২০১৯ সালের সম্ভবতঃ নভেম্বরের মাঝামাঝি ঢাকা থেকে অনুজ প্রকৌশলী তুহিনের টেলিফোন পেলাম। চুয়েটের সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবের আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে থিম সং লেখার জন্য তুহিন বিনীত অনুরোধ জানালো।
আর মাত্র তিন সপ্তাহ পরেই অনুষ্ঠান। আমি থাকি প্রবাসে। এতো কম সময়ের মধ্যে গান লিখে, সুর করে মিউজিক ভিডিও কিভাবে তৈরী হবে ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমি সাথে সাথেই তুহিনকে বললাম, “তরুণ চুয়েটিয়ানদের দিয়ে কাজটা করাও না?”। কিন্তু যাদের দিয়ে কাজটা করানো হবে তা যাচাই বাছাই করতে সময়ের প্রয়োজন। আর এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে, পুরো বিষয়টি বিতর্কিত হয়ে যেতে পারে। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠান। মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে এসব কিছু করা অনেকটা অসম্ভব, বললো তুহিন।
সত্যি বলতে কি সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠান এক বছর পিছিয়ে যাওয়াটা আমার ভালো লাগেনি। এজন্য চুয়েটিয়ানদের মধ্যে বিভিন্ন কোন্দলের খবরও কানে এসেছে। নেপথ্যে যাই ঘটুক, শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি যে হচ্ছে সেটাই আমাদের সবার জন্য ছিল সবচেয়ে বড় পাওয়া। এছাড়া আয়োজক কমিটিতে কারা আছে, কারা নেই, এদের দলীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় কি সেটা আমার কাছে মূখ্য ছিলনা। এরা সবাই চুয়েটিয়ান আর একজন প্রাক্তন চুয়েটিয়ান হিসাবে সুবর্ণ জয়ন্তীতে কিছু করার দায়ব্ধতা থেকেই শেষ পর্যন্ত কাজটা হাতে নিতে আমি রাজী হলাম।
সুবর্ণ জয়ন্তীর থিম সং লিখাটা খুব সহজ কাজ ছিলনা। কারণ এই থিম সং যেমন কোনো একটি ব্যাচের স্মৃতিকে নাড়া দেয়ার জন্য নয়, তেমনি চুয়েট থেকে গত পাঁচ দশকে যতগুলো এলামনাই বের হয়েছে তাদের সবার অনুভূতি একটি গানের মধ্যে নিয়ে আসাটাও কখনো সম্ভব নয়। এছাড়া গত পাঁচ দশকে চুয়েট ক্যম্পাসে যে অবিশ্বাস্য পরিবর্তন এসেছে তা কিভাবে গানে তুলে আনা যায় এসব ভাবতে ভাবতে গানটি নিয়ে কাজ শুরু করলাম।
৮০ দশকে তোরে পুতুলের মত সাজিয়ে, মুখরিত জীবনের মত বেশ কিছু কালজয়ী গান লিখার পর বাংলাদেশের প্রথম সারির প্রায় সব খ্যাতিমান কন্ঠশিল্পীদের অনুরোধ সত্বেও আমার আর গান লিখা হয়নি। কিন্তু চুয়েটের এই কাজটা অনেকটা আবেগতাড়িত হয়েই হাতে নেয়া। যাই হোক দু’দিনের মধ্যে গান লিখে ঢাকায় পাঠালাম সুর ও মিউজিক করার জন্য। আমার সাথে ভোকাল দেয়ার জন্য এই প্রজন্মের জনপ্রিয় শিল্পী শাব্বির ও কোনালকে নেয়া হল। এদিকে তুহিন ওর টিম নিয়ে ছুটে গেলো ক্যাম্পাসে মিউজিক ভিডিও তৈরী করতে। সোস্যাল মিডিয়ার যুগ বলেই রক্ষে। আমি আমার ভোকাল ও ভিডিও প্রবাসের স্টুডিওতে রেকর্ড করে পাঠালাম। এভাবেই তৈরী হল চুয়েট সুবর্ণ জয়ন্তীর থিম সং “একই সুতোয় বাঁধা আমরা চুয়েটিয়ান”।
থিম সং লিখেও অনুষ্ঠানে যাওয়া হলনা আমার। কাতারে কর্মরত আমার মতো অনেকেরই যাওয়া হয়নি স্বুর্ণ জয়ন্তী উৎসবে। কিন্তু তাতে কি? কাতারের সব চুয়েটিয়ানরা মিলে সিদ্ধান্ত নিল মরু-প্রবাস কাতারে আবার বসবে সুবর্ণ জয়ন্তীর আসর।
১৩ ডিসেম্বর, সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার, দোহা শহরের অভিজাত এলাকার একটি আবাসিক কম্পাউন্ড প্রাঙ্গনে আয়োজিত হল চুয়েট প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এই মিলনমেলা। মরুর দেশ কাতারে এখন শীতের আমেজ। সকাল থেকেই রাজধানী দোহা শহরের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। মনে হচ্ছে এই বুঝি নামবে বৃষ্টি। অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে গিয়ে ভাবনগুলো হয়ে যাচ্ছিল এলোমেলা। চুয়েট ক্যম্পাস ছেড়েছি তিন দশক পেরিয়ে গেছে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেই কেটেছে আমার মত বহু প্রাক্তন শিক্ষার্থীর তারুণ্যে ভরা জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো। এখন আমি যৌবন অতিক্রান্ত এক সুদূরের যাত্রী।
সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সারাদিনব্যাপী সাজানো হয়েছে অনুষ্ঠান। প্রাতঃরাশ সেরে সুবর্ণ জয়ন্তীর থিম সং বাজিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হল দিনের আয়োজন। দেখলাম গাল্ফ অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসাবে দুবাই থেকে এই আনন্দ মেলায় যোগ দিতে এসেছে প্রকৌশলী শামীম।
কাজের তাগিদে কাতারের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চুয়েটিয়ানরা। জীবনের ব্যস্ততায় আমরা এমন করে ডুবে আছি যে, একই শহরে থেকেও যেনো আমরা বাস করছি ভিন্ন গ্রহে। অনেকে দুই দশক ধরে কাতারে আছেন, অথচ সতীর্থ কোনো চুয়েটিয়ানের মুখোমুখি হননি কখনো। কিন্তু সুবর্ণ জয়ন্তীর এই আয়োজন, ক্যাম্পাসের হারিয়ে যাওয়া বহু চেনা মূখ ও দুর্লভ মুহূর্তগুলো আবার যেনো ফিরিয়ে দিল। পুরোনো বন্ধুদের সান্নিধ্যে এসে খুনসুটিতে মেতে উঠেছিল সবাই।
অনুষ্ঠানে সব বয়সীদের জন্য ছিল মজার মজার আয়োজন। তবে আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব ছিল চুয়েটিয়ানদের স্মৃতিচারণ। চুয়েটের সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে এসে বহু দিন পর ক্যাম্পাসের স্মৃতিগুলো যেনো হঠাৎ করে আড়মোড়া ভাঙল। শিক্ষকদের চোখে ধুলে দিয়ে সার্ভে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কাজে ফাঁকি দেয়া, শীতকালে ক্যাম্পাসের আশেপাশের গ্রাম থেকে আনা হাঁড়ি ভর্তি খেজুরের রস খাওয়া, হোস্টেলে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে গোলাগুলির মধ্যে রাত কাটানো, সেশন জটের জন্য জীবনের সোনালী দিনগুলো হারিয়ে যাওয়ার মতো বহু অম্ল-মধুর ঘটনা উঠে আসে স্মৃতিকথায়।
স্মারক হিসাবে কাতারের সব চুয়েটিয়ানদের একটি করে সুর্বণজয়ন্তীর লগো আঁকা টি-সার্ট, কফি মাগ ও নিজের নাম খোদই করা ক্রেষ্ট উপহার দেয়া হল। এছাড়া সুবর্র্ণ জয়ন্তী উৎসবের থিম সং-এর গীতিকার ও সহযোগী কন্ঠশিল্পী হিসাবে সন্মানিত করে আমাকে একটি বিশেষ ক্রেষ্টও প্রদান করা হয়, যা আমার জন্য ছিল সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। কাতারে আইইবির টানা চার বছর চেয়ারম্যান ছিলাম। এছাড়া বেশ কিছ’ সামাজিক ও পেশাজীবি সংগঠনের নেতৃত্ব¡ দেয়ার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি আমরা মানুষকে যথাযথ সম্নান দিতে খুব কুন্ঠাবোধ করি। অথচ অন্যকে সন্মানিত করলে নিজের সন্মান কমেনা বরং বাড়ে।
বিগত পাঁচ দশকে চুয়েটের রূপান্ত বিস্ময়কর! ১৯৬৮ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নামে যাত্রা শুরু করে ১৯৮৬-তে বিআইটি, আর এখন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা চুয়েট। চট্টগ্রাম শহরের জনপদ থেকে বহু দুরে রাউজানের সবুজ বনারণ্যে ১৭১ একর আয়তনের বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত চুয়েট ক্যাম্পাস। চুয়েটের এই অদম্য যাত্রার আমিও ছিলাম এজন সারথী, ভাবতেই ভালো লাগে। ৭০ দশকের মাত্র তিনটি ডিপার্টমেন্টের সংখ্যা এখন ১৫। হয়েছে বহু ছাত্রাবাস। আমাদের সময়তো কোনো ছাত্রীও ছিলনা চুয়েটে। আর এখন ছাত্রীদের জন্য রয়েছে দুটো হোস্টেল। ক্যাম্পাসে তৈরী হয়েছে গবেষণা কেন্দ্র এবং ইন্সটিটিউট। সুকুমারবৃত্তি চর্চার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ডিবেটিং সোসাইটি ও বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন।
তবে সবকিছুর সাথে পাল্লা দিয়ে রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলোর দাপটও বেড়েছে অনেক। আধিপত্য বিস্তার করতে যেয়ে সহিংসতার খবরও শুনছি। যা আগে ছিলনা। আমাদের সময়েও ছাত্র রাজনীতি ছিল কিন্তু এ নিয়ে কখনো বাড়াবাড়ি হতে দেখিনি। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক পরিচয় নয় বন্ধুত্বই ছিল বড়। ইদানিং র্যাগিংএর নামে নবাগত শিক্ষার্থীদের উপর শারীরিক ও মানষিক নির্যাতনের খবর শুনে স্মম্ভিত হয়েছি। বিশ্বাস করতে মন চায়নি যে চুয়েট ক্যাম্পাসে এসব ঘটছে। মনে পড়ে চুয়েটে আসার পর ফাইনাল ইয়ারের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের বড় ভাইয়েরা আমাকে মনসুরের দোকানে মিষ্টি খাইয়ে তাদের দলে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন। এই ছিল সত্তর দশকের র্যাগিং। কোথায় গেল সেই দিন!
ইদানিং দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নেই বলে অনেককে আক্ষেপ করতে শুনি। তবে কাতারের সুবর্ণ-জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে অনুজ চুয়েটিয়ানরা সিনিয়রদের যেরকম সন্মান দেখালো, তা একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আজকের প্রজন্মের চুয়েটিয়ানরা আমাদের সময়ের চেয়ে উন্নত চিন্তা-ভাবনা ও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। তবে সতর্ক থাকতে হবে অত্যাধিক আত্মবিশ্বাস যাতে ঔদ্ধত্যে রূপ না নেয়। যা একজন আলোকিত মানুষ হবার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯
