১. অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশি কোটায় হজযাত্রা

বাংলাদেশি হজ কোটায় হজের ভিসা নিতে হয় বাংলাদেশি পাসপোর্টে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া থেকে যাত্রার সময় অস্ট্রেলীয় নাগরিক হিসেবে অস্ট্রেলীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হয়। ফলে যাত্রাপথে দুটি দেশের পাসপোর্ট কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা নিয়ে অনেকের মনে সংশয় ছিল। কারও কারও ধারণা ছিল, এভাবে ভ্রমণ করা সম্ভব নয়।

তবে এ বছর হজ পালন করতে গিয়ে দেখলাম, বিষয়টি নতুন কিছু নয়। দ্বৈত নাগরিকত্বধারী অনেকেই আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সময় দুটি দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে থাকেন। বিমানবন্দরের চেক-ইন কাউন্টারের অধিকাংশ কর্মীরই এ বিষয়ে ধারণা থাকার কথা। তবে বোর্ডিং পাস ইস্যু করার সময় কোনো কর্মকর্তা ইতস্তত করলে অন্য কাউন্টারের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা কিংবা সুপারভাইজারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

হজযাত্রীদের জেদ্দা বিমানবন্দরে সৌদি আরবের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে হয়। সিডনি কিংবা অস্ট্রেলিয়ার অন্য কোনো শহর থেকে জেদ্দায় সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় যাত্রাপথে সাধারণত একটি ট্রানজিট নিতে হয়। কোন এয়ারলাইনসের টিকিট কাটছেন, তার ওপর নির্ভর করে ট্রানজিটের স্থান নির্ধারিত হয়। যেমন, ইতিহাদ এয়ারওয়েজে গেলে আবুধাবিতে এবং কাতার এয়ারওয়েজে গেলে দোহায় ট্রানজিট নিতে হয়।

এ ছাড়া হজযাত্রায় দুটি ভিন্ন এয়ারলাইনসের ফ্লাইটও ব্যবহার করা যায়। যেমন, আমি মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসে কুয়ালালামপুর যাই এবং সেখান থেকে সৌদিয়া এয়ারলাইনসে জেদ্দা পৌঁছাই।

মূল বিষয়টি হলো, প্রতিটি দেশের ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ (Entry) ও প্রস্থান (Exit) করার সময় সংশ্লিষ্ট দেশের জন্য উপযুক্ত একই পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হবে। কোনো দেশের ইমিগ্রেশনে প্রবেশের সময় এক পাসপোর্ট এবং প্রস্থানের সময় অন্য পাসপোর্ট ব্যবহার করলে রেকর্ডের অসংগতি তৈরি হতে পারে। তাই প্রতিটি দেশের প্রবেশ ও প্রস্থানের ক্ষেত্রে একই পাসপোর্ট ব্যবহার করাই নিয়মসম্মত পদ্ধতি।

অন্যদিকে, এয়ারলাইনসের চেক-ইন প্রক্রিয়া ইমিগ্রেশন থেকে আলাদা। বোর্ডিং পাস ইস্যু করার আগে এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ যাত্রীর পরিচয়পত্র, গন্তব্য দেশে প্রবেশের অনুমতি এবং প্রয়োজনীয় ভিসা যাচাই করে।

অস্ট্রেলিয়ার যে শহর থেকে যাত্রা শুরু করবেন, সেখানকার বিমানবন্দরের চেক-ইন কাউন্টারে টিকিটসহ অস্ট্রেলীয় ও বাংলাদেশি, দুটি পাসপোর্টই দেখাতে হবে। স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে, বাংলাদেশি পাসপোর্টে আপনার সৌদি আরবের হজ ভিসা রয়েছে। এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে ট্রানজিট গন্তব্য এবং সেখান থেকে জেদ্দা যাওয়ার জন্য বোর্ডিং পাস ইস্যু করবে। তবে সংযোগকারী ফ্লাইট, ট্রানজিটের নিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের নীতির ওপর নির্ভর করে প্রক্রিয়াটি ভিন্ন হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়া ত্যাগের সময় অস্ট্রেলীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হবে। ট্রানজিট দেশের ইমিগ্রেশন থাকলে সেখানে সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম অনুযায়ী উপযুক্ত পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হবে। আর সৌদি আরবে প্রবেশের সময় জেদ্দা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ও হজ ভিসা দেখাতে হবে।

সুতরাং, দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের জন্য দুটি পাসপোর্ট ব্যবহার করে হজে যাওয়া সম্ভব হলেও যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস এবং অস্ট্রেলিয়া, ট্রানজিট ও সৌদি আরবের কর্তৃপক্ষের নিয়ম যাচাই করে নেওয়া জরুরি।

নিচের লাইন ডায়াগ্রামে পুরো প্রক্রিয়াটি তুলে ধরা হলো।

২. দুটি পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ: অভিজ্ঞতা ও করণীয়

বাংলাদেশি হজ কোটায় হজের ভিসা নিতে হয় বাংলাদেশি পাসপোর্টে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া থেকে যাত্রার সময় অস্ট্রেলীয় নাগরিক হিসেবে অস্ট্রেলীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হয়। ফলে যাত্রার সময় দুটি দেশের পাসপোর্ট কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা নিয়ে অনেকের মনে সংশয় ছিল। কারও কারও ধারণা ছিল, এভাবে ভ্রমণ করা সম্ভব নয়।

কিন্তু ২০২৪ সালে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের ক্ষেত্রে দুটি পাসপোর্ট ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে কোন দেশের ইমিগ্রেশনে কোন পাসপোর্ট দেখাতে হবে, তা আগে থেকে পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি।

সিডনি থেকে জেদ্দা পর্যন্ত সরাসরি কোনো বিরতিহীন ফ্লাইট না থাকায় সাধারণত মাঝপথে একটি ট্রানজিট নিতে হয়। যেমন, ইতিহাদ এয়ারওয়েজে গেলে আবুধাবি এবং কাতার এয়ারওয়েজে গেলে দোহায় ট্রানজিট নিতে হয়। চাইলে দুটি ভিন্ন এয়ারলাইন ব্যবহার করেও যাত্রা করা যায়। আমি মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসে কুয়ালালামপুর এবং সেখান থেকে সৌদিয়া এয়ারলাইনসে জেদ্দা গিয়েছিলাম।

আমার অভিজ্ঞতায়, যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রবেশ ও বহির্গমনসংক্রান্ত নিয়ম এবং এয়ারলাইনসের পাসপোর্ট যাচাইয়ের শর্ত জেনে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় সাধারণত একই পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হয়। এক পাসপোর্টে প্রবেশ করে অন্য পাসপোর্টে বের হওয়ার চেষ্টা করলে ইমিগ্রেশনে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার বিমানবন্দরে চেক-ইন করার সময় আমি দুটি পাসপোর্টই সঙ্গে রেখেছিলাম। কর্মীদের জানিয়েছিলাম, বাংলাদেশি পাসপোর্টে আমার হজের ভিসা রয়েছে। বোর্ডিং পাস ইস্যু করার সময় কোনো কর্মী বিষয়টি নিয়ে দ্বিধায় পড়লে অভিজ্ঞ সহকর্মী বা সুপারভাইজারের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

সাধারণভাবে অস্ট্রেলিয়া থেকে বহির্গমনের সময় অস্ট্রেলীয় পাসপোর্ট এবং সৌদি আরবে প্রবেশের সময় বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করতে হয়। তবে যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও এয়ারলাইনসের কাছ থেকে নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী বিষয়টি নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত।

৩. বাংলাদেশি কোটায় হজে যাওয়ার প্রস্তুতি

বাংলাদেশি কোটায় হজে যেতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আগে থেকে সম্পন্ন করতে হয়। ২০২৪ সালের আমার অভিজ্ঞতায় প্রক্রিয়াটি ছিল নিম্নরূপ।

১. বাংলাদেশি পাসপোর্ট: বাংলাদেশি হজ কোটায় ভিসা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রয়োজন।

২. প্রাক্‌–নিবন্ধন: সংশ্লিষ্ট হজ এজেন্সির মাধ্যমে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রাক্‌-নিবন্ধন করতে হয়।

৩. হজ প্যাকেজ নির্বাচন: এজেন্সিগুলো সাধারণত ভিআইপি, এ, বি, সি ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণির প্যাকেজ দিয়ে থাকে। আর্থিক সামর্থ্য এবং প্যাকেজের সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

৪. বায়োমেট্রিক নিবন্ধন: সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত অ্যাপ Saudi Visa Bio বা পদ্ধতিতে বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।

৫. হজ ভিসা: আমার ক্ষেত্রে এজেন্সি বাংলাদেশি পাসপোর্টের প্রথম পাতার স্ক্যান কপি নিয়ে ভিসার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল। মূল পাসপোর্ট দেশে পাঠাতে হয়নি।

৬. টিকা ও মেডিকেল সার্টিফিকেট: ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতায় ইনফ্লুয়েঞ্জা ও মেনিনজোকক্কাল (Meningococcal A,C,Y,W-135) টিকা নেওয়া এবং নির্ধারিত মেডিকেল সার্টিফিকেট সংগ্রহের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমাদের এজেন্সি বাংলাদেশ থেকে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা করেছিল। ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য আমরা অস্ট্রেলিয়াতেও টিকা নিয়েছিলাম। তবে টিকার ধরন, সনদ এবং গ্রহণযোগ্যতার নিয়ম প্রতিবছর পরিবর্তিত হতে পারে। তাই যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি।

