বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে কাতারিরা যখন মেলামেশা করে, তখন পদমর্যাদার দাম্ভিকতা ও প্রচলিত সামাজিক শ্রেণিবৈষম্য বিশেষ চোখে পড়ে না। কাতারি সমাজের এই দিকটা আমাকে বেশ আকৃষ্ট করেছে। যদিও শুনেছি, আরবিরা আমাদের উপমহাদেশের গরিব শ্রমিকদের মিসকিন বলে ডাকে। কিন্তু আমি এ-ও জানি, নিম্ন স্তরের প্রবাসী কর্মচারীদের সঙ্গে অনেক কাতারি শেখ খুব স্বাচ্ছন্দ্যে মেলামেশা করে থাকেন।

একজন বাঙালি ড্রাইভার ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা হচ্ছিলো, যিনি কাতারি শেখের গাড়ি চালান। তিনি বললেন তাঁর শেখের কথা। খাবারের সময় শেখ তাঁর সঙ্গে একই থালায় বসে খাবার খান। মালিক ও ড্রাইভার একই থালায় খাবার খাবে, এটা আমাদের দেশে অকল্পনীয়। ড্রাইভার সাহেব বললেন, একটি বড় থালায় শেখসহ আরও তিন-চারজন দিনের খাবার খেয়ে থাকেন। এটা আরব সমাজের একটি ঐতিহ্য বলেই আমি মনে করি, যা পরবর্তী সময়ে ইসলামিক আচারের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে। তবে এই আচার ছোট-বড় ধনী-গরিবদের মধ্যে বিদ্যমান ভেদাভেদের দেয়াল যে ভেঙে দেয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সাবের নামের একজন বাঙালি দুই দশক ধরে দোহায় আছেন। তিনি নিয়মিত সিসা ক্যাফেতে যান আড্ডা দিতে। সাবের বললেন, ‘একদিন সিসাঘরের ঠিক দরজার পাশের চেয়ারে বসে আমি সিসা ধূমপানে মগ্ন। হঠাৎ দেখি দরজা দিয়ে ঢুকছেন শেখ আল-মানা, যিনি কাতারের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন শেখ। সেই আল-মানা দরজায় পা রেখে আমাকে না চিনলেও অত্যন্ত বিনীতভাবে কুশল বিনিময় করে পাশের খালি চেয়ারে বসে পড়লেন, যা দেখে কী করবো ঠিক ভেবে পাচ্ছিলাম না।’

কাতারের সুহৃদ শামীমের কাছে জানলাম, গাড়ি কেনার জন্য বড় বড় শেখ বা সামরিক বাহিনীর জেনারেল পদের অফিসাররা তাঁর অফিসে এসে থাকেন। যেকোনো সাধারণ কাস্টমারের মতো তাঁরা বিনয়ের সঙ্গে লেনদেন সারেন এবং চেয়ারে বসে অপেক্ষা করেন। শামীম বললেন, ‘একবার ভেবে দেখুন, আমাদের দেশে একই পরিস্থিতিতে সামান্য একজন ক্যাপ্টেন বা মেজর হলে কী না দাপট দেখাতো! তাদের পেয়াদা-পাইকদের সামাল দিতেই আমার বারোটা বাজতো। আর কাস্টমারদের জন্য নির্ধারিত চেয়ারে বসে থাকা তো দূরের কথা, আমাকে নিজের চেয়ার থেকেই হয়তো সরে বসতে হতো।’

আল-থানি পরিবারের হাতে রয়েছে কাতারের শাসনক্ষমতা। অতএব, নামের শেষে আল-থানি থাকলে বুঝতে হবে ওরা শাসক পরিবারেরই একজন। আর স্বভাবতই তাঁরা হবেন খুবই প্রতাপশালী। সৌদি আরবের মতো কাতারেও বেশ কিছু প্রভাবশালী গোত্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কাতারের শাসনক্ষমতা। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন প্রভাবশালী পরিবারের প্রতিনিধিত্বকারীদের সমন্বয়ে গঠন করা হয় কাতারের মন্ত্রিসভা। আল-থানি পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং দাপুটে গোত্রের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়ে থাকেন। কাতারের অন্যান্য প্রভাবশালী পরিবারগুলোর মধ্যে রয়েছে আল-মিসনাদ, খলিফা, আত্তিয়া, সুয়াইদি, মা’না, কুয়াইরি, মান্নাই, ফারদান, মুহান্নাদি, সুলাইতি ইত্যাদি।

