আইয়ুব বাচ্চুর কনসার্ট মানেই হাউজফুল, সে হোক বিশাল মিলনায়তন, স্টেডিয়াম কিংবা উন্মুক্ত ময়দান। তাঁর শৈল্পিক আঙ্গুলের ছোঁয়ায় রূপালী গিটার ছড়াতো সুরের ইন্দ্রজাল। হ্যামিলনের বংশীবাদকের বাঁশীর সুরের মত আইয়ুব বাচ্চুর যাদুকরী গিটারের টানে তাঁর কনসার্টে ছুটে যেত লক্ষ তরুণ ও যুবক।
আইয়ুব বাচ্চুর প্রয়াণের পর তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম শহরের রাস্তায় যেরকম সব বয়সের, সব শ্রেণীর জনতার শোকার্ত ঢল নেমেছিল, তা দেখে মনে হয়েছে রকস্টার নয়, মানুষ যেন তাদের সবচেয়ে প্রিয় কোনো কিছুকে হারিয়েছে। সুরের যাদুতে বাচ্চু মানুষের আত্মার গভীরে জায়গা করে নিয়েছিল।
পুরো নাম আইয়ুব বাচ্চু, তবে ভক্তদের কাছে ‘এবি’। বয়সে অনুজ আইয়ুব বাচ্চু আমার মতো চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুলের ছাত্র ছিল। স্কুলজীবনে তেমন যোগাযোগ না থাকলেও প্রখ্যাত ব্যান্ড সোলসের একজন প্রাক্তন সদস্য হিসেবে পরবর্তীতে আইয়ুব বাচ্চুর সাথে আমার সখ্যতা গড়ে উঠে। ছোটোবেলা থেকে মা এবং গিটার এ দুটোই ছিল বাচ্চুর সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী। স্কুলজীবনে অন্য সবাই যখন খেলাধুলোয় মত্ত, বাচ্চু তখন গিটারের মধ্যেই ডুবে থাকত।
তবে আইয়ুব বাচ্চুর কিংবদন্তি হয়ে উঠার পথ কুসুমাস্তীর্ন ছিল না। অনেক ঘাম ঝরিয়ে, বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে তবে সফল হয়েছিল এবি। সেই যুগে এখনকার মতো ত্বরিত সাফল্য পাওয়ার কোনো সিঁড়ি ছিল না। ছিল না গানের কোনো রিয়েলিটি শো। টেলিভিশন চ্যানেল ছিল কেবল বিটিভি। এখন ইউটিউব কিংবা ফেসবুকে ভাইরাল হতে পারলে তো কথাই নেই। ওই সময় বিয়ের আসর, গায়ে হলুদ থেকে শুরু করে কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠান ইত্যাদি যেখানেই সুযোগ পেতাম গান করতাম। তারপর রেডিও, টেলিভিশনে অডিশন। আইয়ুব বাচ্চুও এর ব্যাতিক্রম ছিল না।
১৯৭৯ সালের শেষের দিকে সোলসের নেওয়াজ ভাইয়ের হাত ধরে লিড গিটারস্টি হিসাবে সোলস ব্যান্ডে যোগ দেয় আইয়ুব বাচ্চু। এর কিছুদিনের মধ্যে বের হয় সোলসের প্রথম অডিও এলবাম ‘সুপার সোলস’। পুরো দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন তোলে প্রায় প্রতিটি গান। ওই এলবামে আমার লেখা তিনটি গান ছিল- তোরো পুতুলের মতো করে সাজিয়ে, মুখরিত জীবন এবং ভুলে গেছো তুমি। এই এলবামের সংগীতায়োজনে আইয়ুব বাচ্চুর গিটারের অমোঘ ছোঁয়া ছিল।
