সম্প্রতি ঢাকার মিরপুর-১১-তে ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের মরদেহ ৭ দিন ধরে একা একটি ফ্ল্যাটে পড়ে ছিল। মর্মান্তিক বিষয় হলো, তাঁর সন্তানরা সবাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। একজন যুগ্ম সচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক, একজন কানাডাপ্রবাসী। মেয়ে ও জামাতাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। নুরজাহান বেগমের ঘটনায় দেখা যাচ্ছে যে তিনি দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলেন। তাঁর সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী হলেও নিয়মিত যোগাযোগ ছিল না।

আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো, বৃদ্ধা যে কক্ষে থাকতেন সেটি ছিল এতটাই অপরিচ্ছন্ন, অগোছালো এবং আবর্জনায় ভরা যে কল্পনা করাও কঠিন একজন মানুষ সেখানে বসবাস করতেন। অনেক সময় ফুটপাতে থাকা ছিন্নমূল মানুষের আশ্রয়ও এর চেয়ে গোছানো থাকে।

খবরটি আমাদের সবাইকে ব্যথিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ সন্তানদের বিচার চাইছেন, কেউ গালমন্দ করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শিক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নতি এবং সামাজিক অগ্রগতির এই যুগে কেন এমন ঘটনা ঘটছে? কেন একজন মা, যিনি হয়তো সারাজীবন সন্তানদের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন নিঃসঙ্গ ও করুণ পরিণতির মুখোমুখি হলেন?

এদিকে পুলিশ ও একটি পত্রিকার সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি হয়তো শুধু পারিবারিক অবহেলার বিষয় নয়; এর পেছনে গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্যজনিত জটিলতাও থাকতে পারে। খবরে বলা হয়েছে, মৃত নূরজাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরে সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia) নামের একটি জটিল মানসিক রোগে ভুগছিলেন। এই রোগের কারণে তিনি চরম সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন এবং কাউকে নিজের ঘরে প্রবেশ করতে দিতেন না। এমনকি কেউ তাঁকে ক্ষতি করতে পারে, এই আশঙ্কায় বাসার কাজের লোকদেরও বিদায় করে দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তবে প্রকৃত ঘটনা কতটা এমন ছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

তবে ঘটনাটিকে শুধু “অমানবিক সন্তান” বলে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। এর পেছনে পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, নগর জীবনের একাকীত্ব, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ এবং সামাজিক বন্ধনের দুর্বলতার বিষয়গুলোও কাজ করতে পারে।

আমরা প্রায়ই মনে করি উচ্চশিক্ষা মানুষকে উন্নত করে। বাস্তবে শিক্ষা মানুষকে দক্ষ, পেশাগতভাবে সফল এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে পারে; কিন্তু একজন মানুষ সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেও পারিবারিক দায়িত্বে ব্যর্থ হতে পারেন।

সমাজ বদলেছে। যৌথ পরিবারের জায়গা নিয়েছে একক পরিবার। কর্মজীবনের চাপ, বিদেশে বা দূরে বসবাস, নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ততা, এসব কারণে অনেক সন্তান ধীরে ধীরে বাবা-মায়ের জীবন থেকে দূরে সরে যায়। যোগাযোগ কমতে কমতে একসময় সম্পর্ক শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

অনেকে সন্তানদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কথা বলছেন। অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ অনুযায়ী কোনো সন্তান বাবা-মায়ের ভরণপোষণ না করলে জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান আছে। এমনকি ভরণপোষণে বাধা দিলে সন্তানের স্ত্রী, স্বামী বা অন্য নিকট আত্মীয়ও শাস্তির আওতায় আসতে পারেন। একইভাবে, চীনেও ২০১৩ সালে প্রবীণ বাবা-মায়ের দেখভাল নিশ্চিত করতে The Law on the Protection of the Rights and Interests of the Elderly বা Filial Piety Law নামে পরিচিত একটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, আইন কি সত্যিই বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা, যত্ন ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করতে পারে? আমি অন্তত চাই না কোনো বাবা ,মা , সন্তান এক অন্যের বিরুদ্ধে আদালতে দাঁড়াক।

আমরা প্রায়ই বলি, পশ্চিমা দেশে বাবা-মায়েরা সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল হন না। কথাটি আংশিক সত্য। সেখানে মানুষ কর্মজীবনের শুরু থেকেই অবসরকালীন সঞ্চয়, পেনশন, স্বাস্থ্যবীমা এবং বার্ধক্যের পরিকল্পনা করেন। রাষ্ট্রও প্রবীণদের জন্য বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে পর্যাপ্ত আয় না থাকলে রাষ্ট্র নিজেই পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং বয়স্কদের আবাসন সহায়তার দায়িত্ব নেয়।

আরেকটি বিষয় হলো, পশ্চিমা সমাজে সন্তানদের খুব অল্প বয়স থেকেই স্বাবলম্বী হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়। বাবা-মায়েরাও নিজেদের শেষ বয়সের জীবন নিজের মতো করে গুছিয়ে নেন।

আমাদের সমাজের জন্য এখানেই শিক্ষাটা আছে। সন্তানের ভালোবাসা অবশ্যই মূল্যবান, কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্যও পরিকল্পনা থাকা জরুরি।

সন্তানকে বড় করা বাবা-মায়ের দায়িত্ব। সেখানে কোনো শর্ত থাকা উচিত নয়। সন্তানরা তো নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসে না; আমরা চাই বলেই তারা আসে। তাই “আমি কষ্ট করে মানুষ করেছি, শেষ বয়সে ওদেরই আমাকে দেখতেই হবে”, এমন মানসিকতা সব সময় বাস্তবসম্মত নয়।

নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে সন্তানের পেছনে সবকিছু নিঃশেষ করে দেওয়াও অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সন্তানরা যদি স্বেচ্ছায় আপনার দেখভাল করে, সেটি আশীর্বাদ। না করলেও নিজের জীবনকে অসহায় করে ফেলার কোনো মানে নেই।

বাস্তবতা হলো, বাবা-মায়ের যতটা সম্ভব আত্মনির্ভরশীল হওয়া উচিত। এর অর্থ সন্তানদের প্রতি অবিশ্বাস নয়; বরং নিজের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পর্যাপ্ত সঞ্চয়, স্বাস্থ্য পরিকল্পনা, নিজের সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক যোগাযোগ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা, এসব বার্ধক্যে অনেক বড় সহায়তা হতে পারে।

অন্যদিকে সন্তানদেরও মনে রাখতে হবে, বাবা-মা কোনো সামাজিক দায় নন; তারা আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। একটি ফোনকল, একটি খোঁজখবর, কয়েক ঘণ্টা সময়, এসবের মূল্য অনেক বেশি। বার্ধক্যে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রায়ই অর্থ নয়, বরং সঙ্গ, সম্মান এবং ভালোবাসা।

আজ আমরা যেভাবে আমাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে আচরণ করছি, আগামী প্রজন্মও একদিন আমাদের সঙ্গে সেভাবেই আচরণ করতে পারে।

আমাদের দরকার দুটি বিষয়ের সমন্বয়, একদিকে বাবা-মায়ের আর্থিক ও সামাজিক আত্মনির্ভরতা, অন্যদিকে সন্তানদের মানবিক দায়িত্ববোধ। এই দুইয়ের সমন্বয়েই এমন একটি সমাজ গড়ে উঠতে পারে, যেখানে কোনো মা বা বাবা নিঃসঙ্গতায় হারিয়ে যাবেন না, আর মৃত্যুর পর দিনের পর দিন তাদের খোঁজ না পাওয়ার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটবে না।