বাড়ীর কাছের একটি সেলুনে গিয়েছি চুল কাটতে। কেরালার যে ক্ষৌরকার আমার চুল কাটতো সে নেই। তার জায়গায় এক তরুণ ক্ষৌরকার আমাকে অভ্যর্থনা জানালো হিন্দিতে। চুল কাটা শুরু হতেই বুঝলাম এই তরুণের ক্ষৌরিক দক্ষতা অতি উৎকৃষ্ট মানের। মনে মনে বেশ পুলকিত হলাম। এর মধ্যে বেজে উঠলো আমার মুঠোফোন। কথা বলে ফোন রাখার পরই ও বলে উঠলো, “আঙ্কেল আপনি কি বাংলাদেশি?”। চুলকাটার ফাঁকে ফাঁকে এভাবে আলাপ জমে উঠলো। ওর নাম হচ্ছে সালাম। কাতারে এসেছে মাত্র মাস খানেক হল।
সালাম একজন বাঙালি দালাল ধরে এই সেলুনে চাকরী নিয়ে কাতারে এসেছে। যেসব কথা বলে তাকে আনা হয়েছে চাকরীতে, এসে দেখে তার সাথে কোনো মিল নেই। বেতন যা পাবার কথা, পাচ্ছে তার অর্ধেক। দৈনিক কাজ করতে হচ্ছে বারো থেকে চৌদ্দ ঘন্টা। সালাম বলছিল, “দীর্ঘক্ষণ কাজ করার পর মনে হয় নিজের সব ওজন হারিয়ে ফেলেছি; টোকা দিলেই মাটিতে পড়ে যাবো।” কাতারে আসার পর সেই দালাল লাপাত্তা। চাকরীতে যোগ দেয়ার পর চুক্তিপত্র পাবে বলে কথা দেয়া হলেও সেই চুক্তিপত্র এখনো সালামের হাতে আসেনি। সবার মুখেই শুনি একই ধরনের প্রতারনার কথা। জানিনা এই প্রতারনার শেষ কোথায়?
প্রবাসে এসে সালাম এখন ডাঙায় তোলা মাছের মতো ছট্ফট্ করছে। সালামের মনজুড়ে এখন কেবল বাংলাদেশ আর মায়ের মুখ। একবার মায়ের মুখ দেখতে পেলে প্রবাসের সব দুঃখ-কষ্ট এক নিমিষেই উধাও যাবে তার। মাকে ছেড়ে কখনে দুরে থাকেনি সালাম। একবার গ্র্রাম ছেড়ে শহরে গিয়েছিলো কাজ করতে। মাকে ছেড়ে থাকতে পারেনি বেশীদিন। সালাম বাইরে গেলে, বাড়ী ফিরতে দেরী হলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছেলে অপেক্ষায় থাকেন তার স্নেহময়ী মা। আমি সালামের মনের কোনো জমানো কষ্টের কথা মনযোগ দিয়ে শুনছিলাম। ভাবলাম, আমাকে সব খুলে বললে হয়তো ওর বুকের কষ্ট কিছুটা হলেও হালকা হবে। কিন্তু সালামের কথা শুনতে শুনতে মনে হলো আমার কলজেটাকে খামচে ধরেছে কষ্টের থাবা।
মা দিবস গেছে মাত্র কদিন হলো। মায়ের কথা তেমন করে ভাবা হয়নি আমার। সালামের মতো আমার মা-ও জানালার গ্রীলে হাত রেখে সদর দরজার দিকে তাকিয়ে আমার প্রতিক্ষায় দিন গুনতেন। ৯ ভাই ২ বোনের পরিবারে আমি ছিলাম কনিষ্ঠ সন্তান। তাই মার আদর ও ভালোবাসা অন্য ভাইবোনদের তুলনায় যেনো একটু বেশীই পেয়েছি। মা ভেবেছিলেন, সবাই চলে গেলেও ছোটো ছেলেটা হয়তো তাঁর পাশে থাকবে, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি।
