মাত্র কিছুদিন আগে বার্মিংহামে বিশ^দ্যিালয়ের ক্যাডবুরী রিসার্চ লাইব্রেরীতে বিশে^র প্রাচীনতম কুরআনের পান্ডুলিপি পাওয়ার ঘোষণা বিশে^ আলোড়ন তুলেছে। বার্মিংহাম বিশ^দ্যিালয়ের ক্যাডবুরী রিসার্চ লাইব্রেরীতে দুটো পার্চমেন্ট পাতায় লেখা কুরআনের এই খন্ডাংশে সুরা ১৮ থেকে ২০ এর কিছু অংশ লিপিবদ্ধ রয়েছে।
ইতিমধ্যে কার্বন ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করে পশুর চামড়া থেকে তৈরী পার্চমেন্ট পাতায় লেখা এই পান্ডুলিপির সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। কার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে পাওয়া সময়কাল হচ্ছে ৫৬৮ থেকে ৬৪৫ সাল। যার নিভ’লতা হল ৯৫.৪ শতাংশ। মহানবী (সাঃ) এর জীবনকাল হল ৫৭০ থেকে ৬৩০ খৃস্টাব্দ। সেই সূত্র ধরে বার্মিংহাম বিশ^বিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের দৃঢ় ধারণা, আরবি হিজাজি লিপিতে লিখিত এই পান্ডুলিপি তাঁর জীবদ্দশায় লেখা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বার্মিংহাম বিশ^বিদ্যালয়ের প্রফেসর থমাসের মতে, কুরআনের এই পান্ডুলিপির লেখক হয়তো রাসুল (সাঃ) কে দেখছেন এবং তাঁর সাহাবাদের একজন ছিলেন। উল্লেখ্য, কার্বন ডেটিং কখনো শতভাগ সঠিক তথ্য দেয়না। আর বার্মিংহামের কার্বন ডেটিং পরীক্ষা কেবল পার্চমেন্ট পাতার উপর করা হয়েছে। যে কালি দিয়ে লেখা হয়েছে তার উপর কার্বন ডেটিং করলে হয়তো আরো নিখুঁত তথ্য পাওয়া যাবে।
সম্প্রতি বার্মিংহামে পাওয়া কুরআনের এই পান্ডুলিপি নিয়ে বৃটিশ টেলিভিশনে মন্তব্য করতে যেয়ে ঐতিহাসিক টম হল্যান্ড দাবী করেছেন, কুরআন নাকি আসলে মহানবী (সাঃ)- এর জন্মের আগে লেখা। যা পড়ে রীতিমত আক্কেল গুড়ুম হবারই দশা। ইসলামকে কলঙ্কিত করার সুয়োগ পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই পাশ্চাত্যের মিডিয়ায় টম হলান্ডের এই দাবির স্বপক্ষে রীতিমত প্রচারনার হিড়িক পড়ে গেছে।
কুরআন মহানবীর নবুয়ত প্রাপ্তির সময় কাল অর্থাৎ ৬১০ সাল থেকে মৃত্যুকাল ৬৩২ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে নাযিল হয়। তাঁর মৃত্যুর দু’বছরের মধ্যে হয়রত আবুবকর (রাঃ) কুরআনের প্রাথমিক সঙ্কলনের কাজ শেষ করলেও মূলতঃ ৬৫০ সালের দিকে হযরত ওসমান (রাঃ) এর তত্ত¡াবধানে আজকে যে কুরআন আমরা পড়ছি তার কপি সঙ্কলিত হয়। ইয়ামেন, মিসর, ও তুরস্কের তোপকাপি প্রাসাদের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত কুরআনের প্রাচীন কপি নিরীক্ষা করে দেখা যায়, হযরত ওসমান (রাঃ) এর সময়কার কুরআনের ভার্সনের সাথে আজকের কুরআনের বড় রকমের কোনো হের ফের নেই। এ নিয়ে ইসলামের কট্টর সমালোচক পশ্চিমা গবেষকদের মধ্যেও কোনো দ্বিমত নেই। তাই হঠাৎ করে টম হল্যান্ডের এই দাবি অসৎ কোনো পরিকল্পনারই ঈঙ্গিত দেয়।
অধিকাংশ মুসলিম স্কলারের মতামত হচ্ছে, কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও অধ্যায়ের বিন্যাস, অনুক্রম কেমন হবে তা মহানবী (সাঃ)-ই নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে হযরত ওসমান (রাঃ) এর সময়কালে রাসুল (সাঃ)-এর র্নিধারিত নিয়মেই পুরো কুরআন সঙ্কলিত হয়। বার্মিংহামে পাওয়া পান্ডুলিপিতে লাল কালি দিয়ে অধ্যায়গুলো পৃথক করা হয়েছে। মহানবীর জীবদ্দশায় অধ্যায়গুলোকে আলাদা করার কথা কেউ ভাবেননি। তাই বার্মিংহামের পাতাগুলো যদি মহানবী (সাঃ) এর সময়কালের আগে লেখা হয়ে থাকে, তাহলে ওই পৃথকীকরণ চিহৃগুলো আসলো কিভাবে?
