হোটেলের পর্ব যাতে তাড়াতাড়ি শেষ করা যায়, সে জন্য বাসা খুঁজতে শুরু করলাম। কোম্পানির সহকর্মীরা বেশ কয়েকটি রিয়েল এস্টেট এজেন্টর নাম দিলো এবং The Gulf Times, The Peninsula ইত্যাদির মতো স্থানীয় পত্রিকায় বাড়িভাড়ার বিজ্ঞাপন খুঁজতে বললো। এ ছাড়া দোহার একটি বিশেষ ওয়েবসাইটেও বেশ কিছু বিজ্ঞাপন দেখতে পেলাম। তবে পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে আমার নাভিশ্বাস ওঠার মতো অবস্থা। ফার্নিচার সজ্জিত ছোট্ট এক বেডরুম ফ্ল্যাটের ভাড়া হচ্ছে মাসে ছয় হাজার রিয়াল! যা সিডনির তুলনায় অবিশ্বাসই বলা চলে। এগুলোকে অনেকটা Studio Type Apartment বলা যায়। ছোট একটি বেডরুম, সঙ্গে একটি বাথরুম ও নামে মাত্র একটি রান্নাঘর। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ, পানি ও ইন্টারনেট বাড়িভাড়ার মধ্যে থাকে। কিন্ত এমন বাড়ির সংখ্যা খুবই কম। আমি রান্নাঘরসহ বাড়ি খুঁজছিলাম, যাতে সব সময় হোটেলে না খেয়ে বাসায় টুকটাক রান্নাও করা যায়।

কাতারে যে বিষয়টি আমার কাছে অন্যায্য মনে হয়েছে তা হলো, ভাড়ার চুক্তি করার সময় কমপক্ষে এক বছরের বাড়িভাড়ার আগাম চেক দিতে হয়। আর বাড়িতে ওঠার পর রক্ষণাবেক্ষণের সব দায় ভাড়াটের ওপরই বর্তায়। বাড়িওয়ালাকে তখন খুঁজে পাওয়া যায় না। ভাড়াটের কোনো ধরনের অধিকার নেই বললেই চলে। মনে হয়, মালিক যেন অনেকটা দয়াপরবশ হয়ে আমাদের বাড়িভাড়া দিয়েছেন। কোনো কিছু নষ্ট হলে কিংবা ভেঙে গেলে তাতে ভাড়াটের কোনো ত্র“টি না থাকলেও নিজের পয়সা দিয়ে তা ঠিক করে নিতে হয়। বাড়ি ছাড়ার আগে ঘরের দেয়াল রং করার জন্য টাকাটাও বাড়িভাড়া থেকে কেটে নেওয়া হয়। এমন অসমীচীন নিয়মে যে রিয়েল স্টেট ব্যবসা চলে, তা আগে জানা ছিলো না।

দোহার বাসাভাড়া আকাশ ছুঁয়েছে তা খুব বেশি দিনের কথা নয়। এই তো মাত্র তিন-চার বছর আগেও সুইমিং পুলসহ বিশাল ভিলা মাত্র দুই হাজার রিয়ালে পাওয়া যেতো। এ ছাড়া বোনাস হিসেবে থাকতো প্রথম দুই-তিন মাসের ভাড়া মওকুফসহ বিনা মূল্যে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ইত্যাদি। এগুলো এখন কল্পলোকের কাহিনির মতো দোহার প্রবাসী বাঙালিদের মুখে মুখে শোনা যায়। আর এই কথা বলার সময় কখনো তাদের বুক দিয়ে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস!

তবে রকেটের মতো বাড়িভাড়া বাড়ার মূল কারণ হিসেবে দোহায় ২০০৬ সালে আয়োজিত এশিয়ান গেমসকেই দায়ী করা হচ্ছে। এশিয়ান গেমসের অবকাঠামো গড়ার জন্য এবং বিদেশি অতিথিদের চোখে দোহার শহুরে চাকচিক্য বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রায় পাঁচ হাজার হাজার পুরোনো ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভেঙে ফেলা হয়। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে ভাড়া বাড়িঘরের বিশাল চাহিদার সৃষ্টি হয়। সরকারের বাড়িভাড়া-সংক্রান্ত সুষ্ঠু কোনো নীতিমালা না থাকায় এই চাহিদাকে কাজে লাগায় সুযোগসন্ধানী রিয়েল এস্টেট এজেন্ট, দালাল ও মালিক গোষ্ঠী।

সত্যি বলতে কি, অধিকাংশ কাতারি অনেকটা Easy going type। প্রতি মাসে ভাড়া পেলে বা আয়ের টাকা হাতে এলেই তারা খুশি। কিন্তু রিয়েল এস্টেট এজেন্টের দল তাদের ইতিমধ্যে বেশ চতুর বানিয়ে ফেলেছে। অধিক মুনাফা লাভের জন্য এজেন্টের পরামর্শে মালিকপক্ষ অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দিয়েছে বাড়িভাড়া। ফলে মধ্যম থেকে নিম্ন আয়ের মানুষের এখন দুর্ভোগের শেষ নেই। অনেকে তাঁদের পরিবারকে দেশে পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন আর ফিরে গেছেন শেয়ার একোমোডেশনে। এ ছাড়া যে কোনো গত্যন্তরও নেই।

বলে রাখা ভালো, এখানকার প্রবাসীদের অধিকাংশই হলেন শ্রমিক অথবা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত নিম্ন আয়ের কর্মজীবী। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের জৌলুশের চাকা কিন্তু ঘুরছে এই সব ঘামে ভেজা মানুষের শ্রম দিয়ে। এদের অনেকের মাসিক বেতন হলো মাত্র ৫০০ রিয়াল। এখন একটি রুম ভাড়া হলো তিন হাজার রিয়ালের মতো। এক রুমে আটজন থাকলেও খাবার ও অন্যান্য খরচ বাদ দিলে ভাবতেই কষ্ট হয় কীভাবে কাটছে এদের দিন।

যে রঙিন আশা চোখে নিয়ে এরা মধ্যপ্রাচ্য পাড়ি দিয়েছিলো, অনেকের ক্ষেত্রে সেটা এখন ভয়াল দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ব্যাপারটা অনেক দেরিতে বুঝতে পেরে সরকার নিয়ম বেঁধে দেয় এই বলে যে, বছরে ১০ শতাংশের বেশি ভাড়া বাড়ানো যাবে না। কিন্তু যা হওয়ার সে তো হয়েই গেছে।

দোহার রিয়েল এস্টেট সেক্টর এখনো উন্নত বিশে^র মতো হয়নি। তবে দ্রুত এগোচ্ছে। অধিকাংশ রিয়েল এস্টেট ব্যবসা ভারতীয় ও মিসরি আরবদের হাতে। এই খাতে পিছিয়ে আছে বাঙালিরা। তবে ব্রিটিশ ও পশ্চিমা বিশে^র রিয়েল এস্টেট পরিচালনাধীন কিছু অফিসও রয়েছে। এরা মূলত বড় বড় কোম্পানির চাহিদা পূরণ করছে।

অনেক সময় কাতারি মালিকেরা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন না। দালালদের সঙ্গে রয়েছে কাতারি বাড়িমালিকদের যোগাযোগ। দালালদের মাধ্যমে তাঁরা বাড়ি ভাড়া দেন। এ জন্য দালালদেরও টাকা দিতে হয়। কাতারপ্রবাসী অনেকেই এখন টুকটাক রিয়েল স্টেট ব্যবসা শুরু করেছেন। কাতারি মালিক থেকে বড় বড় ভিলা ভাড়া নিয়ে, বাড়ির ভেতরটা ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করে অন্যদের ভাড়া দিচ্ছেন। কর্তৃপক্ষের কোপানলে পড়ার ঝুঁকি থাকলেও এই ব্যবসা করে অনেকে কিছু বাড়তি আয় করছেন।

কাতারে আসার আগে সিডনির আরব কমিউনিটি, বিশেষ করে কিছু লেবানিজ অস্ট্রেলিয়ানদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ দেখে আমার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে একটি অতিশয় বিরূপ ধারণা জন্ম নিয়েছিলো। এ জন্য কাতারে আসার পর আমাকে নিয়ে আমার পরিবার বেশ উদ্বিগ্ন ছিলো। তাই আমার বন্ধুদের কোনো পরিচিত কেউ কাতারে আছেন কি না তা আমার স্ত্রী খোঁজখবর নিতে লাগলো, যাতে নতুন দেশে গিয়ে প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে পারি।

আমার সিডনির এক বন্ধু তাঁর পরিচিত একজনের টেলিফোন নাম্বার দিলেন। শিক্ষিত মানুষ, কাতারে ভালো অবস্থানে আছেন। তিনি নাকি আগে আমার মতো অস্ট্রেলিয়ায় থাকতেন। দেরি না করে পরামর্শ নেওয়ার জন্য সেই ভদ্রলোককে টেলিফোন করে বললাম, ‘আমি থাকার জন্য বাসা খুঁজছি, কী করা যায় একটু বলবেন কি?’ সিডনি থেকে এসেছি, ভাবলাম শুনে হয়তো তিনি উচ্ছ্বসিত হবেন, অস্ট্রেলিয়ার কিছু ভালো-মন্দ খোঁজখবর নেবেন। কিন্তু তাঁর কথাবার্তায় তেমন কোনো উত্তাপ খুঁজে পেলাম না, ‘এই আপদটা আবার কোত্থেকে জুটলো’ এমন একটা ভাব। তিনি কোম্পানির বাসায় থাকেন, তাই এ সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা নেই। হয়তো তা-ই। বিষয়টা আসলে আমাকে বাসা খুঁজে দেওয়া নয়, আমার মতো আগন্তুকের কাছে একজন বাঙালির সহমর্মিতা, একটু সহানুভূতি মরুর দেশে একপশলা বৃষ্টির মতো হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দিতে পারতো। ওই ভদ্রলোকের নিস্পৃহ ভাব দেখে দমে গেলাম।

এর পরদিনই সিডনি থেকে টেলিফোন পেলাম আমার একজন খুব কাছের মানুষের। ছোট ভাইয়ের মতো সম্পর্ক। ও বললো, তার এক জিগরি দোস্ত কাতারে থাকে, আমি যেন অবশ্যই তার সঙ্গে যোগযোগ করি। কাতারের প্রবাসী বাংলাদেশির সঙ্গে প্রথম অভিজ্ঞতার পর আবারও কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো তেমন উৎসাহ পেলাম না।

মাতৃভূমি ছেড়ে নতুন দেশে জীবন শুরু করাটা আমার জন্য এই প্রথম নয়। প্রায় দুই দশক আগে ক্যাঙ্গারুর দেশ অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসী হয়ে শূন্য থেকেই শুরু করেছিলাম জীবন। তখন আমার ছিলো না চাকরি কিংবা পরিবার।

যা-ই হোক, কদিন পর ওই ভদ্রলোককে টেলিফোন করলাম। ওনার নাম শামীম। এমবিএ করা, ভালো কোম্পানিতে কাজ করছেন। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে পরিবার নিয়ে আছেন কাতারে।

টেলিফোন করতেই তাঁর কণ্ঠস্বরে শুনতে পেলাম আগের ভদ্রলোকের চেয়ে ভিন্ন একধরনের আবেগ ও সহানুভূতির সুর। তিনি আমাকে বললেন, ‘আমি অফিস থেকে আপনাকে তুলে নিয়ে যাবো, তখন কথা হবে।’ ঠিক সন্ধ্যায় আমার অফিসের সামনে তিনি হাজির হলেন গাড়ি নিয়ে। সরাসরি বাসায় নিয়ে গেলেন। বাড়ি যাওয়ার পথেই তিনি মোটামুটি কাতারের পরিস্থিতি সম্পর্কে একটা ধারণা দিয়ে দিলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি আমাকে আপন করে নিলেন।

