‘আমায় ডেকো না, ফেরানো যাবে না, ফেরারী পাখিরা কুলায় ফেরে না’…। কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী লাকী আখন্দ পাড়ি জমিয়েছেন এক অচিন দেশে, যেখান থেকে তিনি আমাদের ডাকে আর কখনো ফিরে আসবেন না। লাকী আখন্দ যেন আমাদের সঙ্গীত ভুবনে ফেরারী হয়ে এসছিলেন ক্ষনিকের তরে। সঙ্গীতের অমিয় ধারায় আমাদের সিক্ত করে আবার পাড়ি জমালেন অজানায়।
লাকী আখন্দের সুরারোপিত গানের সংখ্যা দেড় হাজারের মতো। তিনি কাজ করেছেন কম কিন্তু তাঁর সৃষ্টিগুলো ছিল কালজয়ী। প্রতিভাবানদের ক্ষেত্রে মনে হয় এমনই হয়ে থাকে। কারণ, ভালো কাজের পরিমাপ সংখ্যায় নয়, হয় গুণে। একটি বিরল ব্যাপার হচ্ছে লাকী আখন্দ তাঁর সৃষ্টি দিয়ে সেই সত্তর দশক থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজন্মের সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছেন। যা খুব কম শিল্পীরাই পেরেছেন। আজ একুশ শতকের প্রান্তে এসেও তাঁর গানের জনপ্রিয়তায় একবিন্দু ভাটা পড়েনি।
লাকী আখন্দ একজন মিউজিক জিনিয়াস। বাংলা আধুনিক গানের পট পরিবর্তন হয় লাকী আখন্দের করা এই নীল মনিহার গানটি দিয়ে। সত্তর দশকে পপ ও ব্যান্ড সঙ্গীতে মেলোডীর সূচনা করে আজকের পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য লাকী আখন্দের ব্যাতিক্রমী সুর ছিল অনুপ্রেরণার বাতিঘর। সুরকার হিসাবে লাকী আখন্দের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বহুমুখিতা। আধুুনিক, পপ্, সেমি-ক্ল্যাসিকাল, আধ্যাত্মিক, চলচ্চিত্র—যে কোনো ধারার গান রচনায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত এবং অতুলনীয়। নিয়াজ মহাম্মদ চৌধুরীর কন্ঠে ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’ গানটি হল তার অসাধারণ সৃজনশীলতার একটি সামান্য আভাস মাত্র।
সত্তর দশকের শেষের দিকে জনপ্রিয় ব্যান্ড সোলসের জন্য আমার লেখা কিছু গান প্রচুর জনপ্রিয়তা পায়। ওই সময় লাকী ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ঢাকার এক কনসার্টে। তিনি আমাকে আশীর্বাদ করে আরো গান লিখে যেতে বললেন। এরপর দেশের সীমানা ছাড়িয়ে প্রবাস পাড়ি দেয়ার পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু দীর্ঘ তিন যুগ পর আমার প্রথম অডিও অ্যালাবাম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে লাকী ভাইয়ের কাছে আবার ফিরে আসি। আমার অ্যালবামে লাকী ভাইয়ের সুরের ম্যাজিক থাকবে না তা কি হয়?
২০১৫ সালের জুনের এক সন্ধ্যায় ঢাকার রাস্তার জ্যাম ঠেলে হাজির হলাম লাকী ভাইয়ের আর্মানিটোলার ফ্ল্যাটে। তিনি বিল্ডিংয়ের তিন তলায় থাকতেন। সযত্নে চা, বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। অতঃপর তাঁর মিউজিক রুমে নিয়ে গেলেন। ঘরের এককোনায় স্তূপকৃত পুরোনো মিউজিক্যাল ইন্ট্রুমেন্টস। পাশেই টেবিলে রয়েছে কিবোর্ড ও ল্যাপটপ। প্রিয় কিবোর্ড থেকে কাপড় সরিয়ে নিয়ে আমাকে বেশ ক’টা নতুন কম্পোজিশন শোনালেন। আমার এলবামের জন্য দু’টো গান দিলেন, ‘মিথ্যে অভিমানে’ আর অ্যালবামের শিরোনাম সঙ্গীত ‘তোমার জন্য’।