৭. নুসুক কার্ড: সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর নিবন্ধিত হজযাত্রীদের নুসুক কার্ড দেওয়া হয়। রাস্তাঘাটে বা বিভিন্ন চেকপয়েন্টে এটি দেখাতে হতে পারে। তাই কার্ডটি সব সময় সঙ্গে রাখা উচিত। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও একটি পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছিল, যদিও আমার অভিজ্ঞতায় সেটি তেমন কাজে আসেনি।

৪. জেদ্দা বিমানবন্দরে প্রথম অভিজ্ঞতা

জেদ্দা বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। ইমিগ্রেশনের কাজ আনুমানিক পাঁচ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়েছিল। লাগেজও দ্রুত হাতে পেয়েছিলাম।

বাংলাদেশি যাত্রীদের সঙ্গে বিমানবন্দরে দুর্ব্যবহারের কথা আগে অনেকের মুখে শুনেছিলাম। তাই কিছুটা শঙ্কা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি। ইমিগ্রেশন থেকে বের হওয়ার সময় আমাদের দলের মাত্র একজনের মেডিকেল সার্টিফিকেট পরীক্ষা করা হয়েছিল।

বিমানবন্দরে নেমেই চোখে পড়ল ইংরেজিতে দক্ষ একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবক। তাঁরা হজযাত্রীদের বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন। মক্কায় আমাদের হোটেলের নাম বলতেই সৌদি মোয়াল্লেম নির্ধারিত বাসে ওঠার ব্যবস্থা করে দিলেন। বাসে উঠে দেখলাম যাত্রীদের জন্য জুস, কেক ও বিস্কুটের প্যাকেট রাখা আছে।

দীর্ঘ যাত্রার পর এমন সহযোগিতা ও আতিথেয়তা সত্যিই ভালো লেগেছিল।

৫. হজের ফরজ, ওয়াজিব ও প্রকারভেদ

হজের ফরজ কাজ তিনটি:

১. ইহরাম বাঁধা বা হজের নিয়ত করা।
২. আরাফাতের ময়দানে নির্ধারিত সময়ে অবস্থান করা।
৩. তাওয়াফে জিয়ারত বা কাবা শরিফ তাওয়াফ করা।

হজের ওয়াজিব কাজ ছয়টি:

১. মুজদালিফায় নির্ধারিত সময়ে অবস্থান করা।
২. নির্ধারিত দিনে জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করা।
৩. হজের কুরবানি করা (যেসব হজযাত্রীর জন্য প্রযোজ্য)।
৪. ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মাথার চুল মুণ্ডন বা ছোট করা।
৫. তাওয়াফে বিদা বা বিদায়ী তাওয়াফ করা (যাদের জন্য প্রযোজ্য)।
৬. সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাঈ করা।

জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত হজের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমগুলো মূলত পাঁচটি স্থানে সম্পন্ন হয়—মিনা, আরাফাত, মুজদালিফা, জামারাত ও বাইতুল্লাহ শরিফে। এসব স্থানে হজের বিভিন্ন ফরজ ও ওয়াজিব আমল আদায় করতে হয়। হজের কার্যক্রমগুলো নিচের ছবিতে তুলে ধরা হলো।

হজ প্রধানত তিন প্রকার: কিরান, তামাত্তু ও ইফরাদ। মক্কার বাইরে থেকে আগত হজযাত্রীরা প্রযোজ্য বিধান ও নিজেদের পরিস্থিতি অনুযায়ী এই তিন প্রকারের যেকোনো একটি পদ্ধতিতে হজ পালন করতে পারেন।

১. কিরান হজ: মীকাত অতিক্রমের আগে উমরা ও হজ—উভয়ের নিয়তে ইহরাম বাঁধা হয়। একই ইহরাম বজায় রেখে প্রথমে উমরার আমল সম্পন্ন করা হয়। এরপর ইহরাম থেকে মুক্ত না হয়ে হজের নির্ধারিত সময়ে হজের আমলগুলো সম্পন্ন করতে হয়। কিরান হজে কুরবানি করা ওয়াজিব।

২. তামাত্তু হজ: মীকাত থেকে শুধু উমরার নিয়তে ইহরাম বাঁধা হয়। মক্কায় পৌঁছে উমরার আমল সম্পন্ন করার পর মাথার চুল মুণ্ডন বা ছোট করে ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়া যায়। এরপর একই সফরে হজের নির্ধারিত সময়ে নতুন করে ইহরাম বেঁধে হজের আমলগুলো সম্পন্ন করতে হয়। তামাত্তু হজেও কুরবানি করা ওয়াজিব। আমরা তামাত্তু পদ্ধতিতেই হজ পালন করেছি।

৩. ইফরাদ হজ: মীকাত থেকে শুধু হজের নিয়তে ইহরাম বাঁধা হয়। মক্কায় পৌঁছে হজের আমল সম্পন্ন করার জন্য ইহরাম অবস্থায় অপেক্ষা করতে হয়। এ পদ্ধতিতে হজের আগে উমরা করা হয় না। নির্ধারিত সময়ে হজের আমলগুলো সম্পন্ন করা হয়। ইফরাদ হজে হজের কারণে কুরবানি করা বাধ্যতামূলক নয়।

হজ পালনের জন্য শারীরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি বৈষয়িক ও মানসিক প্রস্তুতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকারের হজ ব্যবস্থাপনার আওতায় প্রাক্‌-নিবন্ধন সম্পন্ন করার পর এ বছরের জানুয়ারিতেই আমার হজের কোটা নিশ্চিত হয়েছিল। এই নিশ্চয়তা আমাকে মানসিক স্বস্তি দিয়েছিল। ফলে হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে হজের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পেরেছিলাম।

৬. হজ এজেন্সি নির্বাচন: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশি কোটায় হজ পালনের পরিকল্পনা করলে শুরুতেই একটি নির্ভরযোগ্য এজেন্সি নির্বাচন করা জরুরি। ভিসা, নিবন্ধন, আবাসন, পরিবহন এবং হজের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে এজেন্সির কার্যক্রম সরাসরি জড়িত।

হজের সফর আর সাধারণ ছুটি কাটানো এক বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন মুসলমানের গভীর আবেগ, দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এবং আধ্যাত্মিক প্রত্যাশা। বিশেষ করে যাঁরা প্রথমবার হজে যাচ্ছেন, তাঁদের মনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ থাকে। তাঁরা সঠিকভাবে হজের নিয়মকানুন পালন করতে পারবেন কি না, সুস্থ থাকতে পারবেন কি না, কিংবা প্রয়োজনের সময় সাহায্য পাবেন কি না, এসব চিন্তা স্বাভাবিক।

আমার নিজের অভিজ্ঞতায়, হজের সময় সর্দি-জ্বরসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আমার সঙ্গে যাঁরা গিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে একজন দায়িত্বশীল ও অভিজ্ঞ মোয়াল্লেম এবং এজেন্সির কার্যকর সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এজেন্সি নির্বাচনের আগে পূর্ববর্তী হজযাত্রীদের সঙ্গে কথা বলা উচিত। তাঁরা প্রতিশ্রুত সেবা পেয়েছিলেন কি না, হোটেলের মান কেমন ছিল, খাবার ও পরিবহনব্যবস্থা কতটা সন্তোষজনক ছিল, মিনার তাঁবুর ব্যবস্থা কেমন ছিল এবং কোনো সমস্যায় এজেন্সি কত দ্রুত সাড়া দিয়েছিল, এসব বিষয়ে খোঁজ নিতে হবে।

হজের মতো বিশাল আয়োজনের ক্ষেত্রে সব প্রতিশ্রুতি শতভাগ পূরণ করা সব সময় সহজ নাও হতে পারে। কিছু বিষয় এজেন্সির নিয়ন্ত্রণের বাইরেও থাকে। কিন্তু আবাসন, খাবার, পরিবহন এবং হজের ফরজ ও ওয়াজিব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সহায়তার মতো মৌলিক দায়িত্বে অবহেলা গ্রহণযোগ্য নয়।

কিছু হজযাত্রীর কাছ থেকে শুনেছি, ভিআইপি তাঁবুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে সেখানে জায়গা পাওয়া যায়নি। কোথাও প্রতিশ্রুত মানের হোটেল পাওয়া যায়নি, কোথাও খাবারের মান ছিল নিম্নমানের। আবার চারজনের থাকার কথা থাকলেও একই কক্ষে পাঁচজনকে থাকতে হয়েছে।

এ ধরনের অভিজ্ঞতা এড়াতে হজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই তাড়াহুড়া না করে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। প্যাকেজের বিজ্ঞাপনে কী লেখা আছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবে কী কী সেবা দেওয়া হবে, তা পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া।

৭. হজের প্যাকেজ নির্বাচন

হজের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হজের কার্যক্রম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা অর্জন করা। ইসলামী বিধান অনুযায়ী হজের ফরজ, ওয়াজিব এবং অন্যান্য আমল সম্পর্কে আগে থেকে জানা থাকলে প্যাকেজ নির্বাচন ও সফরের পরিকল্পনা সহজ হয়। ধর্মীয় বিধানের বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