আশি দশকের শেষের দিকে বাচ্চু সোলস ছেড়ে নিজের ব্যান্ড এলআরবি গড়ে তোলে। আমার মতে এটাই ছিল বাচ্চুর সঙ্গীত জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। খ্যাতির তুঙ্গে থাকা সোলস ছেড়ে যাওয়া চাট্টিখানি কথা ছিল না। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল বাচ্চু। আইয়ুব বাচ্চু শুরুতে ইংরেজি গান গাইতো। জিমি হেন্ড্রিক্স, জিম্মি পেজ, রিচি ব্ল্যাকমোরের গিটারের বাজনায় অনুপ্রেরণা খুঁজতো। বাচ্চু বাংলা মেলোডির সাথে ওয়েস্টার্ন ও রক মিউজিকের ফিউসন করে একটা নুতন ধারার সৃষ্টি করতে চাইছিল। সোলস না ছাড়লে হয়তো বাচ্চু নিজেকে নতুন করে আবিস্কার করতো পারতো না, বাংলা সঙ্গীতে হয়তো রক ধারার জন্ম হত না।
আইয়ুব বাচ্চুর সোলস ছাড়ার খবর শুনে বিচলিত হয়ে পড়ি। একদিন চট্টগ্রাম নিউমার্কেটে দেখা হতেই বললো, ‘ভাই, সোলস ছেড়ে দিচ্ছি, দোয়া করবেন।’ যাবার সময় কিংবদন্তি গীতিকার জঙ্গী ভাইয়ের লেখা ‘একদিন ঘুমভাঙ্গা শহরে’ গানটিও সোলসের অনুমতি নিয়ে সাথে নিয়ে গেল। আর ঢাকায় গিয়ে শুর করল রক ব্যান্ড ‘এলআরবি’। এই গানটি সোলসের হয়ে বিটিভিতে পারফর্ম করেছিল বাচ্চু। কিন্তু পরবর্তীতে এলঅরবি’র গান হিসাবে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। কাকতলীয়ভাবে ‘একদিন ঘুমভাঙ্গা শহরে’ গানটির কথাতেই যেন লেখা ছিল বাচ্চুর সুপারস্টার হওয়ার পূর্বাভাস। যেমন ঘুমভাঙা শহর চট্টগ্রামে একটি কিশোর ছেলের স্বপ্ন দেখার কথা; অতঃপর সেই স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে সাফল্যের অমরাবতীতে আরোহনের কথা, কিংবদন্তি হয়ে উঠবার কথা।
আইয়ুব বাচ্চুকে এখন সবাই একজন ব্যান্ড ও রকশিল্পী হিসাবেই জানে। কিন্তু ভার্সেটাইলিটি বা বহুমুখিতাই হল আইয়ুব বাচ্চুর সবচেয়ে বড় পরিচয়। সে সব ধারার গান গাইতে পারতো এবং সুরও করতে পারতো। বন্ধু তপন চৌধুরীর প্রথম সলো এলবামের সুরকার এবং সংগীতায়োজক হল আইয়ুব বাচ্চু। তপনের গাওয়া ‘আমার গল্প শুনে কারো চোখে’র মতো কালজয়ী বেদনাবিধুর মেলোডী গানের স্রষ্টা হচ্ছে আইয়ুব বাচ্চুু। নতুন প্রজন্মের অনেকেরই হয়তো একথা জানা নেই।
আইয়ুব বাচ্চুর জীবন থেকে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনেক কিছুই শেখার আছে। সফল এবং কিংবদন্তি হবার কোনো শর্টকাট পথ নেই। মিউজিক ছিল আইয়ুব বাচ্চুর ধ্যানজ্ঞান। ঘন্টার পর ঘন্টার গিটার নিয়ে অনুশীলন করা, বিভিন্ন ধরনের গান শোনা এবং মিউজিক নিয়ে পরিশ্রম করাই ছিল বাচ্চুর কাজ। খ্যাতির শীর্ষে থেকেও কখনো বিশৃংখল জীবনধারায় গা ভাসিয়ে দেয়নি আইয়ুব বাচ্চু। পারিবারিক মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরে শুদ্ধ জীবন যাপন করেছে।
অনুজপ্রতিম হয়েও আইয়ুব বাচ্চুর এই অসময়ে চলে যাওয়াটা আমার মতো অনেককে চমকে দিয়েছে। অনন্তে যাত্রা করলেও আইয়ুব বাচ্চুর অন্যজাগতিক সুর অমর হয়ে থাকবে মানুষের হৃদয় স্পন্দনে, প্রজন্ম থেকে প্রজনমান্তরে। সবশেষে শুধু এটুকুই বলবো, ‘এবি’ – যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।
