আল-মনসুরার স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে আমার দিন একরকম চলে যাচ্ছিলো। অফিসের পর অধিকাংশ সময় বাসায় থাকি। রাতে খাবার খেতে একবার বের হই। এ ছাড়া গরমের জন্য বাইরে পা রাখা দায়। তবে বাসায় বাড়িওয়ালার সৌজন্যে পেলাম স্যাটেলাইট চ্যানেল। এতে আল-জাজিরা, বিবিসি, সিএনএন থেকে শুরু করে মিউজিক চ্যানেলসহ রয়েছে বেশ কিছু আরবি ও হিন্দি মুভির চ্যানেল, এনডিটিভি ও জি-অ্যারাবিয়া যাতে ২৪ ঘণ্টা ধরে চলে নতুন-পুরোনো হিন্দি ছায়াছবি।

টিভির পাশাপাশি অন্তর্জালে চোখ রেখে আমার সময় কাটে। রুমে সারাক্ষণই চলে এসি। গরমের যা তেজ, এসি ছাড়া টেকা মুশকিল। আমার সহকর্মী সাঁজির বাসায় ছিলো Window AC। সিডনি থেকে এসে প্রথম প্রথম সেই এসির আওয়াজটা বড্ড কানে লাগতো। তাই অনেক বাসা পছন্দ না হওয়ার কারণ ছিলো শুধু Window AC। তবে এই ফ্ল্যাটে রয়েছে ‘ওয়াল এসি ইউনিট’, তাই রক্ষে।

দোহা শহরের একটি অন্যতম পুরোনো এলাকা হলো ‘মুশাইরিব’, যা দোহার প্রবাসী কমিউনিটির কাছে ‘ন্যাশনাল’ বলেই পরিচিত। বেশ কিছু বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ থাকার ফলে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ন্যাশনাল এলাকাজুড়ে বসে বাঙালি প্রবাসীদের বিশাল আড্ডা, যাতে ভিনদেশি প্রবাসীরাও যোগ দেয়। মূলত শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের প্রবাসীরাই এখানে সমবেত হয়, দেওয়া-নেওয়া করে নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা।

সপ্তাহের ছয় দিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর ছুটির দিনটি উপভোগ করার জন্য অনেকে ঝকঝকে কাপড়চোপড় পরে এখানে আসে। ন্যাশনালের প্রধান সড়কের পাশেই রয়েছে একটি পাকা চত্বর, তাতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কিছু বসার বেঞ্চ। শুক্রবার বিকেল থেকে এই চত্বরকে ঘিরেই জমে ওঠে জনসমাবেশ। এই এলাকায় জনতার ঢল রেস্তোরাঁর চার দেয়াল ডিঙিয়ে রাস্তা, অলিগলি ও ফুটপাতেও উপচে পড়ে। যেদিকেই দৃষ্টি রাখা হোক না কেন, চোখে পড়ে কেবল জনতার মিছিল। বাতাসে ভেসে বেড়ায় মানুষের চাপা গুঞ্জরন, যা ঢাকার ব্যস্ত গুলিস্তানের মোড়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

দেশের রেস্তোরাঁয় জ্বাল দেওয়া ঘন লিকারের চা আমার খুবই প্রিয়। ন্যাশনালের বাঙালি হোটেল ‘মধুবন’ ও ‘সোনাগাজী’র চা খেয়ে মনে হলো, যেন স্বদেশের কোনো রেস্তোরাঁয় বসে চা খাচ্ছি। ন্যাশনালের কাছাকাছি আমার বাসা। তাই ছুটির দিনে গরম গরম চা-শিঙাড়া ও জিলাপির আকর্ষণে হেঁটেই চলে যাই ন্যাশনালে। আর ধূমায়িত চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বাঙালিদের আড্ডায় যোগ দিই।

বাঙালি হোটেলের চা ও শিঙাড়া খাওয়ার পর আমার কয়েকজন অস্ট্রেলিয়ান সহকর্মী বাঙালি রেস্তোরাঁর নিয়মিত খদ্দেরে পরিণত হয়েছেন। একদিন দেখি সোনাগাজীতে চা খেতে লাইন দিয়েছে এক জাপানি কনসালট্যান্ট!

