ঢাকা শহরকে মসজিদের শহরও বলা হয়। শহরের আনাচ-কানাচে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য মসজিদের জন্যই এই নামকরণ। কিন্তু কাতারে এসে মনে হলো অন্য দেশেও রয়েছে ঢাকার মতো মসজিদশোভিত শহর। দোহা শহরের প্রতিটি এলাকায় আছে ছোট-বড় প্রচুর মসজিদ। সুপরিকল্পিতভাবে, প্রশস্ত জায়গাজুড়ে এগুলো নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক শহরের মতো যত্রতত্র গজিয়ে ওঠেনি।

দোহা শহরে মসজিদের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৮০০! এর মধ্যে মাত্র তিন শতাধিক ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ছাড়া বাকি মসজিদগুলো সরকার কর্তৃক নির্মিত এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অনুদানে পরিচালিত হয়। মসজিদের ইমামদের জন্য বেতনের সঙ্গে রয়েছে সরকারি বাড়ি এবং বিনা মূল্যে বিদ্যুৎ ও পানি। ২০১০-১১ অর্থবছরে দোহায় আরও ১০০টি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকার পরিচালনাধীন সব মসজিদেই একটা সুশৃঙ্খল ভাব লক্ষ করা যায়। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত প্রতিটি মসজিদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, মেঝে পুরু কার্পেট দিয়ে ঢাকা। রয়েছে ভালো মাইক ও বোস সাউন্ড সিস্টেম। তবে সব মসজিদেই জুমার নামাজ পড়ানোর নির্দেশ নেই। ছোট আকারের মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ানো হয় আর কেবল বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মসজিদেই হয় জুমার নামাজ।

প্রায় সব মসজিদেই রয়েছে সুউচ্চ মিনার। মসজিদের অভ্যন্তরে গম্বুজের নিচে ও দেয়ালে কারুকাজ, ছাদ থেকে ঝুলে থাকা বিশাল আকারের আলোর ঝাড়বাতি সত্যিই দেখার মতো। এ ছাড়া মিনারের দিকে মুখ করে বসানো থাকে ফ্লাডলাইট, যা রাতের বেলায় মসজিদকে করে তোলে মোহনীয়। মসজিদ ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে উঁচু দেয়ালঘেরা ঈদগাহ। ঈদের সময়ে এখানে কেবল ঈদের নামাজ পড়ানো হয়।

দোহার মসজিদের অনেক ইমাম বাংলাদেশি। তাঁদের অধিকাংশই কোরআনে হাফেজ ও আরবি ভাষায় দক্ষ। কাতারের নিয়ম অনুযায়ী জুমার খুতবা আরবিতে দিতে হয়। আর খুতবার সময় নির্র্ধারণ করা হয়েছে কমপক্ষে আধঘণ্টা। তবে ব্যতিক্রম হলো Qatar Islamic Cultural Centre বা আল-ফানার (الفَنَار)। চালু হয়েছে ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে। একমাত্র ফানারে অবস্থিত মসজিদেই ইংরেজিতে খুতবা দেওয়া হয়। এই সেন্টার সম্পর্কে কিছু না বললেই নয়।

‘ফানার’ বলতে যা বোঝায় তা হচ্ছে, নাবিকদের দিক-নির্দেশনার জন্য নির্মিত লাইট হাউস, যার আলোর ছটা থেকে দিশেহারা নাবিক খুঁজে পায় পথের দিশা। ‘আল-ফানার’ কাতার সরকার প্রতিষ্ঠিত একটি বহুমুখী ইসলামিক প্রতিষ্ঠান। যার উদ্দেশ্য-দিগভ্রান্ত মানুষকে ইসলামের আলো দিয়ে আলোকিত করা।

ফানারের কর্মকাণ্ড মূলত অমুসলিমদের কথা মাথায় রেখেই পরিচালিত হয়। যারা মুসলিম হতে চায়, ইসলাম সম্পর্কে জানতে চায় তাদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন বিভাগ ও কর্মসূচি। এতে আছে দাওয়া, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ভাষা শিক্ষা ইত্যাদি বিভাগ। অনেক বাংলাদেশিও ফানারের বিভিন্ন বিভাগে কাজ করছেন।

