দোহায় পবিত্র রমজান পালন করতে গিয়ে দেশের আমেজ ফিরে পাচ্ছি। দিনে পুরো শহরটা যেন ঘুমিয়ে থাকে আর রাত ১০টার পর জেগে ওঠে। গভীর রাত পর্যন্ত শহরতলির রাস্তায় গাড়ি, শপিং মল এবং রেস্তোরাঁয় থাকে মানুষের ভিড়।

মুসলিম-অধ্যুষিত দেশের তুলনায় মুসলিম সংখ্যালঘু দেশে রমজানের আমেজ পুরোপুরি ভিন্ন। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের কথাই ধরা যাক। এই শহরের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ মুসলিম। সিডনিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করার সুবাদে দেখেছি, মুসলিম-অধ্যুষিত মহল্লায় না থাকলে আশপাশের মানুষ ও পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় নেই যে পবিত্র রমজান মাস চলছে। কারণ, ওই দেশে রমজান মাসে সবকিছু আগের মতোই চলে।

সিডনি শহরে রয়েছে ৩০টিরও বেশি মসজিদ। মসজিদ কাছেধারে না থাকলে এলাকার কোনো কমিউনিটি হল কিংবা স্কুলের ক্লাসরুমে সবাই তারাবির নামাজ সেরে নেন। নামাজের অনুমতি দিতে কর্তৃপক্ষকে কখনো তেমন বাড়াবাড়ি করতে দেখিনি। বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে সিডনি শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গোটা চারেক মসজিদ। এসব মসজিদে বাংলাদেশ থেকে হাফেজ এনে খতমে তারাবির আয়োজন করা হয়। পাকিস্তানি, আফগানি মসজিদেও একই ধরনের ব্যবস্থা থাকে।

সিডনিতে অফিস থেকে বাসায় ফিরতে দেরি হতো বলে প্রায়ই সিটি ট্রেনে বসেই ইফতারি সেরে নিতাম। তাই দেশের রমজান মাসের দিনগুলোর কথা ভেবে বেশ কষ্ট পেতাম। কিন্তু দোহায় এসে মনে হচ্ছে, যা হারিয়েছি তার কিছুটা হলেও এখন যেন ফিরে পাচ্ছি।

তবে প্রবাসীদের কাছে সবচেয়ে সেরা হলো স্বদেশের রমজান। কোনো কিছুর সঙ্গেই যে এর তুলনা নেই। রমজান মাস এলে, বিশেষ করে কৈশোরের সেই সোনালি দিনগুলো আমাকে ভীষণ নাড়া দেয়। ভাবি, আহা! রোজার সেই দিনগুলো যদি আবার ফিরে আসতো?

কৈশোরে ইফতারির সময়টা ছিলো মাহেন্দ্রক্ষণ, সবচেয়ে আনন্দের। ইফতারির সময় হলে মহল্লায় বেজে উঠতো সাইরেন। কখনো আবার লম্বা বাঁশের ডগায় টাঙিয়ে রাখা হতো লাল রঙের ইলেকট্রিক বাল্ব। ইফতারের সময় হলেই জ্বলে উঠতো সেই লালবাতি। লালবাতি জ্বললেই বুঝতে হবে ইফতারির সময় হয়ে গেছে। এ ছাড়া আরও বাজতো সাইরেন। বাতি জ¦ললেই বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মধ্যে বয়ে যেতো খুশির বন্যা, শুরু হয়ে যেতো ছোটাছুটি। সবাই দল বেঁধে গেয়ে উঠতো, ‘লাল বাত্তি জ্বল গ্যায়া, ইফতারির টাইম হো গ্যায়া!’ খেলার মাঠ থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতো বাড়ির পানে।

রাতে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে মসজিদে তারাবির নামাজ পড়তে যেতাম। নামাজ শেষ করে রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকানে বেশ কয়েক কাপ চা খেয়ে তবেই বাড়ি ফিরতাম। সেহরির সময় ঘুম থেকে জাগানোর জন্য পাড়ার অলিগলিতে উচ্চস্বরে ডাকাডাকি করা হতো। পালাক্রমে এই দায়িত্ব নিতো পাড়ারই লোকজন। আধো ঘুমে কানে ভেসে আসা সেই ডাক, দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার পর সাইরেন শোনার সঙ্গে সঙ্গে সেহরির খাবার মুখ থেকে ফেলে দিয়ে ফজরের নামাজের জন্য ছোটা, সেই স্মৃতি কি কখনো ভোলা যায়?

