ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে মিসর ও সৌদি আরব। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে দেখা যায়, সেই কেন্দ্রবিন্দু কায়রো ও রিয়াদ থেকে সরে এখন কাতারে চলে এসেছে। ভৌগোলিক আকার ও জনসংখ্যার বিচারে একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হওয়ার পরও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পাওয়ার ব্রোকার হিসেবে কাতারের সাম্প্রতিক উত্থান সত্যিই বিস্ময়কর। সৌদি আরবের মতো হেভিওয়েটকে পেছনে ফেলে কূটনীতির খেলায় কাতার এখন চালকের আসন দখল করে নিয়েছে। এই সাফল্যের কারণ হলো কাতারের শক্তিশালী অর্থনীতি, সুচিন্তিত পররাষ্ট্রনীতি এবং দেশের স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ।

বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ কাতার। কাতারের জিডিপি রেকর্ড ৩০ শতাংশ বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ১১৬ বিলিয়ন ডলারে। শুধু তা-ই নয়, কাতার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ গত এক দশকে বেড়ে হয়েছে ৩৫ গুণ! জনপ্রতি জিডিপির বিচারে এখন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ কাতার আর কাতারি জনসংখ্যার এক-দশমাংশ হচ্ছেন মিলিওনিয়ার।

সিরিয়া থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারকারী প্রথম আরব দেশ কাতার। কাতারের সাহসী নেতৃত্বের ফলেই নির্জীব এবং বিবৃতিসর্বস্ব একটি সংগঠন বলে খ্যাত আরব লিগ এখন সিরিয়াতে ক্ষমতা বদলের জন্য অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। কিছুদিন আগে লিবিয়ার ওপর নো-ফ্লাই জোন আরোপ করার জন্য সরাসরি অংশ নিয়েছে কাতারের বিমানবাহিনী। লিবিয়ার Transitional Council (NTC)-কে স্বীকৃতিদানকারী প্রথম দেশ কাতার। বিশ্ববাজারে লিবিয়ার হয়ে তেল বিক্রি করে দিয়েছে কাতার। আর লিবিয়াকে দেওয়া আর্থিক সাহায্যের কথা নাই-বা বললাম।

কাতারের উদার এবং আধুনিক ভাবমূর্তি পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে যেমন সফল হচ্ছে, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর কাছেও কাতার একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের শত্রু হামাস ও হিজবুল্লাাহকে সাহায্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আমেরিকার সঙ্গেও কাতার গড়ে তুলেছে আস্থার সম্পর্ক। উল্লেখ্য, কাতারে রয়েছে আমেরিকার বিমানঘাঁটি, মধ্যপ্রাচ্যের মিলিটারি কমান্ড।

ফিলিস্তিন, সুদান, ইয়েমেন, লেবানন ও আফ্রিকা থেকে শুরু করে কাবুল পর্যন্ত চলমান বিবাদ নিরসনের জন্য মধ্যস্থতা করে আসছে কাতার। কাতারে তালেবানের একটি রাজনৈতিক অফিস খোলার কথাও শোনা যাচ্ছে। তবে এ ধরনের ভূমিকার কারণে কাতারকে সময় সময় বিভিন্ন আরব দেশ ও আমেরিকার বিরাগভাজনও হতে হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশের ইসলামিস্ট দলগুলোর সঙ্গেও কাতার সুসম্পর্ক রেখে চলেছে। এই ব্যাপারে আমিরের যুক্তি হলো, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার ফলেই মুসলিমরা জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। তাই ইসলামিস্ট দলগুলোকে মূলধারার রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। কাতারের আমির নিজেকে ওয়েস্ট্রেনাইজার কিংবা ডেমোক্র্যাট নয় বরং একজন মর্ডানাইজার বলে দাবি করেন, যিনি বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইসলামিক মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে দেশ চালাতে চান।

আধুনিক কাতারে গণতন্ত্রের চর্চা ত্বরান্বিত করার জন্য ইতিমধ্যে শুরা কাউন্সিলের নির্বাচন হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গত বছর কাতারিদের জন্য দেওয়া হয়েছে বিশাল উপহার, বেতন বৃদ্ধি। কাতারিদের বেতন বেড়েছে ৬০ থেকে ১২০ শতাংশ! এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেতন বাড়বে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের (১০০-১২০ শতাংশ)।

