কাতারে আসার পরপরই বেশ কিছু কাগজপত্র জোগাড় করতে হয়। তার মধ্যে প্রথম হলো রেসিডেন্ট ভিসা। ভিসা পেলেই তার স্বীকৃতিস্বরূপ ফটো আইডি কার্ড দেওয়া হয়, যাকে রেসিডেন্ট পারমিটও বলা হয়। আইডি কার্ড ছাড়া এখানে কোনো কিছুু করা অসম্ভব। কাতারের আইডি কার্ডে বেশ কিছু তথ্য থাকে, যেমন কোন দেশের নাগরিক, ভিসার ধরন, পেশা ইত্যাদি। তাই প্রথমেই ছুটতে হলো রেসিডেন্ট ভিসার জন্য।
আমার অফিসের ‘মানদুব’-এর নাম নওশাদ, ভারতের কেরালার নাগরিক, খুবই ব্যস্ত মানুষ। প্রতি অফিসে রয়েছেন একজন ‘মানদুব’। যার মানে হলো, যিনি বাইরের কাজ করেন। ‘মানদুব’ অফিসের কর্মচারীদের ভিসা, এক্সিট পারমিটসহ যাবতীয় কাজে সাহায্য করে থাকেন। এদের পাবলিক রিলেশনস অফিসারও বলা যায়। আমার ভিসার জন্য যা করণীয় তার ব্যবস্থা করে দিচ্ছিলো। অফিসের গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন সরকারি অফিসে আমাকে নিয়ে যাচ্ছিলো নওশাদ। ফলে বিশেষ কোনো অসুবিধা হচ্ছিলো না।
আইডি কার্ড করার আগে বেশ কিছু ধাপ পেরোতে হয়। প্রথম ধাপ হচ্ছে NOC (No Objection Certificate)। আমার অফিসই এটার ব্যবস্থা করে দিলো। তবে কাতারে ঢোকার আগে NOC-এর ব্যবস্থা করা না হলে কাতারে এসে প্রথম দেশ থেকে বের হয়ে গিয়ে আবার এন্ট্রি করতে হয়, যাকে কিনা বলে Visa Run। তবেই NOC-এর স্ট্যাম্প পড়বে পাসপোর্টে। আমার অফিস ‘ভিসা রান’-এর জন্য সাধারণত স্টাফদের বাহরাইনে পাঠিয়ে থাকে।
দ্বিতীয় ধাপ হলো মেডিকেল টেস্ট। এর মধ্যে রয়েছে রক্ত পরীক্ষা ও এক্স-রে করানো। উল্লেখ্য, কাতারে প্রতিটি কাজেই কমপক্ষে দুটো করে পাসপোর্ট সাইজের ছবি আর সঙ্গে আরবিতে টাইপ করা দরখাস্তের প্রয়োজন হয়। তাই সব সময় হাতের কাছে বেশ কিছু পাসপোর্ট সাইজের ছবি থাকা দরকার। সরকারি অফিসগুলোর সঙ্গেই রয়েছে টাইপরাইটার নিয়ে বসে থাকা টাইপিস্টের দল, যা বাংলাদেশের আদালতের প্রাঙ্গণে সচরাচর দেখা যায়। পাঁচ রিয়াল দিলেই তারা নির্ধারিত ফরমে সবকিছু টাইপ করে দেয়। কী করতে হবে এ সবই তাদের জানা।
ব্লাড গ্রুপ পরীক্ষা করে রীতিমতো ধাক্কা খেলাম। কারণ ওরা বললো আমার রক্তের গ্রুপ O+। অথচ এত দিন ধরে আমি জানতাম O-। তাই কোনটা সঠিক ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। ভাবলাম, পরে আবার পরীক্ষা করে যাচাই করে নিতে হবে আমার রক্তের গ্রুপ আসলেই কী ?
এক্স-রে রুমের অভিজ্ঞতা ছিলো অভাবনীয়। এক্স-রে রুমে ঠিক ঢোকার মুখে রয়েছে আরেকটি ঘর, যাতে সবাইকে শার্ট-গেঞ্জি খুলে রেখে লাইনে দাঁড়াতে হয়। তারপর একে একে এক্স-রে রুমে ঢুকতে হয়। খালি গায়ে লাইনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিলো যেন সার্বিয়ার কনসান্ট্রেশন ক্যাম্পের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি খাবারের অপেক্ষায়। কারণ, আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেরই পাঁজরের হাড় দেখা যাচ্ছিলো। ওদের দেখে মনে হলো যেন অপুষ্টিতে ভোগা শীর্ণকায় বন্দীদের সারি দেখতে পাচ্ছি।
সবখানেই প্রচুর মানুষের ভিড়। অধিকাংশই বিভিন্ন কোম্পানি থেকে আসা শ্রমিক। তবে পেশাদারদের ক্ষেত্রে ভিআইপি ট্রিটমেন্ট, অর্থাৎ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ফলে অনেকক্ষণ ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হলো না। ডাক্তারি পরীক্ষায় পাস হওয়ার পর শেষ ধাপ হলো ফিঙ্গারপ্রিন্ট। ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে দুই হাতের তালু ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হলো। এরপর সপ্তাহখানেকের মধ্যেই নওশাদ হাতে দিয়ে গেলো সেই কাক্সিক্ষত আইডি কার্ড; কাতারে বৈধভাবে থাকার লাইসেন্স।
জুলাই ২০০৮
