২৫শে মার্চ, ১৯৭১। গভীর রাত। গোলা-গুলির প্রচন্ড গর্জনে হঠাৎ করে ঘুম থেকে জেগে উঠেলাম। বাবা বললেন পাকিস্তানী সৈন্য শহরে ঢুকে পড়েছে, লড়াই চলছে। বাবা দরজা খুলে শুধু বারান্দায় পায়চারি করছিলেন। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম ট্রেসার ও ম্যাগনেসিয়াম ফায়ারের তীব্র আলোর ঝলক। আমরা তখন কুমিল্লায়। বাবা সরকারী চাকুরে, কুমিল্লা জজ কোর্টের ঠিক উল্টোদিকের অফিসার্স কলোনীতেই ছিল আমাদের বাসা। আমি কুমিল্লা জিলা স্কুলে পড়ছি। ২৫শে মার্চের সেই ভয়াবহ রাতটা আমরা সবাই জেগেই কাটিয়ে দেই। সকালে বারান্দায় এসে দেখি ঘরের দেয়ালে এলোপাতাড়ি গুলির দাগ। ভাগ্যিস বাবার গায়ে গুলি লাগেনি। ভোরের দিকে গুলির আওয়াজ ও কামানের গর্জন কমে আসলেও চললো লুটপাট আর হত্যাকান্ড। প্রানচঞ্চল কুমিল্লা শহর বদলে গেল নিস্তব্ধ প্রেতপুরীতে।
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর থেকেই সারা কুমিল্লা শহরে এটা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সবার মুখে শুধু একটি কথা – পাকিস্তানী বাহিনী কখন কেন্টনম্যান্ট ছেড়ে শহরে ঢুকবে। ২৪শে মার্চের সন্ধ্যায় বাবার একজন বন্ধু বললেন, কুমিল্লা কেন্টনম্যান্টের রাস্তায় সেনাবাহিনীকে ঠেকাতে জনতা ব্যারিকেড দিয়েছে। পাক-বাহিনী যে কোনো সময় শহরে আক্রমন চালাতে পারে। কিন্তু জনতার গড়া ব্যারিকেডে কোনো কাজ হয়নি। ২৫শে মার্চের রাতের অন্ধকারে পাক-হানাদার বাহিনী বর্বর পাশবিকতায় কুমিল্লার শহরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কুমিল্লা শহরতলীতে ছিল ঈষ্ট পাকিস্তান রাইফেল্সের হেড কোয়ার্টার। তাই কুমিল্লা শহরে ওদের প্রথম টার্গেট ছিল পুলিশ লাইন ও ইপিআর ক্যাম্প। সর্বাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর সাহসী জোয়ানরা সামান্য থ্রি নট থ্রি দিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুললো। কিন্তু পাক-বাহিনীর ভারী অস্ত্রের তোপের মুখে তা বেশীক্ষণ টেকেনি। ওই রাতে কুমিল্লার পুলিশ বাহিনী বলতে গেলে নিশ্চিহৃ হয়ে যায়। শহীদ হন অনেক বীর সন্তান। এদিকে কুমিল্লা কেন্টনম্যান্টে বাঙ্গালী অফিসার সহ হাজারেরও বেশী সেনা সদস্যদের ওই রাতেই হত্যা করা হয়। সেনা সদস্যদের পরিবার, এমনকি কেন্টনম্যান্ট মিলিটারী হাসপাতালের ডাক্তারাও রেহাই পায়নি পাক-বাহিনীর হিংস্র থাবা থেকে।
এর পরের দিনগুলি অনেকটা খাঁচায় বন্দি হয়ে কেটেছে। সকালে স্কুলে যাওয়া আর সন্ধ্যায় বাসায় এসে জানালা বন্ধ করে লো ভল্যুমে বিবিসি শোনা। মার্চের শেষের দিকে চাটগাঁ থেকে খবর আসলো আমার যে ভাই (কমান্ডার ডাঃ মাহবুব) মেডিকেল কলেজে পড়তেন তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা। বিষাদের ছায়া নেমে আসলো বাসায়। মা কেঁদে চললেন। বাবার মুখে কোনো কথা নেই। অফিস থেকে বাসায় ফিরে মরা ইলিশের মতো নিথর চোখ দুটো নিয়ে বারান্দার চেয়ার বসে শূন্যে তাকিয়ে থাকতেন। আর রাতে জায়নামাজে দাঁড়িয়েই কাটাতেন। পাক-বাহিনী যদি তাকে ধরে নিয়ে যায় তাহলে উনি এখন কোথায়? বেঁচে আছেন কি? নয় ভাই ও দু’বোনের সংসারের ৪র্থ সন্তান হলেন আমার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ভাইটি। প্রিয়জনকে হারানোর ব্যাথা বুকে চেপে কেটে গেলো বেশ ক’দিন। একদিন সবাইকে চম্কে দিয়ে ভাইয়া এলেন কুমিল্লায়। ভাইয়ার স্বাস্থ্য আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। তাঁর চোখের তারায় জ্বলছিল অন্য এক ধরণের আলো। সারা রাত ভাইয়ার মুখে শুনেছি তাঁর মুক্তিবাহনীতে যোগ দেয়ার গল্প, পাক-বাহিনীর সাথে সম্মুখ সমরের ভয়ংকর কাহিনী। ভাইয়া মায়ের অনুমতি চাইলে মা দোয়া করে বললেন, “আমার এতগুলো সন্তানের মধ্যে একজন যদি দেশের কাজে লাগে সেটা হবে গর্বের কথা। আমি তোকে দেশের জন্য উৎসর্গ করলাম।”
তখন পুরোদমে লড়াই শুরু হয়ে গেছে। আমাদের ফ্ল্যাটের পাশ ঘেঁষে একটি সড়ক চলে গেছে ভারতীয় সীমান্তের দিকে। ওই রাস্তা দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ট্রাকবোঝাই পাক-সেনা চলাচল করত। মাঝে মধ্যে কৌতুকের ছলে পাক-সেনারা ট্র্রক থেকে আমাদের কলোনীর সামনের ফাঁকা মাঠে গুলি ছুড়তো আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়তো।। ভীষণ আতংকের মধ্যে কাটছিল দিন। প্রায় প্রতিদিনই সীমান্তের দু’দিক থেকে পাল্টাপাল্টি কামানের গোলা বিনিময় চলত। কামানের গোলা যে কোনো সময় মাথায় পড়বে জেনেও সারতো হোতো দৈনন্দিন জীবনের কর্মস‚চী। একদিন বেশ ক’টি দুরপাল্লার কামানের গোলা কুমিল্লা শহরের বাজারে এসে পড়ল, মারা গেল কুমিল্লা জিলা স্কুলের একজন ছাত্র। অন্য একদিন নিশানাবিহীন গোলার আঘাতে আমাদের বাসার কাছেই একটি ফ্ল্যাটের ছাদ ফুটো হয়ে গেল। এর কিছুদিন পরেই আমরা কুমিল্লা ছেড়ে চাটগাঁ চলে এলাম। চাটগাঁয় এসে ভাইয়ার কেসি-১ গ্রæপের কনিষ্ঠতম সহযোদ্ধা হিসাবে কাজ করেছি।
পচিঁশে মার্চের রাতে ঢাকার পতন হলেও চাটগাঁ আয়ত্তে আনতে পাক-বাহিনীর বেশ সময় লাগে। এর অন্যতম কারণ ছিল কাুলরঘাটে ঈষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের গড়ে তোলা সন্মিলিত প্রতিরোধ। ২৪শে মার্চে চট্টগ্রাম বন্দরে তখন নোঙ্গ করেছে “সোয়াত” নামের পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্র বোঝাই ট্রাক। কিন্তু চট্টলাবাসী ওই অস্ত্র যাতে নামতে না পারে সেজন্য গড়ে তুললো অবরোধ। কর্নফুলীতে ডুবিয়ে দেয়া হল বেশ কিছু জাহাজ। ২৬শে মার্চ ঢাকা বেতার পাকিস্তানীদের