কাতারে বসে রমজানের অনেক স্মৃতিকথা আজ ভিড় করছে বুকের ভেতর। ইফতারির সময় হালিম ছিলো আমার খুবই পছন্দের। মনে পড়ে, বিকেল হলেই বাড়িতে হালিম তৈরি হবে কি না সে বিষয়ে খোঁজখবর নিতাম। বাড়ির ইফতারির মেন্যুতে হালিম না থাকলে চট্টগ্রামের চন্দনপুরায় ইকবাল হোটেলের বিখ্যাত হালিম কেনার জন্য বায়না ধরতাম।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজারের ইফতারি দেশখ্যাত। চকের রকমারি ইফতারি খাওয়ার জন্য অনেকে মফস্বল শহর থেকে ঢাকায় আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে যেতেন। চকের ইফতারির বিভিন্ন পদের মধ্যে ছিলো বাখরখানি, চাপাতি, নানরুটি, কুলিচা, নানখাতাই, শিক কাবাব, হান্ডি কাবাব, মাছ ও মাংসের কোপ্তা, শামি ও টিকা কাবাব, পরোটা, বোগদাদি রুটি, মোরগ কাবাব, ফালুদার শরবত ও নানা রকম ফল, পনির, বোরহানি, চাটনি ইত্যাদি।

কাতারের বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় থাকে নানা পদের ইফতারির আয়োজন। এসব রেস্তোরাঁয় বাঙালি কমিউনিটির বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রায় প্রতিদিনই আয়োজিত হয় ইফতার পার্টি। কেউ আবার স্থানীয় মসজিদেও ইফতার পার্টির আয়োজন করেন। করপোরেট ইফতার পার্টি চলে ফাইভ স্টার হোটেলে। এভাবে রমজানের পুরো মাসে কাতারে বিরাজ করে আনন্দ ও উৎসবের আবহ।

কাতারে দোহা শহরের বিশেষ জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে কামান। ইফতারের সময় হলে এসব কামানের তোপধ্বনি নগরবাসীকে ইফতারের সময় জানিয়ে দেয়। কাতার টেলিভিশন চ্যানেলেও কামানের তোপধ্বনি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। কাতারের ঐতিহ্যবাহী এই রীতি সত্যিই উল্লেখ করার মতো।

কাতারে সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবুতে ব্যাচেলর, শ্রমিক এবং নিম্নবিত্ত প্রবাসীদের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয়। এটা সবার জন্য থাকে উন্মুক্ত, ফলে অনেক অমুসলিমও এই ইফতারে শরিক হয়। ইফতারের সময় মুসলিম কিনা এ নিয়ে কোনো রকমের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় না।

ইফতারের এক ঘণ্টা আগেই এসব তাঁবুতে মানুষের সমাগম শুরু হয়, তাই দেরি করলে জায়গা পাওয়া সম্ভব নয়। খুব সুশৃঙ্খলভাবে তাঁবুতে সবাইকে বসানো হয়। ইফতারের জন্য একটি বড় আকারের থালাতে পোলাও-এর সাথে মুরগির রোস্ট কিংবা আরবি স্টাইলে রান্না করা মাটনের তরকারি দেয়া হয়। এছাড়া থাকে খেজুর ও জুস কিংবা লাচ্ছির মতো শরবত, যা এখানে ‘লাবান’ নামে পরিচিত। এটা খুবই প্রসংশনীয় উদ্যোগ বলে আমার মনে হয়েছে।

রমজান মাসে স্থানীয় কাতারি নাগরিক এবং ধনী শেখেরা অকুণ্ঠচিত্তে দান-খয়রাত করেন। প্রতিটি মসজিদে বাংলাদেশের মতো মহল্লাবাসী ইফতারি ও খাবার সরবরাহ করেন। আমি একটি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর কথা জানি, যেখানে রমজান মাসের ৩০ দিন বিনা মূল্যে সবাইকে ইফতারি পরিবেশন করা হয়। রেস্তোরাঁর কাতারি মালিক ইফতারের যাবতীয় খরচ নিজে বহন করেন। তিনি এটা জাকাত নয়, বরং বাড়তি সোয়াবের জন্যই করেন।