২০২২ বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজকের সম্মান অর্জন এবং আল-জাজিরা টেলিভিশনের সাহসী ও প্রতিবাদী ভূমিকা কাতারকে মধ্যপ্রাচ্যেও একটি অন্যতম প্রভাবশালী দেশে পরিণত করেছে। আমরা প্রায়ই আরবদের সমালোচনা করে বলি, পেট্রো ডলারের এত প্রাচুর্য থাকার পরও পশ্চিমা মিডিয়াকে টেক্কা দেওয়ার মতো শক্তিশালী কোনো মিডিয়া আরবরা গড়তে পারেনি। কিন্তু আল-জাজিরা সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে।

বিবিসি, ফক্স ও সিএনএনের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন শেষ হলো বলে। পশ্চিমা মিডিয়াকে এখন রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করছে আল-জাজিরা টেলিভিশন। মধ্যপ্রাচ্যে যে রেভলিউশন চলছে, তা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার ক্ষেত্রে আল-জাজিরা পশ্চিমা মিডিয়া থেকে অনেক এগিয়ে আছে। কাতারের আমির এই মোক্ষম অস্ত্রের সুচতুর ব্যবহার করে একটি নখের সমান দেশের প্রধান হয়েও আঞ্চলিক ও বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব খাটাচ্ছেন।

তবে এ জন্য আল-জাজিরাকে মূল্যও দিতে হচ্ছে অনেক। কিছুুদিন আগে লিবিয়ায় গাদ্দাফি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন আল-জাজিরা টেলিভিশনের একজন কাতারি ক্যামেরাম্যান। সম্প্রতি বহু বিতর্কিত প্যালেস্টাইন পেপার উন্মোচন করার পর ফিলিস্তিন ও লেবাননে আক্রান্ত হয়েছে আল-জাজিরার সাংবাদিক ও অফিস।

আল-জাজিরার সম্প্রচার নিয়ে অধিকাংশ আরব দেশ বিভিন্ন সময়ে অভিযোগও করেছে, কাতারকে দিয়েছে হুমকি। ২০০২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত জর্দান, সৌদি আরব, কুয়েত, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মরক্কোর মতো দেশ কোনো এক সময়ে কাতার থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এ প্রসঙ্গে কাতারের আমির বলেন, ‘অতীতে আমার সঙ্গে অনেক আরব নেতারা কথাই বলতে চাইতেন না।’

আল-জাজিরা মধ্যপ্রাচ্যের মিডিয়া জগতে রীতিমতো বিপ্লব এনেছে। আল-জাজিরা নিয়ে কাতারিরা গর্ব করে থাকে। ইরাক যুদ্ধের সময় আল-জাজিরা আমেরিকার মুখোশ খুলে দিলে জর্জ বুশ আল-জাজিরার দোহা হেডকোয়ার্টারে বোমা মারার হুমকি দেন। কিন্তু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত সেটা হয়নি।

বিশ্বখ্যাত জার্নালিস্ট স্যার রবার্ট ফিস্কের লেখা থেকে জানা যায়, কাতারের আমির হলেন বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি পরাশক্তি আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির অফিস থেকে সাত সেকেন্ডের মধ্যে বেরিয়ে আসেন। জর্জ বুশের আমলে কাতারের আমির একবার ওয়াশিংটনে হোয়াটহাউস সফরে গেলে ডিক চেনি আমিরকে তাঁর অফিসে আমন্ত্রণ জানান। আমির অফিসে ঢুকে দেখেন ডিক চেনির টেবিলে আল-জাজিরা লেখা একটি বিশাল ফাইল। এটা কী জিজ্ঞেস করতে ডিক চেনি বললেন, ইরাক যুদ্ধের রিপোর্টিং নিয়ে আল-জাজিরার বিরুদ্ধে তাঁর নালিশ রয়েছে।

‘তাহলে আমার সঙ্গে নয়, দোহায় আল-জাজিরার এডিটরদের সঙ্গেই আপনার কথা বলতে হবে’…ডিক চেনির মুখের ওপর এ কথা বলে ভাইস প্রেসিডেন্টের কক্ষ থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে আসেন কাতারের আমির।

বিশ্ব রাজনীতিতে আল-জাজিরার প্রভাবের কথা আল-জাজিরা টেলিভিশনের কিছু তরুণ ব্রিটিশ সাংবাদিকের কাছ থেকে জানতে পারি। তাঁরা বললেন, ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট থেকে শুরু করে হিলারি ক্লিনটন পর্যন্ত বিশে^র সব প্রভাবশালী নেতাই আল-জাজিরায় তাঁদের বক্তব্য দেওয়ার জন্য রীতিমতো উন্মুখ হয়ে থাকেন।

মার্চ, ২০১১