কনকনে শীত। সিডনি শহরের পশ্চিমে একটি এলাকা ‘কোয়েকার্স হিল’-এর আকাশে সূর্য ডুবি ডুবি করছে। আমার বাড়িতে কাছের মানুষদের আনাগোনা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। দোতলায় যাওয়ার সিঁড়ির মুখে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে আমার লটবহর। দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমিরাত উড়োজাহাজের ৪১৩ নম্বর ফ্লাইটে চড়ে পাড়ি দিতে হবে সুদূর কাতারে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে টুকটাক শব্দ। গিন্নি আমার পছন্দের বেশ কিছু পদের রান্নায় শেষ স্পর্শ দিচ্ছেন। আমার বড় মেয়ের মুখে গোধূলিবেলার বিমর্ষ আভা স্পষ্ট দৃশ্যমান। দিনটি ছিল মঙ্গলবার, ২৯ জুন ২০০৮ সাল।

ফ্যামিলি রুমের জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম বাড়ির পেছনের উঠোনে। চলনশীল দরোজা দিয়ে বাইরে পা দিলেই পারগোলা। পারগোলার এক কোণে বিশাল বাগানবিলাসের ঝাড় আচ্ছাদন ছেয়ে ফেলেছে। অদূরে গার্ডেন শেডের পাশ ঘেঁষে উঠেছে দেশীয় শিম গাছের ঘন ঝাড়; বাড়ির সীমানা ডিঙিয়ে তা অনধিকার প্রবেশ করেছে প্রতিবেশীর আঙিনায়। এর পাশেই মাত্র কদিন আগে লাগানো পুঁই শাক ও শসা গাছের চারা দেখলাম লকলকিয়ে বেশ বেড়ে উঠছে।

একটু পরেই সিডনিতে দীর্ঘ দুই দশক সময়ের সুতো দিয়ে গাঁথা জীবন পেছনে ফেলে পাড়ি দেবো অজানা গন্তব্যে। আত্মীয়, পরিবার, বন্ধুবান্ধবের পাশাপাশি এসব লতা-পাতার সঙ্গে এতটা সখ্য গড়ে উঠবে, ভাবিনি কখনো। আমি হয়তো থাকবো না, কিন্তু এই তরু-লতা-গুল্মের ভাঁজে ভাঁজে রেখে যাচ্ছি আমার স্পর্শ। আমি থাকবো না তাতে কী? আমার হয়ে কেউ ছুঁয়ে দিলেই ওরা বড় হবে। বড় হতে হতে একদিন আকাশ ছোঁবে। মনে মনে আওড়াচ্ছিলাম এসব কথা।

রাত নয়টায় ফ্লাইট। ভাইপো বললো, এখনই রওনা দিতে হবে, না হলে সময়মতো বিমানবন্দরে পৌঁছাতে পারবো না।

আমিরাতের বিমানে চড়ে কাতারের রাজধানী দোহা শহরের বিমানবন্দরে পা রাখলাম পরদিন বুধবার সকাল নয়টায়। Maunsell Consultancy-তে চাকরি নিয়ে যাচ্ছি। যদিও পরবর্তী সময়ে এটি অন্যান্য বহু কোম্পানির সঙ্গে একীভূত হয়ে AECOM-এ পরিণত হয়।

এয়ারপোর্টে স্বাগত জানানোর জন্য অফিস থেকে লোক পাঠানো হয়েছে। ওদের হাতে ধরা বোর্ডে আমার নাম দেখেই বুঝলাম সঠিক জায়গায় পদার্পণ করেছি।

যা-ই হোক, ওইদিন বিকেলেই অফিসে রিপোর্টিং করার কথা। কিন্তু আমি এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি অফিসে গিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পেপার ওয়ার্কস সেরে ফেলি। পুরো রাতের দীর্ঘ ফ্লাইট। এত ক্লান্ত ছিলাম যে হোটেলে গিয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম।

তবে খুব বেশিক্ষণ ঘুমুতে পারিনি। হোটেলের পাশেই বড় মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনিতে জেগে উঠলাম। সিডনি শহরে মাইকে আজান? এ তো অসম্ভব। হঠাৎ করে মনে হলো এ তো অস্ট্রেলিয়া নয়, ভিন্ন কোনো দেশ, ভিন্ন জনপদ। চাকরির অফার, প্রস্তুতি, ভিসা সবকিছু এত তাড়াতাড়ি হয়েছে যে আমার তখনো ঘোরই কাটেনি। বুঝতেই পারিনি যে দু-দুটো মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমি এখন মরুজগতের এক ভিনদেশে এসে বসতি গেড়েছি।

বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে চোখ রাখতেই চমকে উঠলাম। নিজেকে চিমটি কাটলাম কয়েকবার। চোখ দুটোকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এ যে আমার পরিচিত শহর নয়! একধরনের শীতল অনুভূতি শিরদাঁড়া বেয়ে ছড়িয়ে পড়লো দেহে।