দোহার রেস্টুরেন্টের সামনে বাংলাদেশের মতো হরেক রকমের ইফতারি সাজিয়ে রাখা হয়। দোহার ন্যাশনাল এলাকাতেই বসে বাঙালিদের আড্ডা। ইফতারি কেনার জন্য তাই আমি ন্যাশনালেই ছুুটে যেতাম। কিন্তু সেই ন্যাশনাল এখন ঠাঁই নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। ভেঙে ফেলা হয়েছে ন্যাশনালের সবচেয়ে ব্যস্ত এলাকা। এখন সেখানে দেখি কেবল কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপ আর দানবাকৃতি ক্রেনের সারি। এই ধ্বংসস্তূপের ওপর গড়ে উঠছে অত্যাধুনিক মুশাইরিব শহর। আধুুনিকতার কাছে অবশেষে পরাজিত হলো ঐতিহ্য। ওই এলাকার পাশ দিয়ে যখনই যাই, কিছু একটা হারিয়ে ফেলার বেদনা মনটাকে খামচে ধরে। মনে হয়, নীলিমায় এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে প্রাণচঞ্চল ন্যাশনাল এলাকার গুঞ্জন।

দোহাকে যেভাবে ভেঙেচুরে নতুন করে গড়া হচ্ছে, তাতে ইতিহাস বলে আর কিছু রইবে না। ন্যাশনালের বাঙালি হোটেল ‘বনফুল’ এখন ব্যবসা জমিয়েছে শিল্প এলাকায়। কিন্তু ‘সোনাগাজী’ হোটেলের মালিক ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ারই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সোনাগাজী হোটেলের চা এতই প্রসিদ্ধ ছিলো যে কাতারের স্বয়ং আমির ও তাঁর স্ত্রী শেখা মওজা সোনাগাজীর চা খেতেন।

মাত্র কদিন হলো আমার বাড়ির কাছেই চালু হয়েছে নতুন বাঙালি রেস্টুরেন্ট। সুখের কথা হলো, সোনাগাজীর চায়ের কারিগর রয়েছে এই হোটেলে। তারাবি শেষ করে ফেরার পথে দেশের মতো হোটেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে চা খেতে না পারলেও গাড়িতে বসেই নিয়মিত চায়ের পর্বটা সেরে ফেলি।

দোহার প্রায় প্রতিটি মসজিদেই ৮ কিংবা ২০ রাকাত তারাবির নামাজ হয়ে থাকে। তবে খতমে তারাবি পড়ানো হয় এমন মসজিদের সংখ্যা আগের চেয়ে এখন অনেক কমে গেছে। খতমে তারাবির কথা বলতে গেলে মুশাইরিব এলাকার বুখারি মসজিদের কথা বলতেই হয়। মসজিদের ইমাম বাংলাদেশি। ইমাম ও তাঁর ছেলে দুজন মিলেই খতমে তারাবি পড়ান। তাঁদের সুললিত কণ্ঠের কেরাত ও শুদ্ধ উচ্চারণ মন কেড়ে নেয়।

সম্প্রতি জুমার খুতবায় তারাবি নামাজ নিয়ে দোহার একজন ইমামের মন্তব্য বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। তিনি খুতবায় যাঁরা ২০ রাকাত নামাজ পড়েন, তাঁদের যেভাবে উড়িয়ে দিলেন তা শুনে রীতিমতো ঘাবড়ে গেলাম। তাঁর মতে, এশার পরে তারাবি পড়াটাই শুদ্ধ নয়। কারণ, রাসুল সাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম নাকি কেবল গভীর রাতে তাহাজ্জুদের বদলে তারাবির নামাজ পড়তেন। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা না রেখে এভাবে কথা বলাটা সত্যিই দুঃখজনক।

দেশে যখন ছিলাম তখন তারাবি কত রাকাত পড়তে হবে, সে নিয়ে কখনো বিতর্ক হতে দেখিনি। ইদানীং এই বিতর্কে দেশের মানুষও জড়িয়ে পড়ছেন বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের টেলিভিশনেও দেখলাম এ নিয়ে কথা হচ্ছে। চ্যানেল আইয়ের ‘কাফেলা’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপকের মতে, যাঁরা আট রাকাতের পক্ষে বলছেন, তাঁরা মূলত এজিদের চক্রান্তই বাস্তবায়ন করে চলেছেন। কী অদ্ভুত কথা!

