নিম্ন আয়ের প্রবাসী কর্মী এবং শ্রমিকদের বিনোদনের জন্য কাতার সরকার প্রতিটি ঈদে প্রবাসীদের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। কাতারে কর্মরত শ্রমিকদের সিংহভাগই দোহা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে শিল্প এলাকায় থাকেন বলে অনুষ্ঠানের জন্য শিল্প এলাকার বিভিন্ন ভেন্যু বেছে নেয়া হয়। কাতারের অন্যান্য এলাকা যেমন আল খোর এবং আল ওয়াকরাতেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর কমিউনিটির জন্য আয়োজিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের জন্য ভেন্যু সংরক্ষণ, লেবার ক্যাম্প থেকে অনুষ্ঠানের ভেন্যুতে যাতায়তের জন্য বাস, বসার জন্য চেয়ার, নিরাপত্তা, সাউন্ড সিস্টেম ইত্যাদি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেই ব্যবস্থা করা হয়।
ঈদের এই আয়োজন দর্শকদের কাছে আকর্ষণীয় করার জন্য দেশ থেকে জনপ্রিয় কোনো শিল্পী কিংবা দল আনার জন্যও কর্তৃপক্ষ কমিউনিটিকে উৎসাহিত করে থাকেন। শিল্পী আনার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি সংগ্রহের জন্য সরকার সহযোগীতা করেন এবং অনেক সময় শিল্পীদের পারিশ্রমিক সহ আনুসাঙ্গিক খর মেটানোর জন্য কিছু আর্থিক অনুদানও দেয়া হয়। তবে এই অনুষ্ঠান শুধু বিনোদনের জন্য নয়, অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে কাতারের আইন কানুন সম্পর্কে প্রবাসী শ্রমিকদের অবহিত করাও একটি অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের বিভিন্ন তথ্যমূলক ঘোষণা দিতেও দেখলাম।
কাতারে শ্রমিক সরবরাহকারী প্রধান দেশগুলো যেমন ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার প্রবাসী কমিউনিটিকে অনুষ্ঠান করার জন্য বিভিন্ন ভেন্যু বরাদ্দ করে দেয়া হয়। যেমন এবারে নেপালি কমিউনিটি তাদের ঈদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকরলেন আল-আহলি স্টেডিয়ামে এবং পাকিস্তানীরা দোহা শহরের দক্ষিণে আল ওয়াকরা ফুটবল স্টেডিয়ামে। নেপালি এবং পাকিস্তানী কমিউনিটি ঈদেও আনন্দমেলায় তাদের নিজ নিজ দেশ থেকে জনপ্রিয় শিল্পীদেরও নিয়ে এসেছিলেন।
বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও ভারতীয় কমিউনিটি জন্য বরাদ্দ ছিল তিনটি মঞ্চ, বারওয়া আল-বারাহা ক্রিকেট মাঠ, এশিয়া টাউনের ক্রিকেট স্টেডিয়ামের গাড়ী পার্কিং এলাকা এবং লেবার সিটির অভ্যন্তরে ফুটবল মাঠ। উপরের ভেন্যুতে বাংলাদেশ এবং ভারতীয় কমিউনিটি যৌথভাবে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করে। অন্যদিকে তামিল ও মালায়ালাম কমিউনিটি আলখোর শিল্প এলাকার শ্রমিক বিনোদন কেন্দ্রকে বেছে নিয়েছিল। দোহা শহরের শিল্প এলাকার শেষ মাথায় হল এশিয়া টাউন; শিল্প এলাকার সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা। এখানে রয়েছে বিশাল ডিপার্টমেন্ট স্টোর “গ্রান্ডমল”, বেশ কয়েকটি সুপার মার্কেট, গহনার দোকান, বিনোদনের জন্য চার চারটি সিনেমা হল, এম্পিথিয়েটার এবং প্রচুর এশিয়ান খাবারের দোকান।
