। ধরুন, আপনি কাপড়ের দোকানে ঢুকেছেন কাপড় কিনতে, হঠাৎ দেখবেন বোরকাবৃত একজন মহিলা আরবিতে আপনার কাছে টাকা চাইছে।
একদিন এক বন্ধুর সঙ্গে শপিং করছি, দেখি একজন বোরকাওয়ালি ভিক্ষুক দোকানে হাজির। আমার বন্ধু ১০ রিয়াল দিতে গেলে উনি নেবেন না, আরও বেশি চাই। আমরা বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। শেষ পর্যন্ত আরও বেশি দিয়ে উদ্ধার পাওয়া গেলেও টাকা হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে আরবিতে আমাদের উদ্দেশে খিস্তিÍ আওড়াতে লাগলেন মহিলা।
বাড়ি বাড়ি গিয়েও এরা ভিক্ষা করে থাকে। বিশেষ করে, রমজানের সময় এদের সংখ্যা বেড়ে যায়। সেদিন ইফতারির আগে আমার বাড়িতেও এক মহিলা ভিক্ষুক এলো, সঙ্গে ৮-১০ বছর বয়সী মেয়ে। ওদের পরনের কাপড় বেশ পরিপাটি, দেখে মনে হলো না ভিক্ষুক। যা-ই হোক, আমি কথা না বাড়িয়ে হাতে কিছু দিয়ে ওদের বিদায় করলাম। আমার এক বন্ধু বললেন, ওরা আসলে ভিক্ষুক নয়। বাড়ি যাওয়ার পথে দরজার কড়া নেড়ে যদি কিছু আয় করা যায়, তাতে মন্দ কী?
সেদিন মসজিদের দরজায় এক পাঠান বুকে ব্যান্ডেজ বেঁধে হাজির, সাহায্য চাইছে। পরে দেখা গেলো ব্যান্ডেজটা ভুয়া।
কাতারে ভিক্ষা করা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। ভিক্ষুক দেখলেই পুলিশকে জানানোর নির্দেশ রয়েছে। প্রবাসে যে কেউ আর্থিক সমস্যায় পড়তে পারেন। তাই কেউ সাহায্য চাইলে ভিক্ষুক মনে করে তাড়িয়ে না দিয়ে সাধ্যমতো কিছু দেওয়াটাই ভালো।
জানুয়ারি, ২০১১