চক্রাকার মিনারবিশিষ্ট ফানারের ভবনটি দোহার একটি আবশ্যকীয় দর্শনীয় স্থান। ভবনটির স্থাপত্যশৈলী, অভ্যন্তরের সুযোগ-সুবিধা ও পরিকল্পনা দেখে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এর ফানার নামকরণ হয়েছে সার্থক। আর সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য এ ধরনের একটি সেন্টার আদর্শ হতে পারে।

ফানারের প্রধান ফটক পার হলেই চোখে পড়বে একটি হলঘর, যার দেয়ালে সেঁটে দেওয়া বিশাল পোস্টারে ইংরেজিতে বিবৃত হয়েছে ইসলাম ও মানবজাতির ইতিহাস। দেখেই বোঝা যায়, এটা অমুসলিমদের ইসলাম সম্পর্কে সহজ ও পরিচ্ছন্ন ধারণা দেওয়ার জন্য করা হয়েছে। পাশেই টেবিলে রয়েছে ছোট ছোট ব্রুশিউর, যাতে ইসলামের বিভিন্ন আকিদা-বিশ্বাস ইংরেজি ও বেশ কয়েকটি ভাষায় সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে।

হলের সঙ্গেই রয়েছে স্টেট অব দ্য আর্ট সরঞ্জামে সমৃদ্ধ বিশাল অডিটরিয়াম। ভেতরে আছে পুরুষ ও নারীদের আলাদা বসার ব্যবস্থা। এখানে দেশি-বিদেশি ইসলামিক বিশেষজ্ঞদের উপস্থাপনায় নিয়মিত সেমিনার ও অন্যান্য শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।

ফানারের প্রথম তলায় রয়েছে মসজিদ ও লাইব্রেরি। এই মসজিদে জুমার দিন দোহায় আসা বিভিন্ন অতিথি বক্তা ইংরেজিতে খুতবা দিয়ে থাকেন। আর লাইব্রেরিতে রয়েছে বাংলা, তামিল, উর্দু, হিন্দি, তাগালগ, তুর্কি ও অন্যান্য অনেক ভাষায় অনূদিত কোরআন ও ইসলামিক বই, যা বিনা মূল্যে সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া বাঙালিদের ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছে একটি অফিস রুম। ফুলটাইম বাঙালি কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছেন এই অফিসে। এখানে বাঙালিদের জন্য ইসলামিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় আর বিনা মূল্যে বাংলা ইসলামিক বই-পুস্তক সরবরাহ করা হয়।

তবে ফানারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিনা মূল্যে আরবি ভাষা শিক্ষার কোর্স, যাতে রয়েছে পুরুষ ও নারীদের আলাদা ক্লাসের ব্যবস্থা। কাতার শিক্ষা দপ্তর স্বীকৃত চার সেমিস্টারের এই কোর্স করার সুযোগ কেবল কাতারি রেসিডেন্টদের জন্য। অর্থাৎ ভিজিটর ছাড়া কাতারে কর্মরত সব প্রবাসীই এই কোর্স করতে পারবেন। বিনা মূল্যে ভাষা শিক্ষার এমন ব্যবস্থা কোনো দেশে আছে কি?

কাতারের জাতীয় মসজিদের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র কিছুদিন হলো। কাতারের ঐতিহ্যগত স্থাপত্যশিল্পের আদলেই তৈরি করা হয়েছে এর নকশা। এখন আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের অপেক্ষায় দিন গুনছে মাত্র। এই মসজিদের অভ্যন্তরে ১২ হাজার এবং বাইরের বিশাল খোলা চত্বরসহ সর্বোচ্চ ৩০ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারবেন। নারীদের জন্য নামাজের জায়গাসহ এই মসজিদে আরও রয়েছে লাইব্রেরি এবং কোরআন হিফজকারী ছাত্রদের জন্য হলঘর ও তিন হাজার গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। মসজিদের মূল প্রবেশদ্বারের ডান পাশেই রয়েছে ২২০ ফুট উঁচু বিশাল মিনার। ছোট-বড় সব মিলিয়ে ৯৩টি গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