হাতে চলে গেলে চট্টগ্রামের কালুরঘাটের একটি অখ্যাত বেতার কেন্দ্র “স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র” হিসাবে আত্মপ্রকাশ করল। এই বেতার কেন্দ্র থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা সর্বপ্রথম বিশ্বকে জানানো হয়। ৩০শে মার্চ এই বেতার কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলেও ২৬ থেকে ৩০, এই চারদিনের বিপ্লবী সম্প্রচার দিকহারা বাঙালি জাতির মনোবল চাঙা রাখে। বিশ্বকে জানিয়ে দেয় বাঙালি কখনো মাথা নোয়াবেনা, যে কোনো কিছুুর বিনিময়ে লড়াই চালিয়ে যাবে।
পাক-বাহিনীর অন্যতম পথের কাঁটা ছিল এই বেতার কেন্দ্র। তাই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হয় তুমুল লড়াই। আমার মেডিকেল পড়–য়া ভাইয়া তখন চাটগাঁ মেডিকেল কলেজ কেন্ট্রাল রুমের দায়িত্বে। কালুরঘাটের পতন হলে তিনি রামগড় চলে যান। একাত্তরের মে মাসে মেজর মীর শওকত আলী ও ক্যাপ্টেন অলী আহাদের নেতৃত্বে রামগড়ে পাকিস্তানের তৃতীয় কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের সাথে মুক্তিবাহিনীর যে সর্বশেষ যুদ্ধে হয় তাতে প্রত্যক্ষ অংশ নেন। রামগড় হাতছাড়া হবার পর তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে আগরতলার মনুবাজার ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে সিনিয়র লীডার মনোনীত হয়ে ভারতের বিখ্যাত দেরাদুন সামরিক একাডেমীতে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। প্রশিক্ষণ শেষে কেসি-১ দলের কমান্ডার মনোনীত হন এবং চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাক-হানাদার ও রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে চাটগাঁ শহরতলীতে বড় বড় অপারেশন পরিচালনা করেন। স্বাধীনতার পর শান্তি ও শৃংখলা রক্ষার জন্য ভাইয়া চট্টগ্রাম কতোয়ালী থানার দায়িত্ব নেন এবং যোগ্যতার সাথে সেই দায়িত্ব পালন করেন। নিয়তির কি পরিহাস! নয় মাসের সম্মুখ সমর ও গেরিলা যুদ্ধে শত্রæবাহিনীর গুলি ভাইয়ার শরীরে আঁচড় কাটতে না পারলেও স্বাধীনতার পর কিছু বখে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাঙ্ক লুটের কাজে বাধা দিতে গিয়ে তাকে গুলি খেতে হয়। রিভলবারের বুলেট বক্ষভেদ করে হৃৎপি›েডর পেরিকার্ডিয়ামে আঘাত হানে। তিনি মরতে মরতে বেঁচে যান।
একাত্তরের ২৫শে মার্চের কালো রাত, পরবর্তী দিনগুলো এখনো ভীষণ মনে পড়ে এবং আমার স্মৃতিকে নাড়া দেয়। তবে মাঝে মাঝে ভীষণ হতাশ হই যখন একাত্তরের চেতনা ও সেই একাত্বতার দেখা পাইনা আমাদের মাঝে। বিভক্তির কীট আমাদের যাতে সর্বনাশ করতে না পারে সেজন্য আসুন সবাই স্বাধীনতার চেতনা বুকে ধারণ করি।
(লেখকঃ প্রকৌশলী ও চেয়ারম্যান, আইইবি, কাতার)