তবে কখনো আড্ডার আসর ছেড়ে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে মানুষের ভিড়ে একা হেঁটে বেড়াতেও আমার খুব ভালো লাগে।

আমজনতার এই ভিড় থেকে একধরনের উত্তাপ বিচ্ছুরিত হয়, যা আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে, নিয়ে যায় মাতৃভূমির খুবই কাছাকাছি। আর তখন ছেলেবেলার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, দুরন্ত দুপুর, ক্লান্তিহীন খেলাধুলার স্মৃতি ছুটে বেড়ায় বুকের অলিগলিতে। মজার কথা হলো, মানুষের ভিড় ঠেলে হাঁটতে শুরু করলে চাটগাঁ, নোয়াখালী, সিলেট, কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষা থেকে শুরু করে নেপালি, হিন্দি, পশতুন, মালায়ালামসহ কমপক্ষে এক ডজন ভাষার কিচিরমিচির শোনা যায়।

তবে ন্যাশনালে আকর্ষণ শুধু রেস্তোরাঁ নয়, এখানে রয়েছে সস্তায় কেনাকাটার জন্য রকমারি দোকান, আছে ফটোশপ, বিশাল আইটি মার্কেট ‘সফিটেল’। আর দেশে কথা বলার জন্য আছে ভিওআইপি টেলিফোনের দোকান। নিজ নিজ এলাকার মানুষ খুঁজে পেতে যাতে অসুবিধা না হয়, সে জন্য ন্যাশনালে এলাকাভিত্তিক আড্ডার জন্যও রয়েছে বেশ কিছু নির্দিষ্ট স্পট। সোনাগাজী হোটেলের কাছেই রয়েছে বাংলাবাজার। দোহার খামারে উৎপন্ন তাজা শাকসবজির হাট বসে এখানে। ন্যাশনালে গেলে তাই খালি হাতে কখনো বাড়ি ফেরা হয় না।

দোহায় দুই মাস কেটে গেলো। সেপ্টেম্বর প্রায় শেষ, রমজান মাস সমাগত প্রায়। ভাবছি কখন হবে এই গ্রীষ্মের তীব্র দাহনের অবসান আর কীভাবে কাটবে রোজার মাস। দোহার সবচেয়ে গরমের সময় হলো জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর। এখন তাপমাত্রা সব সময় থাকছে ৪০ ডিগ্রির ওপরে। কখনো আবার ৫০ ছুঁয়ে যাচ্ছে। বাথরুমে ট্যাপের পানি এত গরম থাকে যে ভোরে অফিসে যাওয়ার আগে এই পানি দিয়ে গোসল করা অসম্ভব। তাই সবাই রাতে ঘুমুবার আগে বালতিতে পানি ভরে রাখে, যাতে ভোরে পানি ঠান্ডা হয়ে আসে। সবার মতো আমিও কিনলাম একটি বড় বালতি আর মগ। দীর্ঘদিন পর মগ দিয়ে এভাবে গায়ে পানি ঢালার সময় কৈশোরের দিনগুলো যেন আবার ফিরে পেলাম।

এখন দোহার আবহাওয়া কখনো থাকে শুকনো আবার কখনো খুবই আর্দ্র। একদিন অফিস থেকে বের হয়ে দেখি মুহূর্তের মধ্যে চোখের সানগ্লাসটা ঘোলাটে হয়ে গেলো। বুঝতে পারলাম, আজকের আর্দ্রতা অত্যধিক। গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি একই কাণ্ড। গাড়ির উইন্ডশিল্ড ঘোলাটে হয়ে গেছে, যা রীতিমতো পানি আর ওয়াইপার দিয়ে পরিষ্কার করতে হলো। রাস্তায় বের হলে তো কথাই নেই, ঘামে গা ভিজে সয়লাব হয়ে যায়।

আমার এমনিতেই ঘামের বাতিক আছে। সামান্য গরমেই ভীষণ ঘামতে থাকি, যা দেখে আমার চেয়ে আশপাশের মানুষ আরও বেশি অস্থিরতায় ভোগে। আমি সব সময় পকেটে রাখি রুমাল। ঘাম মুছতে মুছতে পথ চলি আর অনেক সময় একটি রুমালে কাজ হয় না, তাই সাধারণত রুমালের বদলে টাওয়েল রুমাল ব্যবহার করি। এখানে পথ চলতে কী পরিমাণ ধুলো গায়ে উঠে আসে, তার নমুনা দেখলাম কাপড় ধুতে গিয়ে। কাপড় ধোয়া পানির রং কুচকুচে কালো। ভাবলাম হয়তো জামা থেকে রং বেরোচ্ছে। আসলে কিন্তু তা নয়, এ হলো রাস্তাঘাটের ধুলোবালির রং।

দোহার আবহাওয়ার আরেকটি দিক নজরে পড়লো, তা হলো ধূলিঝড়। হঠাৎ একদিন দেখা যাবে ধুলোয় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে চারদিক। রাস্তার ওপারের দালান, বাড়িঘর সবকিছুই মনে হয় পরেছে ধুলোর ধূসর বোরকা। মেঘ করে বৃষ্টি আসার আগে যেমন দিগন্তজুড়ে আঁধার নেমে আসে, ঠিক তেমনি গা-ছমছম করা ভুতুড়ে ভাব গ্রাস করে চারপাশ। তবে দু-এক দিনের মধ্যে আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে।

কিন্তু বৃষ্টি? সে যেন মঙ্গলগ্রহের কোনো এক অচেনা প্রাণী। তাই তার দেখা কখন পাবো জানি না। মাঝেমধ্যে মনটা চাতকের মতো তৃষ্ণায় কাতর হয়, কখন নামবে বৃষ্টি। শুনবো বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ। সিডনিতে টেলিফোন করলেই জানতে পারি, বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে সবকিছু। অথচ দোহায়? কী হচ্ছে এসব?

আমাদের কাব্য-কবিতা, গল্প ও উপন্যাসের বিশাল অংশজুড়ে আছে বৃষ্টি। বাংলা কিংবা হিন্দি চলচ্চিত্রে বৃষ্টিধারায় স্নাত নায়ক-নায়িকার গানের দৃশ্য, সে যে থাকতেই হবে! আর গানে? তা লিখেই শেষ করা যাবে না-আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে, আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে, ও বৃষ্টির পানি তুই দুষ্টু জানি, এই বৃষ্টিভেজা রাতে তুমি চলে যেও না…ইত্যাদি। আরবদের কাব্যপ্রতিভার কথা কারও অজানা নয়। কথায় কথায় পদ্য রচনা করা, কবিদের মধ্যে কাব্যলড়াই ইত্যাদি আরবসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাই এদের কাব্যভান্ডারে বৃষ্টিবিষয়ক কোনো কিছু আছে কি না তা খুব জানতে ইচ্ছে করছিলো।

দোহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের খুবই কাছে আমার অফিস। গাড়িতে চড়ে গেলে মাত্র পাঁচ মিনিট আর হেঁটে গেলে লাগবে ১০ মিনিট। তবে প্লেনের বহর ওঠানামা করার সময় তেমন কোনো শব্দ শুনতে পাই না। বর্তমান ‘দোহা এয়ারপোর্ট’ খুবই ছোট। এর কাছেধারেই তৈরি হচ্ছে বিশাল আকৃতির নতুন এয়ারপোর্ট, যা ২০১০ সালে চালু হওয়ার কথা। ২৫ বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে তৈরি হচ্ছে এই বিমানবন্দর, যার প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল সহজেই ৮৫টি ফুটবল ফিল্ড গিলে খেতে পারবে।

এয়ারপোর্ট আমার একটি পছন্দের জায়গা। এয়ারপোর্টে হাজারো ভিনদেশি মানুষের ঢল দেখতে আমার ভালো লাগে। কেউ আসছে, কেউ যাচ্ছে। কারও মুখে হাসি, কারও মুখে বিষাদের ছায়া কিংবা অশ্র“র ধারা। শুভেচ্ছা স্বাগতর পাশাপাশি নিরন্তর বেজে উঠছে বিদায়ী সুরের মূর্ছনা। তাই কখনো এয়ারপোর্ট গেলে আমি আরও কিছু বাড়তি সময় কাটিয়ে আসি। কফিশপে বসে গরম কফিতে চুমুক দিয়ে রানওয়েতে চোখ রাখি আর ডুবে যাই উদাসী ভাবনায়। কখনো মনের মধ্যে গুনগুনিয়ে ওঠে গানের সুর : ‘আমি পথে পথে ঘুরি আমার নেই যে কোনো ঠিকানা, আমার মনের মাঝে বসত কাহার নিজেই জানি না’। ইচ্ছে করে-আহা! এমন করে ঘুরে ঘুরে যদি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারতাম!

