সেদিন অফিসের টেবিলে দেখলাম রেসিডেন্ট ম্যানেজারের সার্কুলার-রমজানের জন্য পরিবর্তিত অফিস সময়সূচি। এ কদিনের ব্যস্ততায় বুঝতেই পারিনি পবিত্র রমজান শুরু হতে কেবল সাত দিন বাকি। কাতারে অফিস সময়সূচি বেশ কয়েক ধরনের রয়েছে। আমার কনসাল্টিং অফিস সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা, সরকারি অফিস সকাল সাতটা থেকে বেলা দুইটা। ব্যাংক, পোস্ট অফিস, টেলিফোন, পানি, বিদ্যুৎ অফিসসহ অন্যান্য অনেক সংস্থা দুই বেলা খোলা থাকে সকাল আটটা থেকে ১২টা, আবার বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা/নয়টা পর্যন্ত। ফলে অফিস শেষ করে ব্যাংকিং, বিল দেওয়ার কাজ সহজেই সেরে ফেলা যায়।

রমজান মাসে অফিসের সময়সীমা কমিয়ে দেওয়া হয়। যারা বাংলাদেশে কাজ করেছে তাদের জন্য এটা নতুন কিছু না হলেও আমার জন্য এই ঘোষণা ছিলো যেন অপ্রত্যাশিত বোনাস। আমার অফিস রোজার সময় হবে সকাল আটটা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত। মাঝখানে কোনো খাবারের বিরতি থাকছে না। নির্মাণ খাতের শ্রমিকেরা খুব ভোরে কাজ শুরু করে বেলা ১১টার মধ্যে শেষ করে, যাতে সূর্যের খরা থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পায়। ইফতারির পর শুরু রাতের শিফট।

দোহায় এখন দিন বেশ ছোট। জুন-জুলাইয়ের প্রচণ্ড গরমের আঁচটাও বেশ কমে এসেছে। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ইফতারের সময় হচ্ছিলো। সিডনিতে গ্রীষ্মকালের রোজার তুলনায় বলতে গেলে স্বর্গ। মনে পড়ে গেলো নব্বই দশকের কথা। যখন সিডনিতে সন্ধ্যা হতো পৌনে নয়টার দিকে, প্রায় ১৬ ঘণ্টার দিন!

আমার অ্যাপার্টমেন্টের ৩০০ মিটারের মধ্যেই রয়েছে মসজিদ ও বাঙালি রেস্টুরেন্ট। ঢাকার মতোই রেস্টুরেন্টের সামনে রাস্তার ওপর বিক্রি হয় হরেক রকমের ইফতারি। তবে খাবার বাংলাদেশের মতো ততটা সুস্বাদু নয়। বেগুনি ও পেঁয়াজুর বিশাল সাইজ! যা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টেই দেখা যায়। আমি খাবার কিনে এনে রুমে রাখি আর আজান শুনেই ইফতার করি।

ইফতারি খেতে বসে মন ছুটে যায় সিডনিতে। এই প্রথম রমজান কাটাচ্ছি পরিবার থেকে অনেক অনেক দূরে। সবার সঙ্গে বাড়িতে বানানো ইফতার খেতে পারবো না ভাবতেই মনটা বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছিলো বারবার। ভাবতে থাকি বাসায় কী রান্না হচ্ছে আজ? আমার প্রিয় খাবার হালিম কিংবা ডিপ ফ্রাইড সবজি?

কাতারে সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত তাঁবুতে ব্যাচেলর, শ্রমিক ও নিম্নবিত্ত প্রবাসীদের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয়। এটা সবার জন্য থাকে উন্মুক্ত, ফলে অনেক অমুসলিমও এই ইফতারে শরিক হয়। ইফতারের সময় মুসলিম কি না এ নিয়ে কোনো রকমের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় না।

ইফতারের এক ঘণ্টা আগেই এসব তাঁবুতে মানুষের সমাগম শুরু হয়, তাই দেরি করলে জায়গা পাওয়া সম্ভব নয়। খুব সুশৃঙ্খলভাবে তাঁবুতে সবাইকে বসানো হয়। ইফতারের জন্য একটি বড় আকারের থালায় পোলাওয়ের সঙ্গে মুরগির রোস্ট কিংবা আরবি স্টাইলে রান্না করা মাটনের তরকারি দেওয়া হয়। থালায় যে পরিমাণ খাবার পরিবেশিত হয়, তা ন্যূনতম চার থেকে ছয়জন রোজাদার খুব সহজে পেট পুরে খেতে পারবেন।

এ ছাড়া থাকে খেজুর ও জুস কিংবা লাচ্ছির মতো শরবত, যা এখানে ‘লাবান’ নামে পরিচিত। খাবার স্থানীয় রেস্টুরেন্ট থেকে সরবরাহ করা হয়। খাবারের মেন্যু সারা মাস থাকে একই রকম। একদিন মুরগি ও অন্যদিন খাসির বিরিয়ানি, এভাবে পালাক্রমে চলতে থাকে। এটা খুবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ বলে আমার মনে হয়েছে।

কাতার জাকাত ফান্ড থেকেই এই ইফতারের আয়োজন করা হয়। এ বছর ইফতারের জন্য জাকাত ফান্ড বরাদ্দ করেছে আট কোটি টাকা। ইফতারের আয়োজন ছাড়াও জাকাত ফান্ড থেকে অভাবী পরিবারকে সাময়িক ও মাসিক হারে আর্থিক ভাতাও দেওয়া হয়। এবারের রমজান মাসে ১ হাজার ৮০০ নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে মাংস ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করা হবে। রোজার সময় জাকাত ফান্ডে মানুষ প্রচুর দানও করে থাকে। আসছে রমজানে এই দানের পরিমাণ গত বছরের ১১৫ কোটি থেকে বেড়ে ১৩০ কোটি টাকায় দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রতিটি মসজিদেই তারাবির নামাজ পড়ানো হয়। বেশ কিছু মসজিদে খতমে তারাবিও হয়ে থাকে। দোহার মসজিদে কীভাবে তারাবি পড়ানো হয়, তা জানার জন্য ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন মসজিদে আমি তারাবিতে অংশ নিয়েছি। শুরুতে মসজিদ ভর্তি থাকলেও ৮, ১০, ১২ রাকাতের বিভিন্ন পর্যায়ে মুসল্লিরা তারাবি শেষ করে বাড়ি চলে যান।

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ আসে এক ভিন্ন ধরনের উচ্ছলতা, মুক্তি ও আনন্দের আমেজ নিয়ে। আর তখন বাংলাদেশের দিকে দিকে উপচে পড়ে আনন্দের ফোয়ারা। ঈদের চাঁদ দেখার উত্তেজনা লক্ষ করা যায় আবালবৃদ্ধবনিতার মধ্যে। মাসখানেক আগ থেকে পড়ে যায় ঈদের বাজার করার ধুম।

তবে আরবদের ঈদ পালনের ধরন আমাদের দেশের চেয়ে একটু ভিন্ন। এখানে রোজার শুরু থেকেই উত্তেজনার ভাব লক্ষ করা যায়, যেটা পুরো মাস চলে। ফলে আমাদের দেশের মতো, ঈদের দিনে আবেগ ও আনন্দের বিস্ফোরণ ঘটতে দেখা যায় না। আরবরা ইফতারির পর থেকে সেহরির সময় পর্যন্ত অনেকেই বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনদের বাসায় আসা-যাওয়া করে। তারাবির নামাজের পর চলে রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা, সিসা পান, খাওয়াদাওয়া ইত্যাদি।

এখানে ঈদের নামাজ হয় খুব ভোরে, ফজরের নামাজের আনুমানিক এক ঘণ্টা পর। ফলে আমাদের দেশের মতো দলবদ্ধ হয়ে পরিবার-পরিজনসহ ঈদের জামাতে যাওয়ার দৃশ্য এখানে সচরাচর চোখে পড়ে না।

মধ্যপ্রাচ্যের রৌদ্র-দগ্ধ দিনে রোজা রেখে কনস্ট্রাকশন সাইটে চুন-সুরকি ও পাথর নিয়ে যেসব শ্রমিক ভাইয়েরা কাজ করছেন, তাঁদের কাজ করার কথা ভাবলে আত্মাটাই যেন শুকিয়ে যায়। জীবন ও জীবিকার তাগিদে এমন প্রতিকূল পরিবেশেও রোজা রেখে কাতারের মুসলিম শ্রমিকসমাজ কাজ করে যাচ্ছে। একদিকে জীবিকা আর অন্যদিকে ধর্ম, মুসলিম শ্রমজীবীদের জন্য দুটোই যে অপরিত্যাজ্য। ফলে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিনই ডিহাইড্রেশনের কারণে বহু মুসলিম শ্রমিক হাসপাতালে ছুটছেন।

সম্প্রতি আল-জাজিরা টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান Shariah and Life এবং IslamOnline ওয়েবসাইটখ্যাত বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ শেখ আল-কারজাভি রমজানের দিনে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেলে কনস্ট্রাকশনের কাজ বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু কাজ বন্ধ করা না গেলে শ্রমিকেরা যদি অত্যধিক তৃষ্ণাকাতর হয়ে পড়েন, তবে রোজা ভাঙা যাবে বলে ফতোয়া দিয়েছেন শেখ কারজাভি। তিনি আরও বলেন, যে রোজাগুলো ভাঙা হবে, সেগুলো পরে পূরণ করে দিতে হবে।

তবে কাতারের মুফতি শেখ বুয়াইনাইনের মতে, গরমের জন্য শুধু তৃষ্ণার্ত হলেই চলবে না, জীবননাশের ঝুঁকি থাকলে তবেই রোজা ভাঙা যাবে। কাতারের অন্য একজন মুফতি শেখ হিলাল যুক্তি দেখিয়ে বলেন, ইসলামের ইতিহাসে সংঘটিত বড় বড় যুদ্ধ হয়েছে এই রমজানে। তাই কাজের অবস্থা যা-ই হোক না কেন, প্রতিটি সুস্থ সাবালক মুসলিমকে রোজা রাখতে হবে।

মুফতিদের ভিন্ন মত থাকলেও আরব আমিরাতের General Authority for Islamic Affairs and Endowment (AWQAF), কনস্ট্রাকশনের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকেরা স্বাস্থ্যগত কারণে রোজা ভাঙতে পারবে বলে সরকারি ফতোয়া দিয়েছে। তবে ফতোয়ায় স্পষ্ট করে বলা আছে, যারা রোজা রেখেছে কেবল তাদের জন্যই এই ফতোয়া প্রযোজ্য হবে।

রোজায় টুথপেস্ট ব্যবহার করে দাঁত মাজা নিষিদ্ধ বলে আলেমদের মুখে শুনেছি। তবে মুফতি শেখ আল-কারজাভির মতে যেহেতু টুথপেস্ট খাবার কিংবা পানীয় এ দুটোর কোনোটাই নয়, সুতরাং রোজা রেখে টুথপেস্ট ব্যবহার করা ধর্মীয় মতে শুদ্ধ এবং এতে রোজা ভাঙবে না। এ ছাড়া যাঁরা অ্যাজমায় ভুগছেন, তাঁরা রোজা রেখে Inhaler নিতে পারবেন বলে শেখ রায় দিয়েছেন।

কাতার বলে কথা নয়, ফুটবল আরব দেশগুলোর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। রমজান মাসে ফুটবল খেলা নিয়ে শেখ আল-কারজাভির ফতোয়া হলো, নিজ দেশের ফুটবল ম্যাচগুলো ইফতারের পর, অর্থাৎ রাতে হতে হবে। কিন্তু দেশের বাইরে ম্যাচ খেলতে গেলে খেলোয়াড়েরা রোজা ভাঙতে পারবেন। দেশের বাইরে ভ্রমণরত মুসাফির খেলোয়াড়েরা রোজা রাখার দায় থেকেও অব্যাহতি পাবেন।

সেপ্টেম্বর, ২০০৮