ছোটবেলায় পাঠ্যবইয়ে পড়েছিলাম সৈয়দ মুজতবা আলী বর্ণিত পাঠান দেশের কাহিনি। জানতে পেরেছি পাঠানদের আতিথেয়তার কথা, জীবনবাজি রেখে বন্ধুর জীবন রক্ষা করার অবাক করা কল্পকথা। দোহায় এসে বাঙালিদের মুখে শুনলাম কমিউনিটি হিসেবে পাঠানদের একতাবদ্ধ থাকার কথা, এক পাঠানের জন্য অন্য পাঠানের সহমর্মিতার কথা। কোনো পাঠান বিপদে পড়লে অন্য সবাই মিলে কেমন করে তাকে বিপদ থেকে টেনে তোলে আর নতুন কোনো পাঠান দোহাতে এলে তার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা কীভাবে সবাই মিলে করে দেয়, তার কথা। ওদের আবার ভয়ভীতি বলতে তেমন কিছু নেই বললেই চলে। আর খেপে গেলে তো সেরেছে! শুনেছি, স্থানীয় এক কাতারির সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়লে এক পাঠান রেগে গিয়ে ওই কাতারির পেটে ছোরা চালিয়ে দেয়।

পাঠানরা খুবই পরিশ্রমী। কিছুদিন আগেও কাতারের নির্মাণ খাতে কর্মরত শ্রমিকের সিংহভাগই ছিলো পাঠান। কিন্তু নাইন ইলেভেনের ঘটনার পর বাধা-নিষেধের কারণে কাতারে পাঠানদের সংখ্যা অনেক হ্রাস পেয়েছে। তবে কাতারে এসে এই পাঠানদেরই আতিথেয়তায় যে সিক্ত হবো, তা ভাবিনি কখনো।

আল নাখিল হোটেলে আমার প্রায় আট দিন পার হয়ে গেছে। ভাড়া গাড়ি নিয়ে চলাফেরা করছি। কিন্তু দোহার রাস্তাঘাট আমার কাছে অনেকটা Zigsaw Puzzle-এর মতো মনে হচ্ছিলো। এখনো শহরের পরিপূর্ণ Street Directory তৈরি হয়নি। তাছাড়া উন্নত বিশ্বের অন্যান্য শহরের মতো গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বিভিন্ন এলাকার নামধারী সাইনপোস্ট না থাকায় একবার পথ হারিয়ে ফেললে গন্তব্য খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাই হোটেলে যাওয়া-আসার পথে দিকভ্রষ্ট হওয়াটা আমার জন্য মোটামুটি একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।

তবে গাড়িচালকের আসনে বসে রাস্তা হারিয়ে ফেলাটা আমার দীর্ঘদিনের অভ্যেসই বলা চলে। গাড়ি চালাতে গিয়ে সিডনিতে আমি যখন রাস্তা হারিয়ে ফেলতাম, তখন আমার কন্যা মুনিরা বলে উঠতো, Here Daddy goes again…। ফলে ১০ কিলোমিটারের পথ যেতে আমার সচরাচর ১৫ কিলোমিটার লেগে যেতো। অচেনা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে অনেকের উত্তর-দক্ষিণ নির্ণয় করার নির্ভুল জ্ঞান দেখে আমি অবাক হয়েছি আর নিজেকে ধিক্কার দিয়েছি বারবার।

সেদিন ছিলো শনিবার। দুপুরে বাজারে কেনাকাটা করে হোটেলে ফিরছিলাম। কিছুক্ষণ পর মনে হলো, আমি রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি। কারণ, সামনে রাস্তার বড় সাইনপোস্টে লেখা KSA। তার মানে দোহা শহর ছেড়ে আমি এখন সৌদি আরবের সীমানার দিকে যেতে শুরু করেছি। তখনই গাড়ি ঘুরিয়ে উল্টো দিকে চলতে শুরু করলাম। কিন্তু কোনোমতেই রাস্তা খুঁজে পাই না। যেদিকে যাই সবকিছু একই রকম মনে হচ্ছিলো।

একপর্যায়ে বড় রাস্তা ছেড়ে আমার অজান্তেই পাশের একটি গলিতে ঢুকে পড়লাম। সরু রাস্তা, কোনো কোনো জায়গায় গর্ত। রাস্তার দুই পাশে ছোট-বড় ফ্ল্যাটের সারি। অনেক বাড়ির বারান্দায় ভিজে কাপড় ঝুলছে। মনে হচ্ছিলো, পুরান ঢাকা কিংবা সিদ্ধেশ্বরীর কোনো গলিতে ঢুকে পড়েছি। পুরোনো, চুনকাম খসে পড়া বাড়িঘর দেখে মনে হচ্ছিলো এটা দোহার অপেক্ষাকৃত গরিব প্রবাসীদের এলাকা। রাস্তা ঘেঁষে দেখছি চা-খাবারের দোকান। দোকানের সামনেই উনুনে কয়লার আগুনে বানানো হচ্ছে শিক কাবাব। পাশেই এখানে-ওখানে মানুষের জটলা। অধিকাংশ মানুষকেই দক্ষিণ এশিয়ার বংশোদ্ভূত বলে মনে হলো। তবে এর মধ্যে পাগড়ি, লম্বা সালোয়ার-কামিজ পরা বেশ কিছু পাঠানও চোখে পড়লো।