হজের প্যাকেজের মূল্য সাধারণত মক্কা ও মদিনার হোটেলের অবস্থান, কক্ষে কতজন থাকবেন, মিনার তাঁবুর শ্রেণি, খাবারের ব্যবস্থা এবং পরিবহনের ওপর নির্ভর করে। ভিআইপি, এ, বি, সি ইত্যাদি বিভিন্ন নামে প্যাকেজ দেওয়া হয়। তবে শুধু প্যাকেজের নাম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কোন সুবিধাটি বাস্তবে পাওয়া যাবে, তা বিস্তারিত যাচাই করা প্রয়োজন।

কিছু এজেন্সি প্রথমে হজযাত্রীদের মদিনায় নিয়ে যায় এবং পরে হজের আগে মক্কায় নিয়ে আসে। হজের মৌসুমে মক্কায় হোটেলভাড়া সাধারণত অনেক বেশি হওয়ায় এভাবে ভ্রমণের খরচ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।

মিনার তাঁবুর শ্রেণি ও সুযোগ–সুবিধা

হজের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে মিনায় অবস্থান করতে হয়। তাই মিনার তাঁবুর মান ও অবস্থান হজযাত্রীদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জামারাত থেকে দূরত্ব, তাঁবুতে মানুষের সংখ্যা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, বিছানা ও খাবারের ব্যবস্থা বিবেচনা করে বিভিন্ন শ্রেণির তাঁবু নির্ধারণ করা হয়।

২০২৪ সালের আমার অভিজ্ঞতা ও সে সময়ের প্যাকেজের বিবরণ অনুযায়ী, তাঁবুর কয়েকটি শ্রেণির বৈশিষ্ট্য ছিল নিম্নরূপ।

আল কাবশ (ভিআইপি): জামারাত থেকে আনুমানিক ৩০০ থেকে ৭০০ মিটার দূরে। প্রতি তাঁবুতে সাধারণত ১০ থেকে ২০ জনের থাকার ব্যবস্থা। সোফা-বেড, বালিশ, কম্বল, স্প্লিট এসি এবং বুফে খাবারের ব্যবস্থা ছিল।

ক্যাটাগরি এ: জামারাতের প্রায় ৬০০ মিটারের মধ্যে অবস্থিত। প্রতি তাঁবুতে আনুমানিক ১০ থেকে ২০ জনের থাকার ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভিআইপি ক্যাম্পের কাছাকাছি।

আল মুইসিম: অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, তুরস্ক ও ইউরোপের অনেক হজযাত্রীকে এ এলাকায় রাখা হয়। জামারাত থেকে দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। প্রতি তাঁবুতে আনুমানিক ৫০ থেকে ১০০ জন থাকতে পারেন। সুযোগ-সুবিধা সাধারণত ভিআইপি ও এ ক্যাটাগরির মাঝামাঝি।

ক্যাটাগরি বি: জামারাত থেকে আনুমানিক ৫০০ মিটার থেকে এক কিলোমিটার দূরে। প্রতি তাঁবুতে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা। বিছানা, বালিশ, কম্বল, এসি এবং বুফে খাবার থাকতে পারে।

ক্যাটাগরি সি: জামারাত থেকে প্রায় এক থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। প্রতি তাঁবুতে ১০০ জনের বেশি হজযাত্রী থাকতে পারেন। সাধারণত পাতলা ফোমের ম্যাট্রেস, ছোট বালিশ, চাদর ও এসি থাকে। খাবার সরবরাহ করা হলেও সব ক্ষেত্রে বুফে ব্যবস্থা থাকে না।

ক্যাটাগরি ডি: জামারাত থেকে তিন কিলোমিটারেরও বেশি দূরে হতে পারে। প্রতি তাঁবুতে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা থাকতে পারে। সাধারণত পাতলা ফোমের ম্যাট্রেস, ছোট বালিশ, চাদর ও এয়ার কুলার থাকে। খাবারের ব্যবস্থাও তুলনামূলক সাধারণ।

তবে তাঁবুর শ্রেণি, দূরত্ব ও সুযোগ-সুবিধা বছরভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বুকিংয়ের আগে সংশ্লিষ্ট বছরের নির্দিষ্ট প্যাকেজের বিবরণ যাচাই করা জরুরি।

কিছু এজেন্সির মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে তাঁবুর শ্রেণি উন্নীত করার সুযোগ থাকে। যেমন, ক্যাটাগরি ডি থেকে এ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করতে কোনো কোনো এজেন্সি অতিরিক্ত আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত চেয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের পরিবর্তন সব সময় সহজ নয়। এর জন্য সৌদি মোয়াল্লেমের সহযোগিতা এবং এজেন্সির প্রতিনিধির উপস্থিতি প্রয়োজন হতে পারে।

আমি নিজেও তাঁবুর শ্রেণি উন্নীত করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভিআইপি প্যাকেজ না নেওয়ায় এজেন্সি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে আগ্রহী হয়নি। ফলে আমার পক্ষে তাঁবু পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি।

এ অভিজ্ঞতা থেকে বলব, প্যাকেজ নির্বাচনের সময় মিনায় কোন শ্রেণির তাঁবুতে থাকতে হবে, তাঁবুর অবস্থান কোথায় এবং জামারাত পর্যন্ত যাতায়াত কতটা সহজ হবে, তা স্পষ্টভাবে জেনে নেওয়া উচিত।

৮. আমাদের হজ প্যাকেজের অভিজ্ঞতা

প্যাকেজের মেয়াদ

বাংলাদেশি হজ প্যাকেজের মেয়াদ সাধারণত ১৫ দিন থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত হতে পারে। অস্ট্রেলিয়া থেকে যাওয়া অনেক হজযাত্রী সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে ১৫ অথবা ২১ দিনের প্যাকেজ বেছে নেন। আমরাও স্বল্পমেয়াদি প্যাকেজের মাধ্যমে হজ সম্পন্ন করেছি।

মক্কার হোটেল

জেদ্দা বিমানবন্দর থেকে আমাদের সরাসরি মক্কার হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হজের পর আমরা মদিনায় যাই।

আমাদের হোটেলটি মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ১০ মিনিটের হাঁটার দূরত্বে, ক্লক টাওয়ারের পেছনে মিসফালা এলাকায়, বিখ্যাত কবুতর চত্বরের কাছে অবস্থিত ছিল। পুরুষ ও নারীদের আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছিল। প্রতি কক্ষে চারজনের থাকার ব্যবস্থা ছিল। চাইলে তিনজন কিংবা স্বামী-স্ত্রী দুজনের জন্যও কক্ষ নেওয়ার সুযোগ ছিল, তবে সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হতো।

হোটেল নির্বাচন করার সময় শুধু তারকা-মান দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে মসজিদুল হারাম থেকে দূরত্ব বিবেচনা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার মনে হয়েছে। হোটেল যত কাছে হবে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে অংশ নেওয়া এবং তাওয়াফ করার জন্য যাতায়াত তত সহজ হবে।

আমাদের হোটেলের রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন তিন বেলা বাংলাদেশি খাবার দেওয়া হতো। মাছ, মাংস, ডাল, শাকসবজি ও বিরিয়ানির স্বাদ এখনো মনে আছে। মিসফালা এলাকাকে এক অর্থে বাঙালি পাড়া বলা যায়। এখানকার অনেক হোটেলে বাংলাদেশি হাজিরা থাকেন। রাস্তায় বেরোলেই সারি সারি বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি রেস্তোরাঁ চোখে পড়ে।

মদিনার হোটেল

মদিনায় আমাদের হোটেলটিও বেশ মানসম্মত ছিল। মসজিদে নববী থেকে মাত্র তিন মিনিটের হাঁটার পথ। সেখানেও তিন বেলা বুফে খাবারের ব্যবস্থা ছিল।

পরিবহন

মক্কা থেকে মিনার ক্যাম্প, মিনা থেকে আরাফাত, জামারাত থেকে মক্কা, মক্কা থেকে মদিনা এবং ফেরার সময় মদিনা থেকে জেদ্দা বিমানবন্দর পর্যন্ত এজেন্সির বাস সার্ভিস ছিল।

মিনা থেকে জামারাত যাওয়ার জন্য ট্রেন ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া হারামাইন হাইস্পিড ট্রেনে মক্কা থেকে মদিনা কিংবা জেদ্দা বিমানবন্দরের দিকে যাওয়া যায়। অনলাইনে টিকিট কেনা সম্ভব হলেও চাহিদা বেশি থাকায় আগেভাগে বুকিং করা ভালো। ট্রেনে বড় আকারের লাগেজ রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে।

এজেন্সির পক্ষ থেকে মক্কা ও মদিনার দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার ব্যবস্থাও ছিল।

মিনার তাঁবু ও মুজদালিফার অভিজ্ঞতা

হজের সময় বাংলাদেশি হজযাত্রীদের অনেককে মিনার সাধারণ শ্রেণির তাঁবুতে রাখা হয়। হজযাত্রীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কিছু এলাকায় তাঁবুর সীমানা ও অবস্থান নিয়ে জটিলতা দেখা যায়। আমাদের তাঁবুটিও মুজদালিফা এলাকায় ছিল।

