একাত্তরের মার্চ, বাঙালির হৃদয়ে চির জাগরূক স্বাধীনতার মাস। ঘটনাবহুল এই মাসেই বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নিয়েছিল লাল-সবুজ পতাকার দেশ বাংলাদেশ। একাত্তরের ৭ মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু মুক্তি সংগ্রামের যে ডাক দিয়েছিলেন, সেদিন থেকেই মূলত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। তাই আনুষ্ঠানিকতার দিকটা বাদ দিলে ওই দিনটিই আমাদের স্বাধীনতা দিবস হতে পারতো। ৭ মার্চের স্মৃতি, বঙ্গবন্ধুর বজ্রকন্ঠ, লক্ষ জনতার গগনবিদারী স্লোগান এখনো আমার হৃদয়ের তন্ত্রীতে আবেগের ঝড় তোলে। বাঙালি জাতির ওই অবিস্মরণীয় মুহূর্তের সাথী হতে পারার জন্য নিজেকে ভীষণ অহংকারী মনে হয়।

একাত্তরের মার্চ মাসের শুরু থেকেই যুগান্তকারী কিছু ঘটনা ৭ মার্চের পটভূমি তৈরি করেছিল। ৩ মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় অধিবেশন বসার কথা ছিল। কিন্তু পহেলা মার্চ দুপুরে স্বৈারাচারী শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান হঠাৎ করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল ঘোষণা করলেন। পল্টন ময়দানে তখন চলছিল ক্রিকেট খেলা। দর্শকদের হাতে ছিল রেডিও। ইয়াহিয়ার ঘোষণা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ক্রোধে ও ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে, স্লোগান দিতে দিতে খেলার মাঠ থেকে বেরিয়ে আসে। পূর্বানী হোটেলে তখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে চলছিল আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে দিক-নির্দেশনার জন্য বিক্ষুব্ধ জনতা পূর্বানী হোটেলের সামনে জমায়েত হয় এবং অবিলম্বে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে চাপ দিতে থাকে।

২ মার্চ সারাদেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালিত হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা আ স ম আব্দুর রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বাংলাদেশের মানচিত্র সম্বলিত স্বাধীন দেশের নতুন পতাকা উত্তোলন করেন। পরদিন ৩ মার্চ পল্টন ময়দানের এক বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয় এবং বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা ঘোষণা করা হয়।

৪ মার্চ দেশের সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় বাঙালি-বিহারী দাঙ্গা। ৫ মার্চ সারাদেশে আবার হরতাল পালিত হয়। টঙ্গীতে শ্রমিকদের মিছিলের ওপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গুলি চালালে চারজন নিহত ও বহু হতাহত হয়। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গুলিবর্র্ষণে মৃতের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়ে যায়। ৬ মার্চ ঢাকায় আসেন গভর্নর ও প্রধান সামরিক শাসক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত জেনারেল টিক্কা খান।

এভাবে রক্তের পথ বেয়ে আসে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। জনতার সুনামিতে ভেসে যায় ঢাকার রাজপথ। মুখে উচ্চকিত স্লোগান, চোখে উৎকন্ঠা, বঙ্গবন্ধুর দিক-নির্দেশনা শোনার জন্য সবাই ছুটে চলেছে রেসকোর্স ময়দানে। দুপুরের মধ্যেই রেসকোর্স পরিণত হয় জনসমুদ্রে। সবার অস্থির চোখ মঞ্চের দিকে—কখন আসবেন বঙ্গবন্ধু, জাতিকে দেবেন চূড়ান্ত দিক-নির্দেশনা। দেশের অন্যান্য স্থানে মহল্লার দোকান, ক্লাব কিংবা বাড়ি যেখানেই রেডিও আছে সবাই সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আমরা সবাই এক অজানা অশংকা ও উত্তেজনা নিয়ে টেবিলে রাখা রেডিওর দিকে তাকিয়ে আছি।

অবশেষে দীর্ঘ প্রতক্ষার অবসান ঘটিয়ে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবী ও মুজিবকোট পরিহিত বঙ্গবন্ধু আনুমানিক ৩টা ২০ মিনিটে মাইক্রোফানের সামনে বলিষ্ঠ পায়ে এসে দাঁড়ালেন। জলদগম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, ‘ভায়েরা আমার।’ সবাইকে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবার কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিলেন, প্রয়োজনে বুকের রক্তও দিতে হবে—‘তোমাদের কাছে যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো, ঘরে ঘরে দুর্গ দুর্গ গড়ে তোলো।’ ভাষণের শেষে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এবং সমগ্র বিশ্বকে জানিয়ে দিলেন, আর পরাধীনতা নয়, স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত চলবে আমাদের মুক্তির লড়াই। সুপার নোভা থেকে বিচ্ছুরিত অগ্নিশিখার মতো তাঁর মুখ থেকে নিঃসৃত শব্দমালা দিয়ে সেদিন রচিত হলো ইতিহাস।

সেদিন ঢাকা বেতারে সরাসরি ঐতিহাসিক ভাষণটি প্রচারের কথা থাকলেও পাকিস্তানী সামরিক জান্তা তা করতে দেয়নি। কিন্তু তাতে থেমে যাননি ঢাকা বেতারের দুঃসাহসিক শব্দসৈনিকরা। রেসকোর্স থেকে সরাসরি ভাষণ সম্প্রচার করার জন্য প্রকৌশলীরা সব ব্যবস্থা নেন। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে যখন বক্তৃতা করতে যাবেন ঠিক সেই সময় সামরিক বাহিনীর নির্দেশ আসে—এই ভাষণ কোনোভাবেই সম্প্রচার করা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হলো। কিন্তু ঢাকা রেডিওর অনুষ্ঠান সংগঠক মুক্তিযোদ্ধা নাসের আহমদ চৌধুরী তার ছোট্ট টেপ রেকর্ডার দিয়ে পুরো ভাষণটি রেকর্ড করে ফেলেন। রেডিওতে ভাষণ প্রচার করতে না দেয়ার প্রতিবাদে রেডিওর কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ধর্মঘটের ডাক দিলেন। ঢাকা বেতারে সব ধরনের প্রচার বন্ধ করে দেয়া হলো। বিপাকে পড়ে যায় পাকবাহিনী। অবশেষে তারা রেডিও চালু করার শর্ত হিসাবে বঙ্গবন্ধুর পুরো ভাষণ প্রচার করতে দিতে সম্মত হয়। ৭ মার্চ রেডিওতে আর কোনো অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়নি। পরদিন ৮ মার্চ সকালে কর্মচারীরা আবার কাজে যোগ দেন এবং শব্দসৈনিক নাসির আহমদের বেকর্ডকৃত টেপ থেকে বঙ্গবন্ধুর পুরো ভাষণটি প্রচার করা হয়।

ইতিহাসের অনেক বিখ্যাত ভাষণের কথা আমরা জানি। যেমন আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেয়া চার্চিলের ভাষণ, মার্টিন লুথার কিংয়ের I have a dream ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকেও পৃথিবীর সেরা ভাষণগুলোর অন্যতম বলে গন্য করা হয়। লিংকনের ভাষণ যেমন গনতন্ত্রের অমর দলিল হয়ে আছে, তেমনি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছে কিংবদন্তি হয়ে আছে।

গেটিসবার্গে আমেরিকার গৃহযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের সমাধিক্ষেত্রে শান্ত সৌম্য পরিবেশে লিংকন তার লিখিত ভাষণটি পাঠ করেন। ১৯৪০ সালে উইন্সটন চার্চিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা we shall fight on the beaches প্রদান করেন। যদিও যুদ্ধকালীন সময়ে এই ভাষণ দেয়া হয়, কিন্তু চার্চিলের বক্তৃতার শ্রোতা ছিলেন হাউস অফ কমন্সের সাংসদবর্গ, রেসকোর্সের ময়দানের মতো লক্ষ উত্তাল জনতা নয়। তাই প্রেক্ষাপট ও গুরুত্বের বিচারে ৭ মার্চের ভাষণ আপন মহিমায় অনন্য।

অন্যান্য মনীষী ও নেতারা যেমন লিখিত ভাষণ দিয়েছেন, তেমন আগে থেকে চিন্তা-ভাবনা করে লেখা ভাষণ পাঠের সুযোগ বঙ্গবন্ধুর ছিল না। তাঁর দিক-নির্দেশনার জন্য রেসকোর্সে অস্থিরচিত্তে অপেক্ষা করছিল উত্তাল জনতা। দীর্ঘদিনের শোষণ আর নিপীড়নে নুয়ে পড়া বাঙালি স্বাধীনতা ছাড়া অন্য কোনো কথা শুনতে আগ্রহী ছিল না। রেসকোর্সে তাই সাত কোটি মুক্তিপাগল জনতার প্রত্যাশা পূরণের বিশাল চাপ নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে মঞ্চে দাঁড়াতে হয়।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণে কী থাকবে তা নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ৭ মার্চ দুপুরের মধ্যেও কোনো স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পারলে বঙ্গবন্ধু নিজেই ভাষণের দায়িত্ব নেন এবং কোনো রকমের প্রাক-মহড়া ছাড়া মাইক্রোফেন হাতে নিয়ে সাবলীল ও বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে ভাষণ শুরু করেন। প্রস্তুতি ছাড়া দেয়া ২০ মিনিটের এই ভাষণ, একাত্তরে সাত কোটি মানুষকে জীবন বাজী রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে যেভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল, সে রকম ভাষণ এর আগে কোনো নেতা দিয়েছিলেন কিনা আমার জানা নেই। গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বার বার বেজে চলার পরও বিভিন্ন প্রজন্মের কাছে এই ভাষণটির আবেদন এখনো এতটুকু কমেনি। একটানা একটি ভাষণ এতদিন শোনার নজির বিশ্বে বিরল।

পাকবাহিনীর দুরভিসন্ধির মুখে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ঝুঁকিও ছিল অনেক। রাজধানীর চতুর্দিকে তখন টহল দিচ্ছিল মারণাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী। আকাশে হিংস্র শকুনের মতো উড়ছিল জঙ্গীবিমান। তিনি জানতেন, তাঁর ভাষণ বদলে দিতে পারে একটি জাতির ভাগ্য। যার পরিণতিতে যে কোনো সময় জনসভার নিরস্ত্র মানুষের ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে পাকবাহিনী। এছাড়া বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠার ঠিক আগের মুহূর্তে সামরিক বাহিনী তাঁর ভাষণ রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। তবে কিছু দুঃসাহসী শব্দসৈনিক রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেকর্ড করে নেন, যা পরদিন অর্থাৎ ৮ মার্চ ঢাকা বেতারে প্রচারিত হয়।

৭ মার্চের ভাষণকে কবি নির্মলেন্দু গুণ একটি অমর কবিতা হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। রেসেকোর্সের খোলা আকাশের নিচে বঙ্গবন্ধু ২০ মিনিটের যে মহাকাব্য রচনা করেছিলেন তার প্রতিটি চরণে, শব্দমালায় বাঙালির বুকের গভীরে লালিত হাজার বছরের স্বপ্ন, আমাদের প্রিয় স্বাধীনতার কথাই ধ্বনিত হয়েছিল। তাই তো ৭ মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা নয় বরং বাঙালি জাতির মহাকাব্য, যার রচয়িতা হলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু।

সাত কোটি বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষার লেখনী দিয়ে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের এই মহাকাব্য যদি রচনা না করতেন, তাহলে স্বাধীনতা নামের শব্দটি হয়তো আমাদের কখনো হতো না। আর বাঙালির চাওয়া-পাওয়া এবং ভালোবাসা ছিল যার রাজনীতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি সেই বঙ্গবন্ধু এই মহতী কাব্যের স্রষ্টা হবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। আমার হৃদয়ের এই কথাগুলোই ভাষা পেয়েছে এ সময়ের প্রতিবাদী কবি মিনার মনসুরের তুমি শুধু বঙ্গবন্ধু নও কবিতায়:

একজন কৃষকের চাল-চুলোহীন অন্ধকার

ঘরে তোমার একটি নিরাপোষ ছবি সারাক্ষণ

আশ্বাসের পিদিমের মতো ধিকিধিকি জ্বলছিল;

ভূমিহীন অন্নহীন উদ্বাস্তু জীবনে তার শুধু

একটি আশ্রয় ছিল

ছিল ভালোবাসারূপ সেই অনন্ত উর্বর ভূমি তুমি—বঙ্গবন্ধু