বাইরে তখন দুরন্ত গ্রীষ্মকাল। মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত বিকেল। চারদিকে যেন পোড়া উনুনের গরম চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। যেদিকে তাকাচ্ছি, দৃষ্টিজুড়ে কেবল ধূসর দিগন্ত। চোখে পড়ছিলো ধুলোমাখা দালানের সারি, মসজিদের মিনার ইত্যাদি। নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম, কী করছি আমি এই হোটেল কক্ষে? কী কাজ আমার? আমার স্যুটকেস, অন্যান্য ব্যাগ তখনো খোলা হয়নি, রুমের মাঝখানে ছড়িয়ে আছে। কেন জানি না নিজের অজান্তে চোখ দুটো ভিজে উঠছিলো।

বাইরে যদিও কড়া রোদ, আমার বুকের মধ্যে তখন শুরু হয়ে গেছে তুমুল ঝড়। বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। এক অজানা আবেগের সুনামিতে ভেসে যাচ্ছিলাম আমি। মনে হচ্ছিলো, ব্ল্যাকটাউনের প্রসপেক্ট জলাধারের জমানো সব জল যেন আমার চোখ দুটো দিয়ে শুধু বেরোবার চেষ্টা করছে। ইচ্ছে হচ্ছিলো তখনই ছুটে যাই সিডনিতে আমার প্রিয় মানুষগুলোর কাছে।

তবে সঙ্গে সঙ্গেই অনুভব করলাম, এ যে অসম্ভব। আমার পরিচিত পৃথিবী ছেড়ে আমি এখন অনেক অনেক দূরে। নিজেকে টাইম জোনে আটকে পড়া এলিয়েনের মতো অসহায় মনে হচ্ছিলো বারবার। পরিবার-পরিজন ছেড়ে প্রবাসে যাওয়াটা আমার এই প্রথম নয়। উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ ছেড়েছি সেই ১৯৮৩ সালে। তারপর অস্ট্রেলিয়া। শুধু তা-ই নয়, চাকরি নিয়ে আমি অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যন্ত কান্ট্রি এলাকায় একা থেকেছি দীর্ঘদিন। কিন্তু একাকিত্বের বেদনায় ক্লেশবিদ্ধ হয়ে নিজেকে এমন পরাস্ত মনে হয়নি কখনো।

হঠাৎ করে বিছানার পাশে রাখা টেলিফোনে চোখ পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে সিডনিতে বাসার নম্বরে ডায়াল করে বসলাম। আমার বড় মেয়ে মুনিরা টেলিফোন ধরলো। এর পরেরটুকু ঠিক মনে নেই, ঝাপসা হয়ে আছে স্মৃতিতে। মুনিরার কণ্ঠ শুনে নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি, শিশুর মতো কাঁদতে শুরু করলাম। কোনো কথা বলা সম্ভব হয়নি।

কেন এমন করেছি তা ঠিক বলতে পারবো না। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি পুরুষদের নাকি কাঁদতে নেই। চোখের জল পুরুষদের জন্য নয়; কোনো অবস্থাতেই বাড়ির কর্তার ভেঙে পড়া চলবে না। মনে পড়ে একাত্তরের কথা। আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর মাকে দেখতাম প্রায় বিলাপ করে কাঁদতে। মা যখন কাঁদতেন, বাবা তখন ঘন ঘন পায়চারি করতেন বারান্দায় কিংবা বিবর্ণ মুখ নিয়ে চেয়ারে বসে আকাশের দিখে নির্বাক তাকিয়ে থাকতেন। বাবার চোখ দেখলে মনে হতো যেন মরা ইলিশের নিথর দুটো চোখ দেখছি। বাবাকে কাঁদতে দেখিনি কখনো। তবে দোহা শহরের অচেনা হোটেলের নির্জন কক্ষে সেদিন মনে হলো, হোক সে পুরুষ বা নারী, বেদনার রং সবার কাছেই এক এবং অভিন্ন।

টেলিফোনের অপর প্রান্তে আমাকে ভয়ানক ভেঙে পড়তে দেখে আমার অতোটুকুন মেয়ে অনেকটা মায়ের মতো উল্টো আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, ‘বাবা, তুমি যদি কাঁদো তাহলে আমারও যে কান্না পাবে। তুমি আমাদের ছেড়ে গিয়েছো একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। তুমি হলে আমার আইডল, আমি জানি তুমি সফল হবে।’

আমার স্ত্রী সেলি টেলিফোন ধরার পরও আমার চোখের বন্যা থামেনি। সেলি রীতিমতো বিচলিত হয়ে বললো, ‘তোমার আর কাতারে থাকার দরকার নেই। রিটার্ন টিকিট তো কাটাই আছে, আর এখানে তোমার চাকরিও আছে। এখনই সিডনি ফিরে এসো।’

এর পরের ঘটনাগুলো এখন ইতিহাস। আমি এখনো কাতারের দোহা শহরেই আছি।

জুলাই, ২০০৮