শামীমের বাড়ি গিয়ে দেখি টেবিলে খাবারের আয়োজন। পরিবারের সঙ্গে পরিচয় হলো। দুই সন্তানের সুখী পরিবার। মুখে নিরন্তর হাসি ঝুলিয়ে রেখে ছোটাছুুটি করছেন গৃহিণী ভাবি। সিডনি ছেড়ে আসার পর এই প্রথম একটি বাংলাদেশি পরিবারের সান্নিধ্যে এসে মনটা জুড়িয়ে গেলো।

অফিসের দেওয়া হোটেলে আর বেশি দিন থাকা যাবে না। তাই থাকার জন্য বাসস্থান খুঁজতে আটঘাট বেঁধে মাঠে নামলাম। তবে কেন জানি না, মনের গহিনে একধরনের ক্লান্তি আর অবসাদ অনুভব করছিলাম। মনে পড়ে যাচ্ছিলো ২০ বছর আগেকার সিডনির সেই দিনগুলোর কথা, মাত্র দুটো ব্যাগ আর কিছু ডলার নিয়ে যখন পাড়ি জমিয়েছিলাম সিডনির অচেনা বন্দরে। ছিলো না চাকরি, মাথা গোঁজার মতো ঠাঁই, সামনে ছিলো অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তবুও সিডনির অসংখ্য অভিবাসীদের ভিড়ে নিজেকে অবাঞ্ছিত মনে হয়নি কখনো। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও বারবার রোমাঞ্চিত হয়েছে মন অজানা এক অভিযানের সহযাত্রী হওয়ার আশায়। কিন্তু কাতারে এসে আবারও শূন্য থেকে শুরু করার মতো তেমন স্পৃহা পাচ্ছিলাম না।

যা-ই হোক, অনেক খোঁজাখুঁজির পর একজন কাতারি রিয়েল এস্টেট এজেন্টের মাধ্যমে রান্নাঘরসহ একটা স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট পেলাম, আমার অফিসের খুব কাছাকছি নাজমা (نجمة) এলাকায়। ভাড়া মাসে ছয় হাজার রিয়াল। পানি ও বিদ্যুতের খরচ আমাকে বহন করতে হবে। তবে কাতারি এজেন্ট মুচকি হেসে এ-ও বললেন, বোনাস হিসেবে তিনি আমার বডি ম্যাসাজের ব্যবস্থা করে দেবেন। শুনে কী বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না।

কাতারে অধিকাংশ ভাড়া বাড়ি কমপক্ষে এক বছরের চুক্তিতে নিতে হয়। আর বাড়িওয়ালাকে প্রথম দিনই এক মাসের অগ্রিম ভাড়া ও সমমানের সিকিউরিটি ডিপোজিটসহ বাকি বছরের ভাড়া বাবদ ১১টি প্রি-পেইড ব্যাংক চেক দিতে হয়, যা শুনে আমি তো বিস্ময়ে হতবাক! এ যে বাড়ির মালিকের কাছে দাসখত দেওয়ারই শামিল! ব্যাংকে সবেমাত্র অ্যাকাউন্ট খুলেছি, চেকবই হাতে আসেনি, চেক দেবো কোত্থেকে? ছয় হাজার রিয়াল আগ্রিম দেওয়ার পর দুই দিনের মধ্যে চেক দেওয়ার প্রতিশ্র“তি দিলে আমাকে বাসা দিতে রাজি হলো।