এশিয়া টাউন ও আবু হামর কবরস্থানের মাঝামাঝি রয়েছে লেবার সিটি, ভিন জাতীয় শ্রমিকদের বাসস্থান। এখানে কমপক্ষে ৬০ থেকে ৭০ হাজার শ্রমিক বসবাস করছেন। এশিয়া টাউন এমনভাবে তৈরী করা হয়েছে যাতে কেনাকাটা, খেলাধুলা, চিত্তবিনোদন ইত্যাদি কোনোকিছুর জন্যই যাতে শ্রমিকদের দোহা শহরে ভীড় জমাতে না হয়।
লেবার সিটির ঠিক দক্ষিণেই রয়েছে শ্রমিকদের আরেকটি বড় ধরনের বাসস্থান বারওয়া আল-বারাহা লেবার সিটি। অনেকেই এই নামটির সাথে পরিচিত নন। শিল্প এলাকার অন্তিম প্রান্ত হল ৫২ নং সড়ক। এই রোড ফেলে একটু দক্ষিণে গেলেই কারওয়া পকিং-এর সাথেই হল বারওয়া আল-বারাহা লেবার সিটি। যেখানে রয়েছে প্রায় ষাট থেকে সত্তর হাজার শ্রমিকের বাসস্থান। এশিয়া টাউনের মতো এখানেও রয়েছে খেলার জন্য বারাহা ক্রিকেট স্টেডিয়াম।
শিল্প এলাকায় যেমন শ্রমিকরা মেতে উঠেছেন আনন্দে, তেমনি দোহা শহরেও বসে নেই বাংলাদেশি পরিবার। বিভিন্ন বাড়ীতে চলছে কুরবানী ঈদের আয়োজন। কুরবানী মাংস দিয়ে হরেক পদের রান্না করে চলছে দাওয়াত, পাল্টা দাওয়াত। বাংলাদেশের মতো কাতারেও গরু কিনে ভাগাভাগি করে বাংলাদেশিদের অনেকে কুরবানী দিয়ে থাকেন।
আল ওয়াকরা, মিসাইদ, আল-খোর, আল-জাখিরা ,আবু নাখলা সহ কাতারের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ছোট-বড় গবাদি পশুর খামার। সুন্দর ছাউনি দেয়া এই খামারে পশুদের জন্য পর্যাপ্ত পানি ও খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রায় সব খামারেরই রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশি শ্রমিক। তাই কুরবানীর ঈদে পশু কিনতে গেলে দাম-দর করতে বিশেষ অসুবিধা হয়না। এইসব খামারে গরু, খাসি, উট ইত্যাদি সবই পাওয়া যায়। গরুর দাম ৪/৫ হাজার থেকে শুরু করে বড় আকারের অস্ট্র্রেলিয়ান গরুর ১৪/১৫ হাজার রিয়ালেও বিক্রি হয়। তবে এইসব খামারে কেবল কেনা-কাটাই হয়। পশু জবেহ করে কাটা-কুটির ব্যবস্থা একটি সুবিধামত জায়গায় নিজেদেরই করে নিতে হয়।
সৌদি জোটের অবরোধের পর প্রচুর গবাদি পশুর খামার স্থাপন করে দুধ এবং মাংস উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে কাতার । মরুর গরমে যাতে গরুর টিকে থাকতে পারে সেজন্য তৈরী হচ্ছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত খামার। বেশ কিছু ব্যবসায়ী ইতিমধ্যে কাতার এয়ারওয়েজের মালবাহী বোয়িং বিমানে করে হল্যান্ড এবং জার্মানীর বিখ্যাত হলস্টিন প্রজাতির গাভী আনতে শুরু করেছেন। এই প্রজাতির একটি গাভী দিনে গড়ে ৪০ লিটারের মত দুধ দিতে পারে। কাতারে যে হারে খামার বেড়ে চলেছে তাতে গরুর দাম আগামী কুরবানী ঈদে বেশ কমে আসবে বলেই মনে হচ্ছে।
