২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের স্বাগতিক দেশ হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে কাতার। কাতারের দিকে দিকে তাই দেখা যাচ্ছে ফুটবল উন্মাদনার রেশ। দোহার শহরের রাস্তার লাইটপোস্ট থেকে শুরু করে চৌরাস্তার মোড়ে মোড়ে শোভা পাচ্ছে Bidding Nation, Qatar 2022 লেখা বিশাল আকারের পোস্টার। আল-জাজিরা টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনেও প্রদর্শিত হচ্ছে একই ¯স্লোগান। শপিং মলে বিক্রি হচ্ছে ২০২২ বিশ^কাপের লেবেল আঁকা টুপি, টি-শার্ট, পানির বোতল, ব্যাগসহ হরেক রকমের ক্রীড়াসামগ্রী।
বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২ মাথায় রেখে তৈরি হচ্ছে কাতার ও বৃহত্তর দোহা শহরের অবকাঠামো উন্নয়নের মাস্টারপ্ল্যান। সবকিছু মিলিয়ে বরাদ্দ হয়েছে প্রায় দেড় শ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজেট। আগামী বছরই চালু হতে যাচ্ছে ২৫ বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে তৈরি প্রকাণ্ড নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। নতুন বিমানবন্দরের প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল হবে ৮৫টি ফুটবল ফিল্ডের সমান, যাতে সর্বোচ্চ ৫০ মিলিয়ন যাত্রী ওঠানামা করতে পারবে। তৈরি হচ্ছে দুবাইয়ের মতো মেট্রো ট্রেন, বাহরাইন-কাতার সংযোগকারী ৪০ কিলোমটিার দীর্ঘ Friendship Causeway। রিয়েল এস্টেট প্রজেক্টের মধ্যে রয়েছে পার্ল দ্বীপ, দোহা ল্যান্ড, এনার্জি সিটি, লুসাইল সিটি ইত্যাদি।
মরুভূমির ৫০ ডিগ্রি গরমে বিশ্বকাপ ফুটবল? অনেকের কাছে এটা নিছক কৌতুক মনে হতে পারে। কারণ, এখন পর্যন্ত ২৯ ডিগ্রির চেয়ে বেশি তাপমাত্রার কোনো দেশে ফিফা বিশ্বকাপ হয়নি। কিন্তু এই রেকর্ড ভাঙারই পরিকল্পনা করছে কাতার। ৪ বিলিয়ন ডলারে নির্মিত হবে তিনটি হাই-টেক পরিবেশনিয়ন্ত্রিত নতুন স্টেডিয়াম। এ ছাড়া দোহার দুটি পুরোনো স্টেডিয়ামকে আপগ্রেড করা হবে। প্রতিটি স্টেডিয়ামে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার ফুটবল দর্শক বসতে পারবে। অত্যাধুনিক শীতাতপনিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা স্টেডিয়ামের অভ্যন্তরের তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ২০ ডিগ্রিতে নামিয়ে আনতে সক্ষম হবে। স্টেডিয়ামের নকশা দেখে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছি। বিশ্বের কোথাও এমন স্টেডিয়াম আছে কি না জানা নেই।
এশিয়ার পশ্চিম কোণে হাতের তালুর সমান ছোট্ট একটি দেশ কাতারে ২০২২ সালে বসবে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর! অনেক ফুটবল সমালোচক এ নিয়ে কটাক্ষ করে বলছেন, এমন ঘটনা ঘটবার আগে হাতিকে আকাশে উড়তে হবে। এমনটি বলার কারণও রয়েছে। মেসি, রোনালদোর মতো খেলোয়াড়েরা মধ্যপ্রাচ্যের এই গরমে ফুটবল খেলবেন, সেটা কি ভাবা যায়? ২০১৬ সালের অলিম্পিকের জন্য বিড করেছিলো কাতার, কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় গ্রীষ্মের খরতাপ দাহন গরম। অলিম্পিকের মতো বিশ্বকাপ ফুটবল যাতে হাতছাড়া হয়ে না যায়, সেই জন্য পুরো খেলার স্টেডিয়ামকেই শীতল স্বর্গোদ্যানে পরিণত করার হাইটেক পরিকল্পনা করছে কাতার।
বিশ্বকাপ ২০২২ বিডিং কমিটির প্রধান হলেন কাতারের আমির শেখ হামাদের কনিষ্ঠ সন্তান শেখ মুহাম্মদ বিন হামাদ আল-থানি। স্টেডিয়ামে খেলার মাঠের তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড রাখা হবে বলে ফিফাকে গ্যারান্টি দিয়েছেন শেখ মুহাম্মদ আল-থানি। বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য কাতারের ২০২২ সালকে বেছে নেওয়ার কারণ হলো মূলত ইউরোপিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা এড়ানো। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ইউরোপেই হবে বলে ধরা নেওয়া হচ্ছে, আর ২০২২ সালে প্রতিযোগিতা হবে এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে।
অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও মেক্সিকোর মতো বড় বড় রুই-কাতলাদের পেছনে ফেলে জিততে হবে ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপের দৌড়। তাই মরুভূমির গরমকে জয় করা ছাড়াও কাতারের সামনে রয়েছে ফিফা সদস্যদের মন জয় করার বিশাল চ্যালেঞ্জ। তবে কাতার বসে নেই, পর্দার অন্তরালে চলছে জোর লবিং। কিছুদিন আগে কাতার সফরে এসেছিলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট, আরও এসেছিলেন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, ফিফার প্রেসিডেন্ট সেপ ব্লাটার। কাতারের স্পোর্টিং পরিদর্শন করে ফিফার প্রধান খুশি হয়ে মন্তব্য করেন, ‘The Arabic world deserves a World Cup. They have 22 countries and have not had any opportunity to organize the tournament.ব্লাাটারের এই বক্তব্য কাতারসহ সমগ্র আরব বিশ্বে আশার আলো জাগিয়েছে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো একটি মেগা আয়োজন সফল করার জন্য স্থানীয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও নিরলস সমর্থন অত্যন্ত জরুরি। সিডনি ২০০০ অলিম্পিকের একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছিলো। সিডনি গেমসে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যাই ছিলো প্রায় ৪৮ হাজার! প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিকূল আবহাওয়া জয় করে নিয়ে এই আয়োজন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য স্থানীয় কাতারি জনগোষ্ঠীকেও এর সঙ্গে পুরোপুরি সম্পৃক্ত হতে হবে।
কাতারি ও আরব জনগোষ্ঠী ২০২২ বিশ্বকাপ নিয়ে উত্তেজিত হলেও দোহার কর্মজীবী প্রবাসীদের মধ্যে তেমন উত্তাপ দেখতে পেলাম না। ২০০৬ সালের এশিয়ান গেমসের সময় দোহার বাড়িভাড়া তিন-চার গুণ বেড়ে যায়। আজ ২০১০ সালে সেই ভাড়া কিছুটা কমলেও আগের অবস্থায় আর ফিরে যায়নি। বাড়িভাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর দামও বেড়েছে প্রচুর। এ বছর ডিসেম্বরের ২ তারিখ সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ২০১৬ ও ২০২২ বিশ্বকাপ ফুটবলের ভেন্যু নির্ধারণ করবে ফিফা। তাই আমার এক বন্ধু বললেন, ‘ডিসেম্বরের ২ তারিখ যদি কাতার বিজয়ী হয়, খুবই খুশি হবো। তবে আশা করছি, এবার কাতার সরকার প্রবাসীদের কথাও মনে রাখবে।’
কাকা, মেসি গোল পাননি, কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনা। তাতে কী? দক্ষিণ আফ্রিকায় সদ্য সমাপ্ত হয়েছে ফিফার ইতিহাসের অন্যতম সফল বিশ্বকাপ ফুটবলের ঝলমলে আসর। অথচ ১২ বছর আগে আফ্রিকায় যে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসবে, তা কেউ কখনো ভাবেনি। অনেকের মতে এই দক্ষিণ আফ্রিকাই কাতারের ভাগ্যের দ্বার খুলে দেবে। কে জানে, আর মাত্র চার মাসের মাথায় সবাইকে হতবাক করে দিয়ে হয়তো ইতিহাস গড়বে কাতার।
চাঁদে মুহাম্মদ ল্যাবরেটরি
দোহায় যে কথাটি এখন সবার মুখে মুখে ফিরছে তা হলো, চাঁদের পৃষ্ঠে রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের নামে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা। কানাডীয় মুসলিম বিজ্ঞানী রেদওয়ান ফকির দোহার ইসলামিক সেন্টার ‘ফানার’-এ কদিন আগে এই কথা জানান। মুহাম্মদ-১ নামের প্রথম গবেষণাগারটি চাঁদে পাঠানো হবে ২০১৩ সালে। আর ২০১৫ সাল নাগাদ দ্বিতীয় গবেষণাগারটিও (মুহাম্মদ-২) চাঁদের বুকে পৌঁছে যাবে। খরচ হবে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার, যা বহন করবে সমগ্র মুসলিমবিশ্ব।
মহাজাগতিক এই মুসলিম প্রকল্পে কাতার বড় অঙ্কের অনুদান দেবে বলে জানা গেছে। জনাব ফকির বলেন, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে যে মিথ্যা প্রচারণা চলছে, তার বৈজ্ঞানিক জবাব হলো চাঁদের বুকে পরিকল্পিত এই গবেষণাগার। এই উদ্যোগ বিশ্বকে রাসুলের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেবে।’
আমার বিশ্বাস, এই প্রকল্প বিজ্ঞানচর্চায় মুসলিমদেরও দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করবে।
জুলাই, ২০১০