এভাবে উদ্দেশ্যহীনভাবে দুই ঘণ্টারও বেশি চলার পর দেখি বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা সমাগত প্রায়। তখন বেশ হতাশ হয়ে পড়লাম। মনে হচ্ছিলো রাস্তা আর খুঁজেই পাবো না। সমস্যা হলো হোটেলের টেলিফোন নম্বর কিংবা ঠিকানাটাও আমার কাছে নেই। থাকলেও বাড়তি কোনো সুবিধা হতো বলে মনে হয় না। কারণ, দোহায় রাস্তার ঠিকানা বলে লাভ নেই। এখানে রাস্তার নাম বা নম্বর কারও জানা থাকে না। আর নম্বর থাকলেও তা ধারাবাহিকতা মেনে চলে না বলে সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না, যা ঢাকার অনেক এলাকার মতোই। তাই কাতারে সবাই আশপাশের কোনো ল্যান্ডমার্ক স্থাপনা, ট্রাফিক সিগন্যাল, বিল্ডিং ইত্যাদি ধরেই ঠিকানা মনে রাখে।

উপায়ান্তর না দেখে অবশেষে রাস্তার এক পাশে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়লাম। সামনেই দেখি রাস্তার গা ঘেঁষা একটি বাড়ির গেটের ঠিক বাইরে ফুটপাতে বিছানো নড়বড়ে খাটের ওপর বসে আছেন একজন প্রবীণ পাঠান। মাথায় সাদা পাগড়ি, মুখে মেহেদি মাখানো দাড়ি। পেছনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন চামচা-জাতীয় যুবক। তার ভাবভঙ্গি দেখে মোড়ল গোছেরই একজন বলে মনে হলো।

আমি সরাসরি তার কাছে গিয়ে ইংরেজিতে জানতে চাইলাম কীভাবে হোটেলে যেতে পারি। তিনি আরবি বলা শুরু করলে বুঝলাম, ইংরেজি এখানে অচল। তাই ভাঙা ভাঙা উর্দুতে বোঝাতে চেষ্টা করলাম। তিনি হোটেলের ঠিকানা জানতে চাইলেন কিন্তু আমার কাছে যে তা-ও নেই। আমার অবস্থা বুঝতে পেরে তিনি তার চামচাদের একজন দোভাষীর খোঁজে পাঠালেন, যাতে আমার সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলা যায়।

পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যে আরেকজন মধ্যবয়স্ক পাঠান হাজির হলেন। তাকে হোটেলের নামটা বললাম। দোভাষীর সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলে মোড়ল গোছের পাঠান ভদ্রলোক উঠে এসে আমার কাছে গাড়ির চাবি চাইলেন। চাবি দিতেই তিনি আমাকে গাড়িতে উঠতে বলে নিজে চালকের আসনে গিয়ে বসলেন। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে এমন একটা জোরে টান দিলেন যে আমার আত্মা দেহ-খাঁচা থেকে প্রায় উধাও হওয়ার দশা। সরু গলিতে অবলীলাক্রমে ডানে-বাঁয়ে করে তিনি গাড়ি এগিয়ে নিয়ে চললেন। বুঝলাম এখানকার রাস্তাঘাট তার নখদর্পণে। ভয়ে ছিলাম ভাড়া গাড়িতে অ্যাক্সিডেন্ট করে এই বিদেশ বিভুঁইয়ে না জানি আবার কোন বিপদে পড়ি। আলাপ করে জানতে পারলাম তিনি একজন কন্সট্রাকশন ফোরম্যান, দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে কাতারে রয়েছেন।

যা-ই হোক, পনেরো মিনিটের মধ্যে তিনি আমাকে হোটেলের সামনে নিয়ে এলেন। হোটেল চোখে পড়তেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। গাড়ি থেকে নেমে বাড়ি যাওয়ার জন্য তাকে ট্যাক্সি ভাড়া দিতে চাইলাম। অনেক জোরাজুরি করার পরও তিনি টাকা কিছুতেই গ্রহণ করলেন না। হোটেল রুমে এসে হঠাৎ মনে হলো, লোকটার নাম বা যোগাযোগের জন্য টেলিফোন নম্বরটাও তো জানা হয়নি। খুব আফসোস হলো। তাড়াতাড়ি লিফট বেয়ে নিচে নেমে রাস্তায় এসে দেখি ভদ্রলোক পাঠান ততক্ষণে ফুটপাতে মানুষের ভিড়ে হারিয়ে গেছেন। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে রুমে ফিরে এলাম। রাতে বিছানায় শুয়ে চোখ বুজতেই স্মৃতির আয়নায় ভেসে উঠলো ছোট্টবেলায় পড়া গল্প ‘পাঠান মুলুকে’।

আগস্ট, ২০০৮