এখন মধ্যপ্রাচ্যে চলছে দুরন্ত গ্রীষ্মকাল, গা পোড়ানো গরম। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে কাতারের দোহা শহরে আমার প্রথম আগমন দুই বছর আগে জুনের শেষে। সিডনির শূন্য ডিগ্রির কাছাকাছি শীতের মধ্য থেকে দোহায় এসে মনে হয়েছিলো যেন রুটি সেঁকার তন্দুরের মধ্যে এসে পড়েছি। মধ্যপ্রাচ্যে আগে কখনো আমার আসা হয়নি, তবে প্রচণ্ড গরমের কথা শুনেছি অনেক। কিন্তু বিস্মিত হয়েছি সেপ্টেম্বর পেরোতেই প্রকৃতির তপ্ত উনুনকে সহনীয় ও উপভোগ্য উদ্যানে পাল্টে যেতে দেখে। সত্যি বলতে কি, প্রকৃতির এমন রং বদলের খেলা দোহায় না এলে দেখা হতো না।

কাতারে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে তাপমাত্রা ক্রমশঃ কমে গিয়ে নভেম্বর-ডিসেম্বরে ১০-১৫ ডিগ্রিতে নেমে আসে। এই সময়টা হলো কাতার ভ্রমণের শ্রেষ্ঠষ্ঠ সময়। কাতারে যে কদাচিৎ বৃষ্টিপাত হয় তা এই সময়টাতেই হয়ে থাকে। বৃষ্টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবার কারণ নেই, কাতারে সারা বছরে মাত্র নয় থেকে দশদিন বৃষ্টি হয়ে থাকে।

কাতারে গ্রীষ্মকাল হলো খেজুরের মৌসুম। এই সময় রাস্তায় লাগানো সারিবদ্ধ খেজুর গাছে দেখা যায় থোকা থোকা খেজুরের সমাহার। লাল রঙয়ের পাকা খেজুর দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। এ ধরনের স্থানীয় খেজুর একটু পরিপক্ক হলেই বাজারে বিক্রি হয়। রাস্তায় চলার সময় হাত বাড়ালেই খেজুরের নাগাল পাওয়া যায়। ইচ্ছে করলে হাত দিয়ে পেড়ে খেতে বাধা নেই।

দোহা শহরে পা রাখার পর থেকেই দেখছি ভাঙা-গড়ার খেলা। দুই দিন আগে রাস্তার মোড়ে যে দালানটি দেখলাম, আজ দেখি সেটা নেই। বুলডোজার দিয়ে উপড়ে ফেলা হয়েছে, তোলা হচ্ছে আকাশছোঁয়া স্কাই-স্ক্রেপার। প্রায় প্রতিটি রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে চলছে খোঁড়াখুঁড়ির কারবার, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন হাইওয়ে, ফ্লাইওভার। রং বদলের রংমাখা দোহার নিত্যনতুন সাজ দেখে মনে হয়, এ কি দুই বছর আগে দেখা দোহা নাকি অন্য কোনো শহর!

পঞ্চাশের দশকের একটি ঘুমন্ত জেলেপাড়া দোহা, আজ প্রায় ১০ লাখ মানুষের আধুনিক শহর, বিশ্বের সেরা শহরগুলোর একটি হওয়ার নেশায় ছুটে চলেছে ক্লান্তিহীন গতিতে। কাতার আজ বিশে^র অন্যতম ধনী দেশ। দুবাই ক্রাশের পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতির যখন নড়বড়ে অবস্থা, তখন কাতার হুমড়ি খেয়ে পড়েনি। দেশের অবকাঠামোর উন্নয়ন, বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট সেক্টরে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করার ফলে কাতার বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কালো গহ্বর থেকে মোটামুটি অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসে।

এ বছর কাতারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৯ শতাংশেরও বেশি। আর মাথাপিছু আয় প্রায় ৭০ হাজার আমেরিকান ডলার, যা বিশে^র দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কাতারের অর্থনীতির এই ঊর্ধ্বগতির মূল উৎস হলো প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG)। শুধু তা-ই নয়, সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আরব দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশ হলো কাতার। ২০১০ সালের বিশ্ব শান্তি সূচকের (GPI) র‌্যাঙ্কিংয়ে ১৪৯ দেশের মধ্যে কাতারের স্থান ১৫। সবার শেষে রয়েছে ইরাক, ইসরায়েল ও আফগানিস্তান। বাংলাদেশের স্থান ৮৭, আমেরিকা ৮৫ ও সৌদি আরব ১০৭। রাজনৈতিক স্থিতি, অপরাধ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপসহ আরও বেশ কিছু কারণের ভিত্তিতে এই সূচক মাপা হয়েছে। তবে ২০০৭ সালের ৩০তম অবস্থান থেকে মাত্র তিন বছরের মাথায় কাতারের পনেরো ধাপ এগিয়ে যাওয়াটা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।