কাতারে তেলের সন্ধান মিলেছে খুব বেশি দিনের কথা নয়। কুড়ি শতকের প্রথম তিন দশক কাতারের অর্থনীতি মূলত মৎস্য ও মুক্তো ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল ছিলো। শুধু তা-ই নয়, ১৯৩০ সালের দিকে কৃত্রিম প্রক্রিয়ায় তৈরি জাপানিজ মুক্তো বাজারে এলে কাতারের অর্থনীতি একদম ভেঙে পড়ে। কাতারজুড়ে রীতিমতো অভাব-অনটন নেমে আসে। বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশ হিসেবে ছিলো তখন কাতারের পরিচিতি।

কাতারে প্রথম তেলের সন্ধান মেলে ১৯৩৯ সালে। কিন্তু সত্যিকার তেল উৎপাদন শুরু হয় ১৯৪৯ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিলো এই বিলম্বের মূল কারণ। তবে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলে কাতারিদের খোদার দেওয়া প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার ষোলকলায় পূর্ণ হয়। কথায় বলে, ‘আল্লাহ যারে দেয় তারে গামছা ভইরা দ্যায়!’ সত্যিই তাই।

১৯৮০ সালের মাঝামাঝি কাতারে একই স্থানে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ঘনীভূত অফশোর গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান মেলে, যার ধারণক্ষমতা ৯০০ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট। ফলে কাতারের মতো ছোট্ট একটি নগর-দেশ এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসধারকে পরিণত হয়েছে।

মাঝে মাঝে ভাবি, আমাদের দেশে কেন এমন হয় না? কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়, সম্পদ কি শুধু থাকলেই হবে? তা সুরক্ষারও ব্যবস্থা করতে হবে, করতে হবে সুষম বণ্টনের ব্যবস্থা, দেশের স্বার্থে যাতে এই সম্পদ ব্যবহৃত হয়, দিতে হবে তার নিশ্চয়তা। আমাদের তেল থাকলেও তা সাধারণ মানুষের জীবন বদলে দিতে পারতো কি না জানি না। তেল সম্পদ নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করার জন্য হয়তো শুরু হতো জবর লড়াই। কিংবা দেশের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুন্ন করে বিদেশি শক্তির কাছে বিক্রি করা হতো রয়্যালিটি।

কয়লার ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই এই প্রতিযোগিতা আমরা লক্ষ করছি। দেশের স্বার্থের দোহাই দিয়ে সবাই নিজের পকেটে মুনাফা কত আসছে সেটা নিশ্চিত করতে কিংবা বিদেশি শক্তি বা কোম্পানির পে-রোলের চেক গুনতেই ব্যস্ত। আমাদের তো গ্যাস আছে কিন্তু তার সঠিক মূল্যায়ন কি হচ্ছে?

দোহায় শিক্ষার জন্য প্রথম স্কুল খোলা হয় মাত্র ১৯৫২ সালে, ১৯৫৯ সালে পুরোদমে চালু হয় প্রথম হাসপাতাল। আর আজকের সুবর্ণভূমি দুবাইয়ে প্রথম কংক্রিট ভবন তৈরি হয় এই তো সেদিন- ১৯৫৬ সালে। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ভারতীয় রুপি দুবাইয়ের জাতীয় মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তুলনা করলে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি এর চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে ছিলো। তাই নয় কি? যাক, এ নিয়ে আর কথা বাড়াতে চাই না। তাহলে যে আমার গল্পের খেই হারিয়ে ফেলবো।

