ফেব্রুয়ারির ২৪ তারিখ, রাত নয়টা হবে। হামাদ হাসপাতালের অত্যাধুনিক নিবিড় পর্যবেক্ষণ কক্ষে শুয়ে আছে ২২ বছরের একজন টগবগে যুবক, বিপুল হাওলাদার। নাকে-মুখে টিউব, বেডের পাশে থাকা মনিটরে বিচিত্র রঙের রেখা জ্বলছে আর নিভছে। রুমের পিনপতন নীরবতাকে ছাপিয়ে কেবল শোনা যাচ্ছিলো বিপুলের দীর্ঘ শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ।

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মিন্টু হাওলাদারের কাছে খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছি দেখতে এই হতভাগা যুকবকে। মরণব্যাধি একিউট লিউকেমিয়ায় ভুগছে বিপুল, বললেন পাশে দাঁড়ানো বাংলাদেশি ডাক্তার শাহজাহান মণ্ডল। অথচ হাসপাতালে আসার আগে রোগের তেমন কোনো উপসর্গ চোখে পড়েনি কারও।

লিউকেমিয়ার কারণে বিপুলের রক্তে শ্বেতকণিকার পরিমাণ বেড়ে গেছে ভীষণ রকম। ফলে বিকল হয়ে গেছে বিপুলের কিডনি ও একটি ফুসফুস। ডায়ালাইসিস চলছে। এত জটিল ব্যাধি, অথচ ছিলো না আগাম কোনো লক্ষণ। তবে মাসখানেক ধরে কাশিতে ভুগছিলো বিপুল। হঠাৎ একদিন প্রচণ্ড বুকের ব্যথা। হাসপাতালে যাওয়ার পর ধরা পড়লো বুকের মধ্যে টিউমারের মাঝে বাসা বেঁধেছে ভয়ানক ক্যানসার।

বিপুল ভালো হবে তো? আমরা আশায় বুক বেঁধে ওই দিন রাতে বাড়ি ফিরলাম। প্রার্থনা করছিলাম, বিপুল চোখ খুলবে আবার। আগের মতো বলে উঠবে, ‘কেমন আছেন, দাদা?’

তবে তার সেই ডাক আর শোনা হয়নি। পরদির ভোর ১০টায় বিপুল চলে গেলো না ফেরার দেশে। কাতারে এসেছে বিপুল খুব বেশি দিন হয়নি, অথচ কেন জানি না দেশে যাওয়ার জন্য, মাকে একনজর দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলো বিপুল। নিজের চলে যাওয়ার আগাম বার্তা কি পেয়েছিলো বিপুলের অদম্য মন? কে জানে!

হাসপাতালে আসার দিন রাতেই ছিলো বিপুলের দেশে যাওয়ার ফ্লাইট। হায়রে নিয়তি! খুরুজ না মেলায় রাত ১০টায় বিমানবন্দর থেকে ফিরে আসে বিপুল। এর ঠিক দুই ঘণ্টা পরই প্রচণ্ড বুকের ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। জামাকাপড়, মায়ের পছন্দের শাড়িটা স্যুটকেসে পুরে বাড়ি যাওয়ার কথা ছিলো বিপুলের। অথচ আজ যাবতীয় সুখ-দুঃখ কফিনের বাক্সে ভরে বিপুলের হিমশীতল দেহ ফিরে যাবে দুই হাত বাড়িয়ে থাকা অপেক্ষমাণ মায়ের কাছে।

অন্যান্য লাখো তরুণের মতো দুই চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে মাত্র ছয় মাস আগে দোহায় এসেছিলো পেশায় কার্পেন্টার বিপুল। বাড়ি দোহার-নবাবগঞ্জ। গরিব ঘরের সন্তান বিপুল, প্রায় ৩০ হাজার রিয়াল দিয়ে ফ্রি ভিসা কিনে কাতারে এসেছিলো বেকারত্ব ও হতাশা থেকে মুক্তি পেতে এবং সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে। সাত লাখ টাকা কি সহজে মেলে? এ জন্য বিপুলের মতো অনেককে বিক্রি করতে হয় জমি, হালের গরু, মায়ের গয়না, এমনকি বন্ধক রাখতে হয় শেষ বসতবাটি। ভাবলে কষ্ট হয়, বিপুল যখন দেশে যেতে চাইছিলো, তখন মা-বাবা বারণ করছিলেন এই বলে, ‘বাবা, তুই এখন বাড়ি এলে আমরা খাবো কী?’

সবকিছু বিসর্জন দিয়ে যাঁরা মধ্যপ্রাচ্যে আসছেন, তাঁরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন সামান্য আয়ের জন্য। বাটপার দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেকে আবার চাকরিও পান না। অজ্ঞতা ও চাকরি হারানোর ভয়ে পারেন না তাঁরা প্রতিবাদ করতে। মুখ বুজে কাজ করে চলেন। রক্ত-মাংস দিয়ে অর্জিত টাকা পরিবারের উন্নয়ন দূরে থাক, ধার-কর্জ পরিশোধ করতেই গড়িয়ে যায় বছরের পর বছর। যে ভিসা মালিকের কাছ থেকে ভিসা ব্যাপারীরা পাচ্ছে বিনা মূল্যে কিংবা সামান্য টাকার বিনিময়ে, সেই ভিসা দেশের অভাগা মানুষের কাছে তারা বিক্রি করছে ১০-২০ গুণ বেশি দামে। এরা ব্যবসায়ী নয়, এরা হলো মানুষরূপী রক্তখেকো ভয়ংকর হায়েনার দল। দুঃখ হয়, এসব আদম ব্যাপারী দেশ-বিদেশে টাকা দিয়ে খরিদ করছে তথাকথিত সম্মান ও পদ; দখল করে আছে মঞ্চের চেয়ার। কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনকেও টাকার বিনিময়ে ওরা পুরে রেখেছে নিজেদের পকেটে, যারা কাঠের পুতুলের মতো নাচে ওদের কথায়।

বিপুল, তুমি যেখানে গেছো জানি ওখান থেকে ফেরে না কেউ। প্রার্থনা করি, তুমি যেখানেই থাকো না কেন, ভালো থেকো। যদিও তোমার আর আমাদের জগতের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে এক অস্বাভাবিক নীরবতার দেয়াল। কিন্তু তুমি হয়তো জানো না, নিথর দেহের শব্দহীন আকুতি ছুঁয়ে গেছে আমার মতো অনেকের হৃদয়। জেনে রেখো, তোমার মতো বিপুলদের প্রতারিত করে যারা গড়ছে সম্পদ ও প্রতিপত্তির পাহাড়, সেই আদম ও ভিসা ব্যাপারীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও ঘৃণায় ফুঁসছে সবাই। খুব বেশি দিন নেই, যখন প্রতারিত দুর্বল মানুষগুলোই বিদ্রোহে উত্তাল হয়ে রুখে দাঁড়াবে, দাঁড় করাবে ভিসা ব্যাপারীদের কাঠগড়ায়, খুলে দেবে সবার নোংরা মুখোশ।

মার্চ, ২০১৪