শিরোনাম দেখে মনে হতে পারে, এ আবার কেমন কথা? জীবন তো মানুষের থাকে একটাই। কিন্তু গেলো ডিসেম্বরের ১১ তারিখের পর মনে হয়েছে আমাকে তৃতীয়বারের মতো জীবন শুরু করার সুযোগ দিলেন মহান বিধাতা।

১৯৯১ সালে সিডনিতে এক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ি। তখন আমার বেঁচে থাকাটাই ছিলো একটি অলৌকিক ঘটনা। চার-পাঁচটি ভাঙা হাড় ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ১৮-২০টি স্টিচ নিয়ে সে যাত্রায় মোটামুটি বেঁচে যাই। সেই দুর্ঘটনার পর মনে হয়েছে, আমি যেন দ্বিতীয় জীবনে পা রাখছি। তবে মাত্র কদিন আগে দোহায় আমার দ্বিতীয় জীবনেরও সমাপ্তি ঘটতে পারতো। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছে ছিলো অন্য রকম।

দোহায় এখন শীত চলছে, তাই আমি বরাবরই খুব প্রয়োজন না হলে গাড়িতে না চড়ে হেঁটে চলার চেষ্টা করি, যাতে একটু শরীরচর্চাও হয়ে যায়। সেদিন ছিলো বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০০৮। ঈদের ছুটি চলছে। সন্ধ্যায় ন্যাশনাল এলাকার টিঅ্যান্ডটি (এখানে QTel বলা হয়) অফিসে গেলাম টেলিফোন লাইন ও ইন্টারনেটের খোঁজ নিতে। ব্যস্ত শপিং এলাকা। চারদিকে মানুষ গিজগিজ করছে। সামনে একটি T-juction। দুই লেনের রাস্তার অর্ধেকটা পার হয়ে ট্রাফিক লাইটের পাশে সড়কের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আছি বাকি রাস্তাটুকু পার হবো বলে।

T-juction-এ সড়কের গাড়িগুলো একে একে বাঁক নিচ্ছিলো। গাড়িগুলোর বাঁক নেওয়া প্রায় শেষ। তবে শেষের গাড়িটার দিকে আমার চোখ ছিলো। ভাবছিলাম ওটা চলে গেলেই পার হবো রাস্তা। সেই চোখ রাখাটাই যেন জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য করে দিলো। দেখি ওই গাড়ি আচমকা বেঁকে গিয়ে আমার দিকে দানবের মতো ছুটে আসছে। অনেকটা আমার অজান্তেই আমি গাড়িকে এড়ানোর জন্য কয়েক সেন্টিমিটার সরে দাঁড়াই। কিন্তু গাড়িটা আমাকে ধাক্কা দিয়ে অন্য লেন পার হয়ে বিকট আওয়াজ করে ফুটপাতের রেলিংয়ে আঘাত করলো। আমি রাস্তায় ছিটকে পড়লাম।

মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে গেলো সবকিছু। হাতের ডান বাহুতে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছি। মনে হলো, হাতটা ভেঙে গেছে। হাঁটু ও অন্য হাতের কনুই থেকে রাস্তায় ঘষা খেয়ে রক্ত ঝরছিলো। আমি আমার ডান হাতটাকে বুকে চেপে রেখে রাস্তার মাঝখানে বসে থাকি। আমি যদি কয়েক চুল সরে না যেতাম, তাহলে গাড়িটা সরাসরি আমার বুকে আঘাত করার কথা। যার পরিণতি ছিলো অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু। আর তা না হলে এই পরিস্থিতিতে মারাত্মক আঘাত পাওয়াটা ছিলো খুবই স্বাভাবিক।

মুহূর্তের মধ্যে আমার চারপাশে প্রচণ্ড ভিড় জমে গেলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে ঘিরে থাকা জনতাকে বললাম পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পথচারী মোবাইল থেকে টেলিফোন করে দিলো। একজন আমাকে পানি এনে দিলো। কেউ জিজ্ঞেস করছিলো আমি কোত্থেকে এসেছি? কেমন বোধ করছি? আশপাশের পথযাত্রীর সহানুভূতি ও মানবতাবোধ আমাকে অভিভূত করলো। অন্য একজন আমার কাছে এসে বললো, ‘দোহায় আমার কোনো আপনজন আছে কি না, যাকে খবর দেওয়া যায়?’ এই প্রশ্ন শুনে আমার বুকের মধ্যে নীরব রক্তক্ষরণ শুরু হলো। কার কথা বলবো? দোহায় যে আমার কাছের কেউ নেই, তা বলতেও কেন জানি বাঁধলো। কেমন এক শূন্যতাবোধ আমার ঘা খাওয়া শরীরটাকে আরও অবশ করে দিলো। রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কজন ধরাধরি করে আমাকে ফুটপাতে নিয়ে গেলো।

ইতিমধ্যে এক পাকিস্তানি প্রবীণ ভদ্রলোক পুরো পরিস্থিতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিলেন। তিনি মানুষকে ভিড় না করে জায়গা করে দিতে বললেন, যাতে আমার কাছে হাওয়া আসে। তিনি বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন সবাইকে সরে যেতে আর আমার কাছে এসে সাহস দিয়ে বলছিলেন, সহসাই অ্যাম্বুলেন্স চলে আসছে, চিন্তার কারণ নেই। এই জায়গায় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পার্থক্য অনুভব করলাম। পথচারীদের এমন আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ওই সব দেশে পাওয়া যায় না।

কুড়ি মিনিটের মধ্যেই পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স হাজির। যা আমাকে রীতিমতো অবাক করলো। আমি ভাবছিলাম না জানি কতক্ষণ এভাবে ফুটপাতে পড়ে থাকতে হবে। অ্যাম্বুলেন্স অফিসার সাবলীল ইংরেজিতে আমার কুশলাদি জেনে স্ট্রেচারে তুলে দিলেন। গলায় কলার গার্ড পরিয়ে দেওয়া হলো। ওই প্রবীণ পথচারী ও আরেকজন সম্ভবত ভারতীয়, রাস্তায় পড়ে থাকা আমার শপিং ব্যাগটা সযত্নে কুড়িয়ে নিয়ে আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা পর্যন্ত সঙ্গে থাকলেন। কৃতজ্ঞতায় মনটা নুয়ে এলো। গাড়ি চালাবার সময় রাস্তার আইন অমান্য করার জন্য দোহার সাধারণ জনতার ওপর আমি বেশ বিরক্ত ছিলাম। কিন্তু ওদের হৃদয়ের গহিনে মানবতার যে নিয়ন বাতি জ্বলছে, তা দেখার পর মনে মনে তাদের স্যালুট দিলাম।

প্রচণ্ড ট্রাফিকের ভিড় চিরে অ্যাম্বুলেন্স এগিয়ে যাচ্ছিলো। স্ট্রেচারে শুয়ে ব্যথায় নীল হচ্ছিলাম আমি। মনে হচ্ছিলো, শীতের হলুদ পাতার মতো ঝরে পড়বো যেকোনো মুহূর্তেই। ধমনির উত্তপ্ত বালুচরে শুরু হয়ে গেছে সাইমুম ঝড়, শুনতে পেলাম বিপৎসংকেত। তবে চোখ দুটো বুজতেই মনের প্লাজমা ভিশনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম ১৯৯১ সালের সিডনির সেই ত্বরিত মুহূর্তগুলোকে। পার্থক্য শুধু স্থান আর কালের। তখনো শুয়ে ছিলাম অ্যাম্বুলেন্সে। পাশে ছিলো না কোনো আপনজন। ছিলাম বড়ই একা। পাশে এমন কেউ ছিলো না, যার দুই চোখ বেয়ে আমার জন্য ঝরে পড়বে কয়েক ফোঁটা নোনা অশ্রু। আজ প্রায় ১৭ বছর পর দোহায় প্রায় একই ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালের পথযাত্রী আমি। আবারও একা, ভীষণ একা।

মনে হচ্ছিলো, ১৯৯১ সালে একজন মামুন হারিয়ে গেলেও হয়তো পৃথিবীর তেমন কিছু এসে যেতো না। তবে একজন মামুনের এখন চলে যাওয়াটা হয়তো বিধাতাও মেনে নিতে পারেননি। আমার স্ত্রী সেলি আর কন্যা মুনিরার কথা ভাবতেই মনটা শিউরে উঠলো। আমার পরিবারের দোহায় আসার প্রস্তুতি প্রায় শেষ। দোহায় চাকরির বয়স মাত্র ছয় মাস। না না, এসব কিছু আর ভাবতেই পারছিলাম না। সবকিছু এলামেলো হয়ে যাচ্ছিলো। বিধাতা বোধ হয় এবার আমার সবচেয়ে প্রিয় দুজন মানুষের নিদারুণ লোকসানের কথা ভেবে আমাকে আবারও জীবন দিলেন।

হাসপাতালে চলে এলাম। নাম আল-হামাদ হাসপাতাল। দোহার সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল। জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হলো। আমার আগে আরও রোগী ছিলো। কিন্তু আধা ঘণ্টার মধ্যেই আমার ডাক পড়লো। সিস্টার আমার ক্ষত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে টিটেনাস দিয়ে দিলেন। ডাক্তার আমাকে পরীক্ষা করলেন। ডাক্তারের নাম ইউসুফ, সম্ভবত সুদানের। হাসিখুশি আর ইংরেজিতে সাবলীল, ফলে কথা বলতে অসুবিধা হলো না। মনোযোগ দিয়ে আমার ডান হাত-পা পরীক্ষা করে বললেন, তেমন কোনো অসুবিধা নেই। তবু এক্স-রেতে পাঠাতে বললাম। ঝটপট এক্স-রে সেরে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই রিপোর্ট পরখ করে আমাকে বিদায় করা হলো। রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত পুরো ব্যাপারটা যে দক্ষতা ও গতিতে সম্পন্ন করা হলো, তা দেখে আমি রীতিমতো মুগ্ধ। সিডনির যেকোনো হাসপাতালে এর চেয়ে যে অনেক বেশি সময় লাগতো, সেটা নিশ্চিত।

এর মধ্যে পরিচয় হয়েছিলো ফারুক নামের একজন বাঙালির সঙ্গে। আরবি শিক্ষার ক্লাসে ফারুকের সঙ্গে আমার পরিচয়। আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। বাড়ি মীরসরাই। কাতারে এসেছে আমার মাসখানেক আগে। দোহার গ্র্যান্ড হোটেলে রিসেপশনে চাকরি করে। ফারুকের ছোট ভাইও তার সঙ্গে একই হোটেলে রয়েছে। আমার বাসার কাছাকাছি আল-মনসুুরাতেই তাদের বাসা। ফারুক মাদ্রাসার ছাত্র হওয়ার সুবাদে অনেক আরবি শব্দ তার জানা। আরবি ক্লাস শেষে আমরা প্রায়ই একসঙ্গে হেঁটে বাসায় আসি। ফারুকের ভদ্রতা, আতিথেয়তা, উদারতা ও সাধারণ জ্ঞান সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। আমাকে প্রায়ই জোরাজুরি করে ওদের বাসায় খেতে নিয়ে যেতো।

ছোট ভাই ইউসুফ খুবই ভালো রাঁধুনি। বড্ড যত্ন নিয়ে রান্না করে। ওর হাতের মাংস, মাছ রান্না অসাধারণ। দুর্ঘটনার ঠিক ২০ মিনিট আগে ফারুক টেলিফোন করে বলেছিলো, ‘ভাই, আপনার তো এখন ছুটি, চলে আসুন না আমাদের সঙ্গে খাবেন!’ আমি অমত করিনি। এর মধ্যে তো ঘটে গেলো এই অঘটন। তাই আমি টেলিফোন করে ওদের সব বললাম। বলতেই আমার নিষেধ সত্ত্বেও ওরা সঙ্গে সঙ্গেই ট্যাক্সি নিয়ে হাসপাতালে চলে এলো আমাকে দেখতে। সঙ্গে করে ওদের বাসায় নিয়ে গেলো। আমি অনেক বলার পরও আমাকে ট্যাক্সি ভাড়া দিতে দিলো না।

আয় ও সামর্থ্য অনুযায়ী ট্যাক্সি ভাড়াটা ওদের জন্য ছিলো বিলাসিতা। কিন্তু নিজেদের সামর্থ্যরে সীমানা ডিঙিয়ে মানুষকে সাহায্য করার মানসিকতা দেখে আমি সত্যিই অবাক হলাম। নিঃশব্দে ধন্যবাদ জানালাম ফারুক আর ইউসুফকে। মনে হলো, নিজেকে যতটা একা ভেবেছিলাম ততটা একা আমি নই।

ডিসেম্বর, ২০০৮