কাতারে আসার পর আমার অস্থায়ী ঠিকানা হলো ‘আল-নাখিল’ হোটেল। দোহা শহরের পুরোনো এবং ব্যস্ততম মুশাইরিব এলাকায় এর অবস্থান। সিডনির সঙ্গে কাতারের সময়ের ব্যবধান সাত ঘণ্টা! শরীরটা সময়ের এই বিশাল পার্থক্য যেন মেনে নিতে চাইছে না। খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলো। হোটেলের জানালা দিয়ে অলস দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিলাম বাইরের পৃথিবীটা। হোটেলের আশপাশে গিজগিজ করছে দোকানের সারি, রাস্তায় পথচারী ও গাড়ির ভিড়, হর্নের শব্দ। রাস্তার উল্টো দিক দিয়ে দেখলাম বেশ কজন নির্বিকার বাইক চালিয়ে যাচ্ছেন আপন গন্তব্যে, বিশাল আকৃতির গাড়ির গা ঘেঁষে। মনে হচ্ছিলো, এ যেন চট্টগ্রামের জিইসির মোড়।

ভোর সাতটায় অফিসের ড্রাইভার রুমের দরজায় টোকা দিলো। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে অফিসে রওনা দিলাম। হোটেল থেকে অফিসের দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার হলেও ট্রাফিকের ভিড় সরিয়ে অফিসে পৌঁছাতে প্রায় ৩০ মিনিট লেগে গেলো।

আমার অফিস একটি বহুজাতিক কোম্পানি। অফিসের পরিবেশ, প্রটোকল সবকিছুর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার অফিস পরিমণ্ডলের তেমন বিশেষ কোনো পার্থক্য চোখে পড়লো না। অফিসের ইঞ্জিনিয়ারদের অধিকাংশই ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডার মতো বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন। সবাই ইংরেজিতেই কথা বলছেন। মনে হলো, খুব সহজেই খাপ খাইয়ে নেওয়া যাবে।

তবে অন্যান্য কর্মচারীর মধ্যে ফিলিপাইন ও ভারতের কেরালা রাজ্যের মারওয়ারিদের আধিপত্য চোখে পড়লো। অফিসের রিসেপশন, এইচআর এবং অ্যাডমিনে কয়েকজন আরবি ছাড়া একচেটিয়া ফিলিপিনো মহিলা কাজ করছেন। অন্যদিকে আমার বারো জন ড্রাফটিং স্টাফের মধ্যে দশ জনই হলো কেরালার অধিবাসী। আমার অফিসের কোথাও একজন বাংলাদেশি চোখে পড়লো না। হতাশ হলাম।

অফিসে রয়েছে বেশ কজন টি-বয়। সুন্দর পরিচ্ছন্ন ইউনিফর্ম পরে দিনে তিনবার চা ও কফি সরবরাহ করছে। এ ছাড়া প্রয়োজনে ফটোকপি করা, এমনকি বাইরে টুকিটাকি কেনাকাটা থাকলে তা-ও করে দেয়। এটা আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা, তাই বিষয়টি দারুণ লাগলো।

আশির দশকের শেষ দিকের কথা। সিডনিতে প্রথম দিকে অফিস থেকেই চা-কফি সরবরাহ করা হতো। চা-ঘরে গিয়ে আমরা নিজেরাই বানিয়ে খেতাম। কিন্তু কিছুদিন পর কৃচ্ছ্রতা সাধনের নামে তা-ও বন্ধ করে দেওয়া হলো।

কাতারের অফিসে নিজের চেয়ারে বসে টি-বয়ের বানানো গরম গরম কফি ভীষণ উপভোগ করছিলাম। চা, কফি ছাড়া আরও রয়েছে টার্কিশ কফি এবং আরবি কফি গাহওয়া (قهوة)। গাহওয়া কফি আরব এবং স্থানীয় কাতারিদের খুবই প্রিয়। এলাচ ও লবঙ্গ পানিতে সেদ্ধ করে বানানো হয় এই কফি। গাহওয়া দুধ ও চিনি ছাড়া খুব ছোট কাপে অনেকটা এক্সপ্রেসোর মতো পরিবেশন করা হয়। আরবরা এ ধরনের কফি পটকে দাল্লা (دلة) বলে থাকে। তবে তেতো স্বাদ ফিকে করার জন্য সঙ্গে খেজুরও পরিবেশিত হয়। কফি ছাড়াও অনেকে শুধু লাল চা খেয়ে থাকেন, যা সুলেমানি নামে পরিচিত।