একদিন ভোরে আল নাখিল হোটেল থেকে নতুন বাসায় উঠলাম। জিনিসপত্র বাসায় রেখে অফিসে এলাম। অফিসে আসতেই কেরালার একজন কলিগ বললো, তার পরিবার এখন দেশে, তাই এক মাসের জন্য ওর বাসায় থাকা যাবে আর মাসে দুই হাজার রিয়াল দিলেই চলবে। আমি বললাম, এখন তো আর সম্ভব নয়। কারণ, আমি ইতিমধ্যে অন্য বাসায় উঠে পড়েছি।

রাতে নতুন বাসায় গিয়ে বিছানাপত্র গোছালাম। কিন্তু রাত বাড়তেই মনে হলো বুকের মধ্যে হঠাৎ করে আবার চাড়া দিয়ে উঠছে সেই পুরোনো ব্যথা, যা আমাকে কুঁকড়ে দিয়েছিলো দোহায় আসার ঠিক পরপরই আল নাখিল হোটেলের কক্ষে। যে কষ্টটা গত কদিন ব্যস্ততার আড়ালে ঢাকা পড়েছিলো, তা যেন এই অ্যাপার্টমেন্টের নির্জনতায় আবার আমার বুকটাকে ফালা ফালা করে দিতে চাইলো।

অনেক চেষ্টা করেও সারা রাত চোখের দুই পাতা এক করতে পারিনি। বুঝতে পারলাম, এখনো একা থাকার সময় আমার হয়নি। তখনই ঠিক করলাম, এখানে আর এক মুহূর্ত নয়।

পরদিন রিয়েল এস্টেট এজেন্টকে জানালাম। শুনে সে তো অবাক! বিশ^াস করতে পারছিলো না। বুঝে উঠতে পারছিলো না আমার সমস্যাটা কোথায়! সে বললো, আমার দেওয়া এক মাসের অগ্রিম ভাড়া আর ফেরত দেওয়া হবে না। আমি বললাম, রাজি।

অবশেষে অনেক দেন-দরবারের পর ২ হাজার ৫০০ রিয়াল বাদে বাকি টাকা ফেরত পেলাম। এজেন্টের সঙ্গে দফারফা শেষ করে অফিসে এসেই কেরালার সহকর্মীকে বললাম, ‘ভাই, তোমার বাসায় কি ঠাঁই হবে?’ সে বললো, ঠিক আছে। সেই রাতেই সাঁজির বাসায় গিয়ে উঠলাম। আমার সহকর্মী, আইটি বিভাগের প্রধান, সাঁজি শান্ত গোছের মানুষ। মুখে সব সময় মৃদু হাসি নিয়ে চলে। দোহায় সাঁজির পাঁচ বছর চলছে।

সাঁজির বাসা আল-মনসুরা (المنصورة) এলাকায়। আল-মনসুরা আমার অফিস ও দোহা এয়ারপোর্ট থেকে বেশ কাছে। ১০ মিনিটের ড্রাইভ। আর হেঁটে গেলে ২০ থেকে ৩০ মিনিট, যা আমার কাছে সিডনির তুলনায় যেন স্বর্গ হাতে পাওয়ার মতো। সিডনিতে কেবল অফিসে যাওয়া-আসাতেই আমার ব্যয় হতো প্রায় তিন ঘণ্টা। আর ট্রেন লেট করলে তো কথাই নেই। তাই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, অফিস থেকে আর দূরে থাকা নয়।

আল-মনসুরা মূলত একটি আবাসিক এলাকা, যেখানে রয়েছে প্রচুর বহুতল আবাসিক ভবন। অনেক বাঙালি থাকেন এখানে। তবে আল-মনসুরায় মসজিদের সংখ্যা সত্যিই চোখে পড়ার মতো। প্রধান সড়কের কিছুদূর পরপরই একটি করে মসজিদ। নামাজের সময় মাইকে যখন সব কটা মসজিদে একসঙ্গে আজান শুরু হয়, তখন মনে হয় যেন ঢাকা কিংবা চাটগাঁয় আছি।

