ভাগ্যের অন্বেষণে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমাচ্ছেন লাখো বাংলাদেশি। তবে বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়ে ভিসা প্রতারণার শিকার হয়ে ভুগছেন অনেকে। উচ্চমূল্যে ভিসা কিনতে গিয়ে অনেকে আবার বিষয়-সম্পত্তি নিলামে তুলে দিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। বিদেশে যাওয়ার উত্তেজনায় সঠিক খবরাখবর নিতে ভুলে যান, ফলে সহজেই মানুষ প্রতারণার ফাঁদে পড়েন।
কাতারে ভিসা প্রতারণার শিকার এমন ভুক্তভোগী কয়েকজন বাংলাদেশি যুবকের সঙ্গে সেদিন কথা হচ্ছিলো। ওরা ঢাকার একটি ট্রাভেল এজেন্সির কাছ থেকে ভিসা জোগাড় করে। মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে কাতার পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথমে তাদের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। কিন্তু টাকা দেওয়ার পর মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও কাতারের টিকিট তাদের মেলে না। অবশেষে টিকিট পাওয়ার পর কাতার যাওয়ার আগে আরও দেড় লাখ টাকা করে দাবি করে ট্রাভেল এজেন্ট।
ভিসার জন্য এত টাকা ব্যয় করে কাতারে এসে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে ওরা। কাতার আগমনের তিন সপ্তাহের মাথায় একটি লেবানিজ কোম্পানিতে রাজমিস্ত্রি হিসেবে তারা কাজ শুরু করে। কিন্তু তিন মাস পরও তাদের আইডি কার্ড মেলে না। আর আইডি কার্ড না থাকায় কোম্পানি তাদের বেতন দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অবশেষে বেতনের জন্য মামলা করার কথা বললে কোম্পানি বকেয়া বেতন দিয়ে দেয়। কিন্তু এরপর যা ঘটে, সে জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলো না। কোম্পানি জানায়, তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ, তাই এখন তাদের দেশে ফিরে যেতে হবে। তিন লাখ টাকা খরচ করে এসে এমন বিপাকে পড়বে তারা ভাবেনি কখনো।
ওয়ার্ক ভিসা দিয়ে তাদের কাতারে পাঠানোর বন্দোবস্ত করা হলেও ঢাকা এয়ারপোর্টে চেক-ইন করতে আসার পরই তারা জানতে পারে আসলে এক মাসের বিজনেস ভিসা নিয়েই তারা কাতার যাচ্ছে। তখন বাড়ি যে ফিরে যাবে, সেই পথ আর খোলা নেই। বিমানবন্দরে তাদের আশ্বাস দেওয়া হয়, কাতারে আসার পর খুব সহসা দুই বছরের ওয়ার্ক ভিসা দেওয়া হবে। কিন্তু মাস গড়িয়ে গেলেও কাতারের বাংলাদেশি যে দালাল দোহা বিমানবন্দরে এসেছিলো, তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। অবশেষে উপায়ান্তর না দেখে ওই তিন যুবক কাতারস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম বিভাগে অভিযোগ করে। দূতাবাসের কর্মকর্তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা নেন। বাংলাদেশি দালালকে দূতাবাসে ডেকে এনে ওই তিন যুবকের পাওনা মিটিয়ে দিতে চাপ দেওয়া হয়। পরে দূতাবাস ওদের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য এক্সিট পারমিটের ব্যবস্থা করে এবং আর্থিক সহযোগিতাও প্রদান করে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশ দূতাবাস প্রবাসীদের সমস্যা নিয়ে যথেষ্ট আন্তরিক নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে কাতারের বাংলাদেশ দূতাবাস এখন মনে হচ্ছে এর ব্যতিক্রম।
জানা যায়, ভিসার দালাল-চক্র বিজনেস ভিসাকে ফটোশপের কারসাজিতে ওয়ার্ক ভিসায় রূপান্তরিত করে ক্লিয়ারেন্সের জন্য বাংলাদেশের মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। যদিও ভিসা নম্বর দিয়ে কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে খুব সহজেই ভিসা আসল কি নকল তা যাচাই করা যায়। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে বাংলাদেশের সংলশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ভিসা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ভুয়া ভিসা নিয়ে হাজারো মানুষ লোভী দালালদের চক্রান্তের শিকার হচ্ছে। অনেকে কাতারে আসার পর কাজ পাচ্ছে না, অনেকের আবার প্রতিশ্রুত কোম্পানি কিংবা কফিলেরও দেখা মিলছে না। এসব কারণে অনেক বাংলাদেশি এখন কাতারের জেলে মুক্তির দিন গুনছেন। আশা করছি, এ ব্যাপারে বাংলাদেশের শ্রম মন্ত্রণালয় যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
