কাতার থেকে আকাশপথে স্বদেশ পাড়ি দেয়ার অনেক বাড়তি পথ এখন খুলে গেছে। একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো জন্য রীতিমত সভা-সমিতি করতে হয়েছে। আর এখন? প্রতিদিনই থাকছে কোনো না কোনো এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট।
বাংলাদেশ বিমান এবং কাতার এয়ারওয়েজের সাথে যোগ হয়েছে আরো দুটি বাংলাদেশি বেসরকারী উড়োজাহাজ সংস্থা। এগুলো হচ্ছে হাবির গ্রুপের রিজেন্টস এয়ারলান্স এবং বাংলাদেশ-আমেরিকার যৌথ মালিকানধীন ইউ-এস বাংলা এয়ারলাইন্স। এই দু’টি উড়োজাহাজ সংস্থা মূলতঃ বোয়িং ৭৩৭ বিমান দিয়ে সেবা দিচ্ছে। বাংলাদেশ বিমানের মতো এই দুটি বিমানই দোহা থেকে সরাসরি চট্টগাম যাচ্ছে। ফলে চট্টগ্রামগামী যাত্রীদের ঢাকা হয়ে যাবার ভোগান্তি অনেক কমেছে।
এখন চাইলে সপ্তাহের যে কোনো দিন, সকাল কিংবা বিকেলে স্বদেশ পাড়ি দেওয়া যায়। আকাশপথে বিমান সংস্থাগুলোর প্রতিযোগীতা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশগামী যাত্রীরা লাভবান হচ্ছেন। স্বদেশে যাওয়ার উড়োজাহাজ ভাড়াও আগের তুলনায় অনেক কমেছে। এখন এক হাজার রিয়ালের কমে দেশে ফিরতি টিকেট পাওয়া যায়। প্রতিযোগীতার চাপে কাতার এয়ারলাইন্সও ভাড়া অনেক কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ বিমানের টিকেট এখন বারশ’ রিয়ালের নীচে পাওয়া যাচ্ছে।
সম্প্রতি দেশে গেছেন এমন বেশ কিছু বন্ধুদের সাথে তাঁদের আকাশপথে ভ্রমনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা হয়। দোহা থেকে ফ্লাইট চালুর মাত্র কিছুদিনের মধ্যে রিজেন্টস এবং ইউএস বাংলা নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ কানে আসছে। রিজেন্ট এয়ারলাইন্সে করে ঢাকা থেকে আসছিলেন একজন প্রবাসী বাংলাদেশীর ভাগ্নে। কাতারের সময় রাত ন’টায় দোহার আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দরে ফ্লাইট অবতরণ করার কথা। তিনি থাকেন দোহা শহর থেকে বহু দুরে আলখোর এলাকায়। যথাসময়ে তিনি বিমান বন্দরে স্বাগত জানাতে যান ভাগনেকে। ঘন্টা পেরিয়ে যায়, রিজেন্টস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটের দেখা নেই। এভাবে রাত দুইটা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর তিনি নিজের বাসস্তানের পথে রওয়ানা দেন। অর্র্ধেক পথ পাড়ি দেবার রাত তিনটের সময় ভাগ্নের ফোন আসে। ভাগ্নে এখন বিমান বন্দরে। তিনি ভাগ্নেকে টেক্সিক্যাব নিয়ে বাড়ী চলে আসতে বললেন।
রিজেন্টস-এর অন্য একজন ভুক্তভোগী যাত্রী জানালেন, চেক-ইনের সময় ট্যাগ না লাগিয়েই তাঁর একটি স্যুটকেস কনভেয়র বেল্ট দিয়ে ভেতরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। পরে বোর্ডিং করার ঠিক আগে ট্যাগবিহীন মালটি ফেরত আসলে বিষয়টি তিনি জানতে পারেন। এ নিয়ে বেশ ভোগান্তি হয়েছে সেই ব্যক্তির।
যাত্রীদের মালামালে ছাড় দেয়ার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ বিমান। বিমানের যাত্রীরা যাওয়ার সময় ৫০, আসার সময় ৩০, মোট ৮০ কিলো নিতে পারেন। তবে জানা গেছে, রিজেন্টস ও ইউএস বাংলাও যাত্রীদের এখন বাংলাদেশ বিমানের সমপরিমান ওজন বহনের সুবিধা দিচ্ছে।
যাত্রীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমানের কাতার কর্তৃপক্ষ এক মাসের জন্য “থার্ড পিস কনসেপ্ট” নামে বাড়তি মালামাল নেয়ার একটি সুযোগ দিচ্ছে। বিমানের নতুন এই কনসেপ্ট অনুযায়ী একজন যাত্রী মাত্র ৩৩০ রিয়ালের বিনিময়ে ২০ কিলোগ্রামের বাড়তি ওজন নিতে পারবেন। এই হিসাবে প্রতি কিলোগ্রামের জন্য খরচ হবে মাত্র ১৭ দশমিক ৫ রিয়াল। এমনিতে এক কিলোগ্রাম বাড়তি ওজনের জন্য সাধারণতঃ ৫০ রিয়াল দেয়ার কথা। বাংলাদেশ বিমানের এই সাময়িক পদক্ষেপ যাত্রীদের বাংলাদেশে বিমানে ভ্রমন করার জন্য বাড়তি উৎসাহ যোগাচ্ছে। বাংলাদেশ বিমান স্থায়ীভাবে এই সুযোগটি চালু রাখার কথা ভাবতে পারে।