এই আল-মনসুরায় রয়েছে বিশাল ফার্নিচার মার্কেট (সুক আল হারেজ), যা মোটামুটি বাঙালি ব্যবসায়ীদের দখলে। দোহার ফার্নিচার ব্যবসায় বাঙালিদের রয়েছে একচেটিয়া আধিপত্য। ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই চট্টগ্রামের অধিবাসী। মার্কেটে ঢুকলেই প্রায় প্রতিটি দোকানে, রাস্তায় শোনা যাবে বাংলা কথা। এ ছাড়া রাস্তায় রয়েছে মালামাল পরিবহনের জন্য গাড়ির সারি। এগুলোও প্রায় সব বাঙালিদের। ভাড়া নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন গাড়িচালকেরা।

কাতারিরা সাধারণত প্রতিবছরের রমজান মাসে, অর্থাৎ ঈদের আগে ঘরের ফার্নিচার বদল করে থাকে। ফলে রোজার মাসে চলে ফার্নিচারের রমরমা ব্যবসা। এই ফার্নিচার ব্যবসা করে সামান্য কর্মচারী বা কার্পেন্টার থেকে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন দোহার অনেক বাঙালি। সপ্তাহে তিন দিন আবার এই মার্কেটেই বসে পুরোনো ব্যবহৃত জিনিসপত্র বেচাকেনার হাট, যা ঢাকার বঙ্গবাজার কিংবা সিডনির সানডে মার্কেটের সঙ্গে তুলনা করা চলে।

এই মার্কেটে কাপড়চোপড় থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিকস, ঘরের আসবাবপত্র, খেলনা, এমনকি সুই-সুতাও পাওয়া যায়। আমি সময় কাটাতে প্রায়ই এখানে আসি আর ধূমায়িত চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ঘুরেফিরে দেখি। সহকর্মী সাঁজিকে সঙ্গে নিয়ে দোহা শহরকে মোটামুটি চষে ফেললাম। সময় যাচ্ছিলো দ্রুত। সাঁজির পরিবার ছুুটি কাটিয়ে ফিরে আসার সময় হয়ে গেলো।

এর মধ্যে কাতার এয়ারওয়েজে কর্মরত একজন বাঙালি পাইলটের দেখা পেলাম। জানতে পারলাম, কাতার এয়ারওয়েজে অনেক বাঙালি সিনিয়র ও জুনিয়র পাইলট হিসেবে কর্মরত আছেন। তবে যে হারে বাংলাদেশি পাইলটের দল এখানে আসছে, মনে হচ্ছে কিছুদিন পর বাংলাদেশের বিমানবহরগুলোকে অটো পাইলট মুডেই চলতে হবে।

হাতে সময় নেই। কদিনের মধ্যেই সাঁজির বাসা ছাড়তে হবে। তবে সেই সিনিয়র পাইলট সাহেব একটি ফার্নিশড অ্যাপার্টমেন্টের খোঁজ দিলেন, যেখানে তিনিও থাকেন। বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেটসহ ভাড়া মাসে চার হাজার রিয়াল। তবে কোনো রান্নাঘর নেই। আপত্তি করলাম না। কারণ, ঘরটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, এখানে থাকা যায়। ইতিমধ্যে যেসব বাসা দেখেছি সেগুলো দেখে মনে হয়েছে থাকার যোগ্য নয়। এগুলোকে Executive Bachelors Accommodation বলা হয়। কোনো স্থায়ী কন্ট্রাক্ট নেই, মাসে মাসে ভাড়া দিলেই হবে। হোক সে বাঙালি কি ভিনদেশি, একজন অপরিচিত লোকের সঙ্গে সবকিছু মানিয়ে নিয়ে একই বাড়িতে থাকাটা আমার জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার হবে। তাই শেয়ার একোমোডেশনের চিন্তা বাদ দিলাম।

ওই ফ্ল্যাটে সঙ্গে সঙ্গেই উঠে পড়লাম। ধন্যবাদ দিলাম আল্লাহকে আমার পরিবার আসার আগ পর্যন্ত একটা ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার জন্য।

আগস্ট, ২০০৮