ঢাকার বসুন্ধরা শপিং সেন্টারে গিয়েছি জুতো কিনতে। সুন্দর ও গোছানো শপিং মল, ভালোই লাগল দেখে। দেখেশুনে ঐঁংয চঁঢ়ঢ়রবং থেকে এক জোড়া জুতো কিনে ফেললাম। কিছুক্ষণ পর দেখি আমার হাতে জুতোর ব্যাগ নেই। ভেবে চিন্তে দেখলাম, পাঞ্জাবীর দোকানে কেনাকাটার সময় ভুলে জুতোর ব্যাগ ফেলে এসেছি। দৌড়ে গিয়ে দেখি দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। পরদিন ভোরে আবার এসে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও জুতোর ব্যাগটা পেলাম না। কি আর করা, একই ধরনের আরেক জোড়া জুতো কিনে বাড়ি ফিরলাম।

প্রবাস থেকে দেশে এসে ভালোলাগার যে উচ্ছ্বাসে ভাসছিলাম, বসুন্ধরার এই ছোট্ট অঘটনটি তাতে যেন শীতল জল ঢেলে দিল। ভাবছিলাম, দেশটা চলছে কি করে? তবে এর উত্তর পেতে আমাকে খুব বেশি একটা অপেক্ষা করতে হয়নি। মাত্র চারদিনের মধ্যে যে তিনটি ঘটনার সাক্ষী হলাম তাতেই আমার প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেলাম।

ঘটনা ১: চাটগাঁর একটি সুপরিচিত মিষ্টির দোকানে গিয়েছি মিষ্টি কিনতে। দোকানের মালিক থেকে একজন মিষ্টি ক্রেতার অবিশ্বাস্য সততার কথা শুনলাম। ঘটনাটি এরকম―ম্যানেজার দোকানের ক্যাশের টাকা গুনে কয়েকটি খালি মিষ্টির বাক্সে তুলে রাখে। কিন্তু তাড়াহুড়োর মধ্যে দোকানের ম্যানেজার একদিন ওই টাকাভর্তি বাক্সগুলোই একজন ক্রেতাকে অর্ডার দেয়া মিষ্টি ভেবে ডেলিভারি দিয়ে বসে। বাসায় গিয়ে মিষ্টির প্যাকেট খুলে ওই ক্রেতা ভদ্রলোকের চক্ষু দুটো ছানাবড়া। প্যাকেটভর্তি মিষ্টির বদলে কেবল টাকা আর টাকা! তবে এত টাকার লোভ ভদ্রলোককে বিচলিত করতে পারেনি। তিনি দেরি না করে মিষ্টির বাক্সে রাখা প্রায় আড়াই লাখ টাকা দোকানে ফেরত দিয়ে আসেন। এভাবে রক্ষা পেল ম্যানেজারের চাকরি।

ঘটনা ২: চাটগাঁয় বড় ভাইয়ার বাসায় বসে আছি। সন্ধ্যায় একজন রিক্সাচালকের ফোন এলো। সে তার রিক্সায় একটি মানিব্যাগ পেয়েছে। মানিব্যাগে পাওয়া ভাইয়ার কার্ড থেকেই বাসার নাম্বারে ফোন করেছে। বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, আমার এক ভাইপো তার ব্যাগ হারিয়েছে। ভাইপোর মানিব্যাগে নগদ টাকার সাথে ক্রেডিট কার্ডও ছিল। ওইদিন রাতেই রিক্সাচালক বাসায় এসে ব্যাগটি ফেরত দিয়ে গেল।

প্রবাসের পত্রপত্রিকায় দেশের দুঃসংবাদই কেবল ফলাও করে ছাপা হয়। আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতি ঢুকে গেছে সে কথাই কেবল শুনি সবার মুখে। তাই ভাবি আমাদের দেশটা চলছে কি করে? মিষ্টি ক্রেতা এবং রিক্সাচালক যে দু’জনের কথা উপরে বললাম, এরা আমাদের সমাজের চোখে নিতান্তই সাধারণ মানুষ। দুঃসংবাদের স্তূপের নিচে আলোকিত খবরগুলো আলোর দেখা পায় না। এদের সততার কথা পত্রিকার হেডলাইনে হয়তো আসে না; অভাব অনটন ও চরম প্রতিকূলতার মধ্যে বসবাস করেও তারা কেন মানুষকে ঠকাতে চাননি সেকথা টেলিভিশনের টকশোতে আলোচিত হয় না। কিন্তু তাতে কি? আমার চোখে এরাই হলেন সত্যিকারের হিরো এবং দেশপ্রেমিক।

আমাদের সমাজে খ্যাতি ও প্রচারবিমুখ এধরনের মানুষ এখনো আছেন বলেই এত বিপর্যয়ের মধ্যেও মুখ থুবড়ে পড়েনি স্বদেশ। ঢাকায় আসার পরপরই বসুন্ধরা শপিং সেন্টারের ঘটনায় কিছুটা হতোদ্যম হয়ে পড়লেও চাটগাঁয় দুু’জন সৎমানুষের খোঁজ পেয়ে আবারও উজ্জ্বীবিত হলাম; শ্রদ্ধায় নতজানু হয়ে ওই দু’জন মানুষকে মনে মনে স্যালুট করলাম।

প্রকৌশল পাশ করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর শিক্ষকতা ছাড়া দেশে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়নি। অভিবাসী হয়ে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দেয়ার পর ওই দেশে সরকারি এবং বেসরকারি দুই সেক্টরেই প্রকৌশলী হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। হাতের ওপর দিয়ে গেছে বড় বড় টেন্ডার। গোপন দরপত্রের মাধ্যমে কিংবা ঘুষ নিয়ে যোগ্য ঠিকাদারদের ডিঙিয়ে পছন্দের কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার ঘটনা কখনো চোখে পড়েনি। তবে দুর্নীতি ওইসব দেশে যে একবারেই হয় না তা নয়। যদি তা হয় সেটা হবে ব্যাতিক্রম। কিন্তু আমাদের দেশে হচ্ছে ঠিক তার উল্টো। অর্থাৎ দুর্নীতিবাজ নয় এমন মানুষের দেখা খুব সহজে মেলে না। সমাজের বিভিন্ন স্তরে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতির যেরকম বিস্তার ঘটেছে তাতে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা। টেন্ডার দেয়ার সময় দুর্নীতি ও অনিয়ম কর্মক্ষেত্রে রীতিমতো কালচারে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, ঘুষকে বলা হচ্ছে পার্সেন্টেজ।

আমার পরিচিত অনেক প্রকৌশলীদের কথা শুনি যারা এই কালচারের বদৌলতে খুব কম সময়ে প্রচুর বিত্তবান হয়েছেন। তবে প্রবাসে বসে দুর্নীতির কথা যতটা অনায়াসে বলা যায়, অন্যের দিকে আঙুল তোলা যায়, দেশের দুর্নীতিদুষ্ট পরিবেশের মধ্যে বসবাস করে সৎ থাকাটা কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। কারণ দুর্নীতিমুক্ত পথের প্রতিটি বাঁকে রয়েছে বিপদ, মফস্বল কোনো শহরে বদলী হবার সমূহ সম্ভবনা, এমনকি বিপন্ন হতে পারে নিজের জীবন। তাই অর্থের লোভ, জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করেও আমাদের দেশের যে গুটিকতক মানুষ এখনো সততার মধ্যে আছেন, তারাই হলেন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, সোনার মানুষ।

দেশে গিয়ে ট্রেনে-বাসে বিভিন্ন বয়সী যাত্রীদের সাথে আলাপ করার সময় বিস্মিত হয়েছি দেশের আমজনতার সচতেনতা দেখে। চলমান দুর্নীতি সম্পর্কে তারা শুধু সচেতনই নন, দুর্নীতিবাজদের অপকর্মের অনেক তথ্যও রয়েছে তাদের কাছে। একটি ম্যাচের কাঠি বাঁচাতে সারারাত চুলো জ্বালিয়ে রেখে কিভাবে আমরা অমূল্য গ্যাস সম্পদের অপচয় করছি, শিল্প-কারখানাগুলো কিভাবে কর্তৃপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে গোপন লাইনের মাধ্যমে গ্যাস ব্যবহার করছে, কোন নেতা কত হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে, টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে কোন মন্ত্রী কত ভাগ মুনাফা লুটছে ইত্যাদি।

তবে দেখা গেছে, অধিকাংশক্ষেত্রে আমরা ঠিকমতো খোঁজখবর না নিয়ে শোনা কথায় বিশ্বাস করে বসি এবং অন্যকে বলার সময় যা শুনেছি তার চেয়ে অনেক বেশি বাড়িয়ে বলি। দুঃখজনকভাবে আমাদের মিডিয়াতেও কোনো রকমের প্রমাণের তোয়াক্কা না করে শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য রং লাগিয়ে সময় সময় অর্ধসত্য খবর প্রচারিত হয়। এ ধরনের খবর পড়ে ও মানুষের মুখের গুজব শুনে বিচারপতিরাও প্রভাবিত হতে পারেন। এতে ন্যায়বিচার ব্যাহত হবার সম্ভাবনা থাকে, যা কখনোই কাম্য নয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি) বিশ্বব্যাপী দুর্নীতির যে ধারণাসূচক প্রকাশ করে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান শেষের দিকেই থাকে। তবে টিআইবির তালিকা নিয়ে হতাশ হবার কারণ আমি দেখি না। দুর্নীতি সূচকে যাদের হাতে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে শুধু তাদেরই দুর্নীতির প্রবণতার প্রতিফলন ঘটে থাকে। তাই টিআইবির তালিকার শেষের দিকে থাকলেও এটা প্রমাণ করে না যে বাংলাদেশের সব মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত। না হলে ওই মিষ্টিক্রেতা ও রিক্সাচালকের মতো মানুষের দেখা এত সহজে মিলতো না।

আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে, সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে রয়েছে এমন অনেক মানুষ যাদের কাছে সততাই হলো ধর্ম; দুর্নীতিকে তাঁরা প্রত্যাখান করেন ঘৃণাভরে, অর্থের জন্য তাঁরা বিকিয়ে দেন না নিজের সত্তাকে। তাই সত্যিকারের দেশপ্রেমিক ও সৎমানুষ খুঁজতে আমাদের অন্য গ্রহে যাবার দরকার নেই। ওদের বসবাস আমাদের খুবই কাছাকাছি, এই আমজনতার ভীড়ে। দুর্নীতিমুক্ত স্বপ্নের স্বদেশ গড়তে হলে এই সব সৎমানুষদের খুঁজে বের করে এনে চালকের আসনে বসাতে হবে।