বাংলাদেশ এমএইচএম স্কুল এন্ড কলেজ হচ্ছে কাতারের একমাত্র বাংলাদেশি মানে স্বদেশী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের শিক্ষাবোর্ডের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে মিল রেখেই এখানে শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। কাতারস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস পারচালিত এই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে ১৯৭৯ সালে। সেই থেকে অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ স্কুল এন্ড কলেজের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে।
একমাত্র বাংলাদেশী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ স্কুল নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আগ্রহের সীমা নেই। বাংলাদেশ স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন সময় কাতার সরকার এবং অন্যান্য কমিউনিটি আয়োজিত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। এ ছাড়া কাতারের বিভিন্ন আন্তঃস্কুল প্রতিযোগীতায় বিজয়ী হয়ে কমিউনিটির জন্য সাফল্য বয়ে এনেছে এবং আনছে। স্কুলের সাফল্যে তাই সবাই যেমন আন্দোলিত হয়, তেমনি আবার কোনো নেতিবাচক খবর উদ্বেগেরও সৃষ্টি করে। কিছুদিন আগে বেরিয়েছে ২০১৮ সালের মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল। এ বছরের ফলাফল ছিল অনেকটা গত বছরের মতোই। তবে এবার উচ্চ মাধ্যমকি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০১৭ সালের ২২ জন থেকে কমে দুজনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই ফলাফল নিয়ে অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ।
চলতি বছরের প্রথম দিকে বাংলাদেশ স্কুল এন্ড কলেজের পরিচালক হিসাবে লেঃ কমান্ডার (অব.) মোঃ আনোয়ার খোরশেদকে নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস। এট অত্যন্ত জরুরী এবং সময়োচিত পদক্ষেপ বলে মনে করছেন সবাই। কারণ দূতাবাসের আবশ্যকীয় দায়িত্ব পালন করার পর স্কুল পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা দূতাবাসের কর্মকর্তাদের জন্য একটি দূরূহ চ্যালেঞ্জর সমতূল্য।
একজন পেশাদার পরিচালক নিয়োগের পর বাংলাদেশ স্কুলের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট গুণীজনেরা ধারণা করছেন। কিছুদিন আগে নতুন পরিচালকের সঙ্গে স্কুল নিয়ে এক আলাপচারিতায় স্কুলের সমস্যাগুলোকে চিহিৃত করে সেগুলোর সমাধান খুঁজে বের করতে সবার অভিমত শোনার জন্য তার অদম্য আগ্রহ আমাকে আশান্বিত করেছে।
অনেকেরই আক্ষেপ, স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের অভিমত কিংবা অভিযোগ আন্তরিকতার সঙ্গে শোনেন না। স্কুলের বাস নিয়ে একটি ঘটনার কথা আমি জানি। বাংলাদেশ স্কুলের একজন ছাত্র বাড়ী যাবার সময় একবার ভুল বাসে উঠে পড়ে। স্কুল ছুটির পর সময়মতো বাড়ী না আসায় ছাত্রটির বাব-মা চরম উৎকন্ঠিত হয়ে পড়েন। অবশেষে বাবা স্কুলে যেয়ে বিভিন্ন রুটের চালকদের সাঙ্গে কথা বলে শেষ পর্যন্ত ছেলেকে খুঁজে পান। ভুল বাসে চড়ে ছেলেটি বাড়ী যেতে না পেরে অবশেষে আবার স্কুলে ফিরে আসে। ছেলেটির বাবা বিষয়টি স্কুলের কর্তৃপক্ষকে জানালে উল্টো তাঁকে বলা হয়, এতে স্কুল কর্তৃপক্ষের করার কিছুই নেই। তিনি চাইলে ব্যক্তিগত গাড়ীতে করে তাঁর সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পারেন।
