নাগরিকত্ব এবং ভিসা নিয়ে কাতার সরকারের দু’টি সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত কাতারের সব প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত দু’টি হচ্ছে, কাতারে বসবাসরত প্রবাসীদের অনেকে নাগরিকত্ব পাবেন আর কাতার ভ্রমনে ভিসা ছাড় পাচ্ছেন ৮০টি দেশের নাগরিক। নাগরিকত্ব পাবার খবর শুনে অনেকেই উদ্দীপ্ত। ভাবছেন নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন সহসা। কিন্তু বিষয়টি এতোটা সোজা সাপ্টা নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি আমেরিকার অভিবাসন পাবার জন্য পয়েন্ট সিস্টেম চালু করেছেন। উদ্দেশ্য, দক্ষ জনশক্তিকে আমেরিকা যেতে উৎসাহিত করা। কানাডা, অষ্ট্রেলিয়াতেও অনেকটা একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরন করা হয়। কিন্তু দেখা গেছে, ভালো ডিগ্রী ও যোগ্যতা নিয়েও এই পয়েন্ট সিস্টেমে যোগ্যতার শর্ত পূরণ করা বেশ দুরূহ হয়ে পড়ে। আমেরিকার ওয়াশিংটন পোষ্টের একটি প্রতিবেদনে হিসাব কষে দেখানো হয়েছে কিভাবে একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রার্থীও ট্রাম্পের পয়েন্ট সিস্টেমের শর্ত পূরন করতে ব্যর্থ হবেন। এই ঘোষণার পেছনে কাতার সরকারের উদ্দেশ্য কি সেটা না জানা পর্যন্ত নতুন নাগরিকত্ব আইন নিয়ে উদ্বেলিত হবার মতো তেমন কিছু আমি দেখিনা।

আমার বিশ্বাস, কাতারের নাগরিকত্বের আইনটি মূলতঃ যেসব শিশুর মা হলেন কাতারী নাগরিক এবং বাবা বিদেশী তাদের নাগিরকত্ব দেয়ার জন্যই করা হয়েছে। আরব দেশের আইন অনুযায়ী নবজাতক শিশুর বাবা যে দেশের নাগরিক সে দেশেরই নাগরিকত্ব পায়। কাতারের বিরুদ্ধে আবরোধ আরোপের পর কাতারে জন্ম নেয়া অনেকেই সবকিছু ফেলে তাদের বাবার দেশে ফেরত যেতে বাধ্য হয়েছেন। এতে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে অনেক কাতারী পরিবার। এটি কাতার সহ বিশ্বের অন্যান্য মানবাধিকার কমিশনেরও নজরে এসেছে। এদের সাথে সাথে যে সব প্রবাসী নাগরিক কাতারের জন্য উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবেন তারাও নাগিরকত্ব পাবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই অবদানের বিষয়টি খুবই অষ্পষ্ট ফলে কোন শ্রেণীর প্রবাসীরা এই সুবিধা পাবেন সেটা বলা অনেকটা অসম্ভব। মনে হচ্ছে এটা পুরাপুরি নির্ভর করবে কর্তৃপক্ষের মর্জির উপর।

কিন্তু বাংলাদেশের বেশ কিছু নিউজ পোর্টালে যেরকম বিকৃত করে খবরটি উপস্থাপন করা হচ্ছে তা দেখে চম্কে উঠেছি। লেখা হচ্ছে, “কাতারে বসবাসরত হাজার হাজার বিদেশী নাগরিকত্ব পেতে যাচ্ছেন”; “বিদেশীরা চাইলেই নাগরিক হতে পারবেন” ইত্যাদি। খবর পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু টেলিফোন ও মুঠোফোনে বার্তা পেলাম। অনেকেই আবদার করে বলছেন কাতারের নাগরিকত্ব কখন নিচ্ছি কিংবা কিভাবে নাগরিকত্ব পাওয়া যেতে পারে ইত্যাদি। অন্যদিকে ৮০টি দেশকে ভিসা ছাড় দেয়ার খবরটি অনেক জায়গায় এসেছে এভাবে “কাতারে নাগরিকত্ব পাওয়া ৮০টি দেশের তালিকায় নেই বাংলাদেশ।”

