এবারের ইংরেজি নববর্ষ সপরিবারে আরব আমিরাতে কাটাবো ভাবিনি। ইতিমধ্যে অফিসের মিটিং এবং কনফারেন্সের জন্য দুবাই শহরে গিয়েছি বেশ কবার। কিন্তু গাড়ি নিয়ে দুবাই শহরতলি ছেড়ে আশপাশের এলাকাগুলো কখনো ঘুরে দেখা হয়নি। তাই এবার দুবাই বিমানবন্দর থেকেই গাড়ি ভাড়া করে নিলাম, যাতে সবাই মিলে ইচ্ছেমতো ঘোরাঘুরি করা যায়।

দুবাই থেকে শারজাহ পর্যন্ত দীর্ঘ এলাকাজুড়ে যেসব অবকাঠামো দেখলাম, তাতে চমকে গেলাম। আমরা সবাই জানি, ২০২২ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে কাতার। অনেকে বলে থাকেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে উন্নয়নের দৌড়ে কাতার দুবাইকে ধরে ফেলবে। কিন্তু আসলেই কি তাই? আরব আমিরাত ঘুরে আমার মনে হলো, দুবাইয়ের তুলনা হতে পারে কেবল দুবাই।

নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দোহা আগামী এক দশক পর যদি মেগা সিটিতে পরিণত হয়, দুবাই তখন গ্যালাক্টিক সিটিতে রূপান্তরিত হবে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো শহরের পক্ষে দুবাইয়ের নাগাল পাওয়ার সম্ভাবনা আমি দেখি না। আগামী এক্সপো ২০২০-এর আসর বসছে দুবাই শহরে। এক্সপোকে সামনে রেখে আবারও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দুবাই। এক্সপো ২০২০-এর জন্য নির্মিত হচ্ছে একটি অত্যাধুনিক শহর। আশা করা হচ্ছে, এই বাণিজ্য মেলা দেখতে প্রায় আড়াই কোটি অতিথির সমাগম হবে; আর প্রায় তিন লাখ মানুষের হবে কর্মসংস্থান।

সত্তর দশকের তুখোড় ছাত্রনেতা এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. জমির চৌধুরী কাতার ছেড়ে আরব আমিরাতের আবুধাবির বাসিন্দা হয়েছেন বেশ কিছুদিন হলো। তিনি এখন আবুধাবির রাবদান একাডেমির ডিরেক্টর এবং সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকতাও করছেন। একসময় বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি থেকে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবী ছাত্ররা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলো, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সেরা ছাত্র হয়েও তিনি ছাত্ররাজনীতিতে শুদ্ধ ধারা ফিরিয়ে আনতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। ছাত্র নামধারী পেশিবাজ অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এ ছাড়া নব্বইয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও ড. জমির চৌধুরী রাজপথে উত্তাপ ছড়িয়েছিলেন।

আমার দুবাই যাওয়ার খবর শুনে জমির ভাই বললেন, এত কাছে এসেও আবুধাবি ঘুরে যাবে না, সে কী করে হয়? অবশেষে গত ডিসেম্বরের শেষ দিনটিতে আবুধাবিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। জমির ভাই ওইদিন সন্ধ্যায় একটি অভিজাত রেস্তোরাঁয় আমার সঙ্গে আবুধাবির বাঙালি কমিউনিটির সম্মানিত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য সঙ্গে সান্ধ্যভোজের আয়োজন করলেন। উদ্দেশ্য, সঙ্গে সবাই মিলে ইংরেজি নতুন বর্ষকেও বরণ করা হবে।

রাত সাড়ে আটটার মধ্যে একে একে আমন্ত্রিত অতিথিরা হাজির হলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে ড. জমির চৌধুরীর স্বাগত বক্তব্যের পর স্থানীয় অতিথিদের পরিচয়পর্ব সঞ্চালন করলেন বিশিষ্ট প্রবাসীনেতা এবং বাংলাদেশ ইসলামিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যাপক এম আবু তাহের। এই প্রীতিসভায় আমন্ত্রিত অতিথিরা হলেন বৈচিত্র্যময় প্রতিভায় আলোকিত আবুধাবির বাঙালি কমিউনিটির কিছু আইকনিক ব্যক্তিত্ব, যাঁদের নাম না বললেই যে নয়।

