বছর ঘুরে যখন রমজান আসে, তখন এক ধরণের স্বর্গীয় ভালো লাগায় মনটা ভরে ওঠে। রমজানের পবিত্রতায় যেনো সাফ হয়ে যায় কলুষিত মন। বিশ্বের দেশে দেশে ছড়িয়ে আছে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন মুসলিম। রমজানের বিধান সব মুসলিমের জন্য এক হলেও সামাজিক আচার, দৈনন্দিন জীবন যাপনের ধরণ এবং খাদ্যাভাসের জন্য পবিত্র রমজান মাস দেশে দেশে ভিন্ন আঙ্গিকে উদযাপিত হয়। কাতারের রমজানও তাই স্বতন্ত্র বৈশিষ্টে উজ্জ্বল। মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশে এখন চলছে গ্রীষ্মকাল। গ্রীষ্মের প্রচন্ড তাপদাহের মধ্যে কাতারে রমজান পালন করছেন সবাই।

রমজান মাসে কাতারের অফিস-আদালতে সকাল আটটার পর থেকেই কাজ শুরু হয়। কাজের সময় হচ্ছে বেসরকারী সেক্টরে সর্বোচ্চ ছয় ঘন্টা আর সরকারী মন্ত্রণালয়ে পাঁচ ঘন্টা। কন্সট্রাকশন সাইটে খুব ভোরে কাজ শুরু হয়ে ১১টার মধ্যেই শেষ। অন্যদিকে রাতেও একটা শিফ্ট হয়। দোকানপাট রাত অটটা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। রাত দশটার পরই যেনো দোহা শহর জেগে ওঠে। জমে ওঠে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও শীশা খানা। ফার্ষ্ট ফুডের দোকানগুলো আয়োজন করে বিশেষ ইফতারের। রমজান শেষে ঈদের সময় সরকারী আফিসগুলো টানা এক সপ্তাহ বন্ধ থাকে।

কাতারে বাংলাদেশিরা রমজান পালন করেন অনেকটা দেশীয় আমেজে, ইফতার করেন দেশীয় খাবার দিয়েই। বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্তোরাঁয় দেশীয় ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখেই নানা পদের ইফতারি বানানো হয়। অনেক রেস্তেরাঁর সামনেই ইফতারের পসরা সাজিয়ে রাখা হয়। যেখানে থাকে খেজুর, জিলাপি, জুস, শরবত, হালিম, ছোলা মুড়ি, পিয়াজু, বেগুনি, চপসহ নানা ধরণের খাবার। ইফতারি কেনার জন্য বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় রাস্তায় জমে যায় ভীড়। বাংলাদেশি কম্যুনিটির সংগঠনগুলো এসব রেস্তেরাঁয় কিংবা মসজিদে কম্যুনিটি ইফতার পার্টির আয়োজন করেন। কর্পোরেট ইফতার পার্টি চলে ফাইভ ষ্টার হোটেলে। এভাবে রমজানের পুরো মাস জুড়ে কাতারে বিরাজ করে আনন্দ ও উৎসবের আবহ ।

বড় বড় সব হোটেলেই ইফতারের জন্য তৈরী করা হয় বিশাল রমজান ট্যান্ট। গ্রাহকদের আকর্ষণ করার জন্য রমজানের থিম নিয়ে অসাদারণ সাজে সাজানো হয় রমজান ট্যান্ট। খাবারের পাশাপাশি মঞ্চেয যন্ত্রীরা বাজায় হাল্কা ঢংয়ে আরবী গীতবাদ্য। কোনো কোনো জায়গায় থাকে তুর্কি আধ্যাত্মি সুফি নৃত্য। এসব ট্যান্টে ইফতার ছাড়াও থাকে সহুরের আয়োজন। অর্থাৎ ইফতারের পর সহুরের খাবারও পরিবশেন করা হয়।

ইদানিং রমজানের সময় বাড়ী বাড়ী ক’পরিবার মিলে আয়োজন করা হচ্ছে সহুর পার্টি। তারাবী নামাজের পর গল্পগুজব সেরে সহুর খেয়ে তবেই সাবই বাড়ী ফেরে। এভাবে পালাক্রমে বিভিন্ন বাড়ীতে চলে সহুরের আয়োজন।

দোহার সব মসজিদে তারাবীর নামাজ পড়ানো হয়। তবে পবিত্র কোরআন খতম করে তারাবি পড়নো হয় এমন মসজিদের সংখ্যা আগের চেয়ে এখন অনেক কমে গেছে। খতম তারাবীর কথা বলতে গেলে মুশাইরিব এলাকার বুখারী মসজিদের কথা বলতেই হয়। ওই মসজিদের বাংলাদেশি ইমাম মওলানা ওবায়দুল্লাহ সাহেবের সুললিত কন্ঠের সুস্পষ্ট কুরআন তেলাওয়াত তারাবী নামাজের একটি বাড়তি পাওনা বলেই মনে হয়।

রমজান মাসে স্থানীয় কাতারী নাগরিক এবং ধনী শেখেরা অকুন্ঠচিত্তে দান খয়রাত করেন। প্রতিটি মসজিদে বাংলাদেশের মতো মহল্লাবাসীরা ইফতারী ও খাবার সরবরাহ করেন। আমি একটি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর কথা জানি যেখানে রমজান মাসের ত্রিশ দিন বিনামূল্যে সাবইকে ইফতারী পরিবেশন করা হয়। রেস্তোরাঁর কাতারী মালিক ইফতারের যাবতীয় খরচ নিজে বহন করেন। তিনি এটা যাকাত নয় বরং বাড়তি সওয়াবের জন্যই নাকি করেন।

এছাড়া কাতারে সরকারী উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় শীততাপ নিয়ন্ত্রিত তাবুতে ব্যাচেলর, শ্রমিক এবং নিম্নবিত্ত প্রবাসীদের জন্য ইফতারে আয়োজন করা হয়। এটা সবার জন্য থাকে উন্মুক্ত, ফলে অনেক অমুসলিমও এই ইফতারে শরীক হন। ইফতারীর জন্য খেজুর, পানীয় ছাড়াও বড় থালাতে পোলাও-এর সাথে মুরগির রোষ্ট কিংবা আরবী ষ্টাইলে রান্না করা মাটনের তরকারী দেয়া হয়। থালাতে যে পরিমান খাবার পরিবশেন করা হয় তা নূন্যতম চারজন থেকে ছয় জন রোজাদার খুব সহজে পেট পুরে খেতে পারবেন।

কাতারে প্রতি রমজান মাসের একটি দিন আমি ওই তাবুতে যেয়ে আম-জনতার সাথে ইফতারী করি। এবার বেশ কয়েকজন বন্ধুকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম ওয়াকরা কাছে একটি তাবুতে। তাবুর ভেতর ঢুকে দেখি হাউজ ফুল। চেহারা দেখে ও কথা শুনে মনে হলো রোজাদরদের অধিকাংশই হলো বাংলাদেশি। কোথাও বসার চেষ্টা করছিলাম। বেশ কিছু থালাতে দেখি মাত্র তিনজন করে বসে আছে। ওখানে বসতে চাইলে ওরা বলছিলেন, ভাই বসা যাবেনা, এই জায়গার মানুষটি একটু বাইরে গেছেন এখনই এসে পড়বেন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, পরে দেখলাম তাদের ভাষ্যমত যিনি বাইরে গেলেন তিনি আর ফিরে আসলেন না। তারা হয়তো ভাবছিলেন, যে খাবার রয়েছে তা হয়তো তিনজনের জন্য যথেষ্ট নয়। বাড়তি কেউ বসলে হয়তো খাবারে ঘাটতি পড়ে যাবে। অথচ থালাতে যে কবার রয়েছে তা পাঁচজন রোজাদার খেতে পারবে।

যাইহোক খুব জড়সড় হয়ে একটা থালার পাশে বসে পড়লাম। ওখানে বসা বাকী চারজন বাংলাদেশি তেমন একটা কিছু বললেন না। অবাক হয়ে দেখলাম, বেশ কিছু মিসরী ও আরব মাত্র দু’জন করে খাবারের থালা দখল করে আছে। ওখানে এমনকি তৃতীয় কাউকেও বসতে দিচ্ছেনা। এসব দেখে বিষন্নতায় ভরে গেলো মন। মনে হলো, আমার পবিত্র উদ্দীপনাতে কেউ যেনো ঠান্ডা জল ঢেলে দিলো। পবিত্র রমজানের মূল মন্ত্র হলো আত্মসংযম, আর রিপুর চাহিদাকে বলিদান দেয়া। কিন্তু পাঁচ তারা হোটলের উচ্চবিত্তের ইফতার পার্টি বলুন কিংবা নিম্নবিত্তের জন্য নির্ধারিত তাবুই হোক; কোথায় খুঁজে পেলামনা রমজানের সহমর্মিতা।