পাঠকদের আকৃষ্ট করার জন্য সাংবাদিকরা অনেক সময় লেখার বিষয়বস্তু সাথে কিছুটা অসামঞ্জস্যপূর্ন চটকদার শিরোনাম দিয়ে থাকেন। কিন্তু ভিসা ছাড় দেয়াকে নাগরিকত্ব দিচ্ছে বলে চালিয়ে দেয়াটা কি স্বেচ্ছাকৃত তথ্য বিকৃতি নাকি চরম অজ্ঞতা বলতে পারবোনা। এ ধরনের খবর সোস্যাল মিডিয়ায় প্রচুর শেয়ার করা হয় বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। ফলে কোনটা আসল আর কোনটা নকল সংবাদ তা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। সিএনএন-এর মতো সংবাদ মাধ্যমের খবরকে ফেইক নিউজ বলাতে আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনা করি। তবে কাতারের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রকাশিত বিকৃত সংবাদগুলোই হচ্ছে আসল ফেইক নিউজ। সংবাদ মাধ্যম, পোর্টালের সাথে জড়িত অনেকের এই বেহাল অবস্থা দেখে ভীষন কষ্ট হয়। সংবাদের শিরোনাম কি আর তার নীচে কাট এন্ড পেষ্ট করে কি বসানো হচ্ছে সেটা দেখারও যেনো হুশ নেই সাংবাদিক বন্ধুদের।

সেদিন গুগলে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেশ কয়েকটি নিউজ পোর্টালে চোখে পড়লো ভিসা প্রতারণা নিয়ে আমার একটি কলাম। লেখাটি দেশের জাতীয় একটি দৈনিকে ছাপানো হয়েছিলো। একটি পোর্টালে দেখলাম লেখাটির সূত্র দুরে থাক খোদ লেখক অর্থাৎ আমার নামই নেই। লেখাটি তাদেরই কোনে প্রতিনিধির পাঠানো সেটা বোঝানোর জন্য শুরুতেই লেখা হয়েছে ”কাতার থেকে”। অন্য জায়গায় দেখলাম লেখায় কয়েকটি কাতারের চমৎকার ছবি জুড়ে দিয়ে মূল লেখা থেকে একটু পৃথক করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও সূত্রের কোনো উল্লেখ নেই। বাংলাদেশের যে পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হয়েছিল তার সম্পাদকের চোখে লেখাগুলো পড়লে তিনি ভাবতে পারেন আমি ইচ্ছে করেই বিভিন্ন পত্রিকায় একই লেখা দিয়েছি। যা আমার জন্য খুবই বিব্রতকর। কলামটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা নিয়ে লেখা। তাই এর বহুল প্রচারেরও প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সূত্র এবং লেখকের নাম দেয়ার মতো সৌজন্যবোধ ও সততা হারিয়ে গেলে কি আর বাকী থাকে?