এর একটি সুবিধা ছিল, তাঁবুর অবস্থানের কারণে মুজদালিফায় রাত যাপনের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা তুলনামূলক সহজ হয়েছিল। তাঁবুর মাত্র ৫০ মিটার দূরেই কার্পেট বিছানো একটি জায়গা ছিল, যেখানে রাত কাটানোর ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সেখানে জায়গা না পেয়ে আমরা পাশের রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাই।

মুজদালিফায় জামারাতে নিক্ষেপের জন্য ছোট পাথর সংগ্রহ করতে হয়। তবে আমাদের ক্ষেত্রে মোয়াল্লেমের পক্ষ থেকেই ব্যাগে করে পাথর সরবরাহ করা হয়েছিল।

আমাদের মিনার তাঁবুতে প্রায় ১৫০ জন হজযাত্রী ছিলেন। ঘুমানোর জন্য ছিল প্রায় ৫৫০ মিলিমিটার চওড়া পাতলা ফোমের ম্যাট্রেস। প্রচণ্ড গরমে এমন তাঁবুতে থাকা অনেকের জন্য কষ্টকর হতে পারে। কখনো এয়ার কুলার ঠিকমতো কাজ করে না, আবার টয়লেট ব্যবহারের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। এসব পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও সহনশীলতা জরুরি।

তাঁবুর ভেতর প্রথমবার ঢুকে কিছুটা চমকে গিয়েছিলাম। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, পরে মানিয়ে নিতে কোনো সমস্যা হয়নি। বরং এটিকে হজেরই একটি পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম।

তাঁবুর চারপাশে লুঙ্গি ও গামছা পরা বাংলাদেশি হাজিদের দেখে মনে হয়েছিল, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন, এঁরাই আমার আপনজন। এখানেই আমার শিকড়।

তাঁবুর বাইরে বিভিন্ন স্থানে ফ্রিজে ঠান্ডা পানির বোতল রাখা ছিল। এক পাশে রান্নাঘরে বড় বড় হাঁড়িতে বাংলাদেশি হাজিদের জন্য খাবার তৈরি হতো। তিন বেলা বক্সে করে খাবার তাঁবুতে পৌঁছে দেওয়া হতো। বাইরে বড় ডিসপেনসারে গরম চায়ের ব্যবস্থাও ছিল। চা নেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইন দেখেছি। একবার খাবারের পর একজন হাজিকে পানের ডিব্বা খুলে বসতে দেখে ভালো লেগেছিল। তিনি আমাকেও পান ভাগ করে দিয়েছিলেন।

ক্যাম্পে স্কোয়াট ও কমোড, দুই ধরনের টয়লেটই ছিল। সেগুলো নতুন ও মোটামুটি পরিচ্ছন্ন ছিল এবং নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছিল। আগে যেমনটি আশঙ্কা করেছিলাম, বাস্তব পরিস্থিতি ততটা খারাপ ছিল না।

আরাফাতের ক্যাম্প তুলনামূলক উন্নত মনে হয়েছিল। সেখানে স্প্লিট এসি ছিল এবং বাংলাদেশি খাবারের ব্যবস্থাও ছিল।

কুরবানি ও রিয়াদুল জান্নাহ

হজের পর কুরবানির ব্যবস্থাও এজেন্সির পক্ষ থেকে করা হয়েছিল। আমরা জনপ্রতি ৭০০ সৌদি রিয়াল দিয়েছিলাম। সে সময় সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রতি ভাগ ৭২০ রিয়াল বলে জানতে পেরেছিলাম। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী নিজেও অনুমোদিত মাধ্যমে কুরবানির অর্থ জমা দেওয়া যায়। কুরবানি সম্পন্ন হলে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বার্তা পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

মদিনায় রিয়াদুল জান্নাহ জিয়ারতের জন্য এজেন্সি গ্রুপ বুকিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল। তবে শুধু গ্রুপ বুকিংয়ের অপেক্ষায় না থেকে নুসুক অ্যাপের মাধ্যমে নিজেও বুকিংয়ের চেষ্টা করা যায়। এ ক্ষেত্রে আগে থেকে ব্যবস্থা নেওয়া ভালো, কারণ পছন্দের সময়ের স্লট দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে।

৯. হজের জন্য কী কী প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন

হজে যাওয়ার আগে কী কী জিনিস সঙ্গে নিতে হবে, তা নিয়ে অনলাইনে ও ইউটিউবে প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়। তবে অপ্রয়োজনীয় জিনিস বহন না করে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো বেছে নেওয়াই ভালো। আমি অনেক কিছু নিয়ে গিয়েও দেখেছি, তার কিছুই ব্যবহার করা হয়নি।

ধর্মীয় বই ও ইহরামের কাপড়

কুরআন, তাফসির এবং প্রয়োজনীয় ধর্মীয় বই সঙ্গে রাখা যেতে পারে। ইহরামের কাপড় ও বেল্টও আগে থেকে কিনে নেওয়া উচিত।

জেদ্দায় পৌঁছানোর আগেই মিকাত অতিক্রম করতে হয় বলে বিমানে বা ট্রানজিট বিমানবন্দরে ইহরাম পরার প্রয়োজন হতে পারে। তাই অস্ট্রেলিয়া ছাড়ার সময় হাতব্যাগে অন্তত এক সেট ইহরামের কাপড় রাখা ভালো।

আমি সিডনির অবার্ন এলাকা থেকে ইহরামের কাপড় ও বেল্ট কিনেছিলাম। কাপড় খুব মোটা হলে গরমে অস্বস্তি হতে পারে। দুটি সেট থাকলে সুবিধা হয়, কারণ একটি ময়লা হয়ে গেলে অন্যটি ব্যবহার করা যায়। দ্বিতীয় সেটটি মক্কা থেকেও কেনা সম্ভব। হোটেলের আশপাশের দোকানে ৩০ রিয়ালের মধ্যে ইহরামের কাপড় পাওয়া যেত।

তাওয়াফের সময় ইহরাম বেল্টে মোবাইল ফোন, টাকা ও ব্যাংক কার্ড রাখার সুবিধা পেয়েছি।

ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও গরম থেকে সুরক্ষা

আমি প্রচুর জিনিসপত্র নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত compressed tissue, দরজায় ঝোলানোর হুক, wet wipes এবং ইহরাম অবস্থায় ব্যবহারের উপযোগী সুগন্ধিবিহীন সাবান বেশি কাজে লেগেছে।

প্রচণ্ড গরম থেকে সুরক্ষার জন্য ছাতা, সানগ্লাস এবং পর্যাপ্ত পানি পান করার ব্যবস্থা জরুরি। চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশনও সঙ্গে রাখা যেতে পারে। সম্ভব হলে portable misting fan উপকারী হতে পারে।

হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় আমরা নিয়মিত পানির সঙ্গে হাইড্রালাইট মিশিয়ে পান করতাম। দীর্ঘক্ষণ হাঁটার সময় ঠান্ডা পানিতে ভেজানো ছোট তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছলে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেত। মিনা ক্যাম্পেও portable misting fan কাজে লেগেছিল।

মক্কার হোটেলে পৌঁছে মোয়াল্লেম একটি করে সাদা ছাতা দিয়েছিলেন। কিন্তু আমারটি খোলার আগেই ভেঙে যায়। মক্কার দোকান থেকে প্রায় ১০ রিয়ালে ছাতা কেনা যেত। ছাতা হারিয়ে যেতে পারে বা ভেঙে যেতে পারে, তাই প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ছাতা রাখার কথা ভাবা যেতে পারে।

ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী

নিয়মিত ব্যবহৃত ওষুধের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী সঙ্গে রাখা ভালো। যেমন, ব্যান্ডএইড, অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম এবং ত্বকের র‍্যাশের উপযোগী ক্রিম।

জ্বর, ব্যথা, সর্দি বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যার জন্য কী ওষুধ নেওয়া উচিত, তা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শে ঠিক করা ভালো। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়। অন্যের ওষুধ ধার করে খাওয়াও নিরাপদ নয়।

হজের সময় মসজিদুল হারামে যাওয়া, তাওয়াফ করা এবং বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের জন্য প্রচুর হাঁটতে হয়। পায়ের ব্যথার কারণে আমি নিয়মিত প্যারাসিটামল খেয়েছিলাম। মক্কায় ঠান্ডা পানীয় না খেলেও মিনায় যাওয়ার পর আমার জ্বর, গলাব্যথা ও কাশি শুরু হয়। অসুস্থতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় পরে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিল।

মক্কার মিসফালা এলাকায় বাংলাদেশ হজ মন্ত্রণালয়ের একটি মেডিকেল ক্লিনিক ছিল। সেখানে কয়েকজন চিকিৎসক ও একটি ফার্মেসি ছিল। হাজীদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হতো। ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনা আমার কাছে প্রশংসনীয় মনে হয়েছে।