কার্বন ডেটিং পদ্ধতি সাধারণভাবে বয়স নির্ধারণের জন্য একটি সম্ভাব্য সময়কাল (উইন্ডো) দিয়ে থাকে। যেমন বার্মিংহামে প্রাপ্ত কৃুরআনের খন্ডাংশ ৫৬৮ থেকে ৬৪৫ সাল র্অথাৎ ৭৭ বছরের সময়কালে মধ্যে লেখা হয়েছে বলে কার্বন ডেটিং পরীক্ষা থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে। কিস্তু টম হল্যান্ড বলছেন কুরআনের ওই পাতাগুলো ৭৭ বছরের টাইমফ্রেমের আগের ভাগে অর্থাৎ প্রথম ৪২ (৫৬৮-৬১০) বছরের মধ্যেই লেখা হয়েছে। এতোটা নিশ্চিত তিনি হলেন কিভাবে ? অথচ কার্বন ডেটিং-এর সময়কালের শেষ ভাগ অর্থাৎ বাকী ৩৫ বছরের (৬১০-৬৪৫) মধ্যে কুরআন লিখিত হবার সম্ভাবনার কথা কেনো জানিনা তিনি বেমালুম এড়িয়ে গেছেন। এর মূল রহস্য হচ্ছে কুরআনের ওই পাতাগুলো যদি ৬১০ থেকে ৬৪৫ সালের মধ্যে লেখা হয় তাহলে সেটা কুরআন সঙ্কলনের সর্বজন স্বীকৃত ইতিহাসের সাথে মিলে যায়। তাতে টম হল্যান্ডের এজেন্ডা বাস্তবায়ন হয়না।
এছাড়া আমরা জানি কুরআনের আয়াতগুলো রাসুল (সাঃ) এর নবুয়ত প্রাপ্তির পর দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে অবতীর্ণ হয়েছে। রাসুল (সাঃ) এর জীবনের অনেক ঘটনা, যুদ্ধের বিবরণ এবং অনেকের নামও কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে। কুরআন যদি রাসুল (রাঃ) এর জন্মের আগেই লিখিত হয়ে থাকে তাহলে এসবের রেফারেন্স কুরআনে আসলো কিভাবে?
৯/১১ এর পর থেকে টেলিভিশনের পর্দায় এবং মিডিয়ায় বিপুল পরিমান সন্ত্রাশ বিশেষজ্ঞদের আনাগোনা শুরু হয়। ইসলাম ও মুসলিম সম্পর্কে এসব বিশেষজ্ঞদের নূন্যতম জ্ঞান না থাকলেও এরা মুসলিমদের ঢালাওভাবে সন্ত্রাশী হিসাবে চিহিৃত করতে থাকে এবং ইসলাম সম্পর্কে কুৎসা রটনায় ব্যস্ত থাকে। বিশ^ব্যাপী ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে যে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা চলছে টম হল্যান্ড যেনো সেই চিত্রনাট্যেরই একজন নতুন কুশীলব। কুরআন সম্পর্কে মুসলিম ও পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের সর্বসম্মত মতামতকে উপেক্ষা করে কুরআনের ইতিহাস নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করা অন্তত টম হল্যান্ডের মতো একজন মেধাবী ঐতিহাসিকের সাজেনা।
