কাতার স্টিল এবং সার কারখানা কাফকোতে চাকরী নিয়ে সত্তর দশকের প্রথম দিকে বেশ কিছু বাংলাদেশি প্রকৌশলী কাতার আসেন। চট্টগ্রামের ইস্পাত কারখানার আদলে নির্মিত হয় কাতার স্টিল, যেখানে শুরুতে প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মচারী ছিলেন বাংলাদেশী। যদিও এখন তা পাঁচ শতাংশে নেমে এসছে। এর বাইরে কিছু প্রকৌশলী ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বেসরকারী খাতে চাকুরী নিয়ে কাতার পাড়ি জমান।

সত্তর দশকের শেষের দিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ফন্টাসে বেশ কিছু সংখ্যক বাংলাদেশি প্রকৌশলী নিয়োগ পান। এরপর ধীরে ধীরে কাতারের অবকাঠামো এবং জ্বালানী খাতে ব্যাপক উন্নয়ন শুরু হলে বিভিন্ন সরকারী মন্ত্রাণালয়, পেট্রোলিয়াম সংস্থা, কন্সালটিং ও কন্ট্রাক্টিং কোম্পানীতে প্রকৌশলীদের চাহিদা বাড়তে থাকে। তখন দেশ এবং প্রবাসে কর্মরত বহু বাংলাদেশি প্রকৌশলী চাকুরী নিয়ে কাতারে আসতে থাকেন।

কাতারের প্রকৌশলীদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকলে সবাইকে সংগঠিত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। অবশেষে ১৯৯৩ সালে কাতারে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ার্সের প্রথম প্রবাসী শাখা আইইবি কাতার চ্যাপ্টার প্রতিষ্ঠিত হয়।

২০০৮ সালে কাতার আসার পর থেকে আমি আইইবি কাতার চ্যাপ্টারের অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নেই। আইইবি হল একটি পেশাদার সংগঠন। সামাজিক কল্যানের পাশাপাশি যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে প্রকৌশলীদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সেমিনার, ওয়ার্কসপ ও ট্রেনিং-এর আয়োজন করা। ভারতীয় এবং অস্ট্রেলিয়ান প্রকৌশলীদের সংগঠন প্রতি মাসেই একটি করে বিভিন্ন প্রযুক্তি ও কারিগরী বিষয়ের উপর সেমিনার আয়োজন করে থাকে। কিন্তু বছর শেষে ইঞ্জিনিয়ার্স ডের অনুষ্ঠানে একটি সেমিনার ছাড়া প্রায় সব অনুষ্ঠানই ছিল মূলত সামাজিক মিলন মেলা।

কাতারে ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২২ জন্য নির্মানখাতে যে কর্মযজ্ঞ শুরু হয় তাতে অংশ নিতে দক্ষিণ এশিয়া ছাড়া উন্নত দেশগুলো থেকেও অভিজ্ঞ প্রকৌলীর দল কাতারে আসতে শুরু করে। পিএমপি, সিইঞ্জ, পিইি, লিড্স ইত্যাদির মত সার্টিফিকেশন না থাকায় আমাদের অপেক্ষাকৃত তরুন প্রকৌশলীরা যাতে কর্মক্ষেেত্র ওদের সাথে যাতে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে পারে সেজন্য আইঅইবি কাতার চ্যাপ্টারের সক্রিয় সহযোগীতার প্রয়োজন দেখতে পাই। একটা সময় ছিল যখন আইইবি কাতারে সদস্য সংখা ছিল মাত্র ৪০-৬০ জন। তখন চাহিদা ছিল ভিন্ন। কিন্তু পরবর্তীতে কাতাওে করিতকর্মা ও মেধাবী তরুন প্রকৌশলীর সংখ্যা বহুগুনে বেড়ে যায়। তারা আইইবির প্রচলিত কর্মকান্ডে সনতুষ্ট ছিলনা। তারা চাইছিল পরিবর্তন। এজন্য অনেকেই আমাকে আইইবি কাতার চ্যাপ্টার পরিচালনার সাথে সংযুক্ত হতে অনুরোধ করে। যার ফলশ্রুতিতে ২০১৫ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই চার বছর আইইবি কাতার চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান হিসাবে কাজ করার সুযোগ পাই।

চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার নেয়ার পর সামাজিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি সিইঞ্জ, পিএমপি, সিভি মেকিং ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে আমরা নিয়মিত টেকনিক্যাল সেমিনারের আয়োজন করা শুরু করি। সেমিনারা নিয়ে প্রকৌশলীদের মধ্যে প্রচুর উৎসাহ ও উদ্বীপনা দেখতে পাই।

ইতিমধ্যে কাতারে কর্মরত সব প্রকৌশলীদের কাতার পৌরসভা মন্ত্রণালয়ের সাথে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়। নিবন্ধন করার জন্য প্রকৌশলীদের একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। সঠিক তথ্য এবং প্রস্তুতি না থাকায় প্রকৌশলীদের জন্য পরীক্ষার জন্য দরখাস্ত জমা দেয়া, ডিগ্রী মূল্যায়ন করা এবং সর্বোপরি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্য আমরা কাতার চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে প্রকৌশলীদের জন্য একটি গাইডলাইন তৈরী কওে সেমিনারের আয়োজন করি। এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে হাজারেরও বেশী স্যাম্পল প্রশ্নপত্র যোগাড় করে প্রকৌশলীদের ব্যবহারের জন্য অর্ন্তজালে আপলোড করি। আমাদের গাইডলাইন ব্যবহার এবং প্রশ্নপত্র সমাধান করে অনেক প্রকৌশলী প্রথমবারেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে সমর্থ হয়। বলাবাহুল্য শুধু বাংলাদেশী নয়, কাতারের অন্যান্য দেশের প্রকৌশলীরাও এত উপকৃত হয়।

প্রকৌশলীদের সাথে ডিজিটাল মাধ্যমে যোগাযোগের জন্য আমরা কাতার চ্যাপ্টারের ওয়েবপেজ উন্নয়ন সহ প্রথমবারের মত কাতার চ্যাপ্টারের ফেসবুক খোলা হয়। এছাড়া চ্যাপ্টারের সব প্রকৌশলী সদস্যের জন্য আইডি কার্ডও সরবরাহ করা হয়। কাতার চ্যাপ্টারে এ ধরণের নতুন নতুন উদ্যোগ বিশ্বের অন্যান্য প্রবাসী চ্যাপ্টারগুলোকে দিকনির্দেশনা প্রদান করে। অবশেষে আমাদের কাজের স্বীকৃতি সরূপ চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত আইইবির ৫৭তম কনভেনশনে আইইবি কাতার চ্যাপ্টার প্রবাসী ১০টি চ্যাপ্টারের মধ্যে ২০১৭ সালের সেরা চ্যাপ্টার হবার গৌরব অর্জন করে।

সময়ের সাথে বদলে যাচ্ছে কর্মক্ষেত্র ও প্রকৌশলীদের চাহিদা। তাই অতীতের প্রচলিত ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে কাতার আইইবি চ্যাপ্টারকে সময়ের সাথে তাল রেখে যুগোপযোগী নতুন নতুন কর্মসূচী হাতে নিতে হবে। একক সিদ্ধান্তে না গিয়ে কার্যকরী পরিষদের মতামত নিয়ে গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংগঠন পরিচালনা করতে হবে। চ্যাপ্টারের সংখ্যা গরিষ্ঠ সদস্য বিশেষ করে তরুন এবং অপেক্ষাকৃত কমবয়স্ক সদস্যদের চাহিদা কি তা জানার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে এই সংগঠন প্রকৌশলীদের কাছে এক সময় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে।