দোহায় বাঙালির সংখ্যা আনুমানিক এক লাখেরও বেশি। তাঁদের অধিকাংশ হলেন নিম্ন আয়ের শ্রমিক কিংবা কর্মচারী। অন্যান্য সেক্টর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং অফিস-আদালতে বেশ কিছু বাঙালি কাজ করছেন। তবে ফার্নিচার, চুল কাটার সেলুন ব্যবসায় বাঙালিদের প্রভাব চোখে পড়ার মতো। ফার্নিচার মার্কেট আল হারেজের কথা আমি আগেই বলেছি। এ ছাড়া ছোট থেকে মাঝারি ধরনের খাবারের রেস্টুরেন্ট, হার্ডওয়্যার শপ, বিল্ডিং সাপ্লাই, গ্রোসারির দোকান, গাড়ির গ্যারেজ ইত্যাদি চালাচ্ছেন বেশ কিছু বাঙালি ব্যবসায়ী।
ইদানীং কন্ট্রাক্টিং ও শ্রমিক আমদানি করে অল্প সময়ের মধ্যে ভাগ্য পাল্টেছেন অনেক বাঙালি। অথচ মাত্র কিছুদিন আগে তাঁরা নিজেরাও ছিলেন শ্রমিক। এ রকম দুজনের কথা আমি জানি। একজন গাড়ির গ্যারেজের মেকানিক ছিলেন। এখন তিনি দোহার একটি বৃহত্তম গ্যারেজের মালিক। শুনেছি, সব খরচ বাদ দিয়ে মাসিক লাখ রিয়ালেরও বেশি আয় করছেন। অন্য আরেকজন হোটেলের কিচেন হ্যান্ড হিসেবে কাজ করতেন। আর এখন তিনি একটি তিন তারকা হোটেল চালাচ্ছেন। কাতারে ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন একজন ভালো কফিলের। কফিলের সাহায্য-সহযোগিতা না পেলে কোনো কিছুতেই সফল হওয়া যায় না।
সেদিন দোহার কর্নিশ এলাকায় গিয়ে দেখি হরেক রকমের সামুদ্রিক মাছ বিক্রি হচ্ছে। জেলেদের অধিকাংশ বাঙালি। জেলেরা ছোট ছোট ইঞ্জিনের নৌকো করে সাগর থেকে মাছ ধরে এনে কর্নিশের পাকা চত্বরে স্তূপ করে রাখছে। একদম তাজা মাছ, নৌকার পাটাতনে দাপাদাপি করছে। এখানে বাজারের তুলনায় অনেক সস্তায় মাছ পাওয়া যায়। শুধু পার্থক্য হলো মাছ কিনে বাসায় নিজেদের কাটাকুটি করতে হয়।
দর্জি ব্যবসাতেও বাঙালিরা সফল। কাতারিদের সাদা কাপড়ের জুব্বা সেলাই ও সরবরাহে বাঙালিদের সুনাম আছে। অনেকে কেবল এই ব্যবসা করেই কোটিপতি হয়েছেন। কাতারিরা অনেক সময় খুব একটা দর-কষাকষি করে না। ফলে মিটার প্রতি পাঁচ রিয়ালের কাপড় সহজেই পনেরো রিয়াল পর্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে দর্জিরা বিক্রি করতে সমর্থ হয় বলে জানালেন দোহার এক পুরোনো বাঙালি।
বাঙালিরা বরাবরই স্বাধীনচেতা ও প্রতিবাদী। তবে এই স্বাধীনচেতা স্বভাব তাদের জন্য অনেক সময় বিপর্যয় ডেকে আনে। দেখা গেছে, একজন কাতারি মালিক সুযোগ থাকলে বাঙালির চেয়ে কেরালাইট বা নেপালিকে কাজে নেবে। কারণ সে জানে, একজন নেপালি বা কেরালাইটের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলেও তারা চুপচাপ মেনে নেবে। পাল্টা প্রশ্ন না করে ওরা মাথা নিচু করে থাকবে। কিন্তু বাঙালিরা বরাবরই বিদ্রোহী, ‘চির উন্নত মম শির’।
কিছুদিন আগে দোহার রাস্তায় গাড়ি চালাবার সময় একজন বাঙালির সঙ্গে এক কাতারি ড্রাইভারের বচসা শুরু হয়। কাতারি হুট করে পাশের লেনে ড্রাইভরত বাঙালির গাড়ির সামনে চলে আসে। কয়েক ইঞ্চির জন্য সংঘর্ষ থেকে বেঁচে যায় দুটি গাড়ি। স্বাভাবিকভাবে ওই বাঙালি ভাই কাতারি ড্রাইভারকে ইঙ্গিত করে কিছুু বলতে গেলে কাতারি গাড়ি থেকে নেমে এসে গালমন্দ শুরু করে আর বলে, ‘এটা আমার দেশ, আমি যা ইচ্ছে তাই করবো।’ কিন্তু বাঙালি ভায়া দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি তেড়ে এসে কাতারিকে প্রায় মারার উপক্রম করে বলতে থাকেন, ‘দেশটা তোর হলে কী হবে রাস্তা আর কানুন তো তোর নয়?’
বাঙালির তেজি জবাব আর মারদাঙ্গা রূপ দেখে কাতারি ভড়কে যায় আর ভাবে-কী ভেজালেই না পড়লাম! কথা বাড়ালে মার খাবার সমূহ সম্ভাবনা দেখে কাতারি ড্রাইভার কালবিলম্ব না করে ভেজা বিড়ালের মতো লেজ গুটিয়ে ঘটনাস্থল থেকে কেটে পড়ে।
অন্য একটি ঘটনায় দেখা যায়, একজন বাঙালি এক নেপালির সঙ্গে তর্কে লিপ্ত। নেপালির সঙ্গে রয়েছে ৫০-৬০ জনের দল। কিন্তু অকুতোভয় বাঙালি একাই পুরো দলের সঙ্গে লড়ছে আর নেপালি দল বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।
এ ধরনের লড়াকু মেজাজই বাঙালি জাতিকে ’৫২, ’৬৯, ’৭১ ও ‘৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে জয়ী করেছিলো। বাঙালিরা হয় খুব ক্ষমাশীল কিংবা সহজেই সবকিছু ভুলে যাওয়ার প্রবণতায় ভোগে। না হলে একাত্তরে যাদের বিরুদ্ধে ছিলো সংগ্রাম, সেই স্বাধীনতা বিরোধীরাই ক্ষমতায় আসীন হতে পারতো না।
এই এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, রক্তপাত কি কম হয়েছে? বাংলাদেশের এমন কোনো প্রধান কবি নেই, যারা এরশাদের মুণ্ডুপাত করে কবিতা লিখেননি। অথচ সেই এরশাদ এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। গেলো নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের হিসাব অনুযায়ী এরশাদ যদি এককভাবে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য ভোটে দাঁড়ান, তাহলে নিশ্চিত বিজয়ী হবেন। তাই বলতে ইচ্ছে করে, ‘কবি, আপনি কি আপনার কবিতা এবার ফিরিয়ে নেবেন?’
জানুয়ারি, ২০০৯
