কাতারে বসবাসরত প্রবাসী জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এসেছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ মূলত ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে। এ ছাড়া মিসর, পূর্ব ও উত্তর আফ্রিকার দেশ থেকে আসা আরব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ। কাতার বহুদিন ধরে পারস্য সম্রাজ্যের অধীনে ছিলো। ফলে ইরানিদের সংখ্যাও এখানে কম নয়। আর বাদবাকি উল্লেখ করার মতো হলো ফিলিপিনো, শ্রীলঙ্কান ও নেপালি নাগরিক।

একসময় কাতার শাসন করার সুবাদে ইরানিরা ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয় কাতারি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে আছে তাদের ভালো যোগাযোগ। এ ছাড়া ভাষাগত সুবিধার ফলে অনেক বড় বড় ব্যাংক, রিয়েল এস্টেট ব্যবসা ইরানিরা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

ইরানি ও আরবদের পরে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারতীয়রা। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় বড় পদে আসীন রয়েছে ভারতীয়রা। ফলে ভারতীয় জনশক্তি আমদানি প্রাধান্য পাচ্ছে সব জায়গায়। বাঙালিরা অভিযোগ করে বললেন, ভারতীয়রা কোনোভাবেই বাঙালিদের ভালো চোখে দেখে না এবং পারতপক্ষে বাংলাদেশিদের সুযোগ দেয় না। পুরো মধ্যপ্রাচ্যের চিত্র মোটামুটি একই রকম।

আর ভারতীয়দের ৯০ শতাংশ হলো কেরালা ও হায়দরাবাদি। মুখে ট্রেডমার্ক গোঁফ দেখলেই বুঝতে হবে এরা কেরালা থেকে এসেছে। তবে কেরালাইটরা বেশ শান্তিপ্রিয় কিন্তু ধূর্ত। ঝগড়া-বিবাদে মধ্যে না গিয়ে নীরবে, ঠান্ডা মাথায় এরা কাজ সেরে ফেলে। ধমক দিলে পারতপক্ষে ওরা পাল্টা জবাব দেবে না।

কেরালাবাসীর একটা গুণ হলো-ওরা নিজেদের কমিউনিটির লোকজনকে টেনে ওপরে তুলে নিয়ে আসে। কাউকে বৃত্তের বাইরে ছুড়ে না দিয়ে সবাই মিলেমিশে সুযোগটা ভোগ করে। এটা সত্যিকার অর্থে ভালো গুণ কি না, এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কারণ, স্বজনপ্রীতির কারণে কিছু লোক সুবিধা পেলেও অন্যরা হয় বঞ্চনার শিকার।

ফিলিপিনোদেরও নিজের কমিউনিটির জন্য মহব্বতের অভাব নেই। কিন্তু বাঙালিদের ভাষ্য অনুযায়ী আমাদের মধ্যে এমনটা খুব চোখে পড়ে না। ব্যতিক্রম নেই যে তা নয়। কারণ জানতে চাইলে একজন বাঙালি বললেন, ‘কোনো অফিসে একজন কেরালার মানুষ ঢুকলে সে যথাসম্ভব চেষ্টা করে অন্য কোরালাবাসীকে কাজের সুযোগ করে দিতে। আর যে চাকরি দিলো, তার উপকার করতে না পারলেও কখনো ক্ষতি করার চেষ্টা করে না। কিন্তু একজন বাঙালিকে সুযোগ দিলে দেখা যাবে, যে সাহায্য করলো তাকে কীভাবে নামানো যায় সেই চেষ্টা করবে অথবা তাকে ডিঙিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে। তাই একজন বাঙালি অন্য বাঙালিকে সহজে সাহায্য করতে চায় না।’

ভারতীয়দের স্বজনপ্রীতির প্রমাণ পেলাম আমার অফিসে। আমার অফিসের ১০০ শতাংশ ড্রাফটম্যান কেরালার। ভারতের কেরালা রাজ্যে শিক্ষার হার সবচেয়ে বেশি। তার মানে এই নয় যে ড্রাফটম্যান আর অন্য কোনো দেশে নেই।

তবে মোদ্দা কথা হলো, কেরালার কেউ একজন সুচ হয়ে ঢুকতে পারলেই পরে ফাল হয়ে বেরোয়। এ ছাড়া আমি আগেই বলেছি, আমাদের মন্দুপ, টি-বয়ও কেরালার। মজার ব্যাপার হলো, এদের কেউ ছুটিতে গেলে তাদের জায়গায় অস্থায়ী হিসেবে নিজের দেশের কেউ যাতে নিয়োগ পায়, সে ব্যবস্থা করে যায়।

কাতারের ব্যবসা-বাণিজ্য, ডিপার্টমেন্ট স্টোরের সেলস ডিপার্টমেন্ট ও চেক-ইন কাউন্টার, অফিস-আদালতের অ্যাডমিন ও ফ্রন্ট ডেক্স ফিলিপিনো নারীদের পুরোপুরি দখলে। ইংরেজিতে তাঁদের দক্ষতা এর মূল কারণ বলে মনে হয়েছে। একবার আল-ইমাদি হাসপাতালে গিয়ে অবাক হয়েছি। নার্সদের ৯০ শতাংশই ফিলিপিনো। ওরা যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলো, তখন মনে হলো আমি কাতার নই ফিলিপাইনে আছি। আমার অফিসের হিউম্যান রিসোর্স অফিসার একজন ফিলিপিনো নারী। তাঁর অফিস রুমে সহকারী হিসেবে রয়েছেন আরও চারজন কর্মচারী। তাঁরা সবাই ফিলিপিনো।

তবে ফিলিপিনো সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের সরকারের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ফিলিপিন সরকার নিজেদের নাগরিকের বেতন, সুযোগ-সুবিধার ব্যপারে সচেতন, যাতে কেউ নির্যাতন বা প্রতারণার শিকার না হয়। ফিলিপিনো নাগরিকদের জন্য তাদের সরকার একটা ন্যূনতম বেতন ধার্য করে দিয়েছে। তাই কেউ ইচ্ছে করে এর চেয়ে কম বেতনে ফিলিপিনোদের নিয়োগ দিতে পারবে না। ফলে অন্যান্য দেশের নাগরিকদের চেয়ে ফিলিপিনোরা তুলনামূলকভাবে ভালো বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে।

শুধু তা-ই নয়, চাহিদা থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তার কথা ভেবে ফিলিপিনো সরকার তাদের নাগরিকদের নাইজেরিয়া, জর্ডান, সিরিয়া, ইরাক ও লেবাননে কর্মসংস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কারণ, নাগরিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সরকার কোনো রকম ছাড় দিতে রাজি নয়।

সেদিক দিয়ে বিচার করলে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এমনকি ভারত সরকারও নিজের নাগরিকদের ভালো-মন্দ নিয়ে বিশেষ একটা মাথা ঘামায় না। এসব দেশের শ্রমিকেরা নানা হয়রানির শিকার হচ্ছে, পাচ্ছে না নিয়মিত বেতন। মধ্যপ্রাচ্যে ইন্দোনেশিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা থেকে ঘরের পরিচারিকা হয়ে আসা নারীদের অহরহ নির্যাতনের খবর আসছে পত্রপত্রিকায়। কিন্তু আমাদের সরকার এ ব্যাপারে শুধু উদাসীনই নয়, একেবারে নীরব।

ইদানীং বাংলাদেশি ও ভারতীয় বাদ দিয়ে ছোটখাটো কাজের জন্য নেপাল থেকে বেশি শ্রমিক আমদানি করা হচ্ছে। এমনকি অনেক বাংলাদেশি হোটেলের বয়-বেয়ারা এখন নেপালি। তার কারণ, নেপালিদের খুবই কম বেতন দিয়ে আনা যায়। চাকরির কন্ট্রাক্টে কোনো রকম সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও তারা কোনো আপত্তি করে না। এখানে কোনোভাবে আসতে পারলেই যেন ওরা খুশি।

কথা হচ্ছিলো দোহার হোটেলে কর্মরত একজন বাঙালির সঙ্গে। নেপালিদের কথা উঠতেই তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘আরে কইয়েন না, নেপালিরা হলো বড় আকারের বেকুব।’ তিনি বললেন, নেপালিদের বিচার-বুদ্ধিতে একটু ঘাটতি আছে। ফলে মালিকরা তাদের সহজেই খাটিয়ে নেয়। মাত্র কদিনের মাথায় এর প্রমাণ মিললো।

আমার ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার দুজনের একজন নেপালি। নাম হারকা। বেশ ভদ্র এবং আমাকে অনেক ব্যাপারে বেশ উৎসাহ নিয়ে সহযোগিতা করে। এখানে প্রায় সব বাড়িতে ইংলিশ কমোড ও সঙ্গে পানির স্প্রে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো বিমানবন্দরের শৌচাগারে গেলে এটা দেখা যাবে। আমার বাথরুমে স্প্রে দেখলাম না। হারকাকে জানাতেই সে বললো, ‘কোনো ব্যাপারই নয়, আমি কালই যন্ত্রপাতি এনে লাগিয়ে দেবো।’

আমি স্প্রে কিনে আনলাম। হারকা কাজ সেরে চলে গেলো। কানেকশনটা কোথায় দিলো আমি তা পরখ করে দেখার প্রয়োজন মনে করিনি। যথানিয়মে পরের দিন ভোরে স্প্রে চালু করার সঙ্গে সঙ্গে আর্তচিৎকার করে উঠলাম। মনে হলো পুড়েই গেলো সব। তাড়াতাড়ি ফিরে দেখি গরম ও ঠান্ডা পানির দুটো কানেকশন ছিলো। নেপালি হারকা স্প্রের কানেকশন এনেছে হট ওয়াটার থেকে। মনে মনে হাসলাম আর সহজেই নেপালিদের বেকুব বলার একটা কারণ খুঁজে পেলাম।

জানুয়ারি, ২০০৯