কিছুদিন পর একজন আরবির সৌজন্যে কারকাদি (كَرْكأدِ Karkadi) নামের অন্য এক ধরনের চা খাওয়ার সুযোগ হলো। চায়ের রং গাঢ় ম্যাজেন্টা আর স্বাদ টক। পান করে আমি রীতিমতো মুগ্ধ! এখন থেকে বাসায় নিয়মিত কারকাদি পান করার ইচ্ছে পোষণ করছি।
কাতারে আমজনতার চলাচলের জন্য রয়েছে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট (مواصلات)। ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি পরিচালিত বাস ও ট্যাক্সিকে বলা হয় কারওয়া (كروة)। বাস চলাচল শহরের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ। পর্যাপ্ত সংখ্যক বাসস্টেশন না থাকায় স্বীয় গন্তব্যস্থানে যেতে হলে অনেক সময় স্টেশন থেকে বেশ কিছুদূর হাঁটতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রচণ্ড গরমে রাস্তায় হাঁটা আর উত্তপ্ত চুল্লিতে হাঁটা একই কথা। এ ছাড়া সকালে অফিস টাইমে চাহিদা যখন তুঙ্গে থাকে, তখন ট্যাক্সি পাওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার। তাই শহরে যাতায়াতের জন্য গাড়ি ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই।

অবশেষে রেন্ট-এ-কার থেকে গাড়ি ভাড়া নিতে হলো। ভাড়া মাসে ২ হাজার ২০০ রিয়াল (১ আমেরিকান ডলার = ৩.৬৪ রিয়াল)। ১ দশমিক ৮ লিটারের ছোট্ট NISSAN TIDA গাড়ি। অস্ট্রেলিয়ায় যে চড়া দামে পেট্রল কিনেছি, সেটা তখনো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ভাবলাম ছোট গাড়ি, পেট্রলের খরচ কম হবে। গ্যাস স্টেশনে পেট্রলের দাম শুনে হতবাক হয়ে গেলাম। সিডনি শহরে যেখানে ১ দশমিক ৭ ডলার করে পেট্রল কিনেছি, তা কাতারে লিটারপ্রতি মাত্র ২৫ সেন্ট! বলে কী? এ ছাড়া তেলের দাম সরকার-নিয়ন্ত্রিত, তাই ওঠা-নামা করার জো নেই। প্রতিটি গ্যাস স্টেশনে একই দামে পেট্রল কেনা যায়।

এখানে গ্যাস স্টেশনে নিজ হাতে পেট্রল ভরতে হয় না। গাড়ির ইঞ্জিন-এসি চালিয়ে সবাই দিব্যি গাড়ির আসনেই বসে থাকে। টাকার গোছা হাতে নিয়ে অপেক্ষমাণ পেট্রল পাম্পের সেবকরা তেল ভরে দেয়। রাজকীয় ব্যাপারই বটে! কিন্তু নিরাপত্তার কথা ভেবে বিষয়টি আমার কাছে ভয়ংকর মনে হলো। গ্যাস স্টেশনে আসার পর চিরাচরিত অভ্যাসমতো আমি গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। আমাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে স্টেশনের সেবকের চোখে দেখলাম বিস্ময়। কিন্তু প্রচণ্ড গরম, তেল ও ধুলো-বালির তাড়া খেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। ত্বরিত গাড়ির অভ্যন্তরে আশ্রয় নিলাম।