লাকী আখন্দ হলেন একজন পারফেকশনিস্ট। সুরকাররা গানের ডামি ভার্সন নিয়ে ততটা সময় ব্যায় করেন না। কিন্তু লাকী আখন্দ হলেন এর ব্যাতিক্রম। তিনি আমার গান দু’টো কিবোর্ডে কম্পোজিশন করে ল্যাপটপে মিউজিক এডিটর সফ্টওয়্যার কিউবেজ দিয়ে নিজের গলার রেকর্ড করে দিলেন। যা দেখে আমি রীতিমত বিস্মিত হলাম। শুধু তাই নয়, তিনি বললেন, ‘এবার স্টুডিওতে গিয়ে তোমার নিজের গলায় রেকর্ড করে দেখবো সুরটা গলায় ঠিকমতো বসছে কিনা।’ এরপর তিনি আমাকে নিজের গাড়িতে করে নিয়ে রওনা দিলেন মিউজিক স্টুডিওর দিকে।
পথে অনেক কথাই হল লাকী ভাইয়ের সাথে। বেশ হাসিখুশি ছিলেন, ঘন ঘন সিগারেট ফুঁকছিলেন। তিনি মন খুলে বললেন অনেক প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তির কথা। দিলেন অনেক অজানা তথ্য। তিনি বললেন, ভারতের প্রখ্যাত সুরকার বাপ্পি লাহড়ী তাঁকে মুম্বাইর চলচ্চিত্রে কাজ করার জন্য ডেকেছিলেন। কিন্তু তাঁর মুম্বাই যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। তখন কি জানতাম যে এটাই হবে আমাদের শেষ দেখা? তাঁর একজন একজন অন্ধভক্ত হিসাবে আমি অনুযোগ করে বললাম, ‘লাকী ভাই, বিধাতা আপানকে যে অসামান্য মেধা দিয়েছে তার প্রতি আপনি সুবিচার করেননি। আপনার কাছে আমাদের চাওয়া অনেক।’ লাকী ভাই মুচকি হেসে প্রশ্নটি এড়িয়ে গেলেন। বিরল মেধাবীরা মনে হয় এমনি হয়। তাঁরা সৃষ্টির নেশায় এমন করে মেতে থাকেন যে নিজেকে গুছিয়ে রাখার ব্যাপারে তাঁরা থাকেন উদাসীন।
লাকী আখন্দের গানগুলো অন্তর্জালে, ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করে আয় করছেন অনেকেই। কিন্তু তার সিকি ভাগও পাচ্ছেন না লাকী আখন্দ। উল্লেখ্য, লাকী আখন্দের সব জনপ্রিয় গানগুলো মূলত নিজের জন্য করা। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে শিল্পীরা তাঁর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে গানগুলো নিজেদের কন্ঠে ধারণ করেছেন। পরবর্তীতে গানগুলো তুমুল জনপ্রিয়তা পেলেও আর্থিক হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে লাকী আখন্দ বরাবর রয়ে গেছেন আড়ালে। একটি ওয়েজপেজ করে নিজের সুর করা গানগুলো আপলোড করার পরামর্শ দিলে তিনি খুব আগ্রহ দেখালেন। বললেন, ‘এ নিয়ে তোমার সাথে পরে কথা বলব।’ কিন্তু সেই কথা আর আমাকে বলা হয়নি তাঁর। এর ঠিক তিন মাস পর সেপ্টেম্বরে তাঁর ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ে। মাত্র কিছুদিন আগে যে সুস্থ মানুষটাকে দেখে আসলাম, তাঁর ভেতরটা কর্কট ব্যাধির তীব্র কামড়ে এমন করে তছনছ হবে তা বিশ্বাস করতে মন চাইছিলো না।
আমার এলবামের জন্য সুর করা লাকী ভাইয়ের গান দুটো হয়তো একক এলবামের জন্য করা তাঁর সুরারোপিত শেষ গান। আমার এলবামের কাজটি করার ছয় মাসের মধ্যেই তিনি পরপারে পাড়ি জমান। আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান যে এই এলবামের সুবাদে লাকী আখন্দের নামের সাথে গায়ক হিসাবে আমার নামটাও জুড়ে থাকবে। আমার এলবামের জন্য গীতিকার বাকিউল আলম বেশ কয়েকটা গান লিখে লাকী ভাইকে দেন। অনেকগুলো গানের মধ্যে ‘মিথ্যে অভিমানে’ গানটি তিনিই বেছে নেন যার কথা ছিল, ‘অভিমান ভাঙে যদি কখনো তোমার, পথ আর থাকবে কি ফিরে আসবার’। কেন জানি না আজ মনে হচ্ছে, এই গানের মধ্য দিয়ে অভিমান করে আমাদের মাঝে ফিরে না আসবার কথাই যেন তিনি বলে গেলেন।
লাকী আখন্দ, আপনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন। আপনি হয়তো আর ফিরবেন না, কিন্তু আপনার কালজয়ী সুরের মূর্চ্ছনায় আপনাকে খুঁজে পাবে সবাই নীলিমা থেকে অন্তরীক্ষে।