মক্কায় পৌঁছানোর দুদিন পর অসুস্থ বোধ করলে আমি সেখানে যাই। রিসেপশনে বাংলাদেশি পরিচয়পত্র দেখিয়ে টিকিট নিয়ে অপেক্ষা করি। রোগীর সংখ্যা বেশি হলেও সবাইকে সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়াতে দেখেছি। অল্প সময়ের মধ্যেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ফার্মেসি থেকে ওষুধ পাই। এ উদ্যোগের জন্য বাংলাদেশ হজ মন্ত্রণালয় প্রশংসার দাবিদার।

হজের দিনগুলোর জন্য ব্যাগ

মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় যাতায়াতের জন্য মাঝারি আকারের একটি ব্যাকপ্যাক যথেষ্ট। বড় ট্রলি ব্যাগ নেওয়া এড়িয়ে চলাই ভালো। ব্যাকপ্যাক পিঠে নিয়ে জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করতে যাওয়া সহজ, কিন্তু বড় ট্রলি ব্যাগ নিয়ে চলাফেরা করা বেশ অসুবিধাজনক।

মসজিদুল হারামে নামাজ পড়তে যাওয়া ও তাওয়াফের সময় জায়নামাজ, পানির বোতল, ছাতা ও স্যান্ডেল বহনের জন্য ছোট স্ট্রিং ব্যাগও কাজে আসে।

জেদ্দায় পৌঁছানোর পর মোয়াল্লেম আমাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট জমা নিয়ে নিয়েছিলেন। অস্ট্রেলীয় পাসপোর্ট আমি হোটেলের সুটকেসে তালাবদ্ধ করে রেখেছিলাম। হোটেলের কক্ষ নিরাপদ মনে হয়েছিল এবং সেখানে মূল্যবান জিনিস রাখার জন্য সেফও ছিল। তবে পাসপোর্ট সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নিজের নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কপি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।

দীর্ঘ সময় বসার জন্য ফোল্ডেবল ম্যাট

মসজিদুল হারামে পছন্দমতো জায়গায় নামাজ পড়তে হলে কখনো কখনো এক-দুই ঘণ্টা আগেই যেতে হয়। ফলে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয়। আমার কোমরব্যথা থাকায় দীর্ঘক্ষণ মেঝেতে বসে থাকা বেশ কষ্টকর ছিল।

এ কারণে পিঠে ঠেস দেওয়ার সুবিধাসহ একটি ফোল্ডেবল প্রেয়ার ম্যাট আমার খুব কাজে লেগেছিল। মক্কার বিভিন্ন দোকানে ২০ থেকে ২৫ রিয়ালের মধ্যে এ ধরনের ম্যাট পাওয়া যায়। কেউ কেউ ছোট ফোল্ডিং চেয়ারও ব্যবহার করেন। কোমর বা পিঠের সমস্যায় যাঁরা ভোগেন, তাঁদের জন্য এমন ব্যবস্থা উপকারী হতে পারে। মদিনার মসজিদে নববীতেও বসার জন্য বিভিন্ন স্থানে ফোল্ডিং চেয়ার রাখা ছিল।

অর্থ ও ব্যাংক কার্ড

অস্ট্রেলিয়া থেকে যাওয়ার সময় আমি প্রায় ৪ হাজার সৌদি রিয়াল নগদ নিয়েছিলাম। কেনাকাটা ও বাইরে খাওয়াদাওয়ার জন্য নগদ অর্থ বেশ কাজে লেগেছে। কার্ড ব্যবহারে কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চার্জ দিতে হতে পারে, তাই নিজের ব্যাংকের নিয়ম আগে থেকে জেনে নেওয়া ভালো।

আমি Wise International Debit Card-ও সঙ্গে নিয়েছিলাম। এটি দিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ উত্তোলন ও কেনাকাটা করা যায়। তবে বিনিময় হার, উত্তোলন ফি ও অন্যান্য চার্জ কার্ডের শর্ত অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। ভ্রমণের আগে সেগুলো যাচাই করা উচিত।

ম্যাট, বালিশ ও সিম কার্ড

মুজদালিফায় রাত কাটানোর জন্য একটি পাতলা ম্যাট, চাদর ও এয়ার পিলো কাজে লাগতে পারে। মক্কার দোকানগুলোতে এসব জিনিস পাওয়া যায়। চাদরটি মিনার তাঁবুতেও ব্যবহার করা যায়।

মক্কার হোটেলে পৌঁছে লাগেজ রাখার পর স্থানীয় সিম কার্ড কেনা সুবিধাজনক। হোটেলের আশপাশে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের সিম বিক্রির দোকান থাকে। সৌদি আরবে STC, Mobily ও Zain বহুল ব্যবহৃত অপারেটর। নেটওয়ার্ক কভারেজ, ডেটা প্যাকেজ ও মূল্য তুলনা করে সিম নির্বাচন করা উচিত।

আরও কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস

ব্যাগ: বিমান ও বাসে চলাচলের সময় টাকা, পাসপোর্ট এবং জরুরি কাগজপত্র বহনের জন্য কোমরের ব্যাগের তুলনায় কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ আমার কাছে বেশি সুবিধাজনক মনে হয়েছে।

ডিজিটাল স্কেল: লাগেজের ওজন মাপার জন্য ছোট ডিজিটাল স্কেল কাজে লাগে।

স্যান্ডেল: আমি দুই ধরনের স্যান্ডেল নিয়েছিলাম, একটি সাধারণ থং এবং অন্যটি নন-স্লিপ আউটডোর স্যান্ডেল।

পাওয়ার ব্যাংক: হজের ব্যস্ত দিনগুলোতে মোবাইল ফোনে চার্জ দেওয়ার জন্য পাওয়ার ব্যাংক প্রয়োজন হতে পারে। ১০,০০০ mAh ক্ষমতার একটি পাওয়ার ব্যাংক আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয়েছে। তবে বিমানযাত্রায় পাওয়ার ব্যাংক বহনের নিয়ম আগে থেকে জেনে নিতে হবে।

মিনার তাঁবুতে চার্জ দেওয়ার জন্য সীমিতসংখ্যক বৈদ্যুতিক সংযোগ ছিল। অনেকে মাল্টিপ্লাগ ব্যবহার করতেন, তবে নিরাপত্তা ও ক্যাম্পের নিয়ম মেনে চলা জরুরি। হোটেলে ব্যবহারের জন্য একটি উপযুক্ত কনভার্টার প্লাগও কাজে লাগে।

শুকনো খাবার: অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রচুর খাবার নেওয়ার প্রয়োজন নেই। স্থানীয় সুপারমার্কেট থেকেও প্রয়োজনীয় খাবার কেনা যায়। তবে কিছু মিউজলি বার বা হালকা শুকনো খাবার সঙ্গে রাখা সুবিধাজনক হতে পারে।

এসব জিনিসের অনেক কিছু অনলাইনে কেনা যায়। আমি কিছু জিনিস Temu থেকে কিনেছিলাম এবং আমার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয়নি।

উপহার ও জমজমের পানি

দেশে ফেরার সময় পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের জন্য উপহার কেনা হজযাত্রীদের একটি পরিচিত অভ্যাস। আমার অভিজ্ঞতায়, মক্কায় কাপড়চোপড় ও বোরকার বৈচিত্র্য বেশি ছিল। কেনাকাটার সুযোগও তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে, খেজুর কেনার জন্য মদিনা ভালো জায়গা বলে মনে হয়েছে।

জেদ্দা বিমানবন্দরে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী জমজমের পানি কেনার ব্যবস্থা ছিল। ২০২৪ সালে জনপ্রতি ১২ রিয়ালে পাঁচ লিটারের একটি বোতল কেনার সুযোগ পেয়েছিলাম। জমজমের পানি ও লাগেজ বহনের নিয়ম সময়ভেদে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই ফেরার আগে এয়ারলাইনস ও বিমানবন্দরের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা উচিত।

অস্ট্রেলিয়ায় ফেরার সময় খেজুর নিয়ে ইমিগ্রেশনে আমার তেমন সমস্যা হয়নি। তবে খাদ্যপণ্য আনার ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার বায়োসিকিউরিটি বিধি মানা জরুরি। প্রয়োজন হলে পণ্য ঘোষণা করতে হবে।

১০. ২০২৪ সালের হজে এত মানুষের মৃত্যু কেন?