প্রস্থানের চেয়ে যাত্রী আগমনের জায়গাটা আমার বেশি প্রিয়। বিদায়বেলার সাঁঝ কি কারও ভালো লাগে? তবে আগমন এলাকায় ঔৎসুক্য, জনতার বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া সত্যিই উপভোগ্য। কেউ দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়জনের আগমনের অপেক্ষায় হাতে নিয়ে ফুল, কেউ-বা এসেছে বাবা, মা, পরিবারের সদস্য কিংবা নতুন অভিবাসী বন্ধুকে বরণ করে নিতে। কারও হাতে বেলুন, প্ল্যাকার্ড, Welcome Home ইত্যাদি। আর যখন ট্রলি হাতে র‌্যাম্প দিয়ে যাত্রীদের আগমন শুরু হয়, তখন একটা চাপা উত্তেজনায় কেঁপে ওঠে অপেক্ষমাণ জনতা।

কাতারে আসার আগে ভাইপো-ভাইঝিকে আনতে গিয়েছি সিডনি এয়ারপোর্টে। অনেকের ভিড়ে দেখলাম একজন যুবকও দাঁড়িয়ে, হাতে একগোছা তাজা ফুল। তাকে দেখতে বেশ নার্ভাস মনে হচ্ছিলো। পরে বুঝতে পারলাম, সে সম্ভবত তার নতুন বিয়ে করা স্ত্রীর জন্য অপেক্ষারত। স্ত্রীকে আসতে দেখে ছুটে গিয়ে ফুল দেওয়ার পর মনে হলো ইচ্ছে থাকলেও খুব কাছে ঘেঁষতে পারছিলো না যুবক। কারণ, তার নবপরিণীতা স্ত্রীর সঙ্গে এসেছেন দুজন মুরব্বি। হয়তো তাদের কোনো একজনের বাবা-মা। যুবক আনন্দে উদ্বেলিত কিন্তু কী যেন না পাওয়ার হতাশায় কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণ।

এসব দেখে মন ছুটে গেলো ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসের দুর্লভ এক ক্ষণে। যেদিন সিডনি বিমানবন্দরে আমার অবস্থাও ছিলো অপেক্ষমাণ ওই যুবকের মতো। কিন্তু আমি সেই নাম না-জানা যুবকের চেয়ে একটু ভালো অবস্থানে ছিলাম। কারণ, আমার নতুন বিয়ে করা স্ত্রীর সঙ্গে কোনো গুরুজন ছিলো না, তিনি একাই এসেছিলেন।

দোহা এয়ারপোর্টে যে রাস্তা দিয়ে ঢুকতে হয়, তার ঠিক উল্টো দিকে রয়েছে একটি সবুজ খেলার মাঠ। দোহা শহরে এ ধরনের সবুজ খোলা মাঠের খুবই অভাব দেখতে পেলাম। আমি অফিস শেষ করে সন্ধ্যায় মাঝেমধ্যে ওই মাঠে গিয়ে বসতাম। সিডনিতে অফিস থেকে বাসায় ফিরেই কাছের একটি মাঠে নিয়মিত চক্কর দিতাম। অফিসের পাশেই সবুজ মাঠ দেখে সেই অভ্যাসটা আবার চালু করতে চাইলাম। অফিসে জগার, শর্টস, আর টি-শার্ট নিয়ে এলাম। অফিস ছুটির পর কাপড় বদলে মাঠে গেলাম জগিং করতে। কিন্তু এক চক্কর দেওয়ার পর অত্যধিক গরমে আমার মাথাই চক্কর দিতে শুরু করলো। তখন সঙ্গে সঙ্গে জগিং বন্ধ করে শরীরচর্চার পর্ব শীতকালের জন্য রেখে দেওয়াই শ্রেয় মনে করলাম।

সেপ্টেম্বর, ২০০৮