দোহার অধিকাংশ মসজিদে নারীদের জন্য রয়েছে নামাজের জায়গা। জুমার নামাজের দিন মসজিদে নারী ও শিশুদের প্রচুর ভিড় থাকে। দোহায় এসে মনে হচ্ছে পার্থিব ও ধর্মীয় জীবন-এ দুটোর মধ্যে সহজেই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারছি, যা অস্ট্রেলিয়ায় অন্তত আমার পক্ষে করা সম্ভব হয়নি।

পার্থিব জীবনের চাহিদা মেটানোর জন্য আধুনিক উপকরণ দোহায় যেমন সহজলভ্য, তেমনি রয়েছে ধর্ম পালনের সুবিধা। সিডনিতে ধর্ম পালন করতে বাধা যে ছিল, তা নয়। অনেকেই মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় বাড়ি নিয়ে থাকছেন। তবে অস্ট্রেলিয়ায় শুক্রবার ছুুটির দিন না হওয়ায় সপরিবারে মসজিদে গিয়ে কখনো জুমা পড়া হতো না।

শুক্রবার দোহা শহরজুড়ে দেখা যায় উৎসবের আমেজ। সবার মধ্যে থাকে একধরনের অলসতার ছোঁয়া। শহরের ব্যস্ততম রাজপথ দুপুর ১২টার আগে সচল হয় না। অনেকটা ছুটির দিনের ঢাকা শহরের মতো। প্রায় সব বাঙালি ও ভারতীয় রেস্টুরেন্টে দুপুরে রান্না করা হয় বিরিয়ানি। জুমার দিন তাই অনেকেই দেশি রেস্টুরেন্টের বিরিয়ানি খেয়ে থাকেন। দোহায় এসে দীর্ঘদিন পর পরিবারের সবাই মিলে মসজিদে নিয়মিত জুমার নামাজ পড়ার সৌভাগ্য হচ্ছে। মাঝে মাঝে নামাজ শেষে বাংলাদেশি বিরিয়ানি হাউস ‘মধুবন’ থেকে গরম গরম বিরিয়ানি কিনে বাড়ি ফিরি।

এখানে নামাজের সময়সূচি বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় বেশ এগিয়ে থাকে। জুমার খুতবা শুরু হয় বেলা সাড়ে এগারোটায়। আর আসরের নামাজের আজান শোনা যায় ২টা ৪০ মিনিটে। নামাজের সময় মসজিদে প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, বাংলাদেশের মসজিদে বাচ্চাদের সব সময় পেছনের সারিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কারণ, এতে নাকি বড়দের নামাজের ক্ষতি হবে। এই যুক্তি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। অথচ অন্য দেশে বাচ্চারা সাধারণত বাবা-মায়ের সঙ্গে একই সারিতে দাঁড়ায়। ছোটদের পেছনে ঠেলে দিলে দেখা যায়, ওরা নামাজ না পড়ে শুধু দুষ্টুমিই করছে।

মসজিদের শহর এই দোহায় শপিং সেন্টারগুলোতেও রয়েছে পুরুষ ও নারীদের আলাদা নামাজের ব্যবস্থা। ফলে ঘরের বাইরে গেলেও পরিবারসহ নিয়মিত নামাজ আদায় করতে কোনো অসুবিধা নেই। কাতারিরা নামাজের ব্যাপারে খুব হাঁসফাঁস করে না। দৈনন্দিন জীবনের রুটিনমাফিক সময় হলেই তারা নামাজ পড়ে নেয়। কিন্তু আমাদের দেশে বাড়াবাড়ির কারণে নামাজ অনেক সময় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আর তখন অনেকে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।

বাংলাদেশের অনেক মসজিদে নামাজের সময় হাফ শার্ট পরলে পেছনের সারিতে চলে যেতে বলা হয়। মুরব্বি মুসল্লিদের দাবড়ানি দেখে মনে হয় নামাজই হবে না। ছোটবেলায় একবার হাফ শার্ট পরার কারণে মসজিদ থেকে বাড়ি গিয়ে আমার শার্ট বদলে আসতে হয়েছিলো। যা-ই হোক, এ নিয়ে ফতোয়া আর পাল্টা ফতোয়ার ফোয়ারা চলতে পারে, কিন্তু আমি মনে করি, ধর্ম মানুষের কল্যাণের জন্যই এসেছে। তাই লক্ষ রাখতে হবে, ধর্ম পালন করতে গিয়ে যাতে মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার না হয়।

ফেব্র“য়ারি, ২০০৯