কাতারে শান্তির সুবাতাস বইলে কী হবে, দোহার রাস্তায় সেই স্বস্তির দেখা পেলাম না। সিডনি থেকে দোহার রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে রীতিমতো ঘাবড়ে গেলাম। উন্নত দেশের আদলে তৈরি করা হয়েছে কাতারের পথঘাট অথচ ট্রাফিক আইনের প্রতি কারও তেমন শ্রদ্ধা আছে বলে মনে হলো না।

গাড়িচালকদের যথেচ্ছাচারের মধ্যে রয়েছে লেনের মধ্যে গাড়ি না রাখা, হঠাৎ করে সংকেত ছাড়া গা ঘেঁষে লেন বদলে ফেলা, ফুটপাতের ওপর দিয়ে এসে কিউ জাম্পিং, টেইলগেটিং ইত্যাদি। কারণে অকারণে হর্ন ও হাইবিম দেওয়ার বাতিক দেখলাম সবার মধ্যে। বিশেষ করে, রাতের বেলায় পেছন দিক থেকে হাইবিম দেওয়ার ফলে চোখ ধাঁধিয়ে গিয়ে অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে এখানে। সিটবেল্ট না লাগিয়ে মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালানো খুবই স্বাভাবিক এখানে।

তবে দোহার ড্রাইভারদের আরও কিছু ভয়ংকর বদভ্যাসের কথা না বলে পারছি না। যেমন কোলের মধ্যে শিশুসন্তানকে বসিয়ে বাবার গাড়ি চালানো, মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা পড়তে পড়তে স্টিয়ারিং হুইল নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদি। তবে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছি কাঁচি দিয়ে নাসিকার কেশ কর্তন করতে করতে একজন দোহাবাসীকে নির্বিকার ভঙ্গিতে গাড়ি চালাতে দেখে।

দোহার রাস্তায় যেসব গাড়িচালক দেখেছি, তার মধ্যে কেবল দুটি দলের কথাই উল্লখে করবো। প্রথম দলটি রাস্তায় গাড়ি চালানোর নিয়মকানুন সম্পর্কে পুরোপুরিই অজ্ঞ। দেখে মনে হয়, তারা আগে কখনো গাড়িতে পা দেননি। দ্বিতীয় দলটি উদ্ধত ও অহংকারী, নিজেদের আইন-কানুনের ঊর্ধ্বে মনে করে থাকে।

পৃথিবীর সব দেশের গাড়িচালকদের মধ্যে সুযোগ সাপেক্ষে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা দেখা যায়। সিডনিতেও তাই দেখেছি। কিন্তু ওসব দেশে পুলিশ খুবই সচেতন বলে মানুষ নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য হয়। কারণ তারা জানে, নিয়ম ভাঙলে দেশের প্রধানমন্ত্রীরও রক্ষে নেই। শুধু আইন থাকলেই হবে না, সেটার বলিষ্ঠ প্রয়োগ করতে হবে। দোহার রাস্তায় পুলিশের গাড়ি দেখা যায় অনেক কিন্তু পুলিশকে মূলত সিগন্যালে গাড়ি নিয়ন্ত্রণেই বেশি ব্যস্ত দেখি।

দোহার ট্রাফিক জরিমানা পশ্চিমা দেশের তুলনায় অনেক অনেক বেশি মনে হলো। যার শুরুই হলো ৫০০ রিয়াল থেকে। আর ট্রাফিক সিগন্যালের লালবাতিতে আপনার গাড়ি ক্যামেরাবন্দী হলে দিতে হবে ৬ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার রিয়াল! অস্ট্রেলিয়ান ডলারে দুই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার ডলার জরিমানার কথা শুনে তো আমার আক্কেলগুড়ুম হওয়ার দশা। জানতে পারলাম, ট্রাফিক সিগন্যালে কাতারিদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো রোধ করতেই এই আকাশচুম্বী জরিমানা। কিন্তু অনেক সময় নিম্ন আয়ের প্রবাসী কর্মচারীরা কোম্পানির গাড়ি নিয়ে তাড়াহুড়ো করে চলতে গিয়ে বিশাল অঙ্কের জরিমানায় ফেঁসে যায়। জরিমানার টাকা কর্মচারীর বেতন থেকে পর্যায়ক্রমে কেটে রাখে কোম্পানি। এ দেশে প্রবাসীদের দুর্দশার যেন কোনো সীমা নেই।

জুলাই, ২০১০