কাতারে আসার কিছুদিনের মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ অন্য কমিউনিটির বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। কিন্তু স্থানীয় কাতারিদের খুব একটা চোখে পড়লো না। গাড়িতে, শপিংয়ে, মসজিদে ও অন্যান্য জায়গায় কখনো দৃশ্যমান হলেও মনে হলো কাতারিরা যেন অনেকটা ধরাছোঁয়ার বাইরে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে স্থানীয় কাতারি জনসংখ্যার স্বল্পতা। কাতারের মোট জনসংখ্যা ৯ থেকে ১০ লাখ। কিন্তু তার মাত্র ২৫ শতাংশ হলো স্থানীয় কাতারি নাগরিক আর বাকি ৭৫ শতাংশ বহিরাগত, অর্থাৎ আজনবি।

কাতারিদের চেনা যায় তাদের পোশাক দেখে। যেমন গায়ে লম্বা সাদা আলখেল্লা, মাথায় স্কার্ফ আর পায়ে স্যান্ডেল। বুকপকেটে থাকে একটা দামি ব্র্যান্ডের কলম, হাতে বিশাল আকৃতির ঘড়ি ও চোখে কালো চশমা। কিছুক্ষণ পর পর তারা বুকপকেটে রাখা কলম, ঘড়ি ও চশমা নেড়ে চেড়ে পরখ করে দেখে সঠিক জায়গায় আছে কি না।

কাতারি পুরুষদের গলা থেকে পা পর্যন্ত সাদা কুর্তাকে বলা হয় দিসদাস (دشداش) বা থোপ (شوب Thobe), মাথার কাপড় হলো গুতরা (غطر) আর মাথার কাপড়কে ধরে রাখার জন্য কালো মোটা দড়ির আজাল (عجال Agal) ব্যবহৃত হয়। তবে কাতারির সঙ্গে অন্য আরবিদের আজালের মধ্যে একটু পার্থক্য রয়েছে। কাতারিরা আজালের একটা বাড়তি অংশ পিঠের ওপর ঝুলিয়ে দেয়, যা পেছন থেকে দেখতে চুলের বেণি বলে ভুল হতে পারে।

মাথার গুতরা সাধারণত সাদা কাপড়ের হয়ে থাকে, তবে লাল ও সাদা চেক কাপড়েরও বেশ প্রচলন রয়েছে। ফিলিস্তিনি প্রয়াত নেতা ইয়াসির আরাফাত এই চেক গুতরা পরিধান করতেন। ফিলিস্তিনি সংগ্রামের প্রতি একাত্মতা প্রকাশের জন্য চেক কাপড়ের গুতরা আরবদের মধ্যে প্রচুর জনপ্রিয়তা পায়। কাতারি শেখ ও ধনী ব্যবসায়ীরা বিশেষ দিনগুলোতে ‘দিসদাসে’র ওপর কারুকাজ করা বাড়তি জুব্বাও পরে থাকেন, যাকে বিসত্ বা মিসলাহ বলা হয়।

কাতারিরা মোটামুটি লম্বা আকৃতির। গায়ের রং অনেকের খুব ফরসা আবার কেউ বেশ কালো, তবে ঘোর কালো নয়। গায়ের রং নির্ভর করছে তাদের পূর্বসূরির আদিবাস সৌদি, ইরান নাকি আফ্রিকা তার ওপর। অনেকের মুখে দেখা যায় বিভিন্ন ধাঁচের খোঁচা খোঁচা দাড়ি। অপেক্ষাকৃত কম বয়স্ক ও ইয়াং কাতারির কাছে এটা হচ্ছে একধরনের ফ্যাশন। প্রায় সব কাতারি পুরুষ তসবিহ হাতে ঘোরাফেরা করে থাকে। সময় সময় আঙুলে পেঁচিয়ে নিয়ে তসবিহটাকে ঘোরাতে থাকে। কোনো ধর্মীয় কারণে নয় বরং আঙুলে তসবিহ ঘোরানো হচ্ছে আরবদের সংস্কৃতিরই একটি অংশ।

কাতারি নারীরা থাকেন আপাদমস্তক কালো আলখেল্লায় ঢাকা। কারও শুধু দেখা যায় মুখ, কারও শুধু দুটো চোখ আবার কারও মুখটাও থাকে আবৃত। নারীদের পোশাকের রয়েছে দুটি অংশ। শরীরের পরিধেয় পোশাকের ওপর যে কালো, লম্বা, ঢিলা বহির্বাস থাকে; তা হলো আবায়া (عباية) আর মাথার স্কার্ফকে বলা হয় শিইলা (شيلة)। বয়স্ক নারীরা আবার অনেক সময় মুখে চামড়ার তৈরি বোরকা নামের একধরনের মুখোশ পরেন, যা চোখ বাদ দিয়ে নাক, ভ্রু ও গাল দুটোও ঢেকে রাখে।

কাতারে আসা পর্যটক ও প্রবাসীদের কাতারি পোশাক পরিধান না করার জন্যই উপদেশ দেওয়া হয়ে থাকে, যাতে অসাবধানতাবশত কাতারের জাতীয় পোশাক নিয়ে ঠাট্টা বা তামাশায় মেতে না ওঠে। তবে পোশাকের সঙ্গে আরবি ভাষা জানার একটা সম্পর্ক রয়েছে। ওই পোশাক পরলে ধরে নেওয়া হয় পোশাকধারী হয় কাতারি না হয় আরবি। তাই আরবি পোশাক পরিধান করে আরবি বলতে না পারলে ফেঁসে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে ভালো আরবি বলতে পারলে সমস্যা নেই। দীর্ঘদিন ধরে কাতারে আছেন এবং আরবি ভাষায় দক্ষ এমন অনেক বাঙালিকে দেখলাম কাতারি পোশাক পরে ঘোরাফেরা করতে।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য আরব দেশের তুলনায় কাতারিরা যথেষ্ট ভদ্র এবং অযথা গায়ে পড়ে ঝামেলা বাধায় না কিংবা দাদাগিরি দেখাতে যায় না। ওরা থাকে ওদের মতো করে। আমি লক্ষ করেছি, পথযাত্রী রাস্তা পেরোবার সময় অধিকাংশ কাতারি সৌজন্য দেখিয়ে গাড়ি থামিয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের দেশি ভাইদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় তার উল্টোটা ঘটতে দেখেছি। শিক্ষিত কাতারিরা খুবই অমায়িক। প্রবাসীদের দৃষ্টিতে শিষ্টাচারের দিক দিয়ে কাতারিদের স্থান দুবাইয়ের আরবিদের পাশাপাশি। আর দুঃখজনক হলেও সবার নিচে সৌদি আরবিদের অবস্থান। গেয়ো ও কর্কশ স্বভাবের জন্য সৌদিরা সুপরিচিত।

ইদানীং কাতারিরা দোহার ঘনবসতি এলাকা থেকে সরে গিয়ে শহরের উপকণ্ঠে আবাস গড়ে তুলছে, যা এখানকার পশ এলাকা হিসাবে পরিচিতি পাচ্ছে। অনেকটা ঢাকার বারিধারা-গুলশানের মতো। ঘনবসতি এলাকায় প্রবাসীদেরই বেশি দেখা যায়। তবে দোহা শহরের ঘনবসতিপূর্ণ পুরোনো এলাকাতে এখনো প্রচুর কাতারির বাড়ি রয়েছে। বহুতলবিশিষ্ট অ্যাপার্টমেন্টের ফাঁকে উঁচু প্রাচীরঘেরা বাড়ি দেখলে বুঝতে হবে এটা কাতারির বাড়ি। দেয়ালের উচ্চতা, বাড়ির সাইজ কত বড় আর বাড়ির প্রধান ফটকের নকশা কত বাহারি, তা দেখে বুঝে নিতে হবে এটা কত বড় শেখ।

প্রচলিত নিয়মের রেস্টুরেন্ট, হোটেল ছাড়া দোহার প্রতি এলাকাতেই রয়েছে বিশেষ ধরনের কিছু কফি শপ। এখানে সাধারণত আরবি ও কাতারিরা আড্ডা দেন। এসব কফি শপের মূল আকর্ষণ হলো কারুকাজখচিত হুঁক্কা, যাকে এরা সিসা বলে থাকে। কফির পাশাপাশি এখানে সিসাও সরবরাহ করা হয়। বিভিন্ন আকারের ও রঙের সিসা রয়েছে। শপিং সেন্টারে গেলে এর নমুনা দেখা যায়। ১০০ রিয়াল থেকে শুরু করে হাজার রিয়ালেরও সিসা রয়েছে।

এ ছাড়া কফি শপে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে থাকে স্যাটেলাইট টেলিভিশন। ফুটবল কাতারিদের খুবই প্রিয় খেলা। কফি শপে দেখা যাবে কেউবা সিসা মুখে নিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে আর টেলিভিশনের পর্দায় খেলা দেখছে। কেউবা খেলছে কার্ড কিংবা চা-কফি হাতে নিয়ে আড্ডায় মত্ত। আমি কখনো বাইরে দাঁড়িয়ে কফি শপের অভ্যন্তরের তৎপরতা দেখার চেষ্টা করেছি। দেখে মনে হয়েছে, এ তো কফি শপ নয়, যেন রহস্যের চাদরে ঢাকা আরব্য রজনীর উপন্যাসের কোনো এক সরাইখানা, যেখানে সিসার ধূম্রজালে রচিত হচ্ছে কল্পকাহিনির কোনো দৃশ্যপট। এখানে খুঁজলে হয়তো পাওয়া যাবে আলি বাবা ও চল্লিশ চোরের কোনো বংশধর।

আমার জানামতে, একজন বাঙালি ওই ধরনের একটি সিসাঘর, অর্থাৎ কফি শপে নিয়মিত আড্ডা দিতে যান। তিনি অনেক দিন ধরে আছেন দোহায় আর আরবি বলতে পারেন খুবই ভালো। ফলে তাঁকে দেখে ধরার উপায় নেই যে তিনি বাইরের কেউ। তিনি বলেন, ‘আমি আরবি পত্রিকা নিয়ে যখন পড়া শুরু করি, তখন ওরা মনে করে আমি একজন কাতারি। তবে আমার জানামতে, বেশ কয়েকজন বাঙালি আছেন, যাঁরা কাতারি নাগরিকত্ব পেয়েছেন। এটা ৩০-৪০ বছর আগেকার কথা। এখন আর সেই সুযোগ নেই।’

জানুয়ারি, ২০০৯