মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে কাতারের বাংলাদেশ কমিউনিটির তিন জন সদস্য পাড়ি জমালেন পরপারে। এঁরা হলেন – কুলাউড়ার আহমদ জাহেদ, ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হাছান শহীদুল হক এবং নোয়াখালী মাইজদীর ফরহান হোসেন। আহমদ জাহেদ কাতারের বাংলাদেশ কমিউনিটির একজন সক্রিয়, উদ্যমী, ও পরিচিত মুখ ছিলেন। বিভিন্ন কমিউনিটি এবং আঞ্চলিক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। সামাজিক কর্মকান্ডের সুবাদে কাতারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই জাহেদকে তাদের খুব কাছের মানুষ বলে গন্য করতেন । অপরিণত বয়সে আহমেদ জাহেদের চলে যাওয়াটা তাই সবাইকে যারপরনাই ব্যথিত করেছে।

এই পার্থিব সংসারে আমাদের আসা এবং চলে যাওয়াটা নির্ধারিত করে দেন স্বয়ং বিধাতা। এতে কারো হাত নেই। বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন গড়ে দেড় লাখেরও বেশী মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। যে সব মানুষ সবকিছু ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমাচ্ছেন, নিজের পরিবার-পরিজন ছাড়া সবার কথা কি কেউ মনে রাখে? তবে দুই একজন ব্যতিক্রমী কীর্তিমান মানুষ যারা আত্মস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সমাজের জন্য, মানুষের কল্যানের জন্য কাজ করেন, মৃত্যুর পরও তাঁরা বেঁচে থাকেন মানুষের হৃদয়ে। তাই বিধাতা আমাদের কেনো এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, সে নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত হবে। আত্মকেন্দ্রিক হয়ে কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা কিংবা নিজের স্বার্থরক্ষা মানব জীবনের লক্ষ্য হতে পারেনা। সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারলেই সার্থক হয় মানুষের জীবন। সবার সঙ্গে, সবার জন্য বাঁচাটাই হল যথার্থ বাঁচা।

সম্প্রতি বিদেশিদের জন্য কাতারে স্থায়ী আবাসন সুবিধা এবং “এক্সিট পারমিট” বা বর্হিগমন ছাড়পত্র সংক্রান্ত নতুন আইনের অনুমোদন দিয়েছেন কাতার সরকার। প্রথমে আবাসনের কথাই ধরা যাক। মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রথম কোনো দেশ বিদেশিদের স্থায়ী অভিবাসনের এই সুযোগ দিল। মধ্যপ্রাচ্যের প্রেক্ষাপটে এই আইনকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলা যায়। তবে সাধারণ প্রবাসী বাংলাদেশিরা অভিবাসন আইনের কতটা সুফল পাবেন, সে নিয়ে কিছু সংশয় রয়েছে।

আনুমানিক সত্তর দশকের গোড়ার দিকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা কাতারে পাড়ি জমাতে শুরু করেন। বর্তমানে সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশিদের স্থান ভারতীয় এবং নেপালিদের পরে হলেও, প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধিকাংশ বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক হিসাবে কাজ করেন। ফলে অভিবাসী কোটায় বাংলাদেশিদের স্থান করে নেয়াটা খুব একটা সহজ হবেনা বলেই মনে হয়। কাতারে সামরিক বাহিনী, পুলিশ, আমিরি দেওয়ানসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে যেসব প্রবাসী কাজ করছেন, অভিবাসী হবার প্রক্রিয়ায় তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে ।

মিশর, সিরিয়া, সুদান, লেবাননের মতো আরবি ভাষাভাষী দেশের প্রচুর নাগরিক কাতারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কাজ করছেন। কাতারে জন্মগ্রহন করা তাদের সন্তান-সন্ততিও কাতারে বড় হচ্ছে। তাই অভিবাসনের তালিকায় এদের ডিঙিয়ে যাওয়াটা সহজ হবেনা। এছাড়া আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দেশের মধ্যে ভারতীয় এবং বিশেষ করে বহু প্রবাসী পাকিস্তানী পুলিশ, সামরিক বাহিনী, এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করছেন। আরবি ভাষায় তাদের ভালো দখল থাকায় তারা এসব কাজে তারা অগ্রাধিকার পাচ্ছে। আমার মনে হয়, যেসব কাতারী নাগরিক বিদেশিদের বিয়ে করেছেন তাদের এবং তাদের সন্তানদের কথা মাথায় রেখেই আপাতত এই আইন করা হয়েছে। এজন্য সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত অর্র্থাৎ বছরে ১০০ জনের কথা বলা হয়েছে। এতে কাতারের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অভিবাসীদের ভূমিকা রাখার দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনার চোখে পড়ছেনা।

স্থায়ী আবাসনের সুবিধাপ্রাপ্ত প্রবাসীরা চাকুরী, শিক্ষা ও স্বাস্থ খাতে স্থানীয় নাগরিকদের মতো বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা পাবেন। তাঁরা নিজের নামে বাড়ী কেনা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বানিজ্যও চালাতে পারবেন। আমার জানা মতে, নিজের স্পন্সর বা মালিকের সাশে সুসম্পর্ক আছে এমন বহু প্রবাসী বাংলাদেশি স্থায়ী অভিবাসী না হয়েও কাতারে বাড়ী বানিয়ে পরিবার নিয়ে থাকছেন।

বিশ্বের বহু উন্নত দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আশঙ্কাজনক হারে কমতে শুরু করেছে। ওইসব দেশের অধিকাংশ উন্নয়নের কাজ নাগরিকদের দেয়া আয়করের অর্থ দিয়েই সম্পন্ন করা হয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানীর মতো দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠির একটি বিশাল অংশ এখন বুড়িয়ে যাচ্ছে। তারা খুব সহসা কাজ থেকে অবসরে যাবেন। যেমন জার্মানীর জনসংখ্যার ২২ শতাংশ নাগরিকের বয়স এখন ৬৫ বছর। তাই এই সব দেশে বিভিন্ন খাতে জনশক্তির ঘাটতি পূরণের জন্য প্রতিবছর পরিকল্পিত হারে অভিবাসি গ্রহন করা হয়ে থাকে।

কাতারের অর্থনীতি এখনো বলতে গেলে পুরোপুরি জ্বালানী নির্ভর। তেল এবং গ্যাস থেকে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে আরো বহুদিন বিদেশ থেকে জনশক্তি আমদানি করে দেশের চাহিদা মিটাতে পারবে কাতার। এজন্য ব্যক্তিগত আয়ের উপর শুল্ক আরোপের কথা এখনও শোনা যাচ্ছেনা। তাই খুব সহসা বড় সংখ্যায় আভিবাসী নেবার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখছিনা।

কাতারে এক্সিট পারমিট বা বর্হিগমন ছাড়পত্র কার্যকর হয়েছে ২৮ অক্টোবর, যা অভিবাসীদের কাছে খুরুজ হিসাবে পারিচিত। এখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড়পত্র না নিয়েই বেসরকারী খাতের প্রবাসী কর্মীরা কাতার ত্যাগ করতে পারবেন। কয়েক দিনের মধ্যে বেশ কিছু শ্রমিক খুরুজ ছাড়াই কাতার ত্যাগ করেছে জানতে পেরে ভীষণ খুশী হয়েছি। কাতার ত্যাগের জন্য কারো খুরুজ লাগবে কিনা সেটা কাতার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ওয়েবপেজে গিয়ে এখন খুব সহজেই জানা যায় ।

তবে বেশ কিছু প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ বিষয়ে সংশয় এখনো দূর হয়নি। তাঁরা এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে তাঁদের কর্মচারীরা এখন ব্যাংকের দেনা শোধ না করে কিংবা কোম্পানীর অর্থ আত্মসাৎ করে খুব সহজে কাতার থেকে পালিয়ে যেতে পারবেন। তবে এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। এক্সিট পারমিট বাতিল হওয়ার আগেও অর্থ আত্মসাত করে পালিয়ে যাওয়ার মত বহু ঘটনা ঘটেছে। এই তো মাত্র কিছুদিন আগে, কোয়ালিটি সুপার মার্কেটের বিশাল অঙ্কের অর্থ নিয়ে ওই কোম্পানীর ব্যবস্থাপকের গোপনে কাতার ছেড়ে যাওয়ার কথা কারো অজানা নয়। তার মানে খুরুজের মতো প্রতিবন্ধকতা রেখেও প্রতারকদের থামান সম্ভব নয়।

অন্যদিকে এক্সিট পারমিটের সুযোগ নিয়ে প্রবাসী কর্মীরা যেরকম হয়রানির শিকার হচ্ছিল, তা ছিল অমানবিক এবং এতে কাতার সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুন্ন হচ্ছিল। বিশ্বায়নের এই যুগে কাতার কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্বের উন্নত দেশে এক্সিট পারমিট বলতে কিছুই নেই। আর তাই যদি হতো, এক্সিট পারমিট নেই এমন সব দেশের ব্যাংক এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের তহবিল শূন্য হয়ে যেতো।

কাতারের বর্হিগমন ছাড়পত্র আইনে কোম্পানীর স্বার্থ রক্ষার জন্য পাঁচ শতাংশ কর্মীর এই দেশ ছাড়ার আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অর্থাৎ যে প্রতিষ্ঠানে ১০০ জন কর্মী রয়েছে, সেখানে কোম্পানীর পছন্দমাফিক পাঁচ জনের ছাড়পত্র লাগবে। সাধারনত হিসাব ও বিক্রয় বিভাগের মাধ্যমেই চলে কোম্পানির আর্থিক লেনদেন। তাই এসব বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত কিছু কর্মচারীর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অযাচিত দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

বর্হিগমন ছাড়পত্র বাতিলের আইন কার্যকর হবার ফলে কাতারে কর্মরত অভিবাসী জনশক্তি বেশ লাভবান হবেন। আশা করছি, এখন থেকে দেশে যাবার আগে বর্হিগমনের ছাড়পত্রের জন্য অযথা কাঠখড় পোহাতে হবেনা বাংলাদেশী অভিবাসীদের।

 

৭ নভেম্বর, ২০১৮