বাংলাদেশগামী যাত্রীদের বাড়তি ওজন বিমানবন্দরে সবার জন্য মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মালাপত্র নিয়ে বিমান সংস্থার কর্মচারী এবং কিছু প্রবাসী বাংলাদেশীদের বানিজ্য করার কথাও একসময় শোনা গেছে। তবে সঙ্গে করে অতিরিক্ত মাল-পত্র নেওয়ার জন্য যাত্রীরাও বিভিন্ন রকম ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে থাকেন। চেক্-ইন করা হয়ে গেলে যাত্রীরা ভাবেন তাঁদের আর পায় কে? তাই কিছু যাত্রী চেক-ইন গেট পেরিয়ে বিমান বন্দরের অভ্যন্তরে শুল্কবিহীন দোকান থেকে প্রচুর পরিমান কেনাকাটা করেন। ভাবেন এসব নিয়ে তাঁকে আর কেউ প্রশ্ন করবেনা। দেখা গেছে, যাত্রীরা অনেক সময় প্রায় ২০ কিলোগ্রামের মতো কেনাকাটা করে বসেন। বিমানে ঢোকার আগে বোর্ডিং পাস যাচাই-বাছাইয়ের করার সময় হাতের বিশাল আকারের সপিং ব্যাগ নিয়ে আপত্তি তোলা হলে শুরু হয় দেন-দরবার।
অতিরিক্ত ওজনের ফি দিতে বলা হলে কেনাকাটা করতে যেয়ে হাতের সব টাকা শেষ বলে অজুহাত দেখান অনেক যাত্রী। এভাবে অন্যদের চোখে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। এসব করতে যেয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট হবার ফলে যাত্রীরা অনেক সময় নিজেদের ফ্লাইট ধরতেও ব্যর্থ হন। বাংলাদেশ বিমানের সেবকদের কাছ থেকে জানা যায়, চেক-ইন করার পর হঠাৎ করে উদয় হওয়া শুক্লবিহীন দোকান থেকে কোনকাটা ভর্তি যাত্রীদের হাতের ব্যাগ রাখার জায়গা খুঁজতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় তাঁদের। জায়গার অভাবে অনেক সময় বিজনেস ক্লাসের খালি সিটে বেল্ট বেঁধে মালামাল রাখতে হয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমানে ভ্রমনের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন আরেকজন প্রবাসী। তাঁকে যখন খাবার দেয়া হল তিনি লক্ষ্য করলেন, সিটের হাতলের সাথে লাগানো টেবিলটি ভাঙ্গা। বিষয়টি জেনেও বিমান সেবক নির্বিকারভাবে খাবারের প্লেটটি তাঁর হাতে দিয়ে চলে গেলেন। বিমান বন্দরে থাকাকালে জরুরী ভিত্তিতে ছোটখাট মেরামতের কাজ সেরে নেয়া কি এত কঠিন? এই ধরণের উদাসীনতা অনকে সময় দেশপ্রেমিক যাত্রীদেরও আহত করে।
সম্প্রতি কাতার-বাংলাদেশ রুটে বাংলাদেশ বিমান বোয়িং ৭৭৭-৩০০ চালু করেছে, যার ধারণ ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেশী। এটা আমাদের সবার জন্য সুখবরই বটে! তবে ধারণক্ষমতা বাড়ার ফলে সাপ্তাহিক ফ্লাইটের সংখ্যা যাতে কমিয়ে দেয়া না হয়, সেজন্য বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে।
কাতার থেকে বৃহস্প্রতিবার রাতে বাংলাদেশি এয়াররাইন্সের কোনো ফ্লাইট নেই। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায়, বৃহস্প্রতিবার রাতে রওয়ানা দিয়ে শুক্রবার সকালে বাংলাদেশে অবতরণ করলে পুরো ছুটির দিনটি কাজে লাগানো যায়। রিজেন্টস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট রয়েছে শুক্রবার ভোর ২টায়। এই ফ্লাইটে করে মালপত্র নিয়ে, ইমিগ্রেশান করে বের হয়ে বাড়ী যেতে পুরো দিনই চলে যায়। বৃহস্প্রতিবার সন্ধ্যায় দোহা থেকে একটি ফ্লাইট চালুর বিষয়টি এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা উচিত।
দেশের সবাই চায়, গুণে-মানে সবাইকে ডিঙ্গিয়ে বাংলাদেশ বিমান হবে সবার সেরা। বহু প্রতিক’রতার মধ্যেও যাত্রীদের উন্নতমানের সেবার দেয়ার জন্য বাংলাদেশে বিমানের নিরন্তর প্রচষ্টা ইতিবাচক। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, বারংবার সময়সূচির বিপর্যয়ের জন্য যাত্রীদের আস্থা হারাচ্ছে বাংলাদেশ বিমান। তাই যে কোনো মূল্যে বিমানের সময়সূচী ঠিক রাখার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে গুরুতের সাথে ভাবতে হবে। পেশাদার সেবা না পেলে শুধু দেশপ্রেমের আবেগ দিয়ে যাত্রীদের ধরে রাখা যাবেনা।
৪ মার্চ, ২০১৮