২০২৪ সালের হজে প্রচণ্ড গরমের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। এই মর্মান্তিক ঘটনা বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু আবহাওয়ার দিকে তাকালেই হবে না; হজযাত্রীর সংখ্যা, নিবন্ধনব্যবস্থা, পরিবহন, পানির সরবরাহ, চিকিৎসাসেবা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রচণ্ড গরম ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি

সৌদি আরবে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকে। জুন মাসে গড় তাপমাত্রা ২৯ থেকে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে এবং কোনো কোনো দিনে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে। রাতেও তাপমাত্রা অনেক সময় ৩০ ডিগ্রির নিচে নামে না।

ইসলামি বর্ষপঞ্জি চান্দ্র মাসভিত্তিক হওয়ায় হজের সময় প্রতি বছর ইংরেজি ক্যালেন্ডারে প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন করে এগিয়ে আসে। ফলে কয়েক বছর পর হজের সময় গ্রীষ্মের তীব্র গরম থেকে তুলনামূলক শীতল সময়ের দিকে সরে যায়। আবার দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে তা গ্রীষ্মকালেও ফিরে আসে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই ভবিষ্যতে হজযাত্রীদের সুরক্ষায় তাপমাত্রার পূর্বাভাস, পর্যাপ্ত পানির সরবরাহ, বিশ্রামের স্থান, ছায়াযুক্ত পথ এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

অতীতের দুর্ঘটনা ও ২০২৪ সালের প্রাণহানি

হজের ইতিহাসে ভিড় ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ১৯৯০ সালে পদদলিত হয়ে সৌদি সরকারের হিসাবে ১,৪৬২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জামারাত এলাকায় পদদলিত হওয়ার ঘটনায় সরকারি হিসাবে ৭৬৮ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়। ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর মসজিদুল হারামের কাছে একটি ক্রেন ভেঙে পড়ে ১১৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

২০২৪ সালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড গরমের কারণে প্রায় ১,৩০০ হজযাত্রীর মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। নিখোঁজ ব্যক্তিদের হিসাব এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিবেদন নিয়ে তখন অনিশ্চয়তাও ছিল।

সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, মৃতদের বড় একটি অংশ অনিবন্ধিত হজযাত্রী ছিলেন। হজের প্যাকেজের উচ্চমূল্য এবং বয়সসহ বিভিন্ন কারণে কেউ কেউ অনুমোদিত প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে হজ পালনের চেষ্টা করেন। কিছু অসাধু ব্যক্তি হজের অনুমতি বা পারমিটের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অনিবন্ধিত হজযাত্রীদের দুর্ভোগ

হজের অনুমতি ছাড়া সৌদি আরবে প্রবেশ করে হজের কার্যক্রমে অংশ নেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নিবন্ধিত হজযাত্রীরা সাধারণত নির্ধারিত তাঁবু, পরিবহন, খাবার ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পান। কিন্তু অনিবন্ধিত ব্যক্তিরা এসব সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

হজের মৌসুমে মিনা ও আরাফাতের তাঁবুতে নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষের থাকার ব্যবস্থা থাকে। অনুমোদিত পরিচয়পত্র না থাকলে এসব স্থানে প্রবেশ করাও কঠিন হতে পারে। ফলে অনিবন্ধিত হজযাত্রীদের অনেককে নিজস্ব উদ্যোগে থাকা, খাওয়াদাওয়া ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হয়।

আরব দেশের কিছু নাগরিক ভাষা ও সংস্কৃতির মিলের কারণে স্থানীয়দের সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারেন। অন্যদিকে, বিদেশি হজযাত্রীরা অনেক সময় ভাষাগত বাধা ও অপরিচিত পরিবেশের কারণে আরও বেশি সমস্যায় পড়েন।

সৌদি সরকার অনিবন্ধিত হজ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। নুসুক কার্ডের মাধ্যমে নিবন্ধিত হজযাত্রীদের পরিচয় যাচাই করা হয়। মক্কায় অবস্থানকালে আমাদেরও একাধিকবার কার্ড পরীক্ষা করা হয়েছিল। জেদ্দা থেকে বাসে মক্কায় যাওয়ার সময়ও বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি করা হয়। আবাসিক ভবনগুলোতেও অভিযান চালানো হয়েছিল বলে জানা যায়।

তবে অনিবন্ধিত হজ বন্ধের উদ্যোগের পাশাপাশি হজের সামগ্রিক ব্যয় ও সুযোগ-সুবিধা নিয়েও ভাবা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত সামর্থ্যবান ও ইচ্ছুক মুসলমানেরা বৈধ প্রক্রিয়ায় হজ পালনের সুযোগ পান।

১০ জিলহজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

২০২৪ সালের হজে ১০ জিলহজ, অর্থাৎ কুরবানির দিনে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বহু হজযাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে সময় তাপমাত্রা ৫১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

মুজদালিফা থেকে জামারাত এবং জামারাত থেকে মিনায় ফেরার পথে মৃত্যুর বিভীষিকা ছড়িয়ে পড়েছিল। মিনা ও আরাফাতের ক্যাম্পে পানি সরবরাহ থাকলেও দীর্ঘ পথ চলার সময় পর্যাপ্ত পানির অভাব ছিল বলে হজযাত্রীদের কাছ থেকে শুনেছি। প্রচণ্ড রোদে দীর্ঘক্ষণ হাঁটা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং শারীরিক ক্লান্তি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল।

আমাদের মোয়াল্লেম ১০ জিলহজ বড় জামারাতে পাথর নিক্ষেপের পর আমাদের মক্কার হোটেলে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং রাতে আবার মিনার ক্যাম্পে ফিরিয়ে এনেছিলেন। প্রথমে তাঁর এই সিদ্ধান্তে কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন হয়েছিলাম। কিন্তু পরে ১০ জিলহজের প্রাণহানির খবর জানতে পেরে বুঝতে পারি, তাঁর সিদ্ধান্তটি আমাদের জন্য কতটা উপকারী হয়েছিল।

আরাফাত থেকে মুজদালিফার দূরত্ব আনুমানিক আট কিলোমিটার, মুজদালিফা থেকে মিনার দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এবং মিনা থেকে জামারাতের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। তবে তাঁবুর অবস্থান ও নির্ধারিত চলাচলের পথ অনুযায়ী প্রকৃত দূরত্ব কমবেশি হতে পারে।

যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত পরিবহন না থাকলে হজযাত্রীদের প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। হায়দরাবাদের এক হজযাত্রী আমাকে জানিয়েছিলেন, তিনি প্রায় ৪০ কিলোমিটার হেঁটেছিলেন। আমার মোবাইলের স্টেপ কাউন্টারেও সেদিন প্রায় ২৫ কিলোমিটার হাঁটার হিসাব উঠেছিল। আমাদের আরাফাত থেকে মিনার ক্যাম্প পর্যন্ত বাসের ব্যবস্থা থাকায় তুলনামূলকভাবে কম হাঁটতে হয়েছিল।

জামারাতের পথে পানি, ছায়া ও চিকিৎসার সংকট

আরাফাতে অবস্থানের পর মুজদালিফায় রাত কাটিয়ে ফজরের নামাজের পর হজযাত্রীরা জামারাতের দিকে রওনা হন। দিনের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। দীর্ঘ পথে পর্যাপ্ত পানি, ছায়া ও বিশ্রামের সুযোগ না থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

আমার অভিজ্ঞতায়, জামারাতের দিকে যাওয়ার পথে কিছু স্থানে পানি ও বিশ্রামের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত মনে হয়নি। কোথাও কোথাও পানি ছিটানো হলেও তা প্রচণ্ড গরম থেকে যথেষ্ট স্বস্তি দিতে পারেনি। জামারাতে পৌঁছানোর জন্য অনেক হজযাত্রীকে ওপরের তলায় উঠতে হয়েছিল। দীর্ঘ পথ, সিঁড়ি বা ঢাল বেয়ে ওঠা এবং ভিড়ের মধ্যে চলাচল তাঁদের ক্লান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তৃতীয় দিনে পাথর নিক্ষেপের জন্য আমাদেরও তিনতলায় যেতে হয়েছিল। একপর্যায়ে আমার স্ত্রী ক্লান্তি ও অবসাদে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি ও হাইড্রালাইট থাকায় আমরা পরিস্থিতি সামলে পাথর নিক্ষেপ সম্পন্ন করতে পেরেছিলাম।

আমাদের ক্যাম্পে ফিরে অন্য হজযাত্রীদের মুখে পানির অভাবে মানুষের কষ্টের কথা শুনেছি। কেউ কেউ রাস্তার পাশে মানুষকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন। এসব অভিজ্ঞতা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা

হজের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ভিড় সামলাতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে দেখেছি। তবে কিছু ক্ষেত্রে এসব ব্যবস্থার প্রয়োগ হজযাত্রীদের জন্য বাড়তি দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছিল বলে আমার মনে হয়েছে।

কোনো কোনো স্থানে হঠাৎ ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ায় মানুষকে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হয়েছে। ক্লান্ত বা অসুস্থ হজযাত্রীরা বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ চাইলেও সব সময় তা পাননি। কিছু জায়গায় নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণও কঠোর মনে হয়েছে।

অসুস্থ মানুষের তুলনায় প্যারামেডিক ও অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা পর্যাপ্ত ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জরুরি সহায়তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে বলে কয়েকজন হজযাত্রীর কাছ থেকে শুনেছি। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে হিটস্ট্রোক ও অন্যান্য গুরুতর অসুস্থতা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

হজের মতো আন্তর্জাতিক ধর্মীয় সমাবেশে জরুরি চিকিৎসা, দ্রুত উদ্ধার, বিশ্রামের জায়গা এবং পানি সরবরাহের ব্যবস্থা আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।

ভাষাগত বাধা ও পথ হারানোর সমস্যা

হজে বিশ্বের বহু দেশের মানুষ অংশ নেন। তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা ভিন্ন। অথচ এত বড় আন্তর্জাতিক সমাবেশে দিকনির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সবাই সব ভাষায় দক্ষ হবেন, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তবে অন্তত প্রয়োজনীয় কয়েকটি আন্তর্জাতিক ভাষায় নির্দেশনা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

জামারাত থেকে ক্যাম্পে ফেরার সময় অনেককে পথ হারিয়ে ফেলতে দেখেছি। কাতারে বসবাসকারী আমার এক বাংলাদেশি বন্ধু, যিনি আরবিতে দক্ষ, তিনিও মিনার ক্যাম্প খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েছিলেন। পুলিশের কাছে সাহায্য চাইলে তিনি কার্যকর দিকনির্দেশনা পাননি বলে জানান।

সৌদি সরকার হজের ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে আমার মনে হয়েছে। বহুভাষিক নির্দেশনা, সহজে বোঝা যায় এমন মানচিত্র, ডিজিটাল পথনির্দেশনা এবং প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা বাড়ানো গেলে অনেক সমস্যা কমানো সম্ভব।

একজন বিধবার হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা

জামারাত এলাকায় এক কানাডীয় বাংলাদেশি নারী হজযাত্রীর কাছ থেকে তাঁর স্বামীর মৃত্যুর ঘটনা শুনে শিউরে উঠেছিলাম।

জামারাতে যাওয়ার পথে তাঁর স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি স্বামীর হুইলচেয়ার ঠেলে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে জামারাতে পৌঁছান। একপর্যায়ে হুইলচেয়ারটি পাশে রেখে পাথর নিক্ষেপ করতে যান। ফিরে এসে দেখেন, স্বামী সেখানে নেই।

তিনি দিশেহারা হয়ে চারদিকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে পুলিশ স্টেশনে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তাঁর স্বামী মারা গেছেন। তাঁকে মৃত্যুসনদও দেওয়া হয়। কিন্তু কোথায় তাঁর স্বামীকে দাফন করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট তথ্য পাননি বলে ওই নারী আমাকে জানান।

প্রিয়জনকে হারানোর শোকের সঙ্গে শেষবারের মতো তাঁর কবরের অবস্থান জানার অনিশ্চয়তা একজন মানুষের জন্য কতটা অসহনীয় হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

ঘটনাটি শুনে আমার মনে হয়েছিল, হজের মতো পবিত্র সফরে একজন মানুষের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মৃত্যুর পর তাঁর পরিচয় এবং দাফনসংক্রান্ত তথ্য পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

হজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব

হজযাত্রীরা বিপুল অর্থ ব্যয় করে এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে যান। তাঁদের নিরাপত্তা, যাতায়াত, আবাসন, পানি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হজ ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

হজ পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করা মানুষের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও সমবেদনা রয়েছে। কিন্তু একজন হজযাত্রীর মৃত্যু যদি প্রতিরোধযোগ্য অবহেলা, অপর্যাপ্ত চিকিৎসা কিংবা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে ঘটে, তাহলে সেই বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। নিবন্ধিত কিংবা অনিবন্ধিত—যে পরিচয়েরই হজযাত্রী হোন না কেন, মানবিক সহায়তা ও জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার তাঁর রয়েছে।

সৌদি আরবের উচিত প্রতিবছরের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা এবং পরবর্তী হজের আগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। হজযাত্রীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসেবার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

হজযাত্রীর সংখ্যা ও কোটার সংকট

২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত হজযাত্রীর সংখ্যার সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১২ সালে রেকর্ডসংখ্যক মানুষ হজ পালন করেছিলেন। সে বছর হজযাত্রীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩১ লাখ ৬১ হাজার। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ২০২০ সালে এই সংখ্যা নেমে এসেছিল প্রায় এক হাজারে। এরপর আবার সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ২০২৪ সালে প্রায় ১৮ লাখেরও বেশি মানুষ হজ পালন করেন।

বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ হজে অংশ নেন। অন্যদিকে, উচ্চমূল্যের কারণে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দকৃত কোটা পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও বিভিন্ন আরব দেশ থেকে হজে যেতে ইচ্ছুক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে হজের কোটা নির্ধারণের পাশাপাশি প্যাকেজের মূল্য, নিবন্ধনের সুযোগ এবং হজযাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। চাহিদা ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে সমন্বয় করা গেলে আরও বেশি মানুষ বৈধভাবে হজ পালনের সুযোগ পেতে পারেন।

 

হজযাত্রীদের সহায়তায় স্বেচ্ছাসেবক

হজের সময় হজযাত্রীদের পথ দেখানো, চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের নিজস্ব কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক দল থাকে। আমার অভিজ্ঞতায়, ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তা হজযাত্রীদের সহায়তায় সৌদি আরবে যান। তাঁদের বিশেষ পোশাক দেখে সহজেই চেনা যায়। মিনা ক্যাম্পেও বিভিন্ন দেশের এমন সহায়তাকারীদের দেখেছি।

তবে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের পাশে সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করছেন, এমন কর্মকর্তা বা স্বেচ্ছাসেবক আমার চোখে খুব একটা পড়েনি।

সৌদি কর্তৃপক্ষ চাইলে বিভিন্ন মুসলিম দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে বহুভাষিক স্বেচ্ছাসেবক দল গড়ে তুলতে পারে। তাঁরা পথনির্দেশনা, জরুরি যোগাযোগ, বয়স্ক ও অসুস্থ হজযাত্রীদের সহায়তা এবং হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের খুঁজে পেতে ভূমিকা রাখতে পারেন।

এ ধরনের উদ্যোগ হজের সার্বিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে সাহায্য করবে বলে আমার বিশ্বাস।

১১. হজের আধ্যাত্মিক শিক্ষা: এক অন্য পৃথিবীর সন্ধান

দীর্ঘদিন ধরেই হজে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছি, পরিকল্পনা করেছি, মনে মনে প্রস্তুতি নিয়েছি। কিন্তু নানা কারণে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে সময় লেগেছে। অবশেষে ২০২৪ সালে মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার জীবনে সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্তটি এসেছিল, হজ পালনের সৌভাগ্য হয়েছিল। এর আগে উমরা পালনের সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু সত্যি বলতে কী, হজে অংশ না নিলে হজের ব্যাপ্তি, এর গভীরতা, এর ত্যাগ-তিতিক্ষা আর আধ্যাত্মিক মহিমার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করা অনেকটাই অসম্ভব। বই পড়ে, অন্যের অভিজ্ঞতা শুনে কিংবা ছবি-ভিডিও দেখে হজ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়; কিন্তু কোটি মানুষের সেই মহামিলনে নিজেকে শামিল না করলে এর অন্তর্নিহিত অনুভূতিটুকু যেন অধরাই থেকে যায়।

মক্কায় পৌঁছানোর পর প্রথম কয়েকটি দিন কেটেছিল এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে। মনে হতো, যেন পৃথিবীর পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোনো গ্রহে, অন্য কোনো জগতে এসে পড়েছি। চারপাশে মানুষের ঢল, অগণিত মানুষের পদচারণা, মুখে আল্লাহর জিকির, ঠোঁটে দোয়া, চোখে অশ্রু আর হৃদয়ে এক গভীর আকুলতা। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ ভাষা আলাদা, গায়ের রং আলাদা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও জীবনযাপন আলাদা; অথচ সবার গন্তব্য এক, সবার আরাধ্য এক, সবার প্রার্থনা সেই মহান স্রষ্টার কাছে। জাতি, বর্ণ, ভাষা, দেশ কিংবা আর্থিক অবস্থানের সব ব্যবধান যেন মুহূর্তেই তুচ্ছ হয়ে যায়। মনে হয়, মানবজাতির প্রকৃত পরিচয় তো এটাই, আমরা সবাই মানুষ, সবাই একই স্রষ্টার সৃষ্টি।

আর কা’বা শরিফ! প্রথমবার কিংবা প্রতিবারই তার দিকে তাকালে মনের ভেতর যে অনুভূতির জন্ম হয়, তা বর্ণনা করা কঠিন। চোখের সামনে কা’বা, চারপাশে অসংখ্য মানুষ তাওয়াফ করছেন, কেউ কাঁদছেন, কেউ হাত তুলে দোয়া করছেন, কেউ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছেন পবিত্র ঘরের দিকে। মনে হয়, প্রত্যেকের হৃদয়ে জমে আছে কত না বলা কথা, কত অনুশোচনা, কত আকুতি, কত অপূর্ণ স্বপ্ন আর কত প্রার্থনা! কেউ এসেছেন নিজের গুনাহের ক্ষমা চাইতে, কেউ প্রিয়জনের সুস্থতা ও মঙ্গল কামনায়, কেউ জীবনের দুঃখ-বেদনা থেকে মুক্তির আশায়। আবার কেউ হয়তো কেবল নিজের স্রষ্টার কাছে ফিরে এসে অন্তরের শান্তি খুঁজছেন। সেই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ক্ষুদ্রতা অনুভব না করে উপায় থাকে না। মনে হয়, মানুষের জীবনে অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ আর আত্মগরিমারই বা কতটুকু মূল্য!

মক্কার দিনগুলোতে আরও একটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। মনে হয়েছিল, মানুষের মধ্যে ভালো কাজ করার যেন এক নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। সবাই ছুটছেন কা’বার পানে, চেষ্টা করছেন যত বেশি সম্ভব ইবাদত করতে, সাদাকা দিতে, নেকি অর্জন করতে। কারও যেন অন্যদিকে তাকানোর অবকাশ নেই। অনেকে উদার হাতে দান-খয়রাত করছেন। কেউ জায়নামাজ কিনে মানুষের মধ্যে বিতরণ করছেন, কেউ খাবার বিলিয়ে দিচ্ছেন, কেউ ফোল্ডিং চেয়ার কিনে বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের সুবিধার জন্য দিচ্ছেন, কেউ আবার বোতলজাত পানি কিনে ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত হাজিদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। ছোট ছোট এসব কাজের মধ্যেও যে কত বড় মানবিকতা লুকিয়ে আছে, তা সেখানে গিয়ে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি।

সবচেয়ে ভালো লেগেছিল মানুষের প্রতি মানুষের সহজাত মমতা ও সহমর্মিতার কিছু দৃশ্য দেখে। বাসে ওঠার সময় দেখেছি, অনেকে নিজের আগে অন্যকে ওঠার সুযোগ করে দিচ্ছেন। নিজে একটু অপেক্ষা করেও অন্যের সুবিধার কথা ভাবছেন। কারও বয়স বেশি, কেউ হাঁটতে কষ্ট পাচ্ছেন, কেউ ক্লান্তিতে অবসন্ন, তাঁদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে অনেকেই দ্বিধা করছেন না। অপরিচিত মানুষও যেন মুহূর্তের মধ্যে আপন হয়ে উঠছেন। কেউ কাউকে চেনেন না, জানেন না তাঁর নাম কিংবা পরিচয়; তবু বিপদে-আপদে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে পাশে দাঁড়াচ্ছেন। এমন দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে, মানুষের ভেতরের সুপ্ত মানবিকতাকে জাগিয়ে তোলার এক অসাধারণ পরিবেশ তৈরি হয় হজের পবিত্র ভূমিতে।

তখন বারবার মনে হয়েছে, আহা! পৃথিবীটা যদি চিরকাল এমন থাকত! যদি মানুষ প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে অন্য মানুষের জন্য এভাবে ভাবতে পারত! যদি আমাদের সমাজে একটু জায়গা ছেড়ে দেওয়া, একটু অপেক্ষা করা, অন্যের কষ্ট বোঝা কিংবা বিপদে পাশে দাঁড়ানোকে দুর্বলতা নয়, বরং মহত্ত্ব বলে বিবেচনা করা হতো! যদি আমরা নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দিতে শিখতাম, তাহলে পৃথিবীটা কত সুন্দর হতে পারত! হজের সেই দিনগুলো আমাকে যেন নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে, মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার সম্পদে, পদমর্যাদায় কিংবা বাহ্যিক পরিচয়ে নয়; বরং তার আচরণে, সহমর্মিতায়, বিনয়ে এবং অন্যের জন্য কিছু করার মানসিকতায়।

তবে বাস্তবতার আরেকটি দিকও চোখ এড়ায়নি। সব জায়গায়, সব সময় এই সৌহার্দ্য ও সংযম বজায় থাকতে দেখিনি। প্রচণ্ড ভিড়, দীর্ঘ অপেক্ষা, শারীরিক ক্লান্তি, গরম আর মানসিক চাপের মধ্যে কিছু মানুষকে ধৈর্য হারাতে দেখেছি। বিশেষ করে তাওয়াফের সময় কখনো কখনো এমন আচরণ চোখে পড়েছে, যা সত্যিই কষ্ট দিয়েছে। কেউ কেউ সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ধাক্কাধাক্কি করছেন, অন্যের চলার পথ আটকে দিচ্ছেন, এমনকি সামান্য বিষয়েও তর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। পবিত্র ইবাদতের মুহূর্তে এমন দৃশ্য দেখে মনে প্রশ্ন জেগেছে, আমরা কি কখনো ভেবে দেখি, যে ইবাদত করতে গিয়ে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাইছি, সেই ইবাদতের পথেই যেন অন্য কারও কষ্টের কারণ হয়ে উঠছি না?

অবশ্যই হজের সময় প্রচণ্ড ভিড় ও প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলানো সহজ নয়। লাখ লাখ মানুষের একসঙ্গে চলাচলের মধ্যে ধৈর্য ধরে থাকা, নিজের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্যের অসুবিধার কথা বিবেচনা করা সত্যিই কঠিন। কিন্তু সেই কঠিন পরিস্থিতিই তো আমাদের ধৈর্য, সহনশীলতা ও আত্মসংযমের পরীক্ষা। হজ কেবল নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করার নাম নয়; এর ভেতরে রয়েছে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার শিক্ষা, নিজের অহংকারকে বিসর্জন দেওয়ার শিক্ষা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করার শিক্ষা। নিজের সুবিধার জন্য অন্যকে ধাক্কা দেওয়া, সামান্য কারণে উত্তেজিত হওয়া কিংবা তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়া, এসব আচরণ আমাদের সেই শিক্ষার কতটা কাছাকাছি নিয়ে যায়, তা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।

আমার মনে হয়েছে, তাওয়াফের সময় আমরা যদি আরও একটু ধৈর্যশীল হতে পারতাম, অন্যের প্রতি একটু বেশি সহনশীলতা দেখাতে পারতাম, তাহলে এই পবিত্র ইবাদত সবার জন্য আরও স্বস্তিকর ও প্রশান্তিময় হয়ে উঠত। মনে রাখতে হবে, আমাদের পাশের মানুষটিও আমার মতোই একজন হাজি। তিনিও হয়তো বহু বছরের স্বপ্ন, দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, অগণিত ত্যাগ আর বুকভরা আকুতি নিয়ে পবিত্র ভূমিতে এসেছেন। তিনিও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে, তাঁর রহমত পেতে এবং জীবনের ভুলত্রুটি থেকে মুক্তি পেতে এসেছেন। তাহলে তাঁর কষ্টের কারণ হয়ে আমি কীভাবে নিজের ইবাদতের পূর্ণতা খুঁজব? অন্যকে কষ্ট না দেওয়া, অসহায়কে সাহায্য করা, দুর্বলকে সুযোগ করে দেওয়া এবং উত্তেজনার মুহূর্তেও নিজেকে সংযত রাখা—এসবও তো ইবাদতের চেতনারই অংশ।

হজের প্রকৃত শিক্ষা আমার কাছে তাই শুধু কা’বা শরিফের চারপাশে তাওয়াফ করা কিংবা নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হজের শিক্ষা হলো ত্যাগ স্বীকার করা, নিজের আগে অন্যের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া, মানুষের সেবা করা, ধৈর্য ধারণ করা, ক্ষমা করতে শেখা এবং অহংকার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করা। হজের সাদা পোশাক যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীর বাহ্যিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান, সম্পদ ও ক্ষমতার পার্থক্য একদিন মুছে যাবে। শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একই স্রষ্টার সামনে দাঁড়াব। সেই উপলব্ধি যদি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আচরণ ও চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটাতে না পারে, তবে হজের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কতটা শিক্ষা নিতে পারলাম, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

হজ থেকে ফিরে এসে আমার মনে হয়েছে, পবিত্র ভূমিতে অর্জিত অনুভূতি ও শিক্ষা শুধু স্মৃতির পাতায় ধরে রাখার বিষয় নয়; সেগুলোকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশে ফিরে পরিবার, প্রতিবেশী, সহকর্মী কিংবা সমাজের অন্য মানুষের সঙ্গে আচরণে যদি আরও একটু বিনয়ী হতে পারি, কারও বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারি, কারও অধিকার ক্ষুণ্ন করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারি, তাহলে হয়তো হজের সেই শিক্ষা আমাদের জীবনে সত্যিকার অর্থে প্রতিফলিত হবে। কারণ হজের সৌন্দর্য কেবল পবিত্র ভূমিতে অবস্থান করার মধ্যে নয়; সেই ভূমি থেকে ফিরে এসে আমরা কতটা ভালো মানুষ হতে পারলাম, তার মধ্যেও এর সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়।

আজও মক্কার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে হৃদয় আবেগে ভরে ওঠে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে কা’বা শরিফ, অসংখ্য মানুষের তাওয়াফ, চারপাশে প্রতিধ্বনিত দোয়া ও জিকির, আর অপরিচিত মানুষের প্রতি অপরিচিত মানুষের নিঃস্বার্থ সহমর্মিতা। মনে পড়ে, কত মানুষ নিজের আরাম বিসর্জন দিয়ে অন্যের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছেন। আবার কিছু মুহূর্ত মনে করিয়ে দেয়, আমাদের আরও অনেক কিছু শেখার বাকি আছে—বিশেষ করে ধৈর্য, সংযম, বিনয় এবং অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে।

হজের সেই অভিজ্ঞতা আমাকে বারবার ভাবায়, আমরা যদি পবিত্র ভূমিতে শেখা ভালোবাসা, সহমর্মিতা, ত্যাগ ও মানবিকতার শিক্ষা নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারি, তাহলে শুধু আমাদের ব্যক্তিগত জীবনই নয়, আমাদের পরিবার, সমাজ এবং পৃথিবীও আরও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।

মহান আল্লাহর কাছে আমার একান্ত প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের সবাইকে হজের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করার, এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা জীবনে ধারণ করার এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে চলার তৌফিক দান করেন। আমিন।