স্বদেশ থেকে মন্ত্রীর আগমন প্রবাসি বাংলাদেশিদের উচ্ছ্বসিত করে তোলে। অনেকে তাদের দলীয় নেতাকে কাছ থেকে দেখার জন্য থাকেন উদগ্রীব। তিনি যদি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী হন, তাহলে তো কথা-ই নেই। বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত অনেকে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীর মুখ থেকে আলোকিত বাণী শুনবেন, তাদের অন্ধকারে পথ দেখাবেন, সেই আশায় দিন গুনতে থাকেন।

কাতারে এ পর্যন্ত দুই জন প্রবাসীকল্যান মন্ত্রীর সাথে একান্তে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। একবার একজন মন্ত্রীর কাছে প্রবাসে জনশক্তি পাঠানোর আগে তাদের কিছ’ ট্রেনিং দেয়ার সুপারিশ করেছিলাম। কথা শুনেই তিনি রীতিমত জ্বলে উঠে বললেন, “আপনি কি জানেন না, এ ধরনের ট্রেনিং কেন্দ্র দেশে রয়েছে?” আসলে সেই কথা জানা থাকলে আমি সুপারিশই করতাম না। ভাবছিলাম, গনমাধ্যমে এই ট্রেনিং কেন্দ্রের অস্তিত্ব সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রচারের ব্যবস্থা করলে হয়তো আমার মতো অনেকেই জানতে পারতো। সরকারের এমন অনেক ভালো উদ্যোগের কথা জনগন জানেনা বলেই অনেকেই সরকার প্রদত্ত সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে দেশের সন্মুখযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

৮ মার্চ বাংলাদেশ কমিউনিটি কাতারের অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন সদ্য নিযুক্ত প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমেদ। ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ঝানু রাজনীতিবিদ তিনি। নতুন এসেছেন মন্ত্রীসভায়। প্রবাসীদের জন্য নতুন বার্তা বয়ে আনবেন। সেই আশায় অনুষ্ঠানে প্রবাসী জনগোষ্ঠির পক্ষ থেকে মন্ত্রীর কাছে বেশ কিছু দাবী পেশ করা হয়। এর মধ্যে কাতার প্রবাসীদের জন্য একটি কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, স্বল্প শুল্কের বিনিময়ে প্রবাসীদের গাড়ী দেশে নিয়ে যাওয়ার সুবিধা, স্বল্প সুদে এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা, প্রবাসীদের জন্য পেনসন, বীমা, পারিতোষিক তহবিল, কাতার দূতাবাস থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান এবং প্রবাসীদের ভোটাধিকার ইত্যাদি ছিল উল্লেখযোগ্য।

প্রবাসে বসে জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করা এবং জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়া, এই দুইটি দাবী নিয়ে বহুদিন ধরে সোচ্চার প্রবাসীরা। কিন্তু মন্ত্রী মহোদয় প্রবাসীদের দাবী জানানোর বিষয়টি পছন্দ করেননি, তিনি তাঁকে দাবী না জানিয়ে অনুরোধ করতে বললেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যদের প্রাপ্তির কলস কতটুকু পূর্ণ হয়েছে জানিনা, সত্যি বললে কি, সেই রাতে ভগ্ন হৃদয় নিয়ে আমি বাড়ী ফিরেছি।

প্রবাসীদের কাছে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী হলেন তাঁদের অভিভাবক, কাছের মানুষ। আপন জনের কাছেই তো জোর গলায় কোনো কিছু দাবী করা যায়। এতে অসন্মানের কিছু আমি দেখি না। মনে পড়ে, একবার কাতারের শেরাটন হোটেলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনকে কমিউনিটির পক্ষ থেকে ৩৬ টি দাবী পেশ করা হয়। সব শুনে তিনি হেসে দিয়ে বলেছিলেন, “দেখুন, দাবীর তালিকা একটু লম্বা হয়ে গেলোনা? মনে রাখবো কি করে? তবে আমি আমার ব্যক্তিগত সহকারীকে বলেছি সব টুকে নিতে। সময় করে আপনাদের দাবী-দাওয়া গুলো পড়ে দেখবো”। তবে তিনি দাবী-দাওয়াগুলো মনযোগ দিয়ে শোনেন এবং কাতারের বাংলাদেশিদের দাবীর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি বাংলাদেশ স্কুলের জন্য বড় অঙ্কের অনুদান ঘোষণা করেন।

কমিউনিটির দাবীর সাথে সমর্থন জানিয়ে কাতারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাস্ট্রদূত আসুদ আহমদও কিছু দাবী-দাওয়ার কথা তুলে ধরেন মন্ত্রীর কাছে। এটা ছিল আমাদের সবার জন্য খুবই আশাব্যাঞ্জক। ভেবেছিলাম এজন্য মন্ত্রী উচ্ছ্বসিত হবেন এই ভেবে যে, প্রবাসীদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য দূতাবাস ও কমিউনিটি যুগপৎ কাজ করছে। কিন্তু উল্টো, রাস্ট্রদূত বাংলাদেশ কমিউনিটির রাষ্ট্রদূত দাঁড়াচ্ছেন কিনা সে নিয়ে কৌতুক করলেন – যা প্রথমে সবার মধ্যে হাস্যরসের অবতারণা করলেও বারবার একই প্রসঙ্গ টেনে আনায় সেটা আর কৌতুক বলে মনে হয়নি।

এ ছাড়া প্রবাসে পাসপোর্ট করার জন্য যে জাতীয় পরিচয়পত্রের দরকার হয়না, এই বিষয়টি সম্পর্র্কে তাঁর অজ্ঞতা আমাকে বিস্মিত করেছে। তবে তিনি প্রবাসীদের দাবীগুলো লিখিতভাবে দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন যাতে মন্ত্রণালয় উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে। বাংলাদেশ কমিউনিটি কাতার নেতৃবৃন্দ দূতাবাসের মাধ্যমের প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় দাবীগুলো সহসা লিখিতভাবে পাঠানোর কথা ভাবতে পারে।

মন্ত্রী নতুন এসছেন। সবকিছু বুঝে নিতে তাঁকে একটু সময় দিতেই হবে। তবে একটা বিষয় আমার ভালো লেগেছে। তা হল, পাল্টি খাওয়া রাজনীতিবিদদের মতো জনতাকে খুশী করার জন্য তিনি আমাদের মিথ্যে আশ্বাস দিতে চান নি, যেটা তার সাধ্যের মধ্যে কেবল সেটা করারই প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন। আমার বিশ্বাস, প্রবাসীদের জন্য তিনি ভালো কিছ’ করবেন।

বাংলাদেশে কাতার কমিউনিটির অনুষ্ঠানে কাতারের স্বরাষ্ট্র এবং এবং শ্রম মন্ত্রলালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের স্বতঃস্ফ’র্ত উপস্থিতি খুবই আশাব্যঞ্জক। এই ধরনের অনুষ্ঠান কাতারি কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি উন্নয়নের জন্য বড় ভ’মিকা রাখবে। তবে আগামীতে অনুষ্ঠানে খাবার সরবরাহ এবং অতিথিদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ব্যপারে আরো সচেতনতা আশা করছি।

 

২১ মার্চ, ২০১৯