গাড়ির পেট্রল ট্যাংক ভরতে পকেটে টান পড়ে না বলে পাঁচ লিটার কিংবা তারও বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ল্যান্ডক্রজার, লেক্সাস, নিসান পেট্রল, জিএমসির ইউকনের মতো দানবাকৃতির গাড়ির দাপট দেখলাম কাতারের রাস্তায়। স্থানীয় কাতারিদের গ্যারেজে বিলাসবহুল গাড়ি ছাড়াও থাকে বহু জাত ও রঙের গাড়ি। তবে প্রতিটি কাতারির যে গাড়ি থাকা চাই-ই তা হলো টয়োটা ল্যান্ডক্রজার। এটা হচ্ছে কাতারিদের ট্রেডমার্ক গাড়ি। মরুভূমি এবং কাতারের দুর্গম অঞ্চলে যাতায়াতের জন্য টয়োটা ল্যান্ডক্রজারের জুড়ি নেই। বাংলাদেশিদের সামর্থ্য হলে সঙ্গে সঙ্গেই তারা একটা ল্যান্ডক্রজার কিংবা লেক্সাস কিনে ফেলেন। এটা হচ্ছে কাতারের সামাজিক মর্যাদা এবং অবস্থানের প্রতীক।

কাতারের রাস্তায় গাড়ি চলে ডান দিকে। তার মানে ড্রাইভিং হুইল গাড়ির বাম দিকে। তাই কাতারে আসার পর গাড়ির চালকের আসনে বসে সবকিছু উল্টো মনে হচ্ছিলো। অস্ট্রেলিয়ান ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকার সুবাদে কোনো রকম রোড টেস্ট ছাড়া সহজেই কাতারি লাইসেন্স পেয়ে গেলাম। কিন্তু রাস্তায় নেমে দীর্ঘ দুই দশকের ড্রাইভিং অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও ভড়কে গেলাম। সহজাত অভ্যাসের কারণে ইন্ডিকেটরের বদলে বারবার ওয়াইপারে চাপ দিচ্ছিলাম। গাড়ি রাস্তার ডান দিকের Kerb-এ ঠেকে যাচ্ছিলো। ফলে কখন যে টায়ারের সর্বনাশ হয়ে গেছে, তা টের পাইনি। যার মাশুলও আমাকে পরে দিতে হয়েছে। কাতারে এসে জানলাম, পৃথিবীর প্রায় ৮০ শতাংশ রাস্তায় গাড়ি চলে রাস্তার ডান দিকে। ব্রিটিশ রাজের সৌজন্যে অস্ট্রেলিয়াসহ গুটিকয়েক সাবেক বৃটিশ উপনিবেশগুলোতেই কেবল উল্টো নিয়মে গাড়ি চলছে।

একবার রাস্তায় নির্বিঘ্নে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। লক্ষ করলাম, আমার ঠিক পেছনে একটা বিরাট আকারের টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার হাই বিম দিয়ে আমার গাড়ির চুল বরাবর কাছে চলে আসছে আর আমার উদ্দেশে অশুভ ইঙ্গিতে কিছু বলছে। পোশাক দেখে মনে হলো গাড়ির চালক স্থানীয় কাতারি। আমি নিশ্চিত আমি ঠিকই আছি এবং আমার গাড়ির গতিও নিয়ন্ত্রণে। তবে সমস্যাটা কোথায়? ও কি তবে পুলিশ?

একপর্যায়ে ওই গাড়িটা আমাকে ওভারটেক করে সাঁই করে আমার গাড়ির সামনে এসে আকস্মিক ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়লো। আমি ভাগ্যগুণে ওই গাড়িকে পেছন থেকে প্রায় ধাক্কা দিতে দিতে বেঁচে যাই। গাড়িটি দশ সেকেন্ড পর গজগজ করতে করতে আবার নিজের স্পিডে চলে গেলো।

এই ঘটনায় আমি বিস্মিত হই। অফিসে সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার পর ব্যাপারটা খোলাসা হলো। আমি রাস্তার বাম লেনে ধীর গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলাম আর সেটা হচ্ছে কাতারের দ্রুত লেন। বুঝতে অসুবিধা হলো না কেন সেই কাতারি চালক এতটা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলো। এমন পরিস্থিতিতে কাতারিদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও শুনলাম। মনে হলো এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম।