কাতারি নাগরিকদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেখে মনে হয়েছে সবাই কাতারের অগাধ সম্পদের কিছুটা হলেও ভাগ পাচ্ছে। তেল বিক্রি করে যে রয়্যালটি আসে তার সিংহভাগ প্রভাবশালী গোত্রগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও দেশের উন্নতির জন্য তারা টাকা ব্যয় করছে। দেশের নাগরিকদের বাদ দিয়ে সব নিজেদের পকেটে ভরছে না। অস্ট্রেলিয়া থেকে পত্রপত্রিকা পড়ে আমার কখনো মনে হয়েছে-হায়রে, গণতন্ত্র না থাকাতে হয়তো কাতারি নাগরিকেরা দম বন্ধ হয়ে মরছে, নিজেদের দাবি ও সুখ-দুঃখের কথা বলতে পারছে না। তবে এখানে এসে দেখি বাস্তবতা হচ্ছে ঠিক তার উল্টো। প্রাচুর্যের মধ্যে বসবাসরত সাধারণ নাগরিক এ নিয়ে মোটেই উদ্বিগ্ন নয়। সৌদিসহ অনেক আরব দেশে কিন্তু এই অবস্থা বিদ্যমান নয়। সৌদি আরবে ধনী-গরিব দুই ধরনের নাগরিক রয়েছে। কাতারের তুলনায় অনেক বড় জনসংখ্যাও হয়তো এর একটা কারণ। সৌদিদের ভিক্ষা করার কথাও আমি শুনেছি। তবে এ জন্য তাদের নাকি কাউন্সিল থেকে পারমিট সংগ্রহ করতে হয়।

জনপ্রতি জিডিপির হিসাবে কাতার এখন বিশ্বের অন্যতম একটি ধনী দেশ। মজবুত অর্থনীতি, তেল ও গ্যাস থেকে অর্জিত মুনাফা প্রাচুর্যের জোয়ার বয়ে এনেছে কাতারিদের জীবনে। কাতার কিংবা বিদেশ যেখানেই হোক না কেন, কাতারি নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থা ফ্রি। তার মানে বিদেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া থেকে শুরু করে বিদেশের হাসপাতালে চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের যাবতীয় খরচ সরকার বহন করবে।

প্রত্যেক নাগরিককে সরকার বাড়ি করার জন্য জমি দেয় ও নিজের পছন্দসই ডিজাইনের বাড়ি নির্মাণ করার জন্য প্রয়োজনীয় টাকাও দিয়ে থাকে। বাড়ি নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অর্ধেকেরও বেশি সরকার বহন করে আর বাকিটা সুদবিহীন লোন হিসেবে দেওয়া হয়। বাড়ির পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিনা মূল্যে সরবরাহ করা হয় এবং প্রত্যেককে নতুন ঘরের যাবতীয় ফার্নিচার কেনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে পর্যাপ্ত পরিমাণ টাকা দেওয়া হয়।

আমেরিকার তৈরি বিশাল আকৃতির গাড়ি কাতারিদের খুব প্রিয়। তেলের দাম পানির চেয়ে সস্তা হওয়ায় গাড়ির পেট্রল ট্যাংকের তৃষ্ণা মেটাতে তাদের সমস্যা হয় না। দোহার ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোতে রয়েছে আমেরিকা ও ইউরোপের অধিকাংশ ব্র্যান্ড আইটেমের দোকান, স্টারবাক্স কফি শপ আর মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হল। ডিপার্টমেন্ট স্টোরে বা এই সব জায়গায় দেখা যায় ইয়াং কাতারিদের ভিড়।

নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত কাতারি টপ-গানদের দেখেছি স্টারবাক্সে কাতারি পোশাক পরে আয়েশের সঙ্গে বসে কফি পান করতে আর আড্ডা দিতে। গালফ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সেরা হওয়ার এক অদম্য প্রতিযোগিতা। যেমন কারও বিমানবন্দর যদি এশিয়ার সেরা হয়, আমারটা বিশ্বসেরা হওয়া চাই, অন্যের যা আছে আমারও তা চাই। আপনারা হয়তো জানেন, বুর্জ দুবাইয়ের চেয়ে উঁচু টাওয়ার তৈরির পরিকল্পনা করছে সৌদি আরব। এর পরিণতি কী হবে কে জানে!

জানুয়ারি, ২০০৯