এদিকে মিসরভিত্তিক ইসলামিক টেলিভিশন ‘চ্যানেল হুদা’র প্রশ্নোত্তর পর্বেও একই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করছিলেন শ্রোতারা। অনেকের প্রশ্ন ছিলো, খোদ হারাম শরিফ ও মসজিদে নববিতে যদি ২০ রাকাতের খতম তারাবি হয়, তাহলে ২০ রাকাত পড়তে অসুবিধা কোথায়? যাঁরা ২০ রাকাত অথবা কম পড়ছেন, দুই পক্ষের কাছেই হাদিসের দলিল রয়েছে। পার্থক্য হলো, কে কীভাবে হাদিসের ব্যাখ্যা করছেন।

হুদা টেলিভিশনের মুফতিরা কারও প্রতি বিষোদ্গার না করে যেভাবে উত্তর দিয়েছেন, সেটা ভালো লেগেছে। হাদিস নিয়ে আলোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়, তাই সেদিকে যেতে চাই না। তবে ঈদের চাঁদের মতো তারাবি নিয়েও আমরা যেভাবে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছি, তা আমাকে ভাবিয়ে তোলে। অন্যের দিকে আঙুল না তুলে নিজে যেটাকে শুদ্ধ মনে করি, সেটা শান্তিপূর্ণভাবে কি আমরা পালন করতে পারি না?

এবারের রমজানে দোহায় বোরকাবৃত মহিলা ভিক্ষুকদের উৎপাত লক্ষ করা যাচ্ছে। ধরুন, আপনি কাপড়ের দোকানে ঢুকেছেন কাপড় কিনতে, হঠাৎ দেখবেন বোরকাবৃত একজন মহিলা আরবিতে আপনার কাছে টাকা চাইছে।

একদিন এক বন্ধুর সঙ্গে শপিং করছি, দেখি একজন বোরকাওয়ালি ভিক্ষুক দোকানে হাজির। আমার বন্ধু ১০ রিয়াল দিতে গেলে উনি নেবেন না, আরও বেশি চাই। আমরা বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। শেষ পর্যন্ত আরও বেশি দিয়ে উদ্ধার পাওয়া গেলেও টাকা হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে আরবিতে আমাদের উদ্দেশে খিস্তিÍ আওড়াতে লাগলেন মহিলা।

বাড়ি বাড়ি গিয়েও এরা ভিক্ষা করে থাকে। বিশেষ করে, রমজানের সময় এদের সংখ্যা বেড়ে যায়। সেদিন ইফতারির আগে আমার বাড়িতেও এক মহিলা ভিক্ষুক এলো, সঙ্গে ৮-১০ বছর বয়সী মেয়ে। ওদের পরনের কাপড় বেশ পরিপাটি, দেখে মনে হলো না ভিক্ষুক। যা-ই হোক, আমি কথা না বাড়িয়ে হাতে কিছু দিয়ে ওদের বিদায় করলাম। আমার এক বন্ধু বললেন, ওরা আসলে ভিক্ষুক নয়। বাড়ি যাওয়ার পথে দরজার কড়া নেড়ে যদি কিছু আয় করা যায়, তাতে মন্দ কী?

সেদিন মসজিদের দরজায় এক পাঠান বুকে ব্যান্ডেজ বেঁধে হাজির, সাহায্য চাইছে। পরে দেখা গেলো ব্যান্ডেজটা ভুয়া।

কাতারে ভিক্ষা করা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। ভিক্ষুক দেখলেই পুলিশকে জানানোর নির্দেশ রয়েছে। প্রবাসে যে কেউ আর্থিক সমস্যায় পড়তে পারেন। তাই কেউ সাহায্য চাইলে ভিক্ষুক মনে করে তাড়িয়ে না দিয়ে সাধ্যমতো কিছু দেওয়াটাই ভালো।

জানুয়ারি, ২০১১