মুসলিম অধ্যুষিত দেশের তুলনায় মুসলিম সংখ্যালঘু দেশে রমজানের আমেজ অনেকটা ভিন্ন। অষ্ট্রেলিয়ার সিডনী শহরের কথাই ধরা যাক। এই শহরের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪.৫ শতাংশ হলো মুসলিম। সিডনীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করার সুবাদে দেখলাম, মুসলিম অধ্যুষিত মহল্লায় না থাকলে রমজান কখন আসে আর কখন আর সেটা বোঝাই মুশকিল। কারণ ওই দেশে রমজান মাসে সবকিছু আগের মতোই চলে। অফিস থেকে বাসায় ফিরতে দেরী হতো বলে প্রায় সিটি ট্রেনে বসেই ইফতারী সেরে নিতাম। সিডনী শহরে রয়েছে ত্রিশটিরও বেশী মসজিদ। মসজিদ কাছে ধারে না থাকলে এলাকার কোনো কম্যুনিটি হল কিংবা স্কুলের ক্লাস রুমে সবাই তারাবীর নামাজ সেরে নেন। নামাজের অনুমতি দিতে কর্তৃপক্ষকে কখনো তেমন বাড়াবাড়ি করতে দেখিনি। বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে সিডনী শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গোটা চারেক মসজিদ। এসব মসজিদে বাংলাদেশ থেকে হাফেজ এনে খতম তারাবীর আয়োজন করা হয়। পাকিস্তানী, আফগানী মসজিদেও একই ধরনের ব্যবস্থা থাকে।

তবে আমার কাছে সবচেয়ে সেরা হলো স্বদেশের রমজান। কোনো কিছুর সাথেই যে এর তুলনা নেই। রমজান মাসে আসলে বিশেষ করে কৈশোরের সেই সোনালী দিনগুলো আমাকে ভীষণ নাড়া দেয়। ভাবি, আহা রমজানের সেই দিনগুলো যদি আবার ফিরে আসতো? কৈশোরে ইফতারির সময়টা ছিল মহেন্দ্রক্ষণ, সবচেয়ে আনন্দের। ইফতারের সময় হলে মহল্লায় বেজে উঠত সাইরেন। কখনো আবার লম্বা বাঁশের ডগায় টাঙ্গিয়ে রাখা হতো লাল রঙয়ের ইলেকট্রিক বাল্ব। ইফতার সময় হলেই জ্বলে উঠতো সেই লাল বাতি। বাতি জ্বললেই বাচ্চা ছেলে মেয়েদের মধ্যে বয়ে যেতো খুশীর বন্যা, শুরু হয়ে যেতো ছুটোছুটি। সবাই দলবেধে গেয়ে উঠতো, “ লাল বাত্তি জ্বাল গেয়া, ইফতারীর টাইম হো গ্যায়া!”

তখন সেহরীর সময় এখনকার মত ছিলনা এলার্ম দেয়া ঘড়ি কিংবা মোবাইল ফোন। কিন্তু তাতে কি ? “মহল্লাবাসী জাগো, সেহরীর সময় হলো” বলে টিনে বাড়ি দিয়ে কিংবা ঘন্টা বাজিয়ে উচ্চ স্বরে পাড়ার অলি-গলিতে হেঁটে হেঁটে স্বেচ্ছাসেবীরা সবাইকে ডাক দিত। শয়ন কক্ষের দেয়াল ভেদ করে ভেসে আসা ক্ষীণ এই ডাক শুনে সবাই সেহরীর জন্য জেগে উঠতেন।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজারের ইফতারী ছিল দেশখ্যাত। চকের রকমারী ইফতারী খাবার জন্য অনেকে মফস্বল শহর থেকে ঢাকায় আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ী যেতেন। চকের ইফতারির বিভিন্ন পদের মধ্যে ছিল বাখরখানি, চাপাতি, নানরুটি, কুলিচা, নানখাতাই, শিক কাবাব, হান্ডি কাবাব, মাছ ও মাংসের কোপ্তা, শামী ও টিকা কাবাব, পরটা, বোগদাদি রুটি, মোরগ কাবাব, ফালুদার শরবত ও নানারকম ফল, পনির, বোরহানি, চাটনি ইত্যাদি। তবে পুরান ঢাকা এখনো ইফতারীর সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেছে।

রমজানের সময় বিভিন্ন ধরনের ইফতারী মাহফিল, পার্টিতে যাই। টেবিলে বিভিন্ন পদের খাবার থাকে রাশি রাশি কিন্তু তাতে খুঁজে পাইনা প্রানের ষ্পন্দন। ছোট্ট বেলার কিংবা কলেজ জীবনের ইফতারের মজার সিকিভাগও মেলেনা এই আয়োজনে।

 

জুন ২০১৯