উল্লেখ্য, আমাদের প্রতিবেশী দেশ, যেমন শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তান ও ভারত থেকে একজন শ্রমিক আসতে যে খরচ হয়, তার তুলনায় একজন বাংলাদেশিকে বহুগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর চাহিদা পূরণ করতেই এত টাকা গুনতে হয়। ভিসার মাধ্যম যত বেশি হয়, ভিসার দামও তত বেড়ে যায়।
মূলত দুভাবে ভিসা জোগাড় করা যায়-সরাসরি কোম্পানি থেকে কিংবা এজেন্ট-দালালের মাধ্যমে। কোম্পানি সাধারণত বিনা মূল্যে ভিসা দিয়ে থাকে। কিন্তু কোম্পানির ভিসার ক্ষেত্রে যা হয় তা হলো, কোম্পানির ম্যানেজার কিংবা কন্ট্রাক্টর যে ভিসা পান, তা ফ্রি হলেও তাঁরা মুনাফার জন্য কোনো রিক্রুটিং এজেন্ট, মাধ্যম কিংবা দালালের কাছে ভিসা বিক্রি করে দেন। সেই ভিসা যখন বিভিন্ন হাত ঘুরে একজন শ্রমিকের হাতে আসে, তখন সেটার দাম সব মিলিয়ে ২০ থেকে ৩০ হাজার রিয়াল পর্যন্ত এসে দাঁড়ায়।
মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানি একটি লোভনীয় ব্যবসা। কাতারে বহু বাংলাদেশি কোম্পানি এখন জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসা করছে। বড় বড় কন্ট্রাক্টিং কোম্পানিতে তাদের প্রজেক্টের জন্য হাজারো শ্রমিকের দরকার হয়। রিক্রুটমেন্ট কোম্পানিগুলো ভিসার জন্য এসব কোম্পানির এইচআর ডিপার্টমেন্টে ধরনা দেয়। অনেক সময় কোম্পানির লোভী এইচআর ম্যানেজার কিংবা কর্মচারী মোটা অঙ্কের বিনিময়ে কোম্পানির ডিমান্ড লিস্টের ভিসাগুলো রিক্রুটমেন্ট এজেন্টদের কাছে বিক্রি করে দেয়। রিক্রুটমেন্ট এজেন্ট তখন নিজেদের মুনাফা রেখে চড়া দামে ভিসা বিক্রি করে।
কাতারসহ অন্যান্য আরব দেশে প্রতারণার একটি অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে ফ্রি ভিসা। অনেকের কাছে ফ্রি ভিসার মানে হচ্ছে চটজলদি অর্থ উপার্জনের উপায়। কিন্তু ফ্রি ভিসা নামের এই সোনার হরিণ ধরতে না পেয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অনেকে। ফ্রি ভিসা বলতে যে কিছু নেই-এই বিষয়টি দেশ থেকে প্রবাসে পাড়ি দিতে ইচ্ছুক অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশি দালাল এবং ভিসা ব্যবসায়ীদের পাল্লায় পড়ে অনেক হতভাগা শ্রমিক পাচ্ছেন না তাঁদের ন্যায্য মজুরি, কেউ কেউ দিন কাটাচ্ছেন অনাহারে।
ফ্রি ভিসাটা আসলে কী, তা এখন খুলে বলছি। কাতারে কেউ কাজ করতে আসতে চাইলে তাঁর একজন স্পনসর বা কফিলের দরকার হয়। সেই কফিল কোনো কোম্পানি কিংবা একজন ব্যক্তিও হতে পারে। ফ্রি ভিসার মানে হলো ভিসাধারীকে মালিকের বা স্পনসরের কাজ করতে হবে না। সে তার ইচ্ছেমতো বাইরে কাজ করতে পারবে। একজন কফিল বা স্পনসর সরকারের কাছ থেকে তার কোম্পানি, বাড়ির বা বাগানের কাজ করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ আনার অনুমতি পায়। অনেকে তার মধ্যে কিছুসংখ্যক মানুষ দিয়ে নিজের কাজ চালিয়ে বাকি মানুষকে অর্থের বিনিময়ে বাইরে কাজ করার অনুমতি দেয়। এভাবে মূলত কফিল কিছু টাকা আয় করলেও এ ধরনের কফিলের সংখ্যা খুব কম। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কফিলের লোভী কর্মচারীরা কফিলের অজান্তে ফ্রি ভিসার নামে টাকা কামিয়ে নিচ্ছে।
মনে রাখতে হবে, ফ্রি ভিসা নামের প্রক্রিয়াটি আইনগতভাবে বৈধ নয়। ধরা পড়লে কফিলের জরিমানা ২৮ হাজার আর কর্মচারীর ১২ হাজার রিয়াল। ফ্রি ভিসার নাম শুনে অনেকে প্রলুব্ধ হন এবং ভাবেন, এত টাকা খরচ করে বিদেশে এসেছি যখন, বাইরে বেশি বেশি কাজ করে খুব তাড়াতাড়ি ভালো কামাই করা যাবে। ফলে এ ধরনের ভিসার দাম অনেক বেশি। কিছু কিছু বাংলাদেশি ফ্রি ভিসায় কাজ করে সফল হলেও অনেকে চরম ব্যর্থ হয়ে ভুগছেন।
যেসব বাংলাদেশি রিক্রুটিং-ট্রাভেল এজেন্ট, ব্যবসায়ী বা মাধ্যম ভিসা নিয়ে কাজ করছে, তারা চাইলে ভিসার মূল্য অনেক কমানো যায়। এ জন্য প্রয়োজন একটু আন্তরিকতা, সহমর্মিতা এবং অত্যধিক লাভ করার মানসিকতা বর্জন। জনবল বাড়িয়ে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও শ্রমকল্যাণ মন্ত্রণালয় বিষয়টির দিকে নজর দিলে মানুষের ভোগান্তি কমবে আর অনেক বেশি মানুষ প্রবাসে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
জুন, ২০১৬