শিক্ষার্থীদের নিরপাত্তার ব্যপারে স্কুল কর্তৃপক্ষের এ ধরনের উদাসিনতা সত্যিই বেদনাদায়ক। স্কুলের বাসে তুলে দেবার পর সন্তান নিরাপদে বাড়ী ফিরে আসবে – এটাই হল সব বাবা-মায়ের প্রত্যাশা। একজন কোমলমতি, কিশোরের এমন ভুল হওয়াটা অস্বাবাভিক কিছু নয়। ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে এমন ভুল না করে সেজন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব স্কুল কর্তৃপক্ষের উপরই বর্তায়।
তবে সব সমস্যার জন্য শুধু কর্তৃপক্ষ কিংবা শিক্ষকদের দায়ী করাটাও ঠিক নয়। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সফল করার জন্য অভিভাবকদেরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। যেমন নিয়মিত শিক্ষক-অভিবাবকদের বৈঠকে গিয়ে সন্তানের পড়াশুনার অগ্রগতির খোঁজ নেওয়া, সময়মত স্কুলের বেতন দেয়া ইত্যাদি অভিভাকদের আবশ্যকীয় দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এই কর্তব্য পালনে অবহেলা স্কুলের মান এবং অগ্রগতির অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। জেনে বিস্মিত হয়েছি, কোনো কোনো অভিভাবক জানেনা, তাঁর সন্তান কোনে গ্রেডে পড়ে।
আইনের প্রতি নিষ্ঠাবান ও কর্তব্যপরায়ণ কমিউনিটি হিসাবে কাতারে বাংলাদেশিদের সুনাম রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হল, নিজস্ব কমিউনিটির কোনো কার্যক্রমে সেই একই ধরনের দায়িত্ববোধ কিংবা নিষ্ঠার পরিচয় আমরা দিই না। অফিসে নির্ধারিত সময়ের আগে গিয়ে আমরা হাজির হই, কিন্তু কমিউনিটির কোনো অনুষ্ঠানে নির্ধারিত সময়ের একঘণ্টা পরে যেতেও গড়িমসি করি। এমনকি আমাদের কমিউনিটির পেশাদার সংগঠনের সদস্যদের ইমেইলে কোনো বার্তা দিলে তার কোনো উত্তর দেবার প্রয়োজন মনে করেন না কেই। কিন্তু সেই একই মানুষগুলো অফিসের কোনো ই-মেইলের উত্তরর দিতে ভুলে গেছেন – এমন নজির নেই। কেনো এমন দ্বিচারিতা, জানি না।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা জন্য বিশাল বাজেটের প্রয়োজন। ছাত্রদের বেতন ছাড়া, বাংলাদেশ স্কুল এন্ড কলেজের কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস আছে কিনা আমার জানা। কাতারের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের মিলনায়তন এবং মাঝারি থেকে বড় আকারের কক্ষ, বিভিন্ন কমিউনটির সংগঠনগুলোবে ভাড়া দিয়ে প্রচুর আয় করছে। একটি বড় আকারের স্কুল মিলনায়তন ভাড়া নিতে গেলে ১০-১৫ হাজার রিয়লের মতো খরচ হয়।
বাংলাদেশ স্কুলের মঞ্চ সম্বলিত খেলার মাঠ ভাড়া দিয়ে কর্তৃপক্ষ বছরে বড় ধরণের আয় করতে পারে। শুধু তাই নয়, আয়ের পাশাপাশি কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠান করার জন্য কাতারে উপযুক্ত মিলয়াতনের যে সঙ্কট চলছে, তারও একটা সুরাহা হতে পারে।
এ নিয়ে বহু পত্রিকায় লেখালেখি করেছি। কমিউনটির নেতৃবৃন্দ এবং কর্তৃপক্ষে সাথেও কথা বলেছি। তাতে তেমন কোনো লাভ হয়নি। তবে স্কুলের নতুন পরিচালক স্কুলের দায়িদ্ব নেওয়ার পর এই প্রসঙ্গে কর্তৃপক্ষের মনোভাবের পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। স্কুলের মাঠ ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন নতুন পরিচালক। উপরন্তু, ৫০-১০০ জন মানুষ বসার উপযোগী একটি স্কুল কক্ষও শর্ত সাপেক্ষে কমিউনিটির ছোটোখাট অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহারের অনুমতি দেবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। এটা সবার জন্য সুখবরই বটে!
১৬ আগস্ট, ২০১৮