কাতারের বিখ্যাত খামারগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শেখ ঘানেমের আল রাওদাহ এবং আল মাহা দুগ্ধ খামার । রেডিসন ব্লু পাঁচতারা হোটেলের ঠিক উল্টোদিকে রয়েছে শেখ ঘানেমের বিশাল প্রাসাদোপম অট্টালিকা। শেখের বাড়ীর বাইরে রয়েছে একটি ট্যাপ যা থেকে বেরিয়ে আসে সুস্বাদু লাবান। এই ট্যাপ থেকে দরিদ্র মানুষের মধ্যে আল-মাহা খামারের উৎপাদিত লাবান বিনামূল্যে বিতরন করা হয়। প্রতিদিন ভোরে আল-মাহা খামার থেকে আসে দুই হাজার লিটার দুধ । এই দুধ দিয়ে তৈরী লাবান ট্যাপে দেয়া হয়। জানা যায়, গত চল্লিশ বছর ধরে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত চালু রয়েছে এই ট্যাপ, বন্ধ হয়নি কখনো। শুধু তাই নয়, রমজানের সময় শেখ ঘানেম নিজস্ব খামারে উৎপাদিত মাখন এবং দুদ্ধজাত খাবার ও সব্জী, গরীব জনসাধারনের মধ্যে বিতরন করেন। শেখের এই বদান্যতার কথা কিংবদন্তি হয়ে ফিরছে মানুষের মুখে মুখে।
কাতারের সমাজ বান্ধব প্রতিষ্ঠান আল নূর সেন্টার প্রতি বছর ঈদুল আযহা উপলক্ষে বাংলাদেশের দারিদ্র এলাকাগুলোতে কুরবানির গোসত বিতরণ করে থাকে। এ বছর বাংলাদেশের পাশাপাশি কাতারের বিভিন্ন স্থানে ফ্রি ভিসায় আগত বেকার অসহায় প্রবাসীদের কুরবানির সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশে অথবা কাতারে পূর্ণ কুরবানি অথবা কুরবানির কিছু অংশ দরিদ্রদের দেয়ার জন্য কাতার প্রবাসী বাংলাদেশিদের আহ্বান জানিয়েছে আল নূর সেন্টার। এমন একটি ভালো উদ্যোগের জন্য আল-নূর সেন্টারকে ধন্যবাদ জানাই।
বহুদিন পর এই প্রথম বাংলাদেশি ব্যান্ড শ্রাবনের সাথে কাতারের শিল্প এলাকায় ঈদের কনসার্টে গান পরিবেশন করলাম। ব্যান্ডের টগবগে তারুন্যদীপ্ত সদস্যদের সাথে উন্মুক্ত মঞ্চে গান পরিবেশন করতে যেয়ে মনে হল যেনো ফিরে গেছি অতীতের ফেলে আসা সেই উচ্ছ্বল দিনগুলোতে; যখন আমি ব্যান্ডের সাথীদের নিয়ে এক মঞ্চ থেকে অন্য মঞ্চে গান পরিবেশন করে যেতাম। তবে কাতারের এই কনসার্টে গান করার সময় হৃদয়ের কোঠরে অনুভব করছিলাম ভিন্ন এক স্পর্শ, অন্যমাত্রার অনুভ’তি।
বাংলাদেশী ও ভারতীয় মিলিয়ে কনসার্টে আগত দর্শক-স্রোতা হলেন দশ হাজারের মতো খেটে খাওয়া মানুষ। তবে বাংলাদেশিদের সংখ্যাই বেশী মনে হল। ভাবছিলাম, কাছের মানুষদের স্বদেশে ফেলে রেখে শ্রমিক বন্ধুরা কাটাচ্ছেন ঈদ সুদুর প্রবাসে, এই মরুর দেশে। মঞ্চে উঠে দর্শকদের পানে তাকিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলাম। মনটা হারিয়ে যাচ্ছিল স্বদেশের সবুজ প্রান্তরে। গান শুরু করার পর দর্শকদের যেরকম সাড়া পেলাম তাতে মনটা ভরে গেলো। গানের তালে তালে কেউ নাচছিলেন, কেউ আবার আর আমার সাথে প্রান খুলে গাইছিলেন। মনে হচ্ছিল আজকের রাতটা ওরা হেসে গেয়ে কাটিয়ে দিতে চান, ক্ষণিকের জন্য হলেও ভুলে যেতে চান বিচ্ছেদ ও একাকিত্বের জ্বালা।
এই প্রথমবারের মতো ঈদের প্রথম দুই রাত পরিবারকে সাথে নিয়ে কোথাও বেড়াতে বের হতে পারিনি। কারন, পর পর দু’দিন ছিল ঈদের ঝাক্কাস কনসার্ট। তবে শ্রমিক ভাইদের সাথে ঈদের আনন্দ কিছুটা হলেও ভাগাভাগি করে নিতে পেরে নিজেকে খুব পরিতৃপ্ত মনে হচ্ছিল ।
২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