ভিসা ছাড় দেয়ার তালিকায় বাংলাদেশের নাম না থাকায় মর্মাহত হয়েছেন অনেকে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রবাসী নাগরিকদের মনের কোনে প্রত্যাশা ছিল তারা হয়তো এই সুযোগটি পাবেন। তাই কেবল প্রতিবেশী দেশ ভারতের নাগরিকদের ভিসা ছাড় পাওয়াটা বাংলাদেশ সহ পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলংকার অনেক প্রবাসীদের মনে ক্ষোভেরও সঞ্চার করেছে। পরে অবশ্য পাকিস্তানকেও এই তালিকায় স্থান দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি ব্যাক্তিগতভাবে এ নিয়ে হতাশও নই, ক্ষুব্ধও নই। কারন এ ধরনের সিদ্ধান্ত নৈতিক দৃষ্টকোণ থেকে নয় বরং দেশের রাজনৈতিক, সামরিক, ব্যবসায়িক স্বার্থ ইত্যাদি বিবেচনা করেই নেয়া হয়ে থাকে। এতে আবেগের কোনো স্থান নেই। যেমন সম্প্রতি ফিলিস্তিনের হামাসকে আমেরিকার ও ইসরাইলের মতো সৌদি আরব সহ বেশ ক’টি আরব দেশও সন্ত্রাশী সংগঠন হিসাবে ঘোষনা করেছে। এই সিদ্ধান্ত আমি মনে করি পুরোপুরি রাজনৈাতিক এবং ওই সব দেশের স্বার্থরক্ষার জন্যই নেয়া হয়েছে। এর সাথে ন্যায়-নীতি কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে কাতার, তুরস্ক সহ বহু দেশ হামাসকে ফিলিস্তিনের স্বাধিকার আদায়ের জন্য নিবেদিত একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবেই স্বীকৃতি দেয়।

চার দেশের অবরোধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বকাপ ফুটবলকে সামনে রেখে বিশেষ করে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ওই সব দেশ থেকে কাতারে পর্যটন বৃদ্ধি করার জন্যই এই পদক্ষেপ নিয়েছে কাতার। এইজন্য ভিসা ছাড়ের তালিকায় ইউরোপ এবং আমিরকার দেশগুলোই বেশী প্রাধান্য পেয়েছে। লেবানন ছাড়া অধিকাংশ আরব দেশ এই তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। নেই আফ্রিকার দেশ, নেই ফিলিপিন্স। রয়েছে মুসলিম প্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও মালদিভ্স। কাতারের বিরুদ্ধে আবরোধে যোগ দেয়ার জন্য যে সোমালিয়া সৌদি জোটের ৮কোটি ডলারের লোভনীয় সাহায্যের প্রস্তাব প্রত্যখান করে কাতারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, সেই সোমালিয়ার নামও নেই এই তালিকায়।

ভিসা ছাড়ের বিষয়টি দু’টি দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের কথা ভেবেই নির্ধারণ করা হয়। কিছুদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারতের উচ্চ পর্যায়ের সরকারী কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ীরা যাতে ভিসা ছাড়া কাতারে যাতায়ত করতে পারেন সেজন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে গেছেন। কাতারের সাথে এই ধরনের কোনো চুক্তি বাংলাদেশ করেছে কিনা আমার জানা নেই। কাতারের প্রতিটি প্রশাসনিক স্তর, মিডিয়া, বানিজ্য এবং অর্থনীতিতে ভারতের যে প্রভাব তা অস্বীকার করার কোনো যো নেই। কাতার সহ পুরো গাল্ফ অঞ্চলে সত্তর দশক পর্যন্ত ভারতীয় মুদ্রা গাল্ফ রুপী নামে চলতো। ইউরোপ, আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলো ছাড়া কাতারে উচ্চশিক্ষিত, পেশাদার জনশক্তির প্রধান সরবরাহকারী দেশ হল ভারত। অন্যদিকে কাতারীদের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারনা হল বাংলাদেশ হচ্ছে শ্রমিক সরবরাহকারী দেশ। যদিও এটা সঠিক নয়, কিন্তু কোনো দেশের প্রতি এই ধরনের নেতিবাচক মনোভাব নীতি নির্ধারকদের উপর প্রভাব ফেলে। আমাদের ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই।

এ নিয়ে হতাশ না হয়ে কি করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ইতিবাচক করা যায় সে নিয়ে সবাইকে কাজ করতে হবে। ভারত কিভাবে কাতারে এতো প্রভাব খাটাচ্ছে সে নিয়ে ক্ষুব্ধ না হয়ে বরং কিভাবে আমরাও সেই অবস্থানে যেতে পারি সে নিয়ে ভাবতে হবে।

 

অগাস্ট ১৯, ২০১৭