হোটেলের অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল মসজিদ। ঠিক পাশেই মোবাইল ফোন ও অন্যান্য সামগ্রীর মার্কেট ‘সুক নাজাদাও’ ও ‘সুক বারাহা’। আরবিতে সুক (سوق) শব্দের মানে হলো মার্কেট। বিকেলে ঘুরতে গিয়ে মার্কেটে চোখে পড়লো বাংলাদেশি চুল কাটার সেলুন, দোকানের নাম বাংলায় লেখা। দোহা শহরের ৮০ শতাংশ সেলুন ব্যবসা বাঙালির হাতে। বাংলাদেশি সেলুন দেখে দোকানে ঢুকে পড়লাম। দোকানের মূল পরিচালক হচ্ছেন লিটন। সঙ্গে তার ছোট ভাইও সেলুনে কাজ করছে। এদের বাড়ি নোয়াখালী। খুব একটা ইচ্ছে না থাকলেও পরিচিত হওয়ার বাহানায় চুল কাটার জন্য বসে গেলাম।

প্রকৌশলী ও অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছি শুনে আরও বাড়তি মনোযোগ পেলাম। কাতারে পশ্চিমা দেশের পাসপোর্টধারী শিক্ষিত বাঙালির সংখ্যা নাকি হাতে গোনা। চুল কাটার পর দেখি লিটন দুই হাতে মাথা বানানো শুরু করলো। লিটনের মাথা বানানোর কসরত দীর্ঘদিন পর দেশের সেলুনের কথা মনে করিয়ে দিলো। মাথা বানাবার একপর্যায়ে আমার ঘুমই এসে যাচ্ছিলো।

সবশেষে এবার ঘাড়ের মটকা ফোটানোর পালা। দোহার এই নাপিতশিল্পী এক হাতে চুলের মুঠো ধরে অন্য হাত আমার থুতনিতে রেখে ঘাড়ে বেসামাল মোচড় দিচ্ছিলেন। আমার ডান দিকটা সহজে সাড়া দিলেও বাঁ দিকটা কোনোমতেই যখন বাগে আসছিলো না, তখন লিটন মরিয়া হয়ে উঠলে আমি তাড়াতাড়ি তাকে থামতে বললাম। কারণ, একপর্যায়ে মনে হচ্ছিলো আমার ঘাড়ই বোধ হয় মচকে গেলো।

হোটেলে যত দিন ছিলাম, প্রায়ই ওদের দোকানে বসে দুজনের সঙ্গে আড্ডা দিতাম। ওরা খুবই ভালো মানুষ। আমি যখনই গিয়েছি তখন পাশের দোকান থেকে চা ও নাশতা এনে আমাকে আপ্যায়ন করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তো। চা খাওয়ার সময় আলাপের ফাঁকে ফাঁকে লিটন তার হৃদয়ের গভীরে জমিয়ে রাখা অনেক না-বলা কথার ডালি আমার কাছে মেলে ধরতো। ওর কথা শুনতে গিয়ে আমার মনটা নিজের অজান্তেই ভিজে উঠতো।

একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ জীবন গড়ার প্রত্যয় নিয়ে মাতৃভূমি ছেড়ে সুদূর কাতারে পাড়ি জমিয়েছেন লাখো বাংলাদেশি। এখানে অনেকেই কুড়ি থেকে ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন। তবে অধিকাংশ প্রবাসী মানুষ সময়ের খেয়া তরীতে চড়ে একাই পাড়ি দিচ্ছেন প্রবাসজীবন। কারণ, বাড়িভাড়া দিয়ে পরিবারের ভরণ-পোষণ করার মতো সামর্থ্য না থাকলে কর্তৃপক্ষ দেশ থেকে পরিবার আনার অনুমতি দেয় না। আমার অফিসের কয়েকজন ড্রাফটম্যানের ভিসা ক্যাটাগরি দেখলাম ইঞ্জিনিয়ার। বিস্মিত হলাম। ওরা বললো, ‘স্যার, অনেক মাথা কুটে ইঞ্জিনিয়ার ভিসা জোগাড় করে এসেছি। না হলে পরিবার নিয়ে আসার অনুমতি কখনোই পাবো না।’