উপস্থিত ছিলেন প্রথিতযশা রাজনীতিক এবং কমিউনিটি লিডার, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ইফতেখার হোসেন বাবুল; প্রকৌশলী, কবি, নাট্যকার ও বাংলাদেশ সমিতির সভাপতি রফিক সিকদার; চট্টগ্রাম সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কামাল চৌধুরী; বিশিষ্ট ব্যাংকার দিদারুল আলম; লেখক, কবি ও বাংলাদেশ ইসলামিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মীর আনিসুল হাসান; বাংলাদেশ সমিতি ও বিএনপির সহসভাপতি আলহাজ দিদারুল আলম; চট্টগ্রাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর চৌধুরী; বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ সমিতির সহ-কোষাধ্যক্ষ জানে আলম; বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও আজকের সূর্যোদয়-এর ব্যুরো চিফ নাসির তালুকদার; বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক বেলায়েত হোসেন হীরু; প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর সভাপতি এ কে এম রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

রেস্তোরাঁর নিষ্প্রভ চত্বর কিছু আলোকিত মানুষের আগমনে হঠাৎ করে যেন জোতির্ময় হয়ে উঠলো। স্বাগত জানাতে গিয়ে ওই কীর্তিমান মানুষগুলো আমার সম্পর্কে যে রকম উদারচিত্তে সুবচন বর্ষণ করলেন, তাতে আমি ভীষণ রকম সংকুচিত হয়ে যাচ্ছিলাম। সৃজনশীল লেখক অধ্যক্ষ মীর আনিসুল হাসান তাঁর বক্তব্যে অসাধারণ ভাষাশৈলী দিয়ে যেভাবে কথার মালা গেঁথে যাচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিলো গদ্যের অক্ষরে তিনি যেন লিখে চলেছেন পদ্য।

খাবারদাবারের ফাঁকে প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর রফিকুল তাঁদের সামাজিক কর্মকাণ্ডের কিছু বিবরণ দিয়ে কক্সবাজারের কৃতী সন্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাবেক রাষ্ট্রদূত প্রয়াত ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ অনন্য ভুবনের মানুষ আমাকে উপহার দিলেন। দেখলাম, টেবিলে বসেই আজকের সূর্যোদয়-এর জন্য অনুষ্ঠানের চটজলদি রিপোর্ট তৈরি করে ফেললেন প্রতিভাধর সাংবাদিক নাসির তালুকদার। প্রকৌশলী রফিক ভাই আমাকে উপহার দিলেন তাঁরই লেখা দুটো বই মুক্তি পরোয়ানা এবং স্বাধীনতার মুক্তি।

হঠাৎ দেখি শ্রদ্ধেয় ইফতেখার ভাই আমার আর আমার স্ত্রীর হাতে তুলে দিলেন দুটো মূল্যবান পারফিউম। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে অপরিচিত মুখগুলো মনে হচ্ছিলো যেন বহু যুগের চেনা। ভালো-মন্দ মিশিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে আমার ২০১৩ সাল। তবে বছরের শেষ দিনটিতে আবুধাবির আলোকিত সন্ধ্যার স্মৃতি আমার হৃদয়ে চির দীপ্তিমান হয়ে থাকবে।

পরদিন অর্থাৎ নতুন বছরের প্রথম ভোরে জমির ভাইয়ের সঙ্গে প্রাতরাশ করতে গেলাম স্থানীয় একটি বাঙালি হোটেলে। হোটেলের চায়ের অনন্য স্বাদ নিতে নিতে দোহার সোনাগাজী হোটেলের কথা মনে পড়ে গেলো। আমাদের সঙ্গে প্রাতরাশে আরও যোগ দিলেন তাহের ভাই, জাহাঙ্গীর, সুলেখক ও মেধাবী জার্নালিস্ট বাপ্পি এবং আরও কয়েকজন।

সকালের নাশতা শেষ করতেই দেখি বেলা দ্বিপ্রহর। সূর্য তখন মধ্যগগনে। এবার যাওয়ার পালা। জাহাঙ্গীর কবির বাপ্পি বাংলাভিশনের প্রতিনিধি এবং দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকার ব্যুরো চিফ। বিদায় নেওয়ার সময় বাপ্পি অনুরোধ করলেন, ‘দাদা, বাংলাভিশনের জন্য কিছু বলতেই হবে।’ তাড়াহুড়ো করে আবার টিভি ক্যামেরার মুখোমুখি হলাম। কথা শেষ করেই গাড়ির চাবি ঘোরালাম। শেখ জিয়াদ সুপারওয়ের বুক চিরে হিংস্র চিতার মতো ক্ষিপ্রগতিতে ছুটে চলেছে আমার গাড়ি। মনে পড়ছিলো আমার প্রিয় গানের কটি পঙ্ক্তি : ‘আবার হবে তো দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো…।’

জানুয়ারি, ২০১৪