একদিন মাকে ছেড়ে আমি চলে গেলাম সবচেয়ে দূরে, পাড়ি জমালাম সুদূর অস্ট্রেলিয়ায়। অস্ট্রেলিয়া থেকে আমার বাড়ী যাবার সময় হলে, নির্ধারিত দিনের বেশ কদিন আগে থেকে মা দিন গুনতেন। গেটে কড়া নাড়ার শব্দ শুনে জিজ্ঞাসা করতেন, আমি এলাম কিনা। আমার মায়ের এলামেলো ভাবনা কখন যে বৃষ্টির ফোটার মতো দু’চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিল, বুঝতে পারিনি। আমার সামনেই রয়েছে সেলুনের বিশাল আয়না। দেখা যাচ্ছিল আমার ও সালামের মুখ। আমার চোখ যেনো প্রতারনা করতে চাইছে আমার সঙ্গে। আমি চাচ্ছি না, আমার কষ্টের ষ্ট্যাটাসের ছায়া পড়ুক ওই আয়নায়।
সময়ের বিবর্তনে বাবা-মা, সন্তান ও পরিবারের অন্যান্য সদস্য মিলে যৌথ পরিবারের প্রথা ভেঙ্গে পড়ছে দেশে দেশে। নারী বলুন কি পুরুষ, সবাই নিজের মতো করে স্বতন্ত্র জীবন-যাপন করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কাজের খোঁজে ছুটছেন সবাই গ্রাম ছেড়ে শহরে, দেশ থেকে দেশান্তরে। আগের মতো বাবা-মা কেন্দ্রিক পরিবারের বাঁধন অনেকটা শিথিল হয়ে পড়েছে। ফলে জীবনের শেষ সময়ে এসে পিতামাতারা আর্থিক সমস্যায় ভুগছেন, তাদের আশ্রয় ও বাসস্থানও হারাচ্ছেন। এজন্যই বাংলাদেশে সরকারী এবং বেসরকারী উদ্যোগে এখন গড়ে উঠছে অনেক বৃদ্ধাশ্রম।
আমার দৃষ্টিতে বৃদ্ধাশ্রম হল যুগের চাহিদামাত্র। আমরা অনেকেই বিষয়টাকে ঘৃণা করলেও আশ্রয়হীন প্রবীণদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম হচ্ছে অনেকটা আর্শীবাদের মতো। পত্রিকায় হরহামেশা ছাপা হচ্ছে সন্তান কর্তৃক অসহায় বৃদ্ধ পিতা-মাতার নিগৃহীত হবার কথা। জীবনের সবকিছু উজাড় করে দিয়ে পিতা-মাতা ছেলে মেয়েকে শিক্ষিত করেছেন। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এখন কেউ নেই তাঁদের পাশে। ছেরে-মেয়েদের সবাই তাদের সংসার ও জীবন নিয়ে ব্যস্ত প্রবাসে। সন্তান থেকেও নেই এমন অনেক বাব-মা, বৃদ্ধাশ্রমে এসে একাকিত্বের কষ্ট থেকে কিছুুটা হলেও মুক্তি পেয়েছেন। আশ্রমের চার দেয়ালের আড়ালে সমমনা প্রবীণ বন্ধুবান্ধবদের সাথে হাসি-কান্না ভাগাভাগি করে কেটে যাচ্ছে তাঁদের জীবন। দুবেলা আহার কোত্থেকে জুটবে, অন্তত সে নিয়ে আর ভাবতে হয়না।
পশ্চিমা বিশ্বে বৃদ্ধাশ্রমের প্রথা চালু হয়েছে অনেক অগে। পশ্চিমা দেশে বুড়ো হলে বাব-মাকে জোর করে বৃদ্ধাশ্রমে যে পাঠানো হয় তা নয়। ওরা ভীষণ আত্মনির্ভরশীল। বুড়ো বয়সে ছেলেমেয়েদের উপর বোঝা হয়ে থাকবেন, এমন কখনো ভাবেন না। ওদের সামাজিক কাঠামোটাই এমন। আঠারো বছর হলে ছেলে মেয়েদের নিজের পথ নিজেদেরই খুঁজে নিতে হয়। ওরা কখনো যদি বাব-মার সাথে একই বাড়ীতে থাকে তাহলে বাড়ী ভাড়াটাও বাবাকে দিয়ে দেয়। আমাদের সমাজে এমন প্রথার চল এখনো হয়নি। চাকরী করলেও বাবার হোটেলে থাকবো, আবার ভাড়া কিসের?
সিডনী শহরের একটি ঘটনার কথা বলি। আমার বাড়ীর অদূরে একটি বড় বাসায় একা থাকতেন এক বৃদ্ধা। লাঠিতে ভর দিয়ে টুক টুক করে ফুটপাত দিয়ে বাসস্ট্যান্ডে হেঁটে যেতে দেখতাম তাঁকে। কখনো মুখোমুখি হলেই হাসি মুখে স্বাগত জানাতেন। একদিন দেখি, হাতে সপিং ব্যাগ নিয়ে বাস থেকে নামছেন। অনেক আপত্তি সত্ত্বেও বৃদ্ধার একটি সপিং ব্যাগ হাতে করে বাসায় পৌঁছে দিলাম।
বৃদ্ধার স্বামী মারা গেছেন বহু আগে। দুটো সন্তান, নিজেদের পরিবার নিয়ে থাকে অন্য এলাকায়। রান্না-বান্না, ঘরে-বাইরের সব কাজ নিজেই করেন। সপ্তাহে একদিন হাসপাতাল থেকে নার্স আসে চিকিৎসার জন্য। বৃদ্ধার একাকিত্বের কথা ভেবে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। তাকে বললাম, “একা থাকতে তোমার ভয় করেনা?” একটু হেসে উত্তর দিল, “এটা আমার জীবন। নিজেকেই লালন করতে হবে।” পাশে কেউ নেই বলে বৃদ্ধাকে একটুও হা-হুতাশ করতে দেখলাম না। যা আছে তা নিয়েই সে সুখী।
বৃদ্ধ বয়সে আমার মায়ের মধ্যেও এমন ধরনের স্বাবলম্বী ভাব দেখেছি। জীবনের তাগিদে প্রায় সব সন্তান দুরে চলে গেলেও একাকিত্ব নিয়ে মা কখনো অনুযোগ করতেন না। আমার মা কারো উপর নির্ভর না করে নিজের কাজ নিজে করতে পছন্দ করতেন। তিনি সন্তানদের উপর বোঝা হয়ে থাকতে চাননি, তাই একাকিত্ব বরণ করেও বাবার ভিটেতে বাকী জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছেন।
পিতা-মাতার সেবা করা প্রতিটি সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালত করতে কজনই বা সফল হয়? বৃদ্ধ বয়সে যাতে সন্তানের অবহেলার শিকার না হন, সেজন্য বাংলাদেশে ২০১৩ সালে পাশ হয়েছে পিতা-মাতার ভরপোষণ আইন। এ আইনে পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, নানা-নারি ভরণ-পোষণ করা সন্তানের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। এর অন্যথা হলে শাস্তিরও বিধান রয়েছে। চীন এবং পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সে বাব-মার অধিকার রক্ষার জন্য বিধান রয়েছে। ফরিদপুরের একজন বৃদ্ধা মা মা-বাবার ভরপোষণ আইনের আওতায় আদালতে ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এ নিয়ে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এই মামলা বঞ্চিত বাবা-মায়েদের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
মা দিবস নিয়ে অনেকে অনুযোগ করে বলেন, একটি দিন কেনো? বছরের সবদিনই মা দিবস হওয়া উচিত। মানি সে কথা। তবে বদলে যাওয়া এই ব্যস্ত পৃথিবীতে এই দিবসটি যদি একটি দিনের জন্যও ঘটা করে মায়ের কথা মনে করিয়ে দেয় কিংবা মায়ের জন্য ভালোবাসার ফুল ফোটাতে পারে, তাতে দোষের কি? বছরের এই একটি দিন মা দিবসে যদি মার গলা জড়িয়ে ধরে বলতে পারি, “মা, তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি”, সেটাও কম কিসে?।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দিনে মা দিবস পালিত হলেও মূলত আমেরিকাকে অনুসরণ করে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশে মা দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশে সব বয়সীরাই এই দিনে মাকে কি উপহার দেয়া কিংবা মাকে কিভাবে চমক দেয়া যায় সে নিয়ে নানা পরিকল্পনা করে থাকে। বিভিন্ন গিফ্টের দোকান এবং খাবারের রেস্তোঁরাগুলো মা-সন্তানদের আগমনে মুখরিত হয়ে ওঠে। এমন একটি সুন্দর ও মিষ্টি দিনকে স্বাগতঃ না জানিয়ে কি পারা যায়?
১৪ মে, ২০১৭