কাতারপ্রবাসী বাংলাদেশিদের নব্বই শতাংশ খেটে খাওয়া শ্রমিক এবং অল্প বেতনের চাকুরে। ওদের বেতন এতই সামান্য যে দেশ থেকে নিজের পরিবার কাতারে নিয়ে আসার অনুমতি পাওয়া অলীক স্বপ্নই বটে। অনেক বাংলাদেশি তরুণ বয়সে আরব সাগর পাড়ি দিয়ে পা রেখেছেন কাতারের উপকূলে। পরবর্তী সময়ে তারা সংসারী হয়েছেন। নববধূর সঙ্গে অল্প সময়ের জন্য খুনসুটি, ভালোবাসার পর্ব শেষ করে আবার চলে এসেছেন প্রবাসে। অনেকে হয়েছেন বাবা। কিন্তু পৃথিবীতে সন্তান আগমনের সেই দুর্লভ সময়ে স্ত্রীর পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারেননি। দেখতে পাননি নবজাতকের প্রিয় মুখ। হাঁটি হাঁটি পা করে বড় হয়েছে সন্তান। টেলিফোনের ওপার থেকে কেবল ‘বাবা’ ডাক শুনেই প্রবোধ দিয়েছেন মনকে, কিংবা নীরবে ভেসেছেন চোখের জলে। এভাবে দেশে ফেলে আসা প্রিয়জনদের সঙ্গে সমান্তরাল রেখায় কেটে যায় তাদের জীবন।

কাতারে সরকারি কর্মচারীদের অবসর নেওয়ার বয়স ৬০ বছর। তবে ৬০ পেরোবার পর কন্ট্রাক্টের সময়সীমা আরও বাড়বে কি না তা নির্ভর করে বসের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং কর্মক্ষেত্রে কর্মচারীর মূল্যায়ন ইত্যাদির ওপর। বেসরকারি খাতে অবসর নেওয়ার কোনো সময়সীমা নেই। স্পনসর ও কোম্পানি চাইলে আপনি যত দিন ইচ্ছে কাতারে থাকতে পারবেন।

কাতার, সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশে স্থায়ীভাবে নাগরিক হয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই; যেমনটি রয়েছে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য উন্নত দেশে। নিজের হাড়ভাঙা শ্রম, মেধা ঢেলে দিয়ে প্রবাসী জনগোষ্ঠী গড়ে তুলছে কাতার। জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো মরুর বুকে কাটিয়ে দেওয়ার পরও একদিন সবকিছু পেছনে ফেলে রেখে পাততাড়ি গুটিয়ে তাদের চলে যেতে হয় এ দেশ ছেড়ে।

যতদূর জানা যায়, পঞ্চাশ দশকের দিকে চট্টগ্রামের টেকনাফ এলাকা ও সিলেট থেকে কিছু বাংলাদেশি কাতার পাড়ি দিয়েছিলেন। তারাই কিছুদিন পর কাতারের নাগরিকত্ব পান। বেশভূষা, কথা শুনে এদের এখন স্থানীয় কাতারিদের থেকে আলাদা করে চেনা মুশকিল। তবে এর কিছুুদিন পরই নাগরিকত্ব দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বহু প্রবাসী বাংলাদেশি, দেশে ভালো কিছু করতে পারলে সহসা কাতারের পাট চুকিয়ে ফিরে যান দেশে; পথপানে চেয়ে থাকা প্রিয়তমা স্ত্রী, আদরের সন্তান, স্মহময়ী পিতা-মাতার কাছে। কেউ-বা আবার কৈশোর, যৌবনের তেজোময় দিনগুলো কাটিয়ে প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় এসেও কাতারে থাকেন পড়ে। অনেকে আবার ওপারের ডাকে সাড়া দিয়ে কাতার থেকেই পাড়ি দেন না ফেরার দেশে। হিমশীতল কফিনে লাশ হয়ে নোঙর করেন শাহজালাল বিমানবন্দরে।

লিটনের কথায়-গল্পে ছড়িয়ে থাকে অদ্ভুত এক বিষাদ আর সেই বিষাদের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আকুতি। লিটনের গভীর কষ্টকথন কাতারের খেটে খাওয়া পরিশ্রমী মানুষগুলোর সঙ্গে আমার এক অবিচ্ছেদ্য সেতু রচনা করে দিচ্ছিলো। আমার বিদগ্ধ হৃদয়, প্রবাসী মানুষগুলোর কাছে যেন নিবিড় সান্ত্বনা খুঁজে পেলো।

 

আগস্ট, ২০০৮