সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ হলো প্রকৃতির দান। মাছ ধরে ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে হাজারো পরিবার এবং দেশের রাজস্ব আয়েরও একটি বড় উৎস হলো সমুদ্রের মাছ। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বঙ্গোপসাগরে প্রতিবছর ৭ লাখ টন মাছ বাংলাদেশের মৎস্যজীবীরা আহরণ করে। যার সাথে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। সারা দেশে মোট মাছ উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৩৫ লাখ মেট্রিক টন। সম্প্রতি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বড় বড় বাণিজ্যিক ট্রলারের মাধ্যমে যে হারে মৎস্য শিকারের প্রতিযোগিতা চলছে, তাতে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ করা না হলে মৎস্যসম্পদে ধ্বস নামবে। ফলে শুধু সমুদ্রের মাছই নিঃশেষ হবে না, মৎস্যব্যবসার ওপর নির্ভরশীল একটি বিরাট জনসংখ্যার উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
দেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের সুরক্ষায় বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকায় মাছের প্রজননকাল বিবেচনা করে সরকার প্রতিবছর প্রায় দুই মাসের জন্য নৌযান কর্তৃক যে কোনো ধরনের মাছ শিকার নিষিদ্ধ করে থাকে। উল্লেখ্য, সামুদ্রিক মাছের সংরক্ষণের জন্য প্রজনন সৌসুমে ভারত, মিয়ানমার ও শ্রীলংকার সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাতেও দুই মাসের মতো মাছ ধরা বন্ধ থাকে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের কথাই ধরা যাক। সমুদ্রের মাছ সংরক্ষণের জন্য আশির দশক থেকে ভারতে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা চালু রয়েছে। সমুদ্র উপকূলের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের ওপর মূলত এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। বিশাল উপকূলবর্তী এলাকা এবং পরবর্তী প্রজনন মৌসুম বিবেচনা করে ভারতের পশ্চিম উপকূলে জুন-জুলাই এবং পূর্ব-উপকূলবর্তী এলাকায় এপ্রিল-মে মাসে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সর্বনিম্ন ৪৫ দিন থেকে সর্বোচ্চ ৭৫ দিন পর্যন্ত বলবৎ থাকে।
মাছের প্রজননকাল এবং আহরিত মাছের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বছরে কমপক্ষে দুই মাসের জন্য মাছ ধরা বন্ধ রাখলে বছরের বাকি সময় তিন থেকে চার গুণ বেশি মাছ পাওয়া যায়। এর চেয়ে কম সময়ের মধ্যে মাছ উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। সেই হিসেবে কর্তৃপক্ষের আরোপিত ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা যুক্তিযুক্ত এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর নেয়া পদক্ষেপের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। অনেক সময় বর্ষা মৌসুমে বিরূপ আবহাওয়া উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরার জন্য জেলেরা সমুদ্র পাড়ি দেয়। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে বহু জেলের জীবনও রক্ষা পাবে।
২০১৫ সাল থেকে শুধু ট্রলারের ওপরই ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু এবার সব ধরনের নৌযান অর্থাৎ ছোট ফিশিং বোট, ইঞ্জিনচালিত নৌকা, এমনকি দাঁড়বাহী এবং ছোট ডিঙ্গি নৌকাও এর আওতায় পড়েছে। এর ব্যাপ্তিও বাড়ানো হয়েছে, যার মধ্যে দ্বীপাঞ্চল যেমন কুতুবদিয়া এবং মহেশখালী মোহনাও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে। ৬৫ দিনের এই নিষেধাজ্ঞায় ফলে উপার্জনহীন হয়ে যাবার আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ সাগরপাড়ের জেলেরা। এ নিয়ে তারা প্রতিবাদও শুরু করেছেন। জেলেদের অসন্তোষ অমূলক নয়। সমুদ্র অঞ্চরের জেলে পেশার সাথে জড়িত হাজারো পরিবার দৈনিক মাছ ধরে যা আয় করেন তা দিয়েই সংসার চালান। দীর্ঘ দুই মাস কাজ বন্ধ থাকলে তিন বেলা খাবার, সন্তানদের লেখাপড়াসহ সংসারের অন্যান্য খরচ কিভাবে চালাবেন সে নিয়ে তাঁরা শংকিত।
সরকার ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পারিবারকে ভিজিএফ কার্ডের মাধমে চাল বিতরণ কার্যক্রম চালু করেছে। তবে জেলা মৎস্য অফিসের তালিকায় নিবন্ধিত জেলেরাই শুধু এই সুবিধা পাবেন। সমুদ্র উপকূলে এমন আরো বহু জেলে রয়েছেন যারা মৎস্য অফিস কর্তৃক নিবন্ধিত নন, তাদেরকেও এই কার্যক্রমের আওতায় আনা উচিত।
মৎস্যসম্পদ রক্ষার জন্য মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজন রয়েছে। তবে ছোট বড় এমনকি ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা কতটা যুক্তিসংঙ্গত সেটা কর্তৃপক্ষকে একটু খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ এর ফলে বংশ পরম্পরায় মাছ ধরা এবং বিক্রি সংশ্লিট কাজ করে সংসার চালান এমন হাজারো জেলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মাছ ধরা বন্ধ থাকার সময় চাল সরবারাহের পাশাপাশি বহু এলাকায় খাদ্য উপকরণের প্যাকেটও দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তিন বেলার খাবার সরবরাহ করলেই কি সংসারের প্রয়োজন মিটবে? তাদের জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে। নৌকার আকার নির্ধারণ করে দিয়ে সমুদ্র উপকূল থেকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ছোট আকারে নৌকা নিয়ে ক্ষুদ্র জেলেদের মাছ শিকার করার অনুমতি দেয়ার কথা কর্তৃপক্ষ ভাবতে পারে। ভারতে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার আওতায় সমুদ্র উপকূলের ১২ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে এই ধরনের ছাড় দেয়া হয়েছে।
অত্যধিক বাণিজ্যিক মৎস্য শিকারের পাশাপাশি বহু রকমের ক্ষতিকর জালের ব্যবহার মাছের বংশবৃদ্ধির প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো হচ্ছে মশারী জাল, কারেন্ট জাল, সিমফ্রাই জাল, চরঘেরা ইত্যাদি। তবে চিংড়ির পোনা সংগ্রহের জন্য মশারী জালের অবাধ ব্যবহারের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে টেকনাফ উপকূলের মৎস্যসম্পদ এবং জীব বৈচিত্র। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে এই ধরনের জাল। চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সমুদ্র উপকূলে এসে ডিম ছাড়ে। উপকূলের অগভীর জলে পোনাগুলো বড় হতে থাকে। পোনা ব্যবসায়ীরা সেগুলো ধরার জন্য মশারী জাল বসায়। মাত্র দৈনিক ৮০-১০০ টাকার বিনিময়ে অনেক জেলে পোনা আহরণের কাজ করে। মশারী জালে চিংড়ির সাথে নানা জাতের মাছের পোনা ও সামুদ্রিক প্রাণীর লার্ভাও মারা পড়ে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, পোনা সংগ্রহকারীরা একটি গলদা চিংড়ির পোনা ধরতে গিয়ে ধ্বংস করছে ৩৮টি ভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি, ছয় প্রজাতির অন্য মাছ ও ১০০ প্রজাতির জলজ প্রাণীর পোনা বা লার্ভা। যা অবিশ্বাস্যস হলেও সত্য। এছাড়া ঠেলা জালে ধরা পড়া চিংড়ির পোনা আলাদা করে বাদবাকি পোনা ও লার্ভা সমুদ্র সৈকতে ফেলে দেয় জেলেরা। এভাবে নষ্ট হচ্ছে শয়ে শয়ে মূল্যবান ইলিশের ডিম। ইলিশ এবং অন্য প্রজাতির মাছকে বাঁচাতে হলে মোহনার কাছে বা অগভীর সমুদ্রে ট্রল নেট এবং চিংড়ি চাষে ব্যবহৃত মশারী ও মহেন্দি জাল নিষিদ্ধ করতে হবে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন সমুদ্রের মৎস্য প্রজাতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সমুদ্র জলের তাপমাত্রা এবং অম্লীকরণের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, প্রবাল, শামুক ও ঝিুনকের উৎপাদন ব্যাপক হারে হ্রাস পাচ্ছে। সমুদ্রজলের উত্তাপ বেড়ে যাওয়ায় শীত প্রধান মেরু অঞ্চলে সমুদ্রে মৎস্য উৎপাদন যেমন ক্রমশ বাড়ছে তেমনি গ্রীষ্মপ্রধান দেশে তা কমতে শুরু করেছে। মেরু অঞ্চলের দেশ নরওয়ে, আইসল্যান্ড, রাশিয়া ও আলাস্কায় মাছ উৎপাদন ৩০-৭০ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশে ২০-৪০ শতাংশ কমেছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মাছের প্রজননকাল ও মা মাছের ডিম পাড়ার স্থানেরও পরিবর্তন হচ্ছে।
বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ ও ইকো সিস্টেমের ওপর এ পর্যন্ত যেসব গবেষণা ও জরিপ চালানো হয়েছে, তা খুবই সীমিত ও অপর্যাপ্ত। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মাছের বিচরণ ও প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা সুরক্ষিত করার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে বিশদ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এর ফলে আমাদের সমুদ্রে কি কি প্রজাতির ও কত পরিমাণ মাছ আছে তা জানা যাবে। উপরন্তু, কখন, কোথায় এবং কতদিন পর্যন্ত মাছ শিকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে সে বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া